‘প্রতিবন্ধী নারী ও পুরুষের জন্য নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক

বুধবার, ২৯ জুন ২০১৬

গোলটেবিল বৈঠকের আলোচকবৃন্দ :

মো. ওয়ালিউল্লাহ, প্রধান প্রকৌশলী, ডিপিএইচই

শফিকুল ইসলাম, কান্ট্রি ডিরেক্টর, এডিডি

এস এম এ রশিদ, এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, এনজিও ফোরাম

ইয়াকুব হোসেন, ন্যাশনাল কনভেনার, ফ্যানসা বাংলাদেশ

দিবালোক সিংহ, নির্বাহী পরিচালক, দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র

অলোক মজুমদার, কান্ট্রি কো অর্ডিনেটর, বাংলাদেশ ওয়াশ এ্যালায়েন্স

শাহ আনোয়ার কামাল, নির্বাহী পরিচালক, ইউএসটি

সুবীর সাহা , ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, সিডিডি

মো. রিজওয়ানুল হক খান, প্রোগ্রাম কোঅডিনেটর, ফ্যানসা বাংলাদেশ

মনিরুল ইসলাম , ইঞ্জিনিয়ার, আহসানিয়া মিশন

সালমা মাহবুব, সাধারণ সম্পাদক, বি-স্ক্যান

মাহফুজুর রহমান, প্রকল্প কর্মকর্তা, ওয়াটার এইড

আমির খসরু, প্রতিনিধি, ডরপ্

সঞ্চালক

হাসিন জাহান, কান্ট্রি ডিরেক্টর, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন

গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকদের প্রস্তাবনাসমূহ-

১. প্রতিবন্ধীদের প্রতি কোনোপ্রকার সহানুভুতি বা অনুগ্রহ না দেখিয়ে রাষ্ট্রের অন্য নাগরিকদের মত প্রতিবন্ধীদের পানি ও স্যানিটেশন অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারসহ সকলের প্রতি আহ্বান।

২. সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীদের প্রবেশগম্যতা বাড়ানো এবং ওয়াশ বাজেট বৃদ্ধি করা।

৩. প্রতিবন্ধীদের স্যানিটেশনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হবে। এজন্য সরকারীভাবে একটি নীতিমালা প্রণয়ন।

৪. প্রতিবন্ধীদের স্যানিটেশনের জন্য ইউনিভার্সেল একসেসএবল ডিজাইন ব্যবহার করার নীতিমালা প্রনয়ন।

৫. প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের মূলধারাতে অর্ন্তভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া।

৬. ডিপিএইচই-এর মাধ্যমে সরকার পানি ও স্যানিটেশন বিষয়ে যে সকল নতুন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে তা অবশ্যই প্রতিবন্ধীবান্ধব হওয়া।

৭. প্রতিবন্ধীদের স্যানিটেশনের অধিকার বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি সকল পর্যায় থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

৮. ডিপিএইচই-এর সকল প্রকল্পে প্রতিবন্ধীদের স্যানিটেশনের অধিকার নিশ্চিত করা।

৯. প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে সকল পর্যায়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা।

১০. স্কুল কলেজসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীদের স্যানিটেশনের সুব্যবস্থা রাখা।

গত ২৭ জুন, সোমবার ভোরের কাগজ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে ‘প্রতিবন্ধী নারী ও পুরুষের জন্য নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকরণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এডিডি, ফ্রেসওয়াটার অ্যাকশন নেটওয়ার্ক-সাউথ এশিয়া বাংলাদেশ, ভোরের কাগজ ও ক্যাফোডের যৌথ উদ্যোগে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পানি ও স্যানিটেশন অধিকার নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থ’াপন করেন এডিডি-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. শফিকুল ইসলাম ও ফ্যানসা বাংলাদেশর ন্যাশনাল কনভেনার মো. ইয়াকুব হোসেন। এছাড়া গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনায় বক্তরা সুপারিশ আকারে কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেয়া আলোচকদের বক্তব্যের চুম্বক অংশ দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের বিশেষ ক্রোড়পত্র।

মো. ওয়ালিউল্লাহ : প্রধান প্রকৌশলী, ডিপিএইচই

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মানুষের অধিকারকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য সবাই যে ঐক্যবদ্ধ ও সবার যে চিন্তাভাবনা সেজন্য সবাইকে ধন্যবাদ। পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা এই দুটি মানুষের মৌলিক অধিকার। এটি সবার জন্যই প্রযোজ্য। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা থেকে কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ যেন পেছনে না পড়ে সেজন্য আমরা কিছু পদক্ষেপ নিতে পারি। স্যানিটেশনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য যা করছি, তার মধ্যে প্রতিবন্ধীদের জন্য কতটা করছি সেটা দেখার বিষয়। তিনি বলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন উপায়ে যে ডাটাগুলো উপস্থাপন করে।

প্রধান যে ডাটাগুলো আসছে দেশে আমরা করছি সেখানে এখনো ১ ভাগ খোলা জায়গায় স্যানিটেশন ত্যাগ করা হয়। ৯৯ ভাগ মানুষ কোনো কোনোভাবে স্যানিটেশনের আওতায় আছে। এর মধ্যে প্রতিবন্ধীদের জন্য যে স্যানিটেশনের ব্যবস্থা আছে তা কতটুকু। প্রতিবন্ধীদের স্যানিটেশনের ডাটা কিন্তু আমাদের নেই। সমাজে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষ বাস করে। কেউ অন্ধ, কেউ পঙ্গু চলতে পারে না, অন্যের সাহায্য নিতে হয়।তিনি বলেন, গুলশান আর কড়াইল বস্তির স্যানিটেশনের ব্যবস্থা কি এক? একটি স্বাস্থ্যসম্মত, একটি স্বাস্থ্যসম্মত নয়।

এই মানুষগুলো একটা বেদনা নিয়ে বাস করছে। আমরা সবাইকে স্যানিটেশনের সুবিধা দেব সেটা মানসম্মত হবে না সেটি তো হতে পারে না। কাজেই স্যানিটেশন যেন স্বাস্থ্যসম্মত হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। এও ঠিক এককভাবে এটা সমাধান করা সম্ভব নয়। আমাদের সবাইকে এটা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের উন্নয়নে কাজ করতে হবে।

হাসিন জাহান : কান্ট্রি ডিরেক্টর, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন

আমরা যারা ওয়াটার স্যানিটেশন নিয়ে কাজ করছি তারা মনে করি এটাই শুধু আমাদের কাজ আর যারা প্রতিবন্ধী নিয়ে কাজ করছি তারা শুধু ওই এক জায়গায় থাকি। আমি মনে করি এই দু’টির মধ্যে সমন্বয় থাকা দরকার। তা হলো পলেসি লেভেলে। এটা যদি করতে পারি তাহলে ন্যাশনাল ওয়াটার স্যানেটারিসহ সবগুলোতে এর রিফলেকশন থাকবে। এর ফলে এগুলোকে আলাদা করে আমাদের আর সমস্যা হবে না।

সরকার নতুন করে কিছু প্রকল্প তৈরি করতে যাচ্ছে ওয়াটার স্যানেটারির ওপর। ডিপিএইচই এ নিয়ে কাজ করছে। খুব তাড়াতাড়িই এ বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসবে তারা। এ সময় আমরা যদি এ বিষয়গুলো তাদের ভালো করে ধারণা দিতে পারি তাহলেই আমাদের কাজ সার্থক হবে। এসব স্থাপনায় একটু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে যাতে, সেখানে প্রতিবন্ধীরা অংশগ্রহণ করতে পারে।

ডিজাইন সংক্রান্ত বিষয় সরকারকে লিড দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি জানান, আমাদের দেশের বিভিন্ন সংস্থা অনেক ডিজাইন তৈরি করেছে। যা অনেক ভালো। এসব ডিজাইন বাস্তবায়ন করতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে রুরাল এলাকার জন্য সরকার যদি উদ্যোগ গ্রহণ না করে তাহলে এগুলো বাস্তবায়ন হবে না। এখানে একটি বড় সমস্যা আমরা প্রতিজন প্রতিবন্ধীদের জন্য শুধু টয়লেট ডিজাইন করি। এটা কোনো সমাধান হতে পারে না। শিশুরা, প্রতিবন্ধীসহ সবাই ব্যবহার করতে পারে এমন টয়লেট তৈরি করতে হবে। আর এই ভাবনা নিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করা যায় তাহলেই এমন গাইড লাইন তৈরি করা সম্ভব হবে। তাহলেই প্রতিবন্ধীসহ সব মানুষের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি হবে।

এস এম এ রশিদ : এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, এনজিও ফোরাম

প্রতিবন্ধী মানুষদের বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে আখ্যায়িত করে। কিন্তু আমি যেভাবে দেখি তা হলো হিউম্যান ডিগনিটি বা হিউম্যান রাইট। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে যে জনগণ আগে। জনগণের জন্য আমাদের কাজ করে যেতে হবে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধীদের জন্য।

আমরা সবাই জনগণ এই কথাটি মাথায় রেখে যদি আমরা একজন আরেক জনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমটি আরো উন্নত করতে পারি তাহলেই প্রতিবন্ধীদের সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। দ্বীতিয়ত, পৃথিবীব্যাপী প্রতিবন্ধীদের এ সমস্যাটি উঠে আসছে। এজন্য তাদের টেকনিকগুলো আমাদের গ্রহণ করা উচিত।

জাতিসংঘের এক রিপোর্টে উঠে এসেছে বিশ্বে ৭৫০ বিলিয়ন মানুষ পানি ও টয়লেট সমস্যার মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশে এর সংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশ। সুতরাং এ ক্ষেত্রে আমরা যে উন্নয়নমূলক কাজ করছি তা আরো প্রসার করতে হবে। তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশের মানুষ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মধ্যে আছেন এবং এসব সমস্যাগুলো নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণাও হয়েছে। এই সমস্যাগুলোর কারণে যেসব মানুষ জড়িত তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানসহ সব দিক থেকে তারা পিছিয়ে আছে। যার কারণে এই শ্রেণির মানুষদের সঙ্গে দরিদ্রতার এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এর মধ্য থেকে তারা চাইলেই বেরিয়ে আসতে পারছে না।

আমাদের দেশে জাতিসংঘের যে প্রতিবন্ধী সুরক্ষা সনদটি নেয়া হয়েছে ২০০৬ সালে এবং সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে যে আইনটি করেছে সে আইনের আওতায় প্রায় ২৯টি ধারা-উপধারা রয়েছে। এর যে বিষয়গুলো আছে তার মধ্যে বেশির ভাগ বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া নেই। তিনি আরো বলেন, মানুষের মৌলিক অধিকার যেগুলো লঙ্ঘিত হচ্ছে সেই বিষয়গুলোকে আমরা যেন অগ্রাধিকার দিয়ে ইনক্লুসনের আওতায় আনতে পারি।

একই সঙ্গে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক সচেতনতা পরিবর্তন করা দরকার। অন্যদিকে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের উপযোগিতা অনুযায়ী তাদের আবাসিক ব্যবস্থা, স্যানিটারি ব্যবস্থা, পানি প্রাপ্তির ব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কেমন হবে এর প্রতিটি বিষয়ে কিন্তু সরকারের বিবেচনা করা দরকার আছে। আমাদের উচিত এ বিষয়গুলো উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে একটি অংশ শুধু এই প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রাখা। তাহলে তাদের সমস্যা অনেক অংশে সমাধান করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে তারা যাতে এক সময় দক্ষ মানবশক্তিতে পরিণত হতে পারে, এজন্য তাদের এসব সুবিধা প্রদান করতে হবে।

শফিকুল ইসলাম : কান্ট্রি ডিরেক্টর, এডিডি

প্রতিবন্ধীদের নিয়ে আজকের এ আলোচনার আয়োজন করার জন্য সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। এটি ছিল ত্রিপক্ষীয় একটি আয়োজন। এ আয়োজনে যুক্ত হতে ভোরের কাগজকে বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা রাজি হয়েছে। এ বিষয়ে তাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ জানাই। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীদের নিয়ে অনেকেই কাজ করতে আগ্রহী। শুধু আগ্রহী হলেই হবে না, এ সম্পর্কে জানার আগ্রহও থাকতে হবে। এ বিষয়ে অনেক কিছু জানার আছে। সেগুলো ভালোভাবে জানতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, জনসচেতনতা বাড়াতে আমরা যারা স্যানিটারি ল্যাট্রিন নিয়ে কাজ করছি, তারা কতগুলো প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেট তৈরি করেছি তার হিসাব রাখা দরকার। এ ছাড়া আগামী শীতে এ বিষয়ে মেলা করা যায় কিনা, তা ভেবে দেখা হচ্ছে। ১৯ নভেম্বর বিশ্ব টয়লেট দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। এ দিন টয়লেট সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করাই হচ্ছে মূল বিষয়। বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীদের প্রতি অনেক সচেতন। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবন্ধীদের লোন দিতে সার্কুলার জারি করেছে। ব্র্যাক ব্যাংকের সঙ্গে ইতোমধ্যে আমাদের একটি চুক্তি হয়েছে প্রতিবন্ধী লোনের বিষয়ে। সরকার বলেছে প্রতিবন্ধীবান্ধব স্যানিটারি ল্যাট্রিন হবে। আশাকরি ভবিষ্যতে যেসব ল্যাট্রিন নির্মাণ হবে, তা প্রতিবন্ধীবান্ধব হবে। প্রতিবন্ধীবান্ধব সংবাদ আরো বেশি বেশি হওয়া প্রয়োজন। তাহলে জনগণ সচেতন হবে। প্রতিবন্ধীদের প্রতি কাজ করার আগ্রহ বাড়বে।

ইয়াকুব হোসেন : ন্যাশনাল কনভেনার, ফ্যানসা বাংলাদেশ

সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যারা প্রতিবন্ধী স্যানিটেশন নিয়ে কাজ করি তাদের উদ্যোগে একটি প্রতিবন্ধী স্যানিটেশন মেলা হতে পারে, যেখানে একে অপরের কাজ সম্পর্কে জানতে পারবে। মূলত এই ধরণের কাজ আমাদেরকে প্রতিবন্ধী স্যানিটেশন এ ইউনিভার্সাল এক্সেসের দিকে নিয়ে যাবে। এটিই হওয়া উচিৎ আমাদের মূল লক্ষ্য ।

দিবালোক সিংহ : নির্বাহী পরিচালক, দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র

ঢাকার সিএনজি পাম্পগুলো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখা জরুরি। একইসঙ্গে প্রতিবন্ধীদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হবে। এজন্য প্রয়োজন একটি নীতিমালা প্রণয়ন। যা সরকারকেই করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। এজন্য কাজ করার পাশাপাশি তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেইসঙ্গে এটাও দেখতে হবে যে, প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে কিনা? তিনি বলেন, আমাদের দেশে যেসব সাইক্লোন সেন্টার তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোতেও প্রতিবন্ধীদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে কিনা সেটাও কিন্তু দেখার বিষয়। সচেতনতা এবং যারা কাজ করে তাদের সচেতনতা খুবই জরুরি। তাদের মাথায় যেন গেঁথে যায় যে প্রতিবন্ধী বান্ধব টয়লেট নির্মাণ করতে। প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চত করতে হলে যারা প্রতিবন্ধী সংগঠন নিয়ে কাজ করে, তাদের ছাড়া এটা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

অলোক মজুমদার : কান্ট্রি কো অর্ডিনেটর, বাংলাদেশ ওয়াশ এ্যালায়েন্স

জাতিসংঘ থেকে বলা হয়েছে স্যানিটেশন ব্যবস্থা আমাদের অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে প্রত্যেক নারীকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে কি আমরা পেরেছি? জাতিসংঘ ঘোষিত আইনটিকে আমরা ঠিকমতো নিশ্চিত করতে পারছি না। সেজন্য আমাদের কাজ করতে হবে। ল্যাট্রিন তৈরি করলাম অথচ সেখানে কোনো প্রতিবন্ধী মানুষ প্রবেশ করতে পারল না। তাহলে কোনো লাভ হবে না। সেজন্য তাদের জন্য প্রবেশগম্যতা বাড়াতে হবে। বিভিন্ন স্কুল, অফিস-আদালত, প্রতিষ্ঠানে ল্যাট্রিনগুলোতে প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রবেশগম্যতা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, পলিসি মেকারদের কাছে বলা উচিত যে আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে আগে প্রতিবন্ধীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। কমিটমেন্ট অনুযায়ী ওয়াশ বাজেট বাড়ানো হচ্ছে না। কাজেই প্রতিবন্ধীরা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমান বাজেটে যে পরিমাণ ওয়াশ বাজেট দেয়া হয়েছে তার ৮৬ ভাগ শহরে ও মাত্র ১৪ ভাগ গ্রামে। অথচ আমাদের প্রবেশগম্যতা শহরের চেয়ে গ্রামেই সবচেয়ে বেশি। শহরে কিছুটা ভালো। গ্রামে কিছুটা খারাপ। সেখানে বাজেট কম যাচ্ছে। সুতরাং এজন্য দাতা সংস্থাসহ সব প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নারী-পুরুষ প্রতিবন্ধীদের জন্য যদি টয়লেট সুবিধা বাড়ানো না যায় তাহলে তারা সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছে। কাজেই যদি সবাই আমরা আওয়াজ তুলি তবেই এই সমস্যা সমাধান হবে।

সুবীর সাহা : ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, সিডিডি

আমরা এখন ভালো আছি কিন্তু একটি সময় গিয়ে প্রতিবন্ধকতার শিকার হব না এটা আমরা বলতে পারি না। যা কিছু আজ আমরা প্রতিবন্ধী ভাইবোনদের জন্য করছি তা কিছু আমরা আমাদের নিজেদের জন্য করছি এটা মনে রেখে কাজ করতে হবে। এই জায়গা থেকে আমাদের চিন্তা করতে হবে যে, ইউনিভার্সেল এস্কেসেবল ডিজাইন নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রতিবন্ধী মানুষসহ সবার জন্য প্রবেশগম্যতা স্যানিটারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এটি যতটা না বাস্তবায়নের বিষয় তারচেয়ে বেশি হলো এটি একটি এভোকেসি ইস্যু। এটি সর্বপ্রথম বাচ্চাদের মধ্য দিয়ে শুরু করতে হবে। কারণ প্রাইমারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম-৩-এ আমাদের বাজেটের একটি বড় বরাদ্দ আছে। এখানে যে ওয়াশ ব্লুকের কথা বলা হয়েছে তা অনেক প্রশংসনীয়। কিন্তু আপনি যদি সারা বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ওয়াশ ব্লুকগুলোর অবস্থা দেখেন সেগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। যা হওয়ার কথা তা হচ্ছে না। খাতা কলমে আছে কিন্তু বাস্তবে নেই। তাই এই জায়গাগুলোতে আমাদের সবার সম্মিলিতভাবে কাজ করা দরকার। আমাদের দেশে সøাইকোন সেন্টার, ফ্লাড সেন্টার অনেক আছে। ইদানীং যেগুলো তৈরি হচ্ছে কিছুটা ইউনিভার্সেল গাইড লাইনকে ফলো করে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু বিগত দিনে যেগুলো হয়ে গেছে সেসব জায়গায় অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো আশ্রয় নেয়, তাদের মধ্যে যে প্রতিবন্ধীরা থাকে- বিশেষ করে পানি ও স্যানেটারি ব্যবহার করতে তাদের কি পরিমাণ ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা কল্পনার বাইরে।

শাহ আনোয়ার কামাল : নির্বাহী পরিচালক, ইউএসটি

অনেকদিন পরে হলেও অন্তত প্রতিবন্ধীদের টয়লেটের সুব্যবস্থার বিষয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আমরা বলতে পারি এই বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। জাতীয়ভাবে এই সমস্যা সমাধানের জন্য ইতোমধ্যে কাজ হচ্ছে। তাই অক্ষম ব্যক্তিদের ছোট করে দেখারও কোনো সুযোগ নেই। এই ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ও বেসরকারি ভাবে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কিছু উদ্যোগ গ্রহন করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাছাড়া সরকারি-বেসরকারি ভাবে কাজের কোন সমন্বয় না থাকায় ক্ষুদ্র উদ্যোগ খুব একটা প্রভাব ফেলছে না। এজন্য যৌথ ভাবে কাজ করলে আরো দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব। তবে বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগের পরিসীমাও বাড়াতে হবে। জাতীয় বাজেটেও এ বিষয়ে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

সালমা মাহবুব : সাধারণ সম্পাদক, বি-স্ক্যান

একবার একটি সার্ভে করতে গিয়ে দেখি ২০ বিল্ডিংয়ের মধ্যে একটি টয়লেট পেয়েছি যেখানে প্রতিবন্ধীরা ব্যবহার করতে পারে। বাকি ১৯ বিল্ডিংয়ের কোথাও ব্যবহারের অযোগ্য, এমনকি পানির ব্যবস্থাও পাইনি। বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনের আওতায় বর্তমানে বেশকিছু টয়লেট নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমরা যারা প্রতিবন্ধী সংগঠনের সঙ্গে আছি তারা এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে পারিনি বা অমাদের মতামত দিতে পারিনি। এসব স্যানিটেশন ডিজাইনে চিন্তা করে নেয়া প্রয়োজন। স্যানিটারি লেট্রিন নির্মাণের আগে প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নিলে ভালো হয়। একজন প্রতিবন্ধী হিসেবে শুধু নয়, এদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার উপযোগী টয়লেট ব্যবহার আশা করি। এ ছাড়া যেসব টয়লেটগুলো নির্মাণ হচ্ছে- সেগুলো একেক জায়গায় যেন একেক রকম না হয়। একটা কোয়ালিটি যেন সর্বত্রই মানা হয়।

মো. রিজওয়ানুল হক খান : প্রোগ্রাম কোঅডিনেটর, ফ্যানসা বাংলাদেশ

বাংলাদেশর সকল প্রতিবন্ধী সম্পর্কে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দল সচেতন। তারা নির্বাচনের আগে প্রতিবন্ধীদের কাছে যান এবং ভোট চান। কিন্তু নির্বাচনের পরে সেবা দেওয়ার সময় প্রতিবন্ধীদের ভুলে যান। সকল প্রতিবন্ধী বাংলাদেশর নাগরিক এবং বাংলাদেশর সংবিধান। অনুযায়ী তাদেরও রয়েছে সকল েেত্র সমান অধিকার পাওয়ার অধিকার। তাই প্রতিবন্ধীদের প্রতি কোনোপ্রকার সহানুভূতি, দয়া, অনুগ্রহ না দেখিয়ে রাষ্ট্রের অন্য নাগরিকদের মত প্রতিবন্ধীদের পানি ও স্যানিটেশন অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারসহ সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

মনিরুল ইসলাম : ইঞ্জিনিয়ার, আহসানিয়া মিশন

আমি নিয়মিত কাজ করতে গিয়ে অনুভব করেছি টয়লেটের পাশে পানির ব্যবস্থা রাখা জরুরি। কারণ টয়লেট ব্যবহারের পর অবশ্যই ভালোভাবে হাত ধোয়ার কথা আমরা বলি। এর সঙ্গে আমাদের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সুস্থতা জড়িত। অথচ আমরা যদি হাত ধোয়ার ব্যবস্থাই না রাখি তবে এ বিষয়ে সচেতন করে লাভ হবে না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে আমরা যে বর্তমানে টয়লেট তৈরি করছি এক্ষেত্রে লোকাল এন্টারপ্রেনারদের ট্রেনিং দিয়ে টয়লেট ডিজাইন করতে হবে। এসব টয়লেটের জন্য এমন ক্যাটালগ তৈরি করতে হবে যেন সেসব ক্যাটালগে প্রতিবন্ধী বা বাচ্চাদের জন্য কেমন টয়লেট হবে তা নির্ধারণ করা থাকে। আমরা ইতোমধ্যে এমন কিছু টয়লেটের ক্যাটালগ তৈরি করছি।

আমির খসরু : প্রতিনিধি, ডরপ্

উপজেলা পরিষদের অনেকগুলো স্কুলে গিয়েছিলাম। এমন একটি স্কুলও পাইনি যা প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেট। তাই আমরা যারা বাজেট নিয়ে কথা বলি তারা ভবিষ্যতে যেন চিন্তা করি প্রতিবান্ধব টয়লেট নির্মাণ নিয়ে। তিনি বলেন, আমার দুটি প্রস্তাবনা রয়েছে। একটি হচ্ছে- স্কুল ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। কারণ স্কুল ও স্থানীয় সরকারের যে অবকাঠামোগুলো আছে এসব জায়গাগুলোতে মানুষ সবচেয়ে বেশি আসা যাওয়া করে। এখানের লেট্রিন যেন অবশ্যই প্রতিবন্ধীবান্ধব হয়। সরকারিভাবে যে লেট্রিনগুলো তৈরি হচ্ছে- সেগুলো যেন আলোচনা সাপেক্ষে প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেট নির্মাণ হয়।

মাহফুজুর রহমান : প্রকল্প কর্মকর্তা, ওয়াটার এইড

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদারও পরিবর্তন হয়। তাই আমাদের টয়লেটগুলো এমন নকশায় করা দরকার যেখানে সব বয়সের মানুষরা ব্যবহার করতে পারে। আর এ ক্ষেত্রে যারা শারীরিক পতিবন্ধী তাদের বিষয়ও বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে টয়লেট তৈরির ক্ষেত্রে। উন্নতমানের অথবা মানসম্মত টয়লেট তৈরির ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত বেশি খরচের চিন্তা করে থাকি। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই বর্ধিত খরচ খুব বেশি নয়। তিনি বলেন, আমাদের প্রধান সমস্যা রয়েছে চিন্তায়। এখনো মানসিকভাবে আমরা মেনে নিতে পারি না প্রতিবন্ধীরা অন্যদের মতো সমান অধিকার ভোগ করুক। এছাড়া যারা টয়লেট ব্যবহার করবে তাদের কাছ থেকে কোনো পরামর্শই নেয়া হয় না তা নির্মাণ করার জন্য। আর এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের কাছ থেকে কোনো পরামর্শ নেয়া তো আরো কঠিন।

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj