অভাব এবং অতঃপর : নাহিদ হাসান রবিন

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

সেই বছর সুফিয়ার বিয়ার জন্য সুজি, সেমাই, লাচ্ছা নানান পদের খাবার জোগাড় করেও সুফিয়াকে বিয়া দিবার পারি নাই। খানাপিনা শ্যাষ না হতেই টাউন থাইক্যা কয়েকজন সাহেব পুলিশ নিয়া আইসা বিয়াডা ভাইঙ্গা দিয়া গেলো। চ্যাংরাডা ভালো ছিল। রাজমিস্ত্রীর কাজ করে, ভালো কামাই করে। বুঝলেন আপা। বলে গেল সুফিসার নাকি বয়স হয় নাই। ঘরের মেঝে মুছতে মুছতে সুফিসার মা কথাগুলো বলছিল, যে বাড়িতে ঠিকা কাজ করে সেই চৌধুরী সাহেবের বউকে। মিসেস চৌধুরী ঘাটের ওপর বসে একপা আরেক পায়ে তুলে টিভি দেখছিলেন। এমন সময় এসব কথা শুনতে তার ভালো লাগার কথা নয়। অবশ্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে একা একা কথা বলা সুফিয়ার মায়ের পুরাতন রোগ। মিসেস চৌধুরী সাধারণত সেদিকে কান দেন না। কিন্তু আজ যখন মেয়ের বিয়ের কথা বলছিল তখন কিছুটা মমতা নিয়েই বললেন- আবার দেখেশুনে একটা বিয়ের ব্যবস্থা করো। আমরাও কিছু সহযোগিতা করব।

-হ আপা, একটা চ্যাংড়া পাওয়া গেছে। অটো চালায়। সেদিন হ্যার বাপ আর মা এসে আমার সুফিয়াকে দেখে গেছে। চ্যাংড়ার মা তো সুফিয়াকে খুব পছন্দ করেছে। কথাবার্তাও একটু হইছে। হাজার বিশেক টাকা দিতে পারলে বিয়াডা মনে হয় হইব।

মিসেস চৌধুরী বাম হাতে চোখ থেকে চশমাটা নামিয়ে সুফিয়ার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন- বেশ ভালো তো। তাহলে কথাবার্তা পাকা করো।

-খালি কথা পাকা করলেই কি হবে আপা, টাকা পয়সা জোগাড় করা লাগব না? তাগোর বিশ হাজার টাকা দেয়া, খাওন-দাওন আরো কত কেনাকাটা। এত টাকা কেমনে জোগাই বলেন।

-তা ঠিক বলেছো। তারপরেও দেখো, আগে পিছে তো বিয়ে দিতেই হবে। আমরা হাজার দশেক টাকা সাহায্য করব। বাকিটা তোমরা জোগাড় করো।

-অধিক খুশিতে সুফিয়ার মায়ের মুখ হাসিতে ভরে গেল। ঘুরে বসে মিসেস চৌধুরীকে বলল- আপা সত্যিই কইতাছেন?

-কেন তোমার সাথে মিথ্যা বলছি মনে হয়?

-না আপা, তাই কইলাম আর কি। আল্লাহ আপনাগোর সবার মঙ্গল করুক।

রাতে বাড়ি ফিরে সুফিয়ার বাবার সাথে এসব নিয়ে কথা বলে।

সুফিয়ার বাবা বলে- শোন বউ, আপা খুব প্রাণ খোলা মানুষ। দয়া আছে। নইলে কি আর আমাগোর মেয়ের বিয়ার জন্য দশ হাজার টাকা দিবার চায়। আমাগোর তো দু-চারজন ধনি কুটুম আছে, তারা তো মনের ভুলেও কোনোদিন এমন করে বলে নাই। এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাইব না। যেমনে হোক টাকার ব্যবস্থা করতে হবে। সুফিয়ার মামা-খালাগোর খবর দে। দেখি তাদের সাথে পরামর্শ করে বিয়াডা দেওন যায় কিনা।

পরদিন সুফিয়ার মা স্বামীর কথা মতো সুফিয়ার মামা-খালাদের খবর দিয়ে নিয়ে আসে। রাতে খাবার দাবারের পর ওরা সবাই আলোচনায় বসে। বাড়িতে সুফিয়ার চাচা-চাচি থাকলেও তারা এখানে আসবে না। দুই পরিবারের মধ্যে দা কুড়াল সম্পর্ক। যাহোক, মামা-খালারা মিলে বিয়ের জন্য হাজার পাঁচেক টাকা দিতে চায়। আর বাড়িতে একটা মেহগনি গাছ আছে ওইটা বিক্রি করতে বলে। গাছটা বেচলেও হাজার সাতেক টাকা পাওয়া যাবে মনে হয়। এখনো অনেক টাকা বাকি। এত টাকা কোথায় পাবে এসব চিন্তা সারাক্ষণ ঘুরপাক খায় সুফিয়ার মা-বাবার মাথায়। তারা ভেবে কোন ক‚ল কিনারা পায় না। একদিন দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের কাছে যায় সুফিয়ার মা। এসব কথা শুনে বেচারা নগদ পাঁচ হাজার টাকা তুলে দেয় সুফিয়ার মায়ের হাতে। বেচারী খুশিতে বাকবাকুম হয়ে বাড়ি ফেরে। পরদিন ঘটককে ডেকে বিয়ের দিন তারিখ করতে বলে।

সামনে মাসে পূর্ণিমা দেখে বিয়ের তারিখ করা হয়। দিনা পনের সময় আছে। এর মধ্যে সুফিয়ার মা-বাবা নানান জায়গা থেকে টাকা জোগাড় করতে থাকে। জোগাড় করা টাকা থেকে বিশ হাজার টাকা আলাদা করে রাখে বর পক্ষের জন্য। বাকি টাকা থেকে টুকটুক করে কেনাকাটা করতে থাকে।

আর মাত্র তিন দিন পর বিয়ে। কেনাকাটার এখনো অনেক বাকি। এগুলো সারতে এখনো অনেক টাকার দরকার। সুফিয়ার মা-বাবা চোখে সরষে ফুল দেখতে লাগল। ঘটককে ডেকে যৌতুকের দশ হাজার টাকা পরে দিতে চায়। ঘটক বেচারা বর পক্ষের সাথে কথা বলে জানিয়ে গেলো- কোনো বাকি চলবে না। সব টাকা এখনই দিতে হবে। সারাদিন শ্রম বেচে রাতে বাড়ি ফিরে, দুজন মানুষ এইসব বিষয় নিয়ে কথা বলে। আজ রাতে কারো ঘুম নেই। সকালে সুফিয়ার মা, চৌধুরী বাড়িতে যায় কাজ করতে। মেঝে মুছতে মুছতে সুফিয়ার মায়ের চোখ চলে যায় ড্রেসিং টেবিলের উপরে। চকচক করছে একটা বড় সাইজের মালা। কাল বিকালে বাইরে যাওয়ার সময় মিসেস চৌধুরী এই মালাটাই পরেছিলেন। ফিরে এসে খুলে রেখেছেন এখানে। মালাটা দেখতে খুবই সুন্দর। দেখে মনে হয় ওজনও আছে বেশ। সুফিয়ার মা চোখ নামিয়ে নেয়। মনে মনে বলে- অন্যের জিনিস ভালো বা মন্দ হলে আমার কি! নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করে। কিন্তু এক সময় তার বিবেক ডুবে যায় উথাল পাতাল অভাবে।

মিসেস চৌধুরী অনেক বেলা করে ঘুম থেকে ওঠেন। খাটে শুয়ে ওদিকে কাত হয়ে বিভোরে ঘুমাচ্ছেন। জাগা পেতে এখনো অনেক দেরি। তার আগেই সুফিয়ার মায়ের কাজকর্ম শেষ হয়ে অন্য বাড়িতে যাবে কাজ করতে। ভদ্র মহিলার ঘুমের এই সুযোগে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে মালাটা নিয়ে কোমরে গুঁজে ফেলে সুফিয়ার মা। ভয়ে সারা শরীর কাঁপছে। কোনো রকমে কাজ সেরে বের হয় বাড়ি থেকে। আজ আর অন্য বাড়িতে কাজে যাবে না। সোজা নিজের বাড়ির দিকে রওনা হয়। সুফিয়ার বাবা দিনের বেলায় বাড়ি থাকে না, বেশ রাতে আসে। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে কোমরে গোঁজা মালাটা বের করে সুফিয়ার মা। মালাটা দেখতে দেখতে ভাবে- আর টাকার সমস্যা হইব না। এটা বিক্রি করলে ধুমধামের মধ্য দিয়েই বিয়েটা পাড়ি দেয়া যাবে। কিন্তু মালাটা বিক্রি করবে কিভাবে এটাই এখন তার চিন্তা। দোকানে গেলে যদি ধরা খেয়ে যায়, তখন তো সবই যাবে। নানান চিন্তা করে অবশেষে অনেক দূরের একটা সোনার দোকানে যায় মালাটা বিক্রি করার জন্য। দোকানদারকে মালাটা দেখায়। দোকানদার মালাটা নেড়ে চেড়ে দেখে বলে- এটা তো সোনা না, ইমিটিশনের মালা। এটা তুমি কোথায় পেলে?

সুফিয়ার মায়ের মুখে কোন কথা নেই। আঁচলে মুখ ঢেকে মালাটা রেখেই দ্রুত রাস্তা ধরে… হ

ঈদ আয়োজন ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj