শিক্ষা সংক্রান্ত বিক্ষিপ্ত ভাবনা

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৬

** মো. রহমত উল্লাহ **

আমার প্রিয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর একটি দৈনিক ভোরের কাগজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যার জন্য শিক্ষা বিষয়ক কিছু লিখতে গিয়ে কিছুটা বেকায়দায় পড়েছি। আমাদের শিক্ষা নিয়ে লেখার মতো বিষয় এত বেশি যে, কোনটা বাদ দিয়ে কোনটা লিখবো তা ঠিক করতে পারছি না। তাই কিছু বিক্ষিপ্ত বিষয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত পুনঃআলোচনা করছি; যা আমি বলে আসছি বারবার। উদ্দেশ্য একটাই, আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার আলোকে আলোচিত এই বিষয়গুলোর প্রতি যদি শিক্ষক, অভিভাবক এবং সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের সদয় দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে পারি তো সামান্য উপকৃত হবে দেশ ও জাতি।

(ক) জীবনের শুরুতে সবার জন্য চাই সুশিক্ষা অর্জনের শপথ। সঠিকভাবে নিজেকে ও নিজের বিবেককে তৈরি করার শপথ। সৎ ও নীতিবান থাকার শপথ। দুর্নীতিমুক্ত থাকার শপথ। জাতীয়তাবোধ তৈরির শপথ। যেই মজবুত শপথ বুকে নিয়ে সহজেই সম্ভব দেশ, জাতি ও মানুষের সত্যিকার কল্যাণ।

শুধুমাত্র নিচের ক্লাসের অবুঝ শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের পাঠের জন্যই নয়, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ শ্রেণি-পেশা-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্যই বাধ্যতামূলক থাকা চাই একটি সহজবুদ্ধ অর্থবহ নিরপেক্ষ শপথ। যা হবে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের মতই জতীয় শপথ। যা হতে পারে এমন : [‘আমি শপথ করছি যে, সদা সত্য কথা বলবো ও সৎ পথে চলবো। ছোটদের স্নেহ ও বড়দের মান্য করবো। সুশিক্ষা অর্জনে আমরণ আন্তরিক থাকবো। প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র ও স্বধর্মের সকল বিধি-বিধান মেনে চলবো। ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবো। আমাদের জাতীয় চেতনা, একতা ও স্বাধীনতা সুরক্ষায় সর্বদা সক্রিয় থাকবো। হে সর্বশক্তিমান, আমাকে শক্তি দিন, আমি যেন সুনাগরিক হয়ে- প্রতিষ্ঠান, মাতৃভূমি ও মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে পারি।’ -আমিন/(প্রার্থনা পূর্ণ হোক)।

(খ) আনন্দহীন শিক্ষা ক্ষণস্থায়ী আর আনন্দঘন শিক্ষা চিরস্থায়ী। শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রেষণা হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। তিরস্কার না করে ধন্যবাদ দিন, সামান্য কৃতিত্বে অসামান্য পুরস্কার দিন, ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় বুঝতে দিন, দেখবেন তেমন প্রয়োজন নেই শিশুদের শাসন-বারণ। আমরা শিশুদের যতটা অবুঝ মনে করি শিশুরা ততটা অবুঝ নয়। তারা আমাদের চেয়েও অনেক বেশি সবুজ। তাদের কল্পনার জগৎ আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। তারা মিথ্যা জানে না; আমরা জানাই। তারা ফাঁকি বুঝে না; আমরা বুঝাই। তারা নিষ্ঠুর নয়; আমাদের কারণেই নিষ্ঠুর হয়। তারা স্বনির্ভরভাবে দাঁড়াতে চায়; আমরাই পরনির্ভর করে তুলি। শিশুরা দুষ্টুমি জানে না; আমরা জানাই। আমরা যাকে দুষ্টুমি বলি, তা শিশুদের অত্যন্ত জরুরি কাজ বা অতি আনন্দের খেলা। এটি সে আজীবন করবে না। তাকে অন্য কাজ দিন, খেলা দিন। এজন্য শাস্তি দিলে নিরানন্দময় হয় শিশুর জীবন। প্রতিবাদে ফুঁসে উঠে তার কোমল মন। হারায় তারুণ্য। আক্রান্ত হয় বিষণœতায়। শিশুরা দেখে-শুনে-ঠেকে-জেনে, যা বোঝে, যা শিখে তা-ই করে। তাদের অনুকরণ ও অনুসরণ ক্ষমতা অনেক বেশি। আমরা সবাই যদি সঠিক পথে চলি তো আমাদের শিশুরা অবশ্যই সঠিক পথে চলবে। থাকবে না এত বেশি শাসন-বারণ-শাস্তির প্রয়োজন।

(গ) প্রতিদিন হাজারো শিশু শিক্ষার্থী নিজ গৃহেও নির্যাতিত হয় তাদের পিতা, মাতা ও গৃহশিক্ষকদের দ্বারা। আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ করে ক্যাডেট কলেজে ও কওমি মাদ্রাসায় নির্যাতনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি এবং ধরন বিচিত্র। সেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষর্থীরা শ্রেণিকক্ষে, শিক্ষক কক্ষে, প্রশিক্ষণ মাঠে, প্রশিক্ষক কক্ষে এবং আবাসক কক্ষসহ সর্বত্রই প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হয় শিক্ষক/প্রশিক্ষক/সিনিয়রদের দ্বারা। শুধু লেখাপড়ার জন্যই নয়; চলতে-ফিরতে, উঠতে-বসতে, নাইতে-খাইতে, জাগতে-ঘুমাতে এমনকি হাসতে-কানতেও নিয়মের সামান্য ব্যত্যয় ঘটলে পেতে হতে পারে কঠোর শাস্তি। তাই বারবার পালিয়ে যেতে চায় বা পালিয়ে যায় প্রতিষ্ঠান থেকে। বাড়িতে গিয়েও উল্টো ধমক খেতে হয় সবার। পড়া না পারলে, দুষ্টামি করলে, কথা না শুনলে তো মারবেই। ফিরে যেতে বাধ্য হয় আবার সেই ভয়ার্ত আস্তানায়। যারা এতিম, তাদের তো আর পালানোর জায়গাও নেই, কষ্ট শোনার মানুষও নেই!

এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি থেকে সুরক্ষার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়ন। অনেকেই জানেন না, শিক্ষার্থীদের শাস্তি দিয়ে বা ভয় দেখিয়ে নয়; বরং অনুকরণীয়-অনুসরণীয় আদর্শ ব্যক্তিত্ব দিয়ে, সত্যিকারের আদর দিয়ে, উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে, বিবেক জাগ্রত করে, মানব ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে, বাস্তবতাপূর্ণ উচ্চাশা দিয়ে, সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতে দিয়ে, আর সবার মতো সেও পারে এমন সৎসাহস দিয়ে, ভয়ভীতিহীন আনন্দঘন পরিবেশ দিয়েই সুনিশ্চিত করা যায় প্রতিটি শিশুর মেধানুযায়ী সুশিক্ষা। যার জন্য আমূল অনুক‚ল পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়। সরকারের সঙ্গে শিক্ষক, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ, সমাজপতি, ইমাম, নেতানেত্রীসহ সমাজের সবাই মিলে সব প্রতিষ্ঠানে ও আবাসস্থলে শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে নির্যাতনমুক্ত পরিবেশ।

(ঘ) সবাই জানেন ও মানেন, ব্যাপক অর্থে শিক্ষা হচ্ছে ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন।’ সুশিক্ষার জন্য প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। এ জন্যই খেলাধুলাকে এখন বলা হয় সহশিক্ষা। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য প্রতিটি মানুষের, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের প্রয়োজন নিয়মিত খেলাধুলা।

খেলাধুলার এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই শিক্ষার্থীদের পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে শারীরিক শিক্ষা নামে একটি পাঠ্য বিষয়। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে শহরকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তেমন কোনো আঙিনা বা খেলার মাঠ না থাকায় বাস্তবে এই ব্যবহারিক বিষয়টির চর্চা করার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে আমাদের শহর কেন্দ্রিক শিক্ষার্থীরা চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছে খেলাধুলা তথা শারীরিক শিক্ষার অধিকার থেকে।

প্রতিটি সচেতন মানুষই স্বীকার করবেন এই বাস্তব সত্য। অথচ আমরা প্রতিনিয়তই দখল বা জবরদখল করে নিচ্ছি আমাদের সন্তান ও শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য আলো-বাতাসে খেলাধুলা করার প্রতিটি স্থান। এমনকি সরকারের সহায়তায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাতেও বিবেচনা করা হচ্ছে না শিক্ষার্থীদের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় আলো-বাতাস ও খেলাধুলার স্থান সুরক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি! শহরকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত খালি জায়গা নেই, সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও নিচের তলা ফাঁকা না রেখেই তৈরি করা হচ্ছে নতুন নতুন ভবন! আমাদের সন্তানদের বৃহত্তর স্বার্থে কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না এই অবস্থা।

(ঙ) পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি শিক্ষা মূল্যায়ন ফলাফল প্রকাশের গ্রেডিং স্তর। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রে নয়, জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে জরুরি হয়ে পড়েছে যোগ্যতা ও দক্ষতার চুলচেরা ডিজিটাল বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন। সেজন্যই প্রবর্তন করা উচিত এচঅ ১০ পদ্ধতি। যা আমি বিস্তারিত উপস্থাপন করেছি একাধিক পত্রপত্রিকায়। তা না হলে যে হারে বাড়ছে এ+এর সংখ্যা তাতে আর ক’দিন পরেই শুরু হবে এ+ (সর্বোচ্চ মেধাবী) বেকারদের মিছিল। ভালোদের ভিড়েই তো হারিয়ে যাচ্ছে ভালোরা! তাছাড়া ৩৩% নম্বর দিয়ে (দান করে) পাস করানোর কী প্রয়োজন? সরকার নিজেইতো কোনো চাকরিতে আবেদন করার সুযোগ দেয় না এদের! তাহলে কেন প্রদান করা হচ্ছে এই মূল্যহীন সরকারি সনদ? তাই অন্যান্য দেশের মতো ৪৫% বা ৫০% নম্বরে নির্ধারণ করা উচিত (পাস) উ গ্রেড। [যা আমার প্রস্তাবিত এচঅ ১০ পদ্ধতির সর্ব নিম্ন ধাপ।] অপরদিকে ৯০% নম্বরে অ++ বা গোল্ডেন অ+ নামে অতি মেধাবীদের প্রদান করা উচিত একটি আলাদা গ্রেড। [যা আমার প্রস্তাবিত এচঅ ১০ পদ্ধতির সর্বোচ্চ ধাপ।]

(চ) ব্যক্তিগতভাবে প্রতিষ্ঠিত ও বণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হাজার হাজার কোচিং সেন্টার বন্ধ করার আগে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে শ্রেণিকক্ষে পরিপূর্ণ পাঠদান। সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষার্থীদের প্রদত্ত টিউশন-ফির বিনিময়ে প্রাপ্য ক্লাস। দেশের রোগীদের মতো শিক্ষার্থীরাও বাধ্য হয়েই এখন নির্ভরশীল প্রাইভেট ব্যবস্থার ওপর। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও কোচিংয়ের নামে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে প্রাইভেট পড়ানো। দেখেও না দেখার ভান করেছে সবাই। যাদের দেখার দায়িত্ব তাদের অনেকের সন্তানরাই প্রাইভেট পড়ে সর্বাধিক। যে প্রতিষ্ঠানের যত বেশি নাম ডাক, সে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তত বেশি প্রাইভেট-কোচিং। সে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তত বেশি বাণিজ্য। সব স্তরের শিক্ষকরাই থাকা উচিত প্রতিষ্ঠানে অবস্থানের সুনির্দিষ্ট সময় বা কর্মঘণ্টা।

(ছ) সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষাগুলোতে আগের তুলনায় নকল কমলেও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষায় এখনো নকলের আভিযোগ আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএসসি এবং এইসএসসি পরীক্ষায় কোনো ম্যাজিস্ট্রেট থাকে না বিধায় নকলের মহোৎসব চলে। এই মহোৎসব বন্ধ করা জরুরি। মনে রাখতে হবে এ সব শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফলাফল এখন সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীদের ফলাফলের সমমান সম্পন্ন। তারা অধিক যোগ্য হলে, শুধু দেশেই নয়, বিদেশে গিয়েও আয় করতে পারবে অধিক বৈদেশিক মুদ্রা। তাই শুধু পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেই চলবে না; বরং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার পরীক্ষা, বিসিএস পরীক্ষাসহ সব ছোট-বড় চাকরির বাছাই পরীক্ষা করতে হবে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত।

(জ) আমাদের নবীজি (সা.) তো হাত পাততে বলেননি, কাজ করে খেতে বলেছেন। কাজ করতে হলে তো ধর্মীয় জ্ঞানলাভের পাশাপাশি কোনো না কোনো কাজের যোগ্যতা লাভ করতেই হবে।

একটা দেশের সবাই যদি এরূপ কওমি মাদ্রাসায় পড়া এবং পড়ানোর কাজ করে তো হুজুরদের চিকিৎসার জন্য ডাক্তার পাব কোথায়? ওষুধ বানাবে কে? সুন্দর সুন্দর মসজিদ, মাদ্রাসা ও বাড়িঘর বানানোর ইঞ্জিনিয়ার পাব কোথায়? কে বানাবে ফ্যান, ফ্রিজ, এসি, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন? ফ্যানের বাতাস আর এসির ঠাণ্ডা খাওয়ার জন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানাবে বা চালাবে কারা? ওয়াজ করার জন্য মাইক বানাবে কে? চাষাবাদ করার লোক আসবে কোথা থেকে? কে উদ্ভাবন করবে অধিক ফসল উৎপাদনের কৌশল? কারা আবিষ্কার করবে কাপড় তৈরির সুতা? কারা তৈরি করবে শরীর ও পোশাক পাক-সাফ করার সাবান? কে আবিষ্কার করবে মাটির ঢিলার বিকল্প টয়লেট পেপার? কে উদ্ভাবন ও ব্যবহার উপযোগী করবে আল্লাহতায়ালার দেয়া খনিজসম্পদ, পানিসম্পদ, বায়ুসম্পদ, বেতার তরঙ্গ আর সৌরশক্তি? কারা তৈরি ও পরিচালনা করবে দ্রুতগামী যানবাহন? কারা করবে এরূপ দান-খয়রাত?

সুস্থ-সবল সবাই কর্মক্ষম হলে, কর্মে নিয়োজিত হলে নিশ্চয়ই বৃদ্ধি পাবে দেশের সচ্ছলতা ও অগ্রগতি এবং হ্রাস পাবে পরনির্ভরতা ও পরাধীনতা। আত্মনির্ভরশীলতার অভাবই আমাদের অনৈক্য ও অশান্তির প্রধান কারণ। তাই নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী ও বিজ্ঞানমনস্ক করা জরুরি দেশের কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা।

(ঝ) এমন অনেক কলেজ-মাদ্রাসা আছে, যেখানে ১৫/২০ জন শিক্ষক, ৪০/৫০ জন শিক্ষার্থী। অনেক কলেজ-মাদ্রাসায় এমন বিভাগ আছে, যেখানে ৫/৭ জন শিক্ষার্থী, ৮/১০ জন শিক্ষক। অধিকাংশ কলেজ-মাদ্রাসায় এমন এমন অনেক বিষয় আছে যেখানে শিক্ষক আছেন ঠিকই কিন্তু শিক্ষার্থী ২/১ জন আছে অথবা নেই। অথচ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একাধিক বিভাগ ও বিভাগের বিষয় না খুলে একেকটি উপজেলায়/থানায় প্রয়োজন বা চাহিদা অনুসারে বিশেষায়িত করে ছোট-বড় একটি সাইন্স কলেজ, একটি আর্টস কলেজ, একটি কারিগরি কলেজ ও দু’একটি কমার্স কলেজ থাকলে অর্ধেকেরও কম সংখ্যক ভালো শিক্ষক দিয়েই সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা সম্ভব বর্তমান সংখ্যক শিক্ষার্থীর লেখাপড়া। সেখানেই হতে পারে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উচ্চ শিক্ষা।

তদুপরি প্রতিটি উপজেলায় হিড়িক পড়েছে ডিগ্রি, অনার্স ও মাস্টার্স কলেজ করার। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে বিষয় খোলা হচ্ছে নিজেদের বেকার স্বজনদের চাকরির কথা বিবেচনা করে। শিক্ষার্থী থাকুক চাই না থাকুক, নিজের বা দলের মানুষের চাকরি হলেই হলো। বেতন দেবে সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় করে দিবেন প্রতিটি জেলায়। একটা বিশ্ববিদ্যালয়েই তো লেখাপড়া করতে পারে ১০/১৫ হাজার শিক্ষার্থী। তার ওপর এত এত কলেজে উচ্চ শিক্ষা। সবাই উচ্চ শিক্ষা নিলে কারিগরি কলেজে পড়বে কারা? এভাবে অযোগ্য শিক্ষক আর অপরিকল্পিত প্রতিষ্ঠান বাড়ালে কীভাবে বৃদ্ধি পাবে শিক্ষার মান? অবশ্যই বন্ধ করতে হবে এই আত্মঘাতী প্রক্রিয়া। সেইসঙ্গে দলীয় কমিটির কবল থেকে মুক্ত করতে হবে শতকরা ৮০ ভাগেরও অধিক শিক্ষার্থীদের হাজার হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

একটা জেলা বা উপজেলা থেকে কতজন কোন বিষয়ে অনার্স দরকার, কতজন ডাক্তার দরকার, কতজন ইঞ্জিনিয়ার দরকার, কতজন পিএইচডি দরকার, কতজন আলেম দরকার, কতজন মুফতি দরকার, কতজন কৃষিবিদ দরকার, কতজন পুষ্টিবিদ দরকার, কতজন নার্স দরকার, কতজন শিক্ষক দরকার, কতজন কারিগর দরকার এবং এই চাহিদা মিটানোর জন্য কতটি কোন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দরকার তার কোনো হিসাব সরকারের কাছে আছে কিনা আমার জানা নেই। তবে এই হিসাব-নিকাশ করেই তৈরি করা বা অনুমোদন দেয়া দরকার নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। উন্নত বিশ্বে তাই হয়ে থাকে। অন্যথায় শিক্ষা খাতে অর্থ ব্যয় লাভজনক বিনিয়োগ না হয়ে হবে ক্ষতিজনক অপচয়।

(ঞ) সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই মর্মে আদেশ দিয়েছেন যে, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব ডোমেইন আইডি নিয়ে ডায়নামিক ওয়েভসাইট তৈরি করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে হবে। যাতে প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় তথ্য উপস্থাপন করতে হবে নিয়মিত।

যেমন স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, সব প্রকার আয়, সব প্রকার ব্যয়, শিক্ষার্থীদের সংখ্যা, উপস্থিতি, অনুপস্থিতি, পরীক্ষাসমূহের ফলাফল, শিক্ষকদের প্রফাইল, কমিটির প্রফাইল, সহশিক্ষা কার্যক্রম ইত্যাদি যেন যে কেউ যে কোনো সময় যে কোনো দেশে বসে দেখে নিতে পারে। ট্রান্সপারেন্সি নিশ্চিত করে, দুর্নীতি দূর করে, ডিজিটাল ব্যবস্থানার মাধ্যমে আধুনিক প্রগতিশীল উন্নত সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন ডায়নামিক ওয়েভসাইট থাকা জরুরি। তাই দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই রকম ওয়েবপেইজ তৈরির আদেশটি প্রশংসনীয়।

কিন্তু এভাবে এটি বাস্তবায়ন সফল হবে না। কারণ আমাদের দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রাইভেট আটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অযৌক্তিক উচ্চমূল্যে সফটওয়্যার ক্রয় করার মতো সচ্ছলতা নেই অনেক প্রতিষ্ঠানেরই। গ্রামের প্রতিষ্ঠানের তো নেই-ই; শরের অনেক প্রতিষ্ঠানেরও নেই। এই আদেশের পর হঠাৎ দেশে এমন অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠেছে যারা মানসম্পন্ন কাজ জানে না। এইসব নামসর্বস্ব আটি প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধ রেজিস্ট্রেশন আছে কিনা তাও জানে না অনেকেই। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে বা অদৌ কোনো রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে কিনা তার কোনো নির্দেশনা অথবা তালিকা যেহেতু শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রদান করেনি তাই যেকোনো ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানই এই ওয়েবসাইট ও সফটওয়্যার তৈরির কাজে নামার ও নিয়োগ পাওয়ার অবাধ সুযোগ পেয়েছে। তারা যেন তেন একটা পেজমেকাপ করে দিয়ে মোট অঙ্কের টাকা হাতিয়ে কদিন পরে তাদের পালানোর সম্ভাবনাই বেশি। তখন হায় হায় করবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো।

তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত একটি কমন ওয়েবসাইট এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার তৈরি করে সব প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দেয়া। তাতে সব প্রতিষ্ঠানের টাকা সাশ্রয় হবে এবং একই রকম মানসম্পন্ন কাজও হবে। ফটকাবাজদের হাত থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষ পাবে। সারা দেশের কলেজ ভর্তির প্রক্রিয়াই প্রমাণ যে, আমাদের মন্ত্রণালয় ইচ্ছা করলেই ভালো কিছু করা সম্ভব। প্রয়োজনে মন্ত্রণালয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নামমাত্র ফি নিয়ে নিতে পারে এই কাজের জন্য।

(ট) যোগ্য নাগরিক-কর্মী তৈরির কারখানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষকরা এ কারখানর কারিগর। তাই যোগ্য মন্ত্রী, আমলা, নেতা, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, বিচারক, আইনবিদ, সাংবাদিক, লেখক, শ্রমিক-কর্মচারী সবই তৈরির পূর্বশর্ত সুযোগ্য শিক্ষক।

শুধু বেসরকারি নয়, সব শিক্ষক, প্রশিক্ষক ও হুজুরেরই যথাযথ শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি অত্যন্ত ভালোভাবে জানা থাকতে হবে শিক্ষার সংজ্ঞা, শিক্ষার উদ্দেশ্য, শিশু-কিশোর মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষা প্রদানের আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। অবশ্যই থাকতে হবে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ এবং প্রতিনিয়ত প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের ঐকান্তিক ইচ্ছা। তদুপরি একজন শিক্ষককে প্রকৃত শিক্ষক হয়ে ওঠার জন্য তার থাকা চাই অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।

সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম প্রবর্তনসহ শিক্ষাক্ষেত্রে যে হারে আধুকায়ন করা হয়েছে ও হচ্ছে, তাতে যোগ্য শিক্ষক ব্যতীত সঠিকভাবে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা মোটেও সম্ভব নয়। শিক্ষকদের ক্লাস গ্রহণ ঠিক রেখে বিদ্যালয়েই করতে হবে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। ক্লাস বাদ দিয়ে প্রশিক্ষণে পাঠানো হলে, প্রশিক্ষণ না এনে কেবল টাকা নিয়ে চলে আসেন এমন শিক্ষকের সংখ্যাই বেশি।

শিক্ষক ও শিক্ষপ্রতিষ্ঠান প্রধান তথা শিক্ষা প্রশাসক নিয়োগে বাছাই করতে হবে সর্বাধিক সৎ, যোগ্য, দক্ষ, মেধাবী, নির্লোভ, নিরপেক্ষ, ন্যায়নীতিবান, দেশপ্রেমিক মানুষ। কেননা একজন অসৎ ও অযোগ্য শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান তথা শিক্ষাপ্রশাসক সারা জীবন তৈরি করে হাজার হাজার অসৎ ও অযোগ্য নাগরিক। শিক্ষকদের আর্থিক ও অনার্থিক সুযোগ-সুবিধা আরো বৃদ্ধি করে সর্বাধিক ভালো ছাত্রদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে পারলে তারা অবশ্যই ভালো শিক্ষক হবেন। এখনই প্রয়োজন সঠিক সরকারি সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ।

সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর টিউশন ফি শ্রেণি, অবস্থা ও অবস্থান ভেদে ৩শ টাকা থেকে ৫শ টাকা ধার্য করে অনলাইনে সরকারি কোষাগারে জমা করে এবং সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সব শিক্ষকের কাছ থেকে উৎসে আয়কর কর্তন করে সরকারের আয় বৃদ্ধি করে, আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করে সারা দেশে একই মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা এখন আর মোটেও কঠিন বিষয় নয়।

:: মো. রহমত উল্লাহ : লেখক; অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা।

২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিশেষ আয়োজন-২'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj