জিকা ভাইরাস প্রতিরোধে : হোমিওপ্যাথি

শুক্রবার, ২২ এপ্রিল ২০১৬

জিকা ভাইরাস প্রতিরোধে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের প্রয়োগ সংকেত নিয়ে আজকের নিবন্ধ।

পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডার ভিক্টোরিয়া হৃদের কাছে অতি পরিচিত জিকা বনাঞ্চলে ১৯৪৭ সালে প্রথম এই ভাইরাসের সন্ধান মেলে। রকফেলার ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এবং ইয়েলো ফিভার রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর তত্ত্বাবধানে উগান্ডা, আমেরিকা ও ইউরোপের বিজ্ঞানীরা ওই বনে তখন ‘ইয়েলো ফিভার’ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। গবেষণার এক পর্যায়ে ‘দুর্ঘটনাবশত’ বানরের দেহে নতুন এক অনুজীবের খোঁজ পান বিজ্ঞানীরা। যার নাম দেয়া হয় ওই বনেরই নামে ‘জিকা ভাইরাস’।

১৯৫১ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়। এটা জিকাজ্বর, জিকা অথবা জিকা রোগ নামে পরিচিত। ১৯৬৪ সালে জিকা ভাইরাস সম্পর্কে ভালো তথ্য পাওয়া যায়। ইয়েলো ফিভার, ওয়েস্ট নাইল, চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু যে গোত্রের সদস্য জিকা ভাইরাস ও একই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত একটি ফ্লাভিভাইরাস। জিকা যে কারণে বিশ্বের মনোযোগ টেনেছে তা হলো মাইক্রোসেফালি (একটি নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার) ও ভাইরাসটির মধ্যে যোগসূত্র আছে।

জিকার বৈশিষ্ট্য :

অন্যান্য ভাইরাসের মতো এই ভাইরাসেরও কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-

* অকোষীয়,

* নিউক্লিয়াস, মাইটোকনড্রিয়া, সাইটোপ্লাজম এবং রাইজম থাকে না।

* নিজের খাবার নিজে তৈরি করতে পারে না।

* আবাস ও খাদ্যের জন্য পরিবর্তনশীল।

* কোষের বাইরে নিষ্ক্রিয় থাকে কিন্তু অন্য কোষের ভেতর নিজের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে।

লক্ষণ বা উপসর্গ :

* মানবদেহে জিকা ভাইরাস প্রবেশের অল্প কিছু দিনের মধ্যেই রোগের চিহ্ন ও উপসর্গ প্রকাশ পায়।

* ডেঙ্গুর মতো এখানেও জ্বর, র‌্যাশ (চামড়ায় লাল ফুসকুড়ি),

* চোখ লাল হওয়া,

* পেশিতে ও হাড়ে ব্যথা,

* গা ম্যাজ ম্যাজ করা,

* মাথা ব্যথা হতে পারে।

* জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রকৃতপক্ষে শতকরা ৮০ শতাংশ সংক্রমিত ব্যক্তিই আঁচ করতে পারে না যে তাদের শরীরে ভাইরাসটি রয়েছে। এসব কারণে ভাইরাসটি নির্ণয় করা কঠিন, আর এ সুযোগে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

জিকা কিভাবে ছড়ায় :

# এডিস ইজিপ্টি প্রজাতির মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। এই মশার কামড়ের মাধ্যমে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এডিস মশার মাধ্যমে দ্রুত এ ভাইরাসটি ছড়ায়।

# ভাইরাসটির সংক্রমণ ঘটেছে এমন কোনো রোগীকে এডিস মশা কামড়ানোর মধ্য দিয়ে এর স্থানান্তর হয়। পরে ওই মশাটি অন্য ব্যক্তিদের কামড় দিলে তা ছড়াতে থাকে। এরপর ওই ব্যক্তিদের মাধ্যমেই ভাইরাসটির বিস্তার ঘটতে থাকে।

# জিকা ভাইরাস ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো মশার মাধ্যমেই মানুষের দেহে প্রবেশ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলেছেন এক ধরনের মশা জিকা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার পর কোনো মানুষকে কামড়ালে সেই মানুষটিও সংক্রমিত হয়, তবে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ হওয়ার কোনো প্রমাণ এখনো বিজ্ঞানীরা পায়নি।

জটিলতা :

জিকা ভাইরাস প্রধানত ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের মশাবাহিত একটি ভাইরাস। এ ভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের শিশুরা মারাত্মক জন্মগত বৈকল্যের শিকার হয়।

# মেডিকেল জার্নাল স্টেম সেলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিকা ভাইরাস মস্তিস্কের কর্টেক্স বা বহিঃস্তরের কোষকে আক্রমণ করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোষের মৃত্যু হয় এবং অন্যদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও নতুন কোষ তৈরিতে ব্যাহত হয়।

# বিজ্ঞানীরা বলেছেন, গর্ভবতী মা জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তার অনাগত শিশুর মাথা স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হতে পারে এবং মস্তিষ্কের গঠন থাকতে পারে অপূর্ণ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এ রোগকে বলে- ‘মাইক্রোসেফালি’। এর ফলে আক্রান্ত শিশু ‘বুদ্ধি প্রতিবন্ধী’ হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবিকশিত মস্তিস্ক শিশুর মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি গিলিয়ান-ব্যারি সিনড্রোমেও ভুগতে পারেন। এর ফলে সাময়িক পক্ষাঘাত কিংবা ‘নার্ভাস সিস্টেম ডিজ অর্ডারের’ মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

ইংল্যান্ডের চিকিৎসকের পরামর্শ :

# স¤প্রতি একটি বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না গবেষকরা। তাদের কারো মত হচ্ছে, কয়েকটি দেশে শিশুদের ‘মাইক্রোসেফালি’ রোগে আক্রান্ত গর্ভবতী মা। ইংল্যান্ডের চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছেন, কোনো স্বামী যদি জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত এলাকা ভ্রমণ করেন তাহলে তাদের উচিত হবে এক মাসের মধ্যে সন্তান না নেয়া। অন্তত ২৮ দিন পর্যন্ত নিরাপদ যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

# আর কোনো কোনো ব্যক্তি ভ্রমণের পর জ্বরে আক্রান্ত হলে তাকে অন্তত ছয় মাস নিরাপদ যৌন সম্পর্ক করতে হবে।

# লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের চিকিৎসক অধ্যাপক লরা রডরিগুয়েস বলেন, আমি মনে করি, এই ভাইরাস যারা গর্ভবতী হওয়ার পরিকল্পনা কিংবা ইতোমধ্যে গর্ভবতী হয়েছেন তাদের জন্য খুবই স্পর্শকাতর। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’ জানিয়েছে, যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ানোর বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য তারা পাননি।

জরুরি অবস্থা জারি :

১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জিকা ভাইরাস নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। এ ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং তাতে ৩০ থেকে ৪০ লাখ লোক আক্রান্ত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালের জানুয়ারী থেকে সর্বশেষ পর্যন্ত ৪১টি দেশ ও অঞ্চলে জিকা সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। এলসাল ভাদের, কলম্বিয়া, হন্ডুরাস, ইকুয়েডরের মতো দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো ২০১৮ সাল পর্যন্ত মহিলাদের সন্তান ধারণের পরিকল্পনা বাতিল করতে বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। এ ভাইরাসের বিস্তারের জন্য জলবায়ু ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশে জিকার রোগী শনাক্ত :

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আইসিডিডিআরবির প্রতিনিধি দল চট্টগ্রামের এক ব্যক্তির মধ্যে জিকা ভাইরাস শনাক্ত করে। দেশে এটিই প্রথম জিকা ভাইরাস রোগী। যা গত ২৩ মার্চ ২০১৬ ইং তারিখে দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হয়।

রোগ নির্ণয় :

রোগীর ইতিহাস, সংশ্লিষ্ট স্থানে জিকার প্রকোপ এবং রোগের উপসর্গ দেখে সন্দেহ হলে রোগীর রক্তে জিকা ভাইরাস আরএনএ খুঁজতে হবে। অন্যান্য দেহ রসেও (থুথু, প্রস্রাব) এই আরএনএ পাওয়া যেতে পারে।

পরামর্শ ও প্রতিরোধ :

* দিনে ও রাত্রে শোয়ার সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে।

* মশার আবাস ও প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে।

* ফুলের টব ও খালি ড্রাম, গাড়ির টায়ার, গর্তসহ যেব স্থানে মশা বসতে পারে সেসব স্থানে পরিষ্কার ও শুকনা রাখতে হবে।

* দরজা জানালায় নেট ব্যবহার করতে হবে।

* ড্রেন সব সময় পরিষ্কার ও চলমান রাখতে হবে।

* দৈহিক ও মানসিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বজায় রাখতে হবে।

* দৈহিক মিলনে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

* সর্বোপরি ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে জিকা প্রতিরোধে একযোগে কাজ করতে হবে।

হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান :

জিকা ভাইরাসে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ অত্যন্ত কার্যকরী। অন্য প্যাথিতে ব্যাকটেরিয়াজনিত অ্যান্টিবায়োটিক সফলতা দেখালেও ভাইরাসজনিত রোগে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ধন্বন্তরী।

জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে লক্ষণ সাদৃশ্যে নিম্নলিখিত ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। যথা-

১. একোনাইটন্যাপ,

২. বেলেডোনা,

৩. রাসটক্স,

৪. ব্রায়োনিয়া,

৫. পালসেটিলা,

৬. নেট্রাম সালফ,

৭. নেট্রাম মিউর,

৮. পডোফাইলাম,

৯. ইউপেটোরিয়াম-পার্ফোলিয়েটাম,

১০. জেলসিমিয়াম,

১১. ফসফরাস,

১২. ক্যালকেরিয়া,

১৩. কষ্টিকাম,

১৪. জিংকাম সহ আরো ফলদায়ক ওষধ আছে। তার পরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

:: ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

হোমিও চিকিৎসক ও কলামিস্ট

সিএইচসিআর (সেন্টার ফর হোমিও

কনসালটেশন এন্ড রিসার্চ)

১, বংশাল রোড, ফিরিঙ্গীবাজার, চট্টগ্রাম।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj