সেই মহৎপ্রাণ

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৬

** আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক **

একজন মানুষের সততা ও দৃঢ়তা যে কত বড় পরিবর্তন ও প্রভাব ঘটাতে পারে এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের প্রয়াত মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান। মো. জিল্লুর রহমানের রয়েছে দীর্ঘ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও কর্মজীবন। বঙ্গবন্ধুর সাহচর্যে সময় কাটিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ দেশের সব মানুষের আপনজন ছিলেন।

মো. জিল্লুর রহমান রাজনীতির দীর্ঘপথ পরিক্রমায় কখনোই নিজেকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখেননি। জনগণই ছিল তার শক্তি, উৎসাহ ও প্রেরণা। জনকল্যাণই ছিল তার রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আপাদমস্তক এই রাজনীতিক দেশের প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের কাতারে থেকে যে ভূমিকা আমৃত্যু পালন করে গেছেন, তা কত ব্যাপক এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে বর্ণনা দেয়া দুরূহ। সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় বহু সাধারণ মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন যে, আমাদের রাষ্ট্রপতির শারীরিক অবস্থা এখন কেমন? কথাটা এ জন্য উল্লেখ করলাম, একজন রাষ্ট্রপতির জন্য সাধারণত মানুষের এমন উৎসাহ তার প্রতি প্রবল ভালোবাসারই সাক্ষ্য বহন করে। রাজনীতিনিষ্ঠ খাঁটি মানুষের প্রতিকৃতি তো এমনই। মো. জিল্লুর রহমান একটি নাম, একটি অনন্য ব্যক্তিসত্তার পরিচয়। একজন আদর্শবাদী একনিষ্ঠ রাজনীতিবিদদের প্রতিকৃতি। অত্যন্ত সাদাসিধা ও সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন আমাদের এই জননন্দিত রাষ্ট্রপতি। দেশ-জাতির বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে তার ভূমিকা এ দেশের রাজীতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। শুধুই রাষ্ট্রপতি নন, তিনি ছিলেন জাতির অভিভাবকতুল্যও। বিভাজনের রাজনীতিতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আস্থার প্রতীক। সততা ও আদর্শনিষ্ঠার জন্য জীবদ্দশায়ই তিনি হয়ে ওঠেন প্রবাদপুরুষ।

আজ বহু স্মৃতি মনে পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির নবীন সাংবাদিকদের নিয়ে আমি একবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত এই তরুণ ছাত্রছাত্রীদের কাছে পেয়ে তিনি ফিরে গিয়েছিলেন তার ছাত্রজীবনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সেদিনের সেই সাক্ষাতে তিনি অনেক কিছুই বলেছিলেন অকপটে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সময় ছাত্র হিসেবে তার ভূমিকা ও ছাত্র রাজনীতিতে তার সম্পৃক্ততা ইত্যাদি নানা বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও গর্বের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের কাছে উপস্থাপন করছিলেন। তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের স্বর্ণময় অধ্যায় থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে অনেক কিছু।

ছাত্রছাত্রীরা মুগ্ধ হয়ে শুনছিল মহামান্য রাষ্ট্রপতির ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতার কথা, সে সময়ের ছাত্র রাজনীতির মূল্যবোধের কথা, নীতি-নৈতিকতার কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি এসেছিলেন আমাদের ৪৭তম সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করার জন্য। ওই সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জি। বাংলা ভাষাভাষী দুই রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি বসে থাকার চিত্র প্রতীকী অর্থে একটি বিরল মুহ‚র্ত। আমাদের রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদানের পর যে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন তা এখনো কানে বাজছে। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তিনি তুলে ধরেছিলেন মানবসেবার কথা, দেশপ্রেমের কথা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। আমাদের রাজনীতির অঙ্গনের এই বিশুদ্ধ পুরুষের শারীরিক বিদায় আসলে অকাল মৃত্যুই বলতে হবে। কিছু কিছু মানুষ থাকেন যারা যত পরিণত বয়সেই মৃত্যুবরণ করেন না কেন তাদের মৃত্যু অকাল মৃত্যুই থেকে যায়, কারণ আরো বহু কিছু দেয়ার থাকে তাদের। প্রয়াত মো. জিল্লুর রহমান সেই ধরনেরই একজন বিরল ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষ।

তার জীবনচিত্রই বলে দেয় তার কর্ম ও খ্যাতির পরিধি কত বিস্তৃত। দলের সরকারের, সাধারণ মানুষের ও রাজনীতিকদের কাছে তিনি নিজ গুণেই হয়ে উঠেছিলেন সবার আপনজন। ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় সহধর্মিণী রাজনীতিক আইভি রহমানকে হারিয়ে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। তারপরও তিনি সবকিছু সহ্য করে আবার শক্তি সঞ্চয় করে দেশ-জাতির স্বার্থে দায়িত্ব কাঁধে নেন। সেই হামলায় অনেক মূল্যবান প্রাণ ঝরে যায়। তিনি তখন সাংবাদিকদের মাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘এই দেশটাকে বাঁচান, মৌলবাদীদের হাতে দেশটাকে ধ্বংস হতে দেবেন না।’ আজ যখন বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের তাণ্ডব পরিলক্ষিত হচ্ছে, তখন মো. জিল্লুর রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কথা পুনরুদ্ধার গভীরভাবে মনে পড়ছে। আবারো তার স্মৃতির উদ্দেশে গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

:: আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক : উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিশেষ আয়োজন-২'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj