ক্রিকেট ব্যাটের গ্রাম যশোরের নরেন্দ্রপুর

শনিবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৬

আলমগীর কবীর, যশোর থেকে : দেশজুড়ে ক্রিকেট ব্যাটের অন্যতম যোগানদাতা যশোরের নরেন্দ্রপুর। এই গ্রামে দেশীয় প্রযুক্তিতে এখন এতই বেশি ক্রিকেট ব্যাট তৈরি ও বিপণন হচ্ছে যে, স্থানীয়রা এখন নরেন্দ্রপুুর গ্রামকে চেনে ‘ব্যাটের গ্রাম’ নামে।

এ এলাকার অনেকেই এখন ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করে পাল্টে ফেলেছেন নিজেদের ভাগ্য। এখানকার দুই শতাধিক পরিবার ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এই গ্রামে তৈরি করা ব্যাট ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয়।

দেশে এ মুহূর্তে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলার নাম ‘ক্রিকেট’। আন্তর্জাতিক খেলাগুলোতে আমাদের ক্রিকেটাররা অনেক সুনাম বয়ে আনায় এ খেলা এখন ছড়িয়ে পড়েছে সারা বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জেও। তাই সব এলাকাতেই দেদার বিক্রি হচ্ছে ক্রিকেটের সরঞ্জাম।

এক সময় ক্রিকেটের সব ধরনের সরঞ্জামই আনা হতো বিদেশ থেকে। তবে সময় বদলেছে। উন্নতমানের সরঞ্জাম এখনো বিদেশ থেকেই আনতে হয়, তবে সাধারণ মানের সরঞ্জামের অনেক কিছুই এখন দেশে তৈরি হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রিকেট ব্যাট।

যশোর শহর থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে নরেন্দ্রপুর গ্রাম। এই গ্রামের মিস্ত্রিপাড়াই মূলত ‘ব্যাটের গ্রাম’ হিসেবে বিশেষ পরিচিত। আর এই গ্রামের বাসিন্দা সঞ্জিত মজুমদারের হাত ধরেই তৈরি হয়েছে এই রূপকথা।

সরজমিন, ব্যাটের কারিগর সঞ্জিত মজুমদারকে খুঁজতে যাই নরেন্দ্রপুর গ্রামে। একটু খুঁজতেই তার পড়শিরাই দেখিয়ে দেন তার বাড়ি। তার মুখেই শোনা ব্যাট বানানোর গল্প।

সঞ্জিত বলেন, ১৯৮৪ সালের দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দিদি বাড়ি বেড়াতে যাই। সেখানে কাঠের তৈরি নানা শিল্পকর্ম দেখে মাথায় আসে নতুন কিছু করার। এরপর দেশে ফিরে ভাইপো উত্তম মজুমদারকে সঙ্গে নিয়ে নতুন কিছু বানানোর চেষ্টা করি। ক্রিকেট আমাকেও খুব টানতো। সেই সুবাদে যশোরের লিডিং স্পোর্টস দোকানের মালিক ও শহরের ঘোপ এলাকার বাসিন্দা বাবু ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়।

তিনি আমাদের ক্রিকেট ব্যাট বানানোর পরামর্শ দেন। বাবু ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় ১৯৮৬ সালে ভাইপোকে নিয়ে প্রথম ব্যাট তৈরি করি।

সেগুলো প্রথমে যশোরে বিক্রি হতো। বাবু ভাই আমাদের আরো ব্যাট বানানোর প্রেরণা দেন। সেই থেকে শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আমাদের। পরে এই ব্যাট যশোরের আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

সঞ্জিত বলেন, ১৯৮৬ সালে প্রথম হাতে ব্যাট তৈরি আমরা। সে বছরই সেগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি শুরু হয়। এ ব্যবসায় আমরা সাফল্য পাওয়ায় আমাদের দেখাদেখি আরো অনেকে ব্যাট তৈরিতে নেমে যান।

ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কারখানা এখন নরেন্দ্রপুরের মিস্ত্রিপাড়া ছাড়িয়ে মহাজেরপাড়া, বলরামপুর, রুদ্রপুর ইত্যাদি গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে।

সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে ৬০-৬৫টির বেশি কারখানা। এসব কারখানায় শুরুতে সবকাজ হাতে করা হলেও বর্তমানে অনেকেই তা মেশিনে করছেন। এতে কাজের গতি বেড়েছে। এসব কারখানায় মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার ব্যাট তৈরি হচ্ছে।

সঞ্জিত জানান, ব্যাট তৈরিতে ব্যবহার করা হয় ছাতিয়ান, কদম, নিম, জীবন, পিঠেগড়া, আমড়াসহ বিভিন্ন প্রকার দেশীয় কাঠ।

শ্রমিকদের পাশাপাশি বাড়ির বউ-ছেলে মেয়েরাও টুকটাক কাজ করেন। তাদের কাজের মধ্যে রয়েছে ব্যাটে পুডিং লাগানো, ঘষামাজা করা, স্টিকার লাগানো, প্যাকেটজাত করা ইত্যাদি।

ব্যাট নির্মাণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা জানান, একশ ব্যাট বানিয়ে দিলে তারা এক থেকে দেড় হাজার টাকা হারে মজুরি পেয়ে থাকেন। তাদের পক্ষে সপ্তাহে চারশ ব্যাট তৈরি করা সম্ভব। ব্যাটে পুডিং, স্টিকার লাগানোসহ পলিশের কাজ করেন অন্যরা।

এই এলাকায় ১০-১১ বছর ধরে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কাজ করছেন ওমর আলী। তিনি জানান, ব্যাট প্রতি খরচ ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। বিক্রি হয় ৭০ টাকা। তার অধীনে তিনজন এ কাজ করেন। তিনি বলেন, আগের চেয়ে এখন আমি বেশ ভালোই আছি।

ওমর আলী জানান, তাদের তৈরি ব্যাট যশোরের বাজার ছাড়াও বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা নিয়ে যান। কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে জিতলেই ব্যাটের বিক্রি বেড়ে যায়।

নরেন্দ্রপুর গ্রামের তরিকুল ইসলাম এক সময় যশোর শহরে কাঠের আসবাবপত্র বানানোর ব্যবসা করতেন। তা ছেড়ে দিয়ে এখন তিনি বানাচ্ছেন ক্রিকেট ব্যাট। গ্রামের বাড়িতেই এখন তার ব্যাট তৈরির কারখানা। বাংলাদেশের সব জায়গাতেই বিক্রি হচ্ছে তার ব্যাট।

নরেন্দ্রপুরের মিস্ত্রিপাড়ার ব্যাট নির্মাতা পরিবারগুলোর নারী-পুরুষ সবাই জড়িয়ে পড়েছে এই কাজের সঙ্গে। ফাতেমা বেগম সংসার চালান ব্যাট বিক্রি করেই। পারিবারিক এ উদ্যোগে কাজ করছেন তার স্বামী এবং শ্বশুর-শাশুড়িও।

তথ্যমতে, বাংলাদেশের ক্রিকেট ব্যাটের সিংহভাগই আসে যশোরের নরেন্দ্রপুর গ্রাম থেকে। এক সময় দেশের বাইরে থেকে এসব ব্যাট আমদানি করতে হতো এবং বাজারটি ছিল বিদেশি ব্যাটের দখলে। কিন্তু গত এক দশকে এই পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে নরেন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দারা।

এই ব্যবসা করেই ঘুরে গেছে সেখানকার অনেক বাসিন্দার জীবন। নরেন্দ্রপুরের তৈরি ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে অবশ্য পেশাদার বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা হয় না। এসব ব্যাট মূলত টেনিস বল বা টেপ দিয়ে মোড়ানো বল দিয়ে ক্রিকেট খেলারই উপযোগী।

এসব ব্যাট দিয়ে ক্রিকেট খেলা হয় শহরের গলি-মাঠ থেকে শুরু করে ফসল কাটার পর ধানক্ষেত পর্যন্ত। কিন্তু ভবিষ্যতের পেশাদার ক্রিকেটারদের অনেকেই হয়তো অল্প বয়সে তাদের ক্রিকেট খেলা শুরু করেছেন এ ধরনের ব্যাট দিয়েই।

বিশেষ সংখ্যা : খুলনা বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলন-২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj