আলমডাঙ্গা বধ্যভূমিতে তারা খুঁজে ফেরেন স্বজনদের

শনিবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৬

রফিক রহমান, চুয়াডাঙ্গা থেকে : চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গাবাসীর মনে বারবার সেই ১৯৭১-এর ভয়াবহ দিনগুলোর কথা স্মরণ করে দেয়। তৎকালে আলমডাঙ্গার রেলের লাল ব্রিজের কাছে ট্রেন থেকে নামিয়ে শতশত মুক্তিকামী যুবক, নারী ও পুরুষকে নির্যাতন শেষে হত্যা করা হতো।

সেই স্থানটিতে গড়ে তোলা হয়েছে আলমডাঙ্গার বধ্যভূমি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান জাতীয় সংসদের হুইপ সোলায়মান হক জোয়ার্দার ছেলুন এমপি নিজ উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেন। এখন সেই স্থানটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন নারী-পুরুষরা। জানতে পারছেন অতীতের বিভীষিকাময় কিছু ঘটনা। ১৯৭১-এর নির্যাতনের বিভিন্ন প্রতিছবি সংবলিত ভাস্কর্য দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বধ্যভূমি। প্রায় ২ বিঘা জমির ওপর ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা হয়।

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার রেলের লাল ব্রিজের অদূরে ১৯৭১-এর বধ্যভূমি এ জনপদের স্বাধীনতাকামী মানুষের নীরব সাক্ষী। ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিকামী বাঙালি স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধ চলাকালে বর্বর নরপশু পাকবাহিনী নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে ধর্ষণ, নির্যাতন, বেপরোয়া গণহত্যা শুরু করে। এ জনপদে বর্বর পাকবাহিনী হত্যার জন্য বেছে নেয় চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা রেল স্টেশনের অদূরে লাল ব্রিজের কাছে বধ্যভূমি। পাকবাহিনী এ বধ্যভূমিতে নারী-পুরুষসহ স্বাধীনতাকামী মানুষকে ধরে এনে নির্বিচারে হত্যার আগে তাদের দিয়েই গর্ত করে পরে হত্যা করত। আবার কাউকে জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে হত্যা করেছে।

নরপশু পাকবাহিনী বাঙালি জাতির ওপর জঘন্যতম এই নির্যাতনের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে আলমডাঙ্গা বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও বাস্তবায়ন কমিটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। স্মৃতিস্তম্ভটি ইতোমধ্যে এলাকায় প্রশংসনীয় হয়ে উঠেছে। আলমডাঙ্গা উপজেলা বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুলতান জোয়ার্দার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে নেতারা চুয়াডাঙ্গা জেলাকে বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী ঘোষণা করেন।

শুরু হয় সরকার গঠন করার প্রক্রিয়া। ফলে পাকিস্তানি বাহিনীর টার্গেটে পরিণত হয়। যে কারণে এ অঞ্চলে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুহুর্মুহু প্রতিরোধ ও সম্মুখ যুদ্ধ লেগেই থাকত। এ জনপদে পাকবাহিনী গণহত্যার জন্য বেছে নেয় আলমডাঙ্গা রেল স্টেশনের অদূরে লাল ব্রিজের কাছে বধ্যভূমি। এ ব্রিজের তলায় পাকবাহিনী চেক পোস্ট বসায়। আপ ও ডাউনে চলাচলকারী ট্রেন থামিয়ে নারী পুরুষদের জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের হলুদ খালাসি ঘরে (বর্তমান স্মৃতিস্তম্ভ) টর্চার সেলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালাত।

নরপশুরা নারীদের ধর্ষণ করত নির্বিচারে। তিনি আরো বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই বধ্যভূমির গর্তে পাওয়া গেছে শত শত মানুষের মাথার খুলি ও হাড়। অনেকে এই বধ্যভূমিতে এসে তাদের আত্মীয় স্বজনদের আজো খুঁজে ফেরে। কেউ গুমরে কেঁদে ওঠে আবার কেউ নীরবে চোখের পানি ফেলে ফিরে যায় আপন ঠিকানায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকারু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আব্দুস সালামের সার্বিক সহযোগিতায় ও চারু বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের কারু কাজসহ বধ্যভূমির মূল নকশা বিনা পারিশ্রমিকে তৈরি করে এনে সরাসরি স্থাপন করে দিয়েছে। এই কারু কাজে দেখানো হয়েছে পাকবাহিনীর নারী ও পুরুষদের ওপর বর্বর নির্যাতনের বাস্তব চিত্রসহ মানুষের অসংখ্য মাথার খুলি। বধ্যভূমি স্মৃতি সৌধের কাছে টর্চার সেলের সেই হলুদ ঘরটি সংস্কার করে নতুন প্রজন্মকে জানাতে ১৭৫৭-১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামের সচিত্র ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি মুক্তিযুদ্ধের পর সারা দেশে খুঁজে পাওয়া বধ্যভূমিগুলো (কিলিং ফিল্ড) যাতে নতুন প্রজন্মসহ সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপিত হতে পারে সে ব্যাপারে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তারা গুগল সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে বাংলাদেশের বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিত করার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এ জন্য তৈরি হয়েছে গ্লোবাল পারসেপশন বা জিপিএস ম্যাপ। এলাকাবাসীর দাবি ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস কমিটির কার্যক্রমের অন্তর্গত করা হোক আলমডাঙ্গার বধ্যভূমিটি।

বিশেষ সংখ্যা : খুলনা বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলন-২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj