ডুমুরিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তিতে চিংড়ি চাষ বদলে দিয়েছে চাষিদের ভাগ্য

শনিবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৬

বাবুল আকতার, খুলনা ও শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া থেকে : খুলনার ডুমুরিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তিতে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে এলাকায় সাড়া জাগিয়েছে চিংড়ি চাষিরা। ঘেরের পানির গভীরতা বাড়িয়ে পরিকল্পিত নার্সারি স্থাপন, ভাইরাসমুক্ত বাগদা পিএল মজুদ ও নিয়মিত সম্পূরক খাদ্য প্রদান করে উপজেলার বড়ডাঙ্গা গ্রামের চাষিরা নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যে কারণে এখন চাষিদের মধ্যে চিংড়ি চাষে আগ্রহ বাড়ছে দ্বিগুন।

জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় ১০-১২ বছর যাবৎ ডুমুরিয়া উপজেলার বড়ডাঙ্গা গ্রামের চাষিরা সনাতন পদ্ধতিতে ঘেরে চিংড়ি চাষ করেন। এতে রোগ বালাইয়ের কারণে বেশি চিংড়ি উৎপাদন না হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ে চাষিরা। ফলে দিন দিন ঋণের টাকা পরিশোধ করতে তারা দিশাহারা হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালের প্রথম দিকে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সরোজ কুমার মিস্ত্রী এ অঞ্চলে এসে চাষিদের নিয়ে নতুন প্রযুক্তি শুরু করেন। বিভিন্ন পরামর্শ দেন চাষিদের। ঘেরের পানির গভীরতা কমপক্ষে ৩ ফুট বাড়িয়ে পরিকল্পিত নার্সারি স্থাপন, ভাইরাসমুক্ত বাগদা পিএল মজুদসহ নিয়মিত সম্পূরক খাদ্য প্রদান করে চিংড়ি উৎপাদন বৃদ্ধির অধুনিক প্রশিক্ষণ দেন তিনি।

বড়ডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা সুজিত মণ্ডল ও কয়েকজন চাষি একত্রিত হয় এ প্রযুক্তি চাষাবাদ প্রথমে শুরু করে। উপজেলা মৎস্য অফিস হতে তাদের উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বছর শেষে সুজিতের ঘেরে দ্বিগুনেরও বেশি চিংড়ি উৎপাদন হয়। খরচ বাদে হেক্টর প্রতি ৮০০ কেজি চিংড়ি উৎপাদন হয়। এতে সুজিত লাভ করে প্রায় ৫ লাখ টাকা। সুজিতের এই সফলতা দেখে ওই গ্রামের অন্যান্য চাষিরা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তারা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করে। উপজেলা মৎস্য বিভাগ এসটিডিএফ প্রকল্পের সহায়তায় ২টি ক্লাস্টারে ৫০ জন চাষিকে একত্রিত করে চাষাবাদ শুরু করে।

তাদের দেখাদেখি ওই বিরলের আরো ১৭৮ জন চাষি একই পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেছে। উপজেলা মৎস্য বিভাগ থেকে এসব চাষিকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, তদারকি ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে চাষি সুজিত মণ্ডল জানান যে, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সরোজ কুমার মিস্ত্রীর সহযোগিতায় আমাদের এ গ্রামের শতাধিক চাষি স্বাবলম্বী হয়েছে।

তিনি সরকারি দায়িত্বের বাইরেও আমাদের তদারকি করেন, পরামর্শ প্রদান করেন। এ প্রসঙ্গে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হরেন্দ্র নাথ সরকার জানান যে, বড়ডাঙ্গা এখন চিংড়ি চাষের মডেল। এখানকার চাষিরা মৎস্য অধিদপ্তরের প্রযুক্তি গ্রহণ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। এখানে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যস্মতভাবে মাছ ও চিংড়ি তৈরি হয়। চাষিরা এখানে মিশ্র চাষ পদ্ধতিতে গলদা, বাগদা ও কার্প জাতীয় মাছ চাষ করছেন।

আবার পাড়ে সবজিও চাষ হচ্ছে। জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে চাষি জয় বিশ্বাস বলেন, আমরা সবজি উৎপাদনে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করি না। ঘেরে গোবর, হাঁসমুরগির বিষ্ঠা বা কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করি না। এখানে গুড এ্যাকুয়াকালচার প্রাকটিস অনুসরণ করা হয়। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে আমরা বদ্ধপরিকর। বর্তমানে এখানে হেক্টর প্রতি এক হাজার কেজির বেশি চিংড়ি উৎপাদিত হচ্ছে। এ মডেল প্রযুক্তি দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চিংড়ি চাষি ও মৎস্য উৎপাদনে জড়িত ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত এখানে যাওয়া আসা করছেন।

সফলতার গল্প শুনে ইতোমধ্যে মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক এম আই গোলদার, ওয়ার্ল্ড ফিস, ম্যালেশিয়ার মহাপরিচালক, বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ইটালির সদর দপ্তরের সিনিয়র এ্যাকুয়াকালচার অফিসার, মৎস্য অধিদপ্তরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নিত্যরঞ্জন বিশ্বাস, বিএসএফএফ চেয়ারম্যান ডক্টর মাহামুদুল করিম, এফএও কান্ট্রি প্রতিনিধি মাইক রবসন, এফএও কনসালটেন্ট রবি কুমার, মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ উপপরিচালক প্রফুল্ল কুমার সরকার, খুলনা বিভাগীয় মৎস্য উপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, গবেষকসহ দেশি বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিরা। স্থানীয় চিংড়ি চাষিরা জানান মৎস্য বিভাগের কার্যক্রম আমাদের আশার আলো দেখিয়েছে। আমরা নতুনভাবে পথ চলতে শিখেছি। বড়ডাঙ্গা গ্রামে এখন আনন্দের জোয়ার বইছে।

বিশেষ সংখ্যা : খুলনা বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলন-২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj