প্রায় লক্ষাধিক মানুষের চরম দুর্ভোগ : দাকোপে বিশুদ্ধ খাবার পানির হাহাকার

শনিবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৬

বাবুল আকতার, খুলনা ও রুহুল আমীন, দাকোপ থেকে : এখন বৈশাখ মাস, বৃষ্টির দেখা নেই অধিকাংশ খাল ও পুকুরের পানি প্রায় শুকিয়ে গেছে। বিশুদ্ধ খাবার পানি কোথাও তেমন একটা দেখা মিলছে না। গভীর নলক‚প কোথাও কার্যকারী না হওয়ায়, এখন নদীর লবণাক্ত পানিসহ গ্রামে হাতে গোনা কয়েকটি পুকুরের সামান্য পানিতে শ্যাওলা দুর্গন্ধ যুক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে সমুদ্র উপক‚লীয় খুলনার দাকোপের প্রায় লক্ষাধিক মানুষকে। আমরা খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান চাইনা, কোনো রকম বেঁচে থাকার জন্য একটু বিশুদ্ধ খাবার পানি চাই। কথা গুলো বলছিলেন আবেগ উৎকণ্ঠা বিজড়িত কণ্ঠে আইলা দুর্গত সুতারখালী ইউনিয়নের গুনারী গ্রামের দিন আব্দুর রহিম গাজী। বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র হাহাকার শুধু আব্দুর রহিম গাজীর একার নয় তার মতো করে গোটা উপজেলায় বিশুদ্ধ খাবার পানির নানা কষ্টের কথা তুলে ধরলেন কামারখোলার ইউপির মেম্বার আব্দুস সত্তার সানা, সুতারখালী ইউপির গুনারী গ্রামের মহিউদ্দিন মীর, কমলা রানী মণ্ডল, ফতেমা বেগম, তীলডাঙ্গা ইউনিয়নের কাঁকড়া বুনিয়া গ্রামের কমরউদ্দিন গাজী, চালনা পৌর সভার সোহাগ হাওলাদার, রনজিত মণ্ডল, বাজুয়ার ইউনিয়নের কচাঁ গ্রামের জয়দেব রায়, মাহবুবুর রহমান, লাউডোব ইউনিয়নের তপন কুমার রায়, কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের দিনেশ মণ্ডল, মাধুরী রায়, দাকোপ ইউনিয়নের সাহেবের আবাদ গ্রামের মহাদেব সাধু, গৌতম সরকার প্রমুখ।

সরজমিন ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চৈত্র মাসের শুরু থেকেই সমুদ্র উপক‚লীয় দাকোপ উপজেলার চালনা পৌরসভাসহ ৯টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র হাহাকার। গ্রামের একমাত্র খাবার পানির উৎস অধিকাংশ পুকুরের পানি এ সময়ে শুকিয়ে যাওয়ায় এখন একটু খানি বিশুদ্ধ খাবার পানির সন্ধানে এলাকাবাসীকে তাড়া করে ফিরেছে। গ্রামের অধিকাংশ নলক‚পে পানি উঠছে না এবং অনেক নলক‚প অকেজ হয়ে পড়েছে। গ্রামের পুকুর গুলো শুকিয়ে যাওয়ায় সরকারি বেসরকারিভাবে নির্মিত ফিল্টার গুলোও এখন আর কোনো কাজে আসছে না। তাই বিভিন্ন গ্রামের লোকজন মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে কলসিতে করে আবার কেউ কেউ ভ্যান, ট্রলার ও নৌকা যোগে নদী পথে পানি সংগ্রহের অভিযানে নেমে পড়েছে। এভাবে কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে মধ্যে রাত পর্যন্ত চলে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহের অভিযান। এলাকার একটু বিত্তশালী লোকজন তারা খুলনাসহ পার্শ¦বর্তী উপজেলা পাইকগাছা, বটিয়াঘাটার বিভিন্ন স্থান থেকে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে কিছু কিছু গ্রামাঞ্চলের অসহায় মানুষ জীবন বাঁচানোর তাগিদে নদীর লবণাক্ত পানিতে ফিটকিরি মিশিয়ে খাওয়া ও রান্নাবান্নার কাজেও ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া কিছু কিছু পুকুরের যৎসামান্য পানিতে শ্যাওলার দুর্গন্ধ হলেও ওই সব পুকুরের পানি কিছু কিছু লোকজন বাধ্য হয়ে পান করায় অনেকে পানি বাহিত রোগ পেটের পীড়াসহ, ডায়েরিয়া ও আমাশয় আক্রান্ত হচ্ছে।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভৌগোলিক কারণে এ উপজেলাটি সাধারণত সমুদ্র উপক‚লীয় হওয়ায় এখানে গভীর নলক‚প বা শ্যালো টিউবওয়েল কার্যকরী নয়। বছরের প্রায় ৭ থেকে ৮টি মাসই এলাকাসীকে লবণাক্ত পানির সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করে বাঁচতে হয় এ উপক‚লবাসীদের। এ উপজেলাটিতে বিশুদ্ধ খাবার পানি হিসেবে বৃষ্টির পানি ও পুকুরের পানির ওপর নির্ভরশীল। চৈত্র মাসের শুরুতেই বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলের খাবার ও রান্নাবান্না করার একমাত্র উৎস পুকুর গুলো শুকিয়ে যাওয়ায় তখন খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২ লাখ মানুষের বিশাল এ পানির চাহিদার বিপরীতে উল্লেখযোগ্য কোনো রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্লান্ট নেই, এলাকায় সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানা মজা পুকুর পুনঃখননের উদ্যোগ নেই, ফলে এ সময়ে স্থানীয় গ্রামবাসীরা এক ফোটা বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহের জন্য পার্শ্ববর্তী উপজেলা গুলোতে যেতে হচ্ছে। উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিশাল পানির চাহিদার বিপরীতে এ মুহুর্তে সরকারি ও বেসরকারিভাবে মজা পুকুর গুলো পুনঃখননসহ নতুন করে প্রতিটি গ্রামে পুকুর খনন ও স্বাস্থ্য সম্মত রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্লান্ট নির্মাণ জরুরি। এ গুলো নির্মিত হলে এলাকাবাসী কিছুটা হলেও তাদের পানির চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোজাম্মেল হক বলেন, বর্তমানে ভ্যাপসা গরম আর বিশুদ্ধ পানির অভাবে প্রতিদিন শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধরা পর্যন্ত পেটের পীড়াসহ ডায়রিয়া, আমাশায় আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৫০ থেকে ৬০ জন রোগীকে চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা হচ্ছে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত অনেকে এখানে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছে।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, এ উপজেলায় গভীর নলক‚প কার্যকর নয়, তাই সারা বছরই স্থানীয় এলাকাবাসীর রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্লান্ট ও পুকুরের পানির ওপর নির্ভর থাকতে হয়। এখানে টিউবওয়েলের পানিও লবণাক্ততা রয়েছে অনেক টিউবওয়েলে এখন তেমনভাবে পানি উঠছে না। তাই পানির চাহিদা পূরণে এ অঞ্চলের পর্যাপ্ত পুকুর ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং নির্মাণ করা প্রয়োজন।

বিশেষ সংখ্যা : খুলনা বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলন-২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj