বেদে নৃগোষ্ঠী : জীবন ও সাহিত্য : তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

বেদে কাব্য- ‘জেক ঘাটে রান পাই/

জারুকঘাটে খাগলাই /

জাংগু কোনো খোগবাড়ি নাইটুক’। /

অর্থাৎ ‘মোরা এক ঘাটেতে রান্ধি-বাড়ি,/আরেক ঘাটে খাই,/মোদের ঘরবাড়ি নাই’। বেদেদের আসলেই ঘরবাড়ি নেই, মাথার ওপর ছাদ নেই, নিজেদের দেশ নেই, সামাজিক সম্মান নেই। তারা নিরন্তর ঘুরে বেড়ায়, রক্তেই যেন ঘুরে বেড়ানোর নেশা। আজ এক জায়গায় তো কিছুদিন পর অন্য জায়গায়। খাদ্য ও বেঁচে থাকার তাগিদে নিত্যাচারে যাযাবর জীবনে অভ্যস্ত- এদের অবস্থা এরা না ঘরকা না ঘাটকা। নৌকাই এদের ঘর ও সম্পদ। একে ঘিরেই আবর্তিত এদের জীবনযাত্রা। এরা নৌকায় ঘুরে বেড়ায় গ্রাম থেকে গ্রাম, বন্দর থেকে বন্দরে। মাঝেমধ্যে স্থলে নোঙর ফেলে টোল/তাঁবুতেও বাস করে। কেউ সঠিক করে বলতে পারে না- এরা কারা! কোথায় তাদের আদি নিবাস। তবে মজার ব্যাপার হলো, এদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, এমনকি সাহিত্যও। অবশ্য তাদের সাহিত্য কোনোভাবেই লিখিত নয়। ফলে তা দুষ্প্রাপ্য। এ বিষয়ে অন্যরা লিখলেও তাদের ভাষায় লেখা নিজস্ব সাহিত্য দুরবিন দিয়ে খুঁজলেও পাওয়া কষ্টকর।

বাঙালির অতি পরিচিত নৃগোষ্ঠী হিসেবে এরা সাধারণ্যে ‘বেদে’ নামে পরিচিত। অনেকে মনে করেন, ‘বেদে’ কথাটি ‘বৈদ্য’-এর বিবর্তিত রূপ -বৈদ্য>বাইদিয়া>বাইদ্যা>বেদে। ফোকলোর বিশেষজ্ঞ ওয়াকিল আহমেদ বলেন, বেদে শব্দটি ‘বাদিয়া’ থেকে এসেছে। জেমস ওয়াইজের মতে, সংস্কৃত ‘ব্যাধ’ থেকে বেদে শব্দটি এসেছে। আবার ভিন্ন মতও আছে। বলা হয়ে থাকে, ‘বেদুইন’ থেকে ‘বেদে’ শব্দের উদ্ভব। জনশ্রæতি আছে, তাদের আদি নিবাস মিসরে। বেদুইন হিসেবে ‘মিসর’ থেকেই তাদের প্রথম পথ চলা শুরু। খ্রিস্টীয় সাত শতকের শেষ দিকে তাদের পূর্বপুরুষরা আরব উপদ্বীপের আলবাদিয়া বন্দরে বসবাস করতো। অন্য এক তথ্যানুযায়ী, তারা পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার পাণ্ডুয়াতে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। তারা মাদ্রাজের অধিবাসী বলে একটি মতও রয়েছে। আবার কারো মতে, বেদেরা বাংলাদেশে এসেছে আরাকানের ‘মনতং- মান্তা’ নৃগোত্র থেকে। ১৬০০ থেকে ১৬৫০ খিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোনো এক সময় তারা বল্লাল রাজের সঙ্গে ঢাকার বিক্রমপুরে আসে। কেউ কেউ এও বলেন, তারা পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুরা জেলার বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের উত্তরসূরি। বিষ্ণুপুরে সাপকে কেন্দ্র করে আজো ‘ঝাঁপান উৎসব পালন করা হয়ে থাকে। এ উৎসবে শরীরে সাপ পেছিয়ে নৃত্য করা হয়। প্রকৃত বাস্তবতা হলো এই যে, তাদের আদি শিকড় কোথায় প্রোথিত, তা আজো অনুদঘাটিত।’

বাংলাদেশের যশোহরের কালিয়াগঞ্জ, ঢাকার সাভার, বিক্রমপুর, খড়িয়া, গোয়ালিমান্দ্রা, কানসার গ্রাম, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া, ধামরাই, সুনামগঞ্জের ছাতক, সোনাপুর, মুন্সীগঞ্জের মুন্সির হাট, লৌহজংয়ের গোয়ালীমান্দা, মৌলভীবাজারের মনু নদীর পাড়, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর, চাঁদপুরের মতলব (দ.), বরগুনার বামনা, জামালপুরের কাচারীপাড়া, নাটোরের সিংড়াবাজার, শেরপুরের ঝিনাইগাতীর দুধনাইবাজার, মাদারীপুরের মাদারীপুর বাজার, গাজীপুরের জয়দেবপুর, কুমিল্লার হাজিগঞ্জ বাজার, চৌদ্দগ্রাম-চান্দিনা, ফেনীর সোনাগাজী, চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ফতেহাবাদ, মিরসরাই, রাউজানের মুন্সীরঘাটা এলাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৭ লাখ বেদে স্থলে ও নৌকার মাধ্যমে জলে বসবাস করে। তবে ঢাকার সাভারে একসঙ্গে অনেক বেদে বসবাস করে। সাভারের কাঞ্চনপুর, বক্তারপুর, খঞ্জনকাঠি, সচীনগর, পোড়াবাড়ি, ওমরপুর, ছোট ওমরপুরে একসঙ্গে প্রায় ২২ হাজার বেদে বসবাস করে।

বেদেরা নিজেদের ‘মাঙতা’ বা ‘মানতা’ নামে ডাকে। মাঙতা অর্থ মেগে বা ভিক্ষা করে খাওয়া। তারা সাপ, বাঁদর, ভাল্লুক ইত্যাদি নাচিয়ে, শারীরিক কসরত- জাদুর খেলা দেখিয়ে, পোক-জোঁক ফেলে, শিঙ্গা বসিয়ে, শেকড়-বাকর ও তাবিজ-কবজ বিক্রি করে, তন্ত্র-মন্ত্র পড়ে- লোকজন থেকে যা পায় তা-ই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে বলে তারা নিজেদের ‘মানতা’ নামে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। তারা এক ধরনের পেশাজীবী গোষ্ঠী। শান্দার মানতা, মাল মানতা ও বাজিকর মানতা- এ তিন সম্প্রদায়ের মানুষ এ নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য ‘বাংলাপিডিয়া’ এদের ৯টি এবং জেমসওয়াইজ এদের ৭টি শ্রেণি পেশায় বিভক্ত করেছেন। যদিও এদের মাঝে কোনো জাতিভেদ প্রথা নেই। সাহসী এই নৃগোষ্ঠী এক সময় রাজা-বাদশাহ বা জমিদারদের পেশাদার গুপ্তচর হিসেবেও কাজ করতেন। গুপ্তচরবৃত্তি করতে গিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে এক ধরনের সাংকেতিক ভাষা আদান-প্রদান করতেন। পরবর্তীকালে এই ভাষাই ‘মাঙতা’- ‘ঠেট’- ‘ঠের’ ভাষা হিসেবে নিজেদের ভাষার স্থান দখল করে, যা তাদের পেশাগত কাজের ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। আজো বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ‘বেদে’ বা ‘মনতা’ নৃগোষ্ঠী এই ভাষাতেই নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করেন, কথা বলেন। এই ভাষাটি সম্পূর্ণ মৌখিক, এর কোনো লিখিত রূপ নেই।

বেদেদের ভাষায় বেদেরা ছাড়া অন্যরা কথা বলতে পারে না। এই সমাজের বাইরে অন্যরা এই ভাষা জানেও না। লক্ষ করুন- বেদেরা বাবাকে বলেন ‘খেপতে’, মা- আমরি, নিমাই; ছেলে- নামড়া, মেয়ে- নেমরি, বহ্নি; শিশু- ল্যালো, বুড়ো- ডোকনা, বুড়ি- ডুকি, মহিলা- লিমরদ, ভদ্রলোক- গেল, মানুষ- খেনুষ, বিয়ে- হুলু, বাংলাদেশি- চ্যাঙ্গাল, তেমনি তারা বলেন, চুল- গোশলে, দাঁত- খোঁজ কুই, চোখ- গোঙকুরি, নাক- নাকচু, কান- পাতারী, হাত- কোঁথ, পা- খুড়পু, স্তন- নোনাই, সাপ- মুসেল, লতা; বেজি- চেজি, পাখি- পোক্কর ইত্যাদি। অর্থাৎ তাদের ভাষার সাথে বাংলা ভাষার কোনো মিল নেই। বলা যায়, এটি একটি স্বতন্ত্র ভাষা, যা আমাদের কাছে জটিল ও দুর্বোধ্য বলেই মনে হয়। তাই এই ভাষাটি দুর্বোধ্য ভাষা হিসেবেই টিকে থাকলো। যদিও এরই মধ্যে তারা ‘মনসা মঙ্গল’ কাব্যসহ বিভিন্ন গান-কবিতা তাদের ভাষায় রূপান্তরিত করে তাদের মাঝে সচল রেখেছেন। উদাহারণ হিসেবে বাংলা লিপিতে মানতা ভাষায় বিয়ের জল ভরার গান নিচে উল্লেখ করা হলো-

‘মাটি করবো মাঠা মে/ পর ভরউয়া করবো ঘাটামে/ চল হে দেউরা/ পাটা পূজা বেলা/ হলে রে হলে।।

বেদে পল্লীর শাহ পরান আমাকে ‘মান্ তা’ ভাষা থেকে গানটির বাংলা অনুবাদ শুনিয়েছেন এভাবে-

‘কপালে সিঁদুর দেব/ পর হবে আপন/ দেবরজী চলো/ বেলা যে বয়ে যায়!/ তাড়াতাড়ি চলো’।।

মানতা ভাষার তেমনি আর একটি বেদে কবিতা, যা সঙ্গীত হিসেবে গীত হয় তা নিচে উল্লেখ করা হলো-

‘গল আইলো হে মাইয়াজি/ যমুনা বেড়িয়া কলসা মহঙ্গ হল/ মাইয়া ভালে আইলো হে/ মাইয়া তাজ কচুর/ মহঙ্গ হাইলে ভালে আইলু হে’।।

শাহ পরান বাংলায় এটির অনুবাদ করেছেন-

‘জামাই আসবে হে মেয়ে/ গলায় কলস বেঁধো না/ মেয়ে পচা কচু না

মেয়ে ভালো হলে আবারো আসবে/ কপালের লিখন ঠিকই রবে।’

বেদেরা সাপের বিষ নামানোর সময় বা সাপ তাড়ানোর সময় বিভিন্ন মন্ত্র পড়ে থাকে। লোকজ সাহিত্যে এসব মন্ত্র বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ড. ওয়াকিল আহমদ ‘বাংলা সাহিত্যে মন্ত্র’ নামের গ্রন্থে তেমনই এক মন্ত্র সংকলিত করেছেন, যা নিচে তুলে ধরা হলো :

‘তলে জমি উপরে চক/ দিলাম ধুলা পড়া, যেখানেই থাক/ মনসার বরে লড়িস না, চড়িস না/ যেখানেই আছ পইড়া থাক।/ বেড়ি চাইড়া চইলা যা।/ যার আজ্ঞা কার আজ্ঞা,/ মা মনসা দেবীর আজ্ঞা।

মায়াবী বাঁশির সুরে নান্দনিক শারীরিক কসরত সহযোগে ঝাড়-ফুঁক দিয়ে সাপের বিষ নামানোর সময় বেদেরা যে গান করে, তা এ দেশে যুগ যুগ ধরে প্রবহমান। বেদেদের গান নিছক গান নয়; এ আমাদের লোকজ সংস্কৃতিরই অংশ। তাদের গানে তাদের সমাজ জীবনের সুখ-দুঃখ সঙ্গীতের মূর্ছনায় বাঙময় হয়ে ওঠে। বেদে সঙ্গীত যে আমাদের লোকজ সংস্কৃতিতে নীরবে একটি বড় স্থান দখল করে আছে, তা হয়তো আমরা খেয়ালই করি না। লোকালয়ে গান করার সময় বেদেরা নিজেদের ভাষা ব্যবহার করে না, তারা বাংলায় গান গায়। সাপ নাচানোর সময় বেদেনীরা গান গায় আর ডুগডুগি বাজায়-

‘আমার মরণ কিসে গো,/ আমার সোয়ামির মরণ সাপের বিষে/ আমার মরণ কিসে গো।/ মদন পোড়া চিতের ছাইয়ে/ কে দেবে হায় দিশে গো,/ আমার মরণ কিসে গো’।

সাপ-খেলা দেখানোর সময় তারা নানা ঢঙে, নানা আঙ্গিকে নানা ধরনের গান করে। তেমনি একটি লোকগীতি-

‘বেহুলা ভাসে রে ভাসে রে অগম দরিয়ায়।/ অভাগিনী বেহুলার নাই রে গাছের ছায়।।/ মৃতপতি কোলে বালা ভাসে রে ভাসে রে ।/ কি করিবে কোথা যাবে বুঝা বড় দায়’।।

বাঁদর-নাচ নাচানোর শেষে বেদেনীরা টাকা-পয়সা তোলে। এ সময় তারা গানের মাধ্যমে ভীতি সৃষ্টি করে অভিশাপ দেয়-

‘খা খা রে খা, বক্কিলারে খা,/ কিপটারে খা, কন্জুসরে খা।/ গাঁইটে টাকা বাইন্দা যে/ না দেয় বেদেনীরে,/ মা মনসার চেড়ি তাদের/ খা খা করে খা।

খা খা খা- ওই বক্কিলারে, কিরপনেরে-

গাঁইটে পয়সা বাইন্দা যে/ না দেয় বেদেনীরে,/ তার চক্ষু উপড়াইয়া খা’।।

মানতা লোকসাহিত্যে অনেক প্রবাদ-প্রবচনের উপস্থিতি লক্ষণীয়। যেমন- (১) ‘কহন্তা সরস্বতী /চলন্তা বাবু, / খাওন দাওন চকরবকর/ ঘুমন্ত প্যাকর। /’ অর্থাৎ কথাবার্তা জ্ঞানগর্ভ ও চলনে ফিটফাট হলেও, যত্রতত্র খাওয়া-দাওয়া এবং ঘুমের অভ্যাস জানিয়ে দেয়, তারা বেদে। (২) ‘যোদেরের চরিত্র সাড়ি করপাই মাঙতা, / মাঙতায় চুবি যোদরে খায় টাগে’।/অর্থাৎ ‘বাঁদরের চরিত্র বেদেরা জানে, তবে বেদের টাকা বাঁদরেই খায়’।

বাংলা সাহিত্যে বেদেরা অপাঙ্ক্তেতয় নয়, বরং তাদের উল্লেখ দেখা যায়। ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকায়’ মহুয়া পালাটি তো বেদের জীবনাচারের আখ্যান চিত্র। এতে মহুয়া সুন্দরীকে নিয়ে বেদেদের যে জীবনচিত্র উদ্ভাসিত, তা বেদে সমাজের চিরন্তন রূপ। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন-

‘আমরা হেলায় নাগেরে খেলাই/নাগেরি মাথায় নাচি’। কবি জসীমউদ্দীনের কবিতায়ও উঠে আসে বেদে প্রসঙ্গ। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’-এ তিনি লিখেন :

‘ও নাও হইতে শুঁটকি মাছের গন্ধ আসিছে ভাসি,/ এ নায়ে বধূ সুন্দা ও মেথি বাটিতেছে হাসি হাসি।/কোনখানে ওরা সিহর নাহি রয়ে, জ্বালাতে সান্ধ্য দ্বীপ,/এক ঘাট হতে আরেক ঘাটে যেয়ে, দোলায় সোয়ার টিপ ’।

সাধারণ জীবনে অভ্যস্ত বেদেনীদের নিয়ে কবি জীবনান্দ দাশ ‘বেদিয়া’ কবিতায় লিখেন :

‘চকিত পরশপাথর কুড়ায়ে বালকের মতো হেসে,/ছুড়ে ফেলে দেয় উদাসী বেদিয়া কোন সে নিরুদ্দেশে।/যতœ করিয়া পালক কুড়ায়, কানে গোঁজে বনফুল, / চাহেনা রতন-মনি মঞ্জুয়া হীরে মানিকের দুল’। /

মধ্যযুগের জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ মনসামঙ্গল বা ‘পদ্মপুরাণ’-এ বিধৃত হয়েছে সর্প দেবী মনসার জন্ম ও কর্মবৃত্তান্ত। মনসাকে নিয়ে বেদেদের যে বিশ্বাস ও কর্মযজ্ঞ তা এ পৌরাণিক আখ্যান থেকেই চালু। মা মনসার সুতোয় সাপকে জব্দ করতে পারা বেদেদের জন্য এক দারুণ রোমাঞ্চকর ও দুঃসাহসিক কাজ। এর সাথেই আবর্তিত বেদেদের সাহিত্য। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র ‘বিলাসী’ গল্পে মনসা দেবীর দোহাই দিয়ে সাপের বিষ নামিয়েছেন। গল্পে আছে-

‘ওরে কেউটে তুই মনসার বাহন/ মনসা দেবী আমার মা / ওলট-পালট পাতাল ফোঁড়/ ঢোঁড়ার বিষ তুই নে/ তোর বিষ ঢোঁড়ারে দে/

দুধ রাজ মণিরাজ্য / কার আঞ্জা বিষ হরির আঞ্জা’।

বেদেদের নিয়ে নানা সিনেমাও হয়েছে। ১৯৩৯ সালে দেবকী বসুর ‘সাপুরে’ নামের বাংলা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সাপ ও সাপুড়ে কেন্দ্রিক বেদেদের জীবন কাহিনী নিয়ে সিনেমার যাত্রা শুরু। তারপর বেহুলা- লখিন্দর, নাগিন কন্যার কাহিনী, নাগিন, সর্প রানী, সাপুড়ে মেয়ে, নাচে নাগিন, বেদের মেয়ে, রাজার মেয়ে বেদেনী ইত্যাদি অনেক সিনেমা নির্মিত হয়েছে। তবে তোজাম্মেল হক বাবুল পরিচালিত ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ বাংলাদেশের লোকজ ধারার চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এক বিশেষ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ইলিয়াস কাঞ্চন ও অনজু ঘোষ অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে এতদকালের সর্বাপেক্ষা ব্যবসা সফল ছবি।

জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে বাংলাদেশে বেদেরা ইসলাম ও হিন্দু ধর্ম উভয়কেই মেনে চলেন। তবে তারা নিজেদের মুসলমান দাবি করেন। তাদের বিয়ে হয় নিজেদের সমাজের মধ্যে এবং বিয়ে পড়ানো হয় মৌলানার মাধ্যমে মুসলিম রীতিতে। তবে নিজ সম্প্রদায়ের বাইরে কেউ বিয়ে করলে তাকে সমাজচ্যুত করা হয়। তাদের মাঝে তালাক প্রথাও প্রচলিত আছে। বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে স্ত্রীর ইচ্ছায়। এ ক্ষেত্রে বিয়ের সময় স্বামীর দেয়া যৌতুকের অর্ধেক স্বামীর পরিবারকে ফিরিয়ে দিতে হয়। মুসলমানদের মতো তারা ওয়াক্তিয়া নামাজ ও জুমার নামাজ আদায় করে। এমনকি তারা ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, শবেবরাত ইত্যাদিও পালন করে। তাদের মধ্যে পীরের প্রভাব লক্ষণীয়। দরগায় ওরশের সময় উপস্থিত থেকে নানা মানত করে। তাদের সর্দার মারা গেলে তারা অতীতে তার কবরের ওপর মাজার নির্মাণ করতো। এখন অবশ্য তারা তা করে না। মৃত্যুর পর ইসলামী রীতি অনুযায়ী তাদের দাফন করা হয়। তারা কুলখানি ও চল্লিশা পালন করে। তবে রোজা রাখার ব্যাপারে তাদের মধ্যে শিথিলতা দেখা যায়। নিজেদের তারা মুসলমান দাবি করলেও তাদের অনুকরণবাদী চরিত্রের কারণে তারা শিব, ব্রহ্মা ও মনসায় বিশ্বাস করে। আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে তারা বেশির ভাগ সময়ে হিন্দুয়ানী রীতি অনুসরণ করে। সর্পদেবী মনসাকে মান্য করে তারা বিয়ের প্রথম রাতে বাসর এড়িয়ে চলে। কারন এ রাতেই বেহুলার বাসরে সাপ ঢুকে লখিন্দরের প্রাণ নিয়েছিল। এ রাতকে তারা কালরাত বলে। বিয়ের পরদিন সূর্য ওঠার আগে বর-কনের সিঁথিতে হিন্দু রীতির অনুরূপ ‘সেন্দেল’ (সোনালি রঙের জাফরান) পরিয়ে দেয়া হয়। বিয়ের সময় ঘট ও কলাগাছ স্থাপন, কুলাতে আম পাতা, জলভরা, বিয়ের স্নান যাত্রা, নববধূকে পিত্রালয়ে বরণ, সাজ বিয়ে, বাসি বিয়ে, কনে বিদায়, ছদনা তলা ইত্যাদি অনুষ্ঠানাদি হিন্দুদের মতো পালন করে। তারা সর্প দংশন থেকে বাঁচতে মা মনসার পূজা করে। তাদের বিশ্বাস, মনসার পূজা করলে বা নাম শুনলে সাপে কাটলেও বিষ হবে না।

বেদেদের জীবন বড়ই বিচিত্র। তাদের ধর্মমত, বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান, চলাফেরা, কথাবার্তা- সবকিছুতে এক ধরনের রহস্যময়তার চাদর-আবৃত অবস্থান দেখা যায়। তারা হয়তো বেদে বা যাযাবর বলেই তাদের এই অবস্থান। তাদের সাহিত্যও লিখিত নয়। ‘জীবনের সহিত’ সাহিত্যের যে যোগ, তা অবশ্য তাদের সাহিত্যে আছে। তবে তা বিক্ষিপ্ত, খণ্ডিত। অবশ্য লোকজ সাহিত্য হিসেবে তা গ্রহণযোগ্য, নন্দিত ও যুগ পরম্পরায় চর্চিত। হ

ঈদ আয়োজন ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj