স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক ও বর্তমান কাল

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৬

** রবিউল হুসাইন **

বিংশ শতাব্দীর সত্তর দশকে দুই মাথার আজব দেশ অসভ্য পাকিস্তান আর তাই সাহায্যকারী পরাশক্তি আমেরিকা ও চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও সংগ্রাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন নিঃসন্দেহে পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য গণযুদ্ধ বিজয়ের ঘটনা। সাধারণত ২০ শতকে দেখা গেছে, একটি দেশের স্বাধীনতা লাভ হয়েছে সরাসরি বিপ্লব বা ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে পারস্পরিক বোঝাবুঝির মাধ্যমে। যেমন বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়া, চীন, কিউবা, ভিয়েতনামে যথাক্রমে লেনিন, মাও সেতুং, ফিডেল কাস্ট্রো, হোচি মিন প্রমুখ কালজয়ী বিপ্লবী দেশনায়কের দক্ষ ও সংগ্রামী পরিচালনা ও যুদ্ধজনিত প্রভূত রক্তক্ষয়ের বিনিময়ে, আর ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বহু দেশ পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শাসকদের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা-সমঝোতার ভিত্তিতে সেসব দেশে স্বাধীনতার লাল সূর্য উদিত হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এবং অনন্য উপায়ে অর্জিত এবং তা হচ্ছে প্রচলিত গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক কাঠামোর গণ্ডিতে থেকে এর চর্চা করতে করতে ধীরে ধীরে আপন গতিতে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনেও দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে একটি শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে যায়। এর পেছনে ছিল বিভিন্ন সময়ের জোর গণতান্ত্রিক আন্দোলন, জনতার নিরঙ্কুশ সমর্থন, দেশের ভাষা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, শিল্প, সংস্কৃতি, ধর্ম, লোকাচারের প্রতি অভিন্ন মনোযোগ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের নিজস্ব স্বপ্নের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সুচারু ও বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপনা। এ কথা সত্যি যে, বাংলাদেশ নামক ভূভাগ অতীতকালে বহুদিন যাবৎ বিদেশি শাসকদের অধীনে যুগ যুগ ধরে শাসিত হয়ে আসছিল। এইসবের প্রেক্ষিতে তাই ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে স্বাধীনতা লাভের জন্য ঘোষণা এবং পরবর্তী সময়ে তার অর্জন এ দেশের মানুষের জন্য বিশাল প্রাপ্তি ও বিরাট রাজনৈতিক সফল ঘটনা। এর পেছনে কাজ করেছে শত শত মানুষের আত্মোৎসর্গের ঘটনা ও মূল লক্ষ্যের প্রতি অবিচল ও একতাবদ্ধ থাকার অব্যাহত প্রচেষ্টা। এই সঙ্গে আরো একটি উপাদান মূলধারা হিসেবে কাজ করেছে। তা হলো আপামর জনসাধারণের উদ্দীপ্ত সাংস্কৃতিক চেতনা, যা ছাড়া স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা কোনোদিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারতো না। তাই বলা যায়, স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা ও প্রাপ্তির ঐকান্তিক ইচ্ছা সাংস্কৃতিক চেতনা থেকেই উৎসারিত, যেহেতু সংস্কৃতি গড়ে ওঠে সাধারণ মানুষের লোকায়ত জীবনাচার, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, গণতান্ত্রিক মানসিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, দেশ, মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা, শিল্প ও ঐতিহ্যের প্রতি মমত্ববোধ, আপন ধর্ম, ভাষা, লৌকিক আচার ও স্বরূপের প্রতি সচেতনতা ও পরিক্রমান্তর চর্চা- এইসবের সমভিব্যাহারে আপনাআপনি স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে জন্ম নেয় স্বাধীন হওয়ার স্পৃহা। আমাদের স্বাধীন হওয়ার আকাক্সক্ষা এইভাবেই সংস্কৃতি চেতনার সচেতন চর্চার মধ্য দিয়েই জন্ম লাভ করেছে এবং সঠিক নেতৃত্ব ও আপামর জনগণের প্রাণঢালা সমর্থনে তার বাস্তবায়ন হয়েছে। সাংস্কৃতিক চেতনা উৎসারিত বোধে জারিত এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রনীতি ও কাঠামোর ভেতরে থেকে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পাকিস্তানের সেনা শাসন ব্যবস্থায় যখন একটি রাজনৈতিক দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগের অংশ নেয়া খুব স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরিত হতে যাচ্ছিল তখন গণতন্ত্রলেবাসী সামরিক শাসকরা তা না করে নিরপরাধ-নিরস্ত্র শান্তিকামী বাঙালি জনগণের ওপর হঠাৎ করে সশস্ত্র আক্রমণ করে যুদ্ধের অবতারণা করে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব, দুটি দেশের মধ্যে ধর্ম ছাড়া ভাষা, সংস্কৃতি, লোকাচার, শিল্প ও ঐতিহ্যের বিশাল ব্যবধান। বছর বছর ধরে ক্রমাগতভাবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের পূর্ব বাংলা শোষণ, প্রায় সব মানবিক অধিকার থেকে বাঙালিদের বঞ্চিত করা, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, জিঘাংসা, অব্যাহত সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের নামে স্বৈরশাসন, প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার অধিকার হরণ ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে দেখা দেয় এবং এই অবস্থার সুযোগ, যদিও তা বহু ত্যাগ, রক্ত ও বিসর্জনের মধ্যে দেখা দিয়েছিল, এ দেশের রাজনৈতিক নেতা শেরে বাংলা, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী এবং পরিশেষে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে গ্রহণ করে সেটিকে সফল এক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার কাক্সিক্ষত দরজায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। জনগণের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী এই দেশে যুগে যুগে বহু বছরব্যাপী স্বাধীনতা বাস্তবায়িত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সফলতার মুখ ও সুখ খুব কম এবং অল্প সময়ের জন্য দেখা দিয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় দশকে অশোকের আমলে এবং পরবর্তী সময়ে যে বৌদ্ধ শাসন এ দেশে চলেছিল যার অস্তিত্ব বগুড়ার পুণ্ড্রনগরে বা নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বরে আমাদের সবচেয়ে প্রাচীন প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শনে দেখা যায় তখন আইনের শাসন বৌদ্ধ ধর্মের উদার মানবিক নীতি অনুযায়ী প্রায় স্বাধীন দেশের মতোই এদেশবাসী বসবাস করেছিল। হিন্দু ধর্মের কঠোর বর্ণপ্রথা মানবিক অধিকারের পরিপন্থী এবং সেকালে এই কারণে সাধারণ মানুষের ওপর অপমান, অবিচার, অত্যাচার, সবসময় অব্যাহত ছিল বছরের পর বছর। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ হেতু পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের আবির্ভাব ঘটে এবং দেখা গেছে এ দেশে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী শাসকরাই সবচেয়ে সফলভাবে দেশ পরিচালনা করে গেছেন যেখানে মানুষের মধ্যে মানবিক গুণ, পরমত, পরধর্ম, পরগোত্র সহিষ্ণুতা প্রবলভাবে বজায়ের ধারাবাহিকতায় উজ্জ্বল ছিল। এর ফলে এ দেশের শিল্প, সাহিত্য ও স্থাপত্যে এদেশীয় স্বরূপ ও নিজস্বতার জন্ম হয়। মাৎস্যন্যায় ও অরাজকতা বহুল পরবর্তী সময়ে সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে এ দেশে গণতন্ত্রের প্রধান চালিকাশক্তি গণনির্বাচনের মাধ্যমে একজন রাজা যার নাম গোপাল প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন এবং দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের নাটকের সেন রাজন্যরা পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধদের এদেশ থেকে বিতাড়ন করার কঠোর ও অমানবিক কর্মসূচি অনুসরণ করে শাসনভার গ্রহণ করে। এই সময়ে উত্তর বাংলার দিনাজপুরে দশম শতকে দিব্যক নামে একজন সুশাসক কৈবর্ত গোত্র থেকে আবির্ভূত হয়ে স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা করা শুরু করেন। কিন্তু তা উচ্চবর্ণের বৌদ্ধ-ব্রাহ্মণদের চরম অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তাই তাকে বৌদ্ধ রাজাদের সাহায্যে নৃশংসভাবে দমন করে আরো কঠোরভাবে বর্ণ প্রথার প্রচলন হয়। যারা নিচু জাতের তারা এ রূপে আবির্ভূত না হতে পারে। পরবর্তীকালে হিন্দু রাজন্য সেনদের কুশাসন আমলেই বখতিয়ার খিলজী নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করে যখন সতেরোজন অশ্বারোহী নিয়ে এদেশে আমগন করেন তখন প্রায় বিনা বাধায় অত্যাচারিত সাধারণ মানুষের সমর্থনে তিনি সংবর্ধিত হন। এরপর সুলতানী আমলের ইলিয়াস শাহের শাসনামলে সোনারগাঁও রাজধানী কেন্দ্রিক সুশাসনে এ দেশের সব ধর্মের মানুষ সবচেয়ে শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ পায়। অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় লালিত সেই সুলতানগণ হিন্দু সম্প্রদায়ের বুদ্ধিজীবী, পণ্ডিত ও শিক্ষিত ব্যক্তিদের সহযোগিতায় এ দেশে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সুশাসনের আদর্শ অবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার যে প্রমাণ রেখে গেছেন, তা এককথায় আজ এই বৈরী সময়ের প্রেক্ষিতে এক অসামান্য রাজনৈতিক সহাবস্থানের অভূতপূর্ব নিদর্শন হয়ে বিরাজ করবে যুগ যুগ ধরে। সেই সময়ে সেই বিদেশি পরে স্বদেশী মুসলিম সুলতানদের রাজত্বে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, কৃষ্টি, স্থাপত্য, কবিতা, ক‚টনীতি যেভাবে যে উচ্চতায় পৌঁছেছিল তা এক কথায় অনবদ্য। বাঙালি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চিরস্থায়ী নিদর্শন- সেই সময়কে কেন্দ্র করে যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীর বৌদ্ধ ধর্মীয় পাল আমলের পর আবার তার পুনরাবির্ভাব ঘটে। এই রাজনৈতিক সুশাসনের দ্বারা স্বাধীন হয়ে সব সময় অবস্থান করার আকাক্সক্ষাই সাধারণ মানুষের মনের কথা যা যুগে যুগে বিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং সেটিই এ দেশের বাঙালিদের প্রকৃত পরিচয় বজায় রাখার ধারাবাহিকতা বা যোগসূত্র। এই সূত্র বারবার ছিন্ন হয়েছে ঠিকই কিন্তু কালের অমোঘ নিয়ম এমনই যে, যা সৎ, সঠিক, মানবতাবাদী এবং মাটি ও মানুষের প্রকৃত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনুসারী তাকে কখনো ধ্বংস করা যায় না। এর ধারাবাহিকতা টিকে থাকেই। এই কারণে দেখা যায় সুলতানী আমলের সুশাসনের পর বিভিন্ন কালে পরবর্তী সময়ে মোগল পর্যন্ত মোটামুটি এ দেশ বিদেশি পরে স্বদেশিতে রূপান্তরিত শাসনকর্তাদের দ্বারা শাসিত হতে হতে আঠারোশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত বিজাতীয় ইংরেজ- পরে চব্বিশ বছর অত্যাচারী পাকিস্তানি শাসকদের হাতে নির্যাতিত ও অধিকার বঞ্চিত হয় এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের সমর্থনে এ দেশ বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এই স্বাধীনতার বয়স পঁয়তাল্লিশ বছর। এর মধ্যে দুঃখ ও হতাশাজনকভাবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং একাধিক সেনাশাসক জিয়াউর রহমানসহ দুই রাষ্ট্রপতি ও রাজনীতিবিদের হত্যা ও একাধিক গণতান্ত্রিক নির্বাচন এ দেশে ঘটে গেছে। জনবহুল এবং ছোট্ট এই সবুজ দেশে তবুও শান্তি ফিরে আসছে না। আগের সরকারের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যেভাবে হত্যা, সন্ত্রাস, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, রাজনৈতিক অত্যাচার, পরাজিতের ওপর বিজিতদের নির্যাতন, প্রতিশোধমূলক নিষ্পেষণ ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা চলছে না ঠিক, তবে মনে হয় আমরা আফ্রিকার রুয়ান্ডাবাসীদের মতো দুটি পরস্পরের চিরপ্রতিদ্ব›দ্বী গোত্র হুতুতু আর টুটসিদের মতো উন্মাদ হয়ে গেছি যাদের প্রত্যেককে জাতিসংঘের উচিত তাদের পক্ষ থেকে অতি জরুরি ভিত্তিতে রাজনৈতিক শিষ্টাচার শিক্ষা ও তৎপরবর্তী মানসিক সুচিকিৎসার জন্য অবিলম্বে আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান মনোবিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মনোচিকিৎসার টাস্কফোর্স গঠন করে এই মুহূর্তেই কাজে নেমে যাওয়া। তা না হলে অতি শিগগিরই ঘেয়ো কুকুরদের মতো মারামারি করতে করতে আমাদের অস্তিত্ব দুঃখজনকভাবে সত্বর বিলীন হয়ে পড়বে।

:: রবিউল হুসাইন : কবি, স্থপতি।

২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিশেষ আয়োজন-২'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj