চার্লি চ্যাপলিন : জীবনের কাছে হার না মানা অভিনেতা : নজরুল ইসলাম নঈম

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

‘আমি বৃষ্টিতে হাঁটতে ভালোবাসি, কারণ তখন কেউ আমার কান্না দেখতে পায় না।’ এই উক্তিটি হলো- যিনি নিজের চোখের পানি আড়াল করে শুধু মূকাভিনয়ের মাধ্যমে অগণিত মানুষের হাসির খোরাক হয়েছেন, জায়গা করে নিয়েছেন অসংখ্য ভক্ত হৃদয়ে তিনি হলেন স্যার চার্লেস স্পেন্সার চার্লি চ্যাপলিন।

নাকের নিচে নকল ছোট গোঁফ, মাথায় টুপি, হাতে ছড়ি, ঢিলেঢালা প্যান্ট, আঁটসাঁট কোট, ঢাউস আকারের জুতো তাও আবার উল্টো করে হেঁটে বেড়াচ্ছেন আর তাই দেখে দর্শকরা হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে। লোকটি যখন হাসছে, দর্শকদের চোখে তখন জল। আর লোকটি যখন কাঁদছে, তখন দর্শকদের হাসতে হাসতে দম বন্ধ হবার জোগাড়। অত্যন্ত দারিদ্র্য ও কষ্টের মাঝে শৈশব পার করেছেন বলেই হয়তো তিনি খুব ভালো করেই উপলব্ধি করতেন, আনন্দ মানুষের জীবনে কতটা প্রয়োজন।

চার্লি চ্যাপলিনের জন্ম ১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল ইংল্যান্ডের দক্ষিণ লন্ডনের ওয়েলওর্থের বার্লো স্ট্রিটে। তার কোনো বৈধ জন্ম প্রমাণপত্র পাওয়া যায়নি আর এজন্য তার জন্মস্থান নিয়ে বরাবরই একটা কুয়াশা থেকে গেছে। তার বাবার নাম চার্লস চ্যাপলিন আর মা হানা চ্যাপলিন। বাবা-মা দুজনই বিনোদন জগতে কাজ করতেন এ জন্য স্বাভাবিকভাবেই চার্লির ভেতরেও শৈল্পিক দিকগুলো কানায় কানায় পূর্ণ ছিল।

চার্লির বয়স তখন পাঁচ বছর। একদিন তার মা মঞ্চে গান গাইছিলেন। আর ছোট্ট চার্লি বসে বসে মায়ের অভিনীত গীতনাট্য দেখছিলেন। সে সময় লন্ডনে খেটে খাওয়া শ্রমিক, ভবঘুরে কিংবা নেশাতুর লোকেরাই বিনোদনের জন্য থিয়েটারে ভিড় জমাত। মঞ্চে গায়িকা বা নর্তকীর কোনো হেরফের হলেই চিৎকার-চেঁচামেচি করে থিয়েটার মাথায় তুলে নিত। মঞ্চে গান গাইছিলেন চার্লির মা। চার্লির মায়ের গলায় আগে থেকেই সমস্যা ছিল। গান গাওয়ার এক পর্যায়ে চার্লির মায়ের গলার স্বর ভেঙে যায়। বাধ্য হয়ে তিনি মঞ্চ থেকে নেমে যান। কিন্তু হল ভর্তি দর্শককে শান্ত করার জন্য মায়ের জায়গায় চার্লিকে উঠানো হয় মঞ্চে। চার্লি তার মায়ের পরিবর্তে মঞ্চে গান গাইতে শুরু করেন- ‘জ্যাক জোনস ওয়েল অ্যান্ড নোওন টু এভরি বডি…’। চার্লির গানে দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে কয়েন ছুড়তে থাকে। চার্লি হঠাৎ অঙ্গভঙ্গিসহ বলে ওঠেন, ‘আমি এখন গান গাইব না; আগে পয়সাগুলো কুড়িয়ে নেই, তারপর আবার গাইব। এটি ছিল দর্শকদের হাসির জন্য চার্লির প্রথম কৌতুকাভিনয়।’

ইতোমধ্যে চার্লির বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। চার্লির মা তাকে আর তার বড় ভাইকে নিয়ে দক্ষিণ লন্ডনের বিভিন্ন বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। ভাড়া দিতে না পারায় প্রায়ই তাদের বাসা থেকে বের করে দেয়া হতো। এভাবে বাড়িওয়ালার তাড়া খাওয়ার চাইতে চার্লি পার্কের বেঞ্চিতে ঘুমাতেই বেশি পছন্দ করতেন।

খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য চার্লি প্রথমে একটি মুদি দোকানে কাজ নিয়েছিলেন। তারপর চাকরি নেন ডাক্তারখানায়। সেখান থেকে কাজ চলে যাওয়ার পরে মানুষের বাড়ির বাসন মাজার কাজে লেগে পড়েন। তারপর একে একে কাচের কারখানা, রঙের দোকান, লোহার দোকান, ছাপাখানা, খেলনার কারখানা, কাঠচেরাই কল, কাগজ বিক্রি ইত্যাদি নানা কাজের মধ্যে তিনি যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তখন চার্লির অর্থনৈতিক অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে, পচা খাবার কুড়িয়েও তাকে খেতে হয়েছে।

মায়ের হাত ধরেই চার্লির অভিনয়ে হাতেখড়ি। এক সময় চার্লির মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। চার্লি সে সময় বিভিন্নবারের সামনে নেচে টাকা উপার্জন করতেন। এক সময় ক্ষুধা আর অপুষ্টির অভাবে চার্লির মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তারপর চার্লি তার মাকে একটি আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানেই তার মা দীর্ঘ ১৭ বছর থেকে মৃত্যুবরণ করেন। অভিভাবকহীন চার্লি একটি এতিমখানায় আশ্রয় নেন। এতিমখানার নিয়ম না মানার কারণে সেখানে তাকে প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন করা হতো। এতিমখানার জীবনের সেই অভিজ্ঞতা চার্লির সিনেমা জগতে ভালো প্রভাব ফেলেছিল।

১৮৯৮ সালে নয় বছর বয়সে চার্লি একটি নাচের দলে যোগ দেন। দলের সাথে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন জায়গায় নাচ গান করে বেড়াতেন। এরপর যুক্ত হয়ে পড়েন কমেডিয়ান দলের সঙ্গে। পাশাপাশি করতেন মূকাভিনয়। ১৯১৩ সাল। চার্লি ইংল্যান্ড ছেড়ে পাড়ি জমান আমেরিকায়। ঐ বছরেই নিউইর্য়ক মোশন কোম্পানি সাপ্তাহিক ১৫০ ডলারের ভিত্তিতে চার্লির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। বলা যেতে পারে ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন হয়েছে পরের বছরই বেশ কয়েকটি ছবি মুক্তি পায় চার্লির। রাতারাতি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। ধীরে ধীরে পেছনের দুঃখের সময়গুলো ¤øান হতে শুরু করে। ১৯১৮ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে নয়টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি এবং সেগুলোর বেশির ভাগই দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯২৫ সালে নিজের প্রযোজিত ছবির জন্য পান একাডেমি অ্যাওয়ার্ড। ১৯৩৬ সালে মুক্তি পায় অন্যতম সাড়া জাগানো ছবি ‘মর্ডান টাইমস’। ১৯৫২ সালে মুক্তি পায় ‘লাইম লাইট’ নামে আত্মজীবনীমূলক ছবি। ছবিটি দর্শক হৃদয়ে স্থান করে নেয়।

চার্লি চ্যাপলিন তখন পৃথিবী বিখ্যাত। একবার তার অনুকরণে অভিনয়ের একটা প্রতিযোগিতার অয়োজন করা হয়। গোপনে চার্লিও নাম দেন সেই প্রতিযোগিতায়। মজার বিষয় হলো প্রতিযোগিতার শেষে দেখা গেল প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে অন্য দু’জন প্রতিযোগী আর চার্লি চ্যাপলিন হন তৃতীয়।

চার্লি চ্যাপলিনের ৭৫ বছরের দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনটি বাদে বাকি সব চলচ্চিত্রই ছিল নির্বাক। চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম কথা বলেন ১৯৪০ সালে, দ্য গ্রেট ডিকটেটর চলচ্চিত্রে।

চার্লি চ্যাপলিন যখন পৃথিবী বিখ্যাত তখন একবার দুই দিনের জন্য জন্মভূমি ইংল্যান্ডে গেলেন। আর এই সময়ের মধ্যে ঘটে গেল তুঘলকি কাণ্ড। মাত্র দু’দিনে তাঁর কাছে প্রায় ৭৩ হাজার চিঠি আসে।

১৯২৫ সালের ৬ জুলাই প্রথমবারের মতো অভিনেতা হিসেবে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে আসেন চার্লি চ্যাপলিন।

চার্লির ট্রেড মার্ক চরিত্র ভবঘুরে ২৬ বছরে আবির্ভূত হয় ৭০টি পূর্ণ ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিতে।

১৯৮৭ সালে দেড় লাখ ডলারে বিত্রিæ হয় চার্লির টুপি ও ছড়ি।

১৯৫২ সালে আমেরিকা চার্লি চ্যাপলিনকে তার দেশ থেকে বহিষ্কার করে। কারণ হলিউডের সংগঠন ‘মোশন পিকচার্স এলায়েন্স ফর প্রিজারভেশন অব আমেরিকান আইডিয়াল’ চার্লি চ্যাপলিনকে কমিউনিস্ট ঘোষণা করে মামলা ঠুকে দেয়। স্নায়ুযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে আমেরিকায় কমিউনিস্ট অভিধা ছিল গুরুতর অপরাধ। কথিত বাক স্বাধীনতার দেশ আমেরিকা তাই চার্লি চ্যাপলিনকে দেশত্যাগে বাধ্য করেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সেই সময় কমিউনিস্ট হিসেবে পরিচিত সোভিয়েত ইউনিয়নেও চার্লি চ্যাপলিন তখন নিষিদ্ধ। সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদে বিশ^াসী নন বলে সেখানে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত। প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার এই দোলাচলে বিরক্ত চার্লি চ্যাপলিন শেষে আশ্রয় নেন সুইজারল্যান্ডের এক নিভৃত গ্রামে।

চার্লি চ্যাপলিন তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমার কাছে সৌন্দর্য হচ্ছে নর্দমায় ভেসে যাওয়া একটা গোলাপ ফুল’। তিনি আরো লিখেছেন- শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি তার শৈশবকে বয়ে বেরিয়েছেন। যে শৈশব ছিল দুঃসহ। বাবা তার মাকে ত্যাগ করেছিলেন। মা কখনো সস্তা নাটকের দলে গান গেয়ে, কখনো সেলাই করে চালিয়েছেন সংসার। তারা না খেয়ে থেকেছেন বহুদিন। কখনো ভিক্ষা করে, কখনো চুরি করে জোগাড় করতে হয়েছে খাবার। শৈশবের সেই বঞ্চনা আর অপমানকেই যেন চার্লি মোকাবিলা করেছেন তার চলচ্চিত্রের ভেতর দিয়ে। চার্লি লিখেছেন, প্রবল বঞ্চনার ভেতর দাঁড়িয়েও কী করে পৃথিবীকে ভালোবাসতে হয়, সে শিক্ষা তিনি পেয়েছেন তার মায়ের কাছ থেকে।

শিল্প কী, চার্লির উত্তর ‘শিল্প হচ্ছে পৃথিবীর কাছে লেখা এক প্রেমপত্র।’ তার অনবদ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে চার্লি চ্যাপলিন এমন একেকটি প্রেমপত্রই পাঠিয়েছেন পৃথিবীর মানুষের কাছে। সেই প্রেমপত্রগুলো আজকের এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পৃথিবীতেও সমান প্রাসঙ্গিক। তার চলচ্চিত্রগুলো দেখতে গিয়ে এখনো প্রাণবন্ত হাসির স্রোতে ভাসতে ভাসতে মহৎ বেদনায় আর্দ্র হওয়া যায়।

চার্লি চ্যাপলিন একাধারে অভিনেতা, গায়ক, চিত্রনাট্যকার, গল্প লেখক, পরিচালক, শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালকসহ আরো বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষিত। এই মানুষটি একটি দুর্বিষহ শৈশব পার করে এলেও জীবনের কাছে কখনো হার মানেননি। আর অনেক বেশি প্রাণবন্ত ছিলেন বলেই হয়তো তিনিই বলতে পারেন- ‘আমার জীবনে অনেক সমস্যা আছে কিন্তু আমার ঠোঁট তা জানে না তাই সে সব সময় হাসতে থাকে।’

১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর চার্লি চ্যাপলিন প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান সুইজারল্যান্ডে। ১৯৭৮ সালের ৩ মার্চ সুইজারল্যান্ডের করসিয়ার-সার- ভেভে গোরস্তান থেকে চুরি হয়ে যায় চার্লি চ্যাপলিনের মৃতদেহ। অবশেষে ১৮ মার্চ পুলিশ মৃতদেহটি উদ্ধার করে এবং পুনরায় সমাহিত করা হয় চার্লি চ্যাপলিনকে। হ

ঈদ আয়োজন ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj