মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার চ্যালেঞ্জ নিরন্তর

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৬

** মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী **

সর্বত্র ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র কথা উচ্চারিত হতে শোনা যায়। কম-বেশি সবাই নিজেকে এই চেতনার একজন বলেও দাবি করে থাকেন। এমন অবস্থানে যদি অনড় থাকা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গভীরতা উপলব্ধির চেষ্টার বিষয়টি প্রশ্নাতীত থাকে তাহলে ভরসার জায়গা ক্রমেই সবল এবং বৃদ্ধি পায়। কিন্তু নির্মম সত্য হচ্ছে যারাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কথা উচ্চারণ করে থাকেন, তারা যদি সত্যি সত্যি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করার চেষ্টা করত, তাতে অবিচল থাকার চেষ্টা করত তাহলে বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে এত ভিন্নতা, বৈপরীত্য, সংঘাত-সংঘর্ষ এমনকি সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটাতে দেখা যেত না। আমার মনে হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে কথা এবং কাজে বিস্তর ফারাক আছে। কেউই নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরের মানুষ হিসেবে দেখাতে প্রস্তুত নয়, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণকারী ব্যক্তি এবং দলও এসে নিজেকে দাবি করে থাকে যে, তিনি বা তার দল মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করে। এ কথা বলার মাধ্যমে যেটি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হচ্ছে তা হলো, ১৯৭১ সালে তিনি বা তার দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে থাকলে সেটি মূলত ভারত এবং ধর্মের প্রশ্নে ভিন্ন চিন্তা থেকেই করা হয়েছিল। তারা তখন মনে করেছিল যে, ভারত পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র করছে, সেই ষড়যন্ত্রে ভারত সফল হলে বাংলাদেশ ভারতের বলয়ে থাকতে বাধ্য হবে। এ দেশে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগসহ বেশ কিছু দলের নেতাকর্মীরা ১৯৭১ সালে তাদের দলের ভূমিকা সম্পর্কে এমন উত্তরই দিয়ে আসছে। এটি তাদের অপযুক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। এত বড় একটি গণযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধকে তারা তখন বিরোধিতা করেছিল নিতান্ত ভারত জুজু এবং ধর্মের প্রতি বেশি বিশ্বাস (!) থেকে, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া, সমর্থনকারী বাকি সবাই তাদের চাইতে ধর্মে কম বিশ্বাসী, বা ভারতের অধীন নিজের দেশটাকে দিয়ে দেবে- এ ধরনের রাজনৈতিক ভাবনা, বিশ্বাস ও অবস্থান যাদের রয়েছে তাদের রাজনৈতিক দর্শনই কতটা খেলো, কতটা পাকিস্তানের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসে আটকে ছিল কিংবা এখনো আছে- তা খুব একটা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন পড়ে না, এর বাইরেও বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষ রয়েছে যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বলে দাবি করে থাকেন। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আপনি বা আপনারা সমর্থিত দল কী বুঝে? এর উত্তরে কেউ গণতন্ত্রের কথা বলেন, কেউ জাতীয়তাবাদের কথা বলেন। কেউ অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলেন। তবে বেশির ভাগই বিষয়টি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন এমনটি দেখা যায় না। বস্তুত ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ প্রত্যয়টি দুই শব্দের হলেও এর ব্যাখ্যা কিন্তু বেশ বড়, বেশ গভীর তাৎপর্যবাহী। সেটি জানা, বোঝা এবং ধারণ করা মোটেও সহজ কাজ নয় বরং নিরবচ্ছিন্ন চর্চার ওপর নির্ভরশীল ব্যাপার, এটি মোটেও কথার কথা নয়, মুখ দিয়ে শুধু বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বা থাকার বিষয় নয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে দুটো শব্দের দুটো আলাদা প্রত্যয়ও রয়েছে। চেতনার মূল ভিত্তি হচ্ছে বাস্তবতার প্রতিবিম্বিত ধারণা। মুক্তিযুদ্ধ একটি বিশাল গণযুদ্ধ যার পেছনে ছিল আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস, ১৯৭১ সালে এর সংঘটনে ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা, এতে যুক্ত হওয়ার পেছনে পাকিস্তানের বর্বর গণহত্যা, বৈরী আচরণ, বাঙালি তথা পূর্ব বাংলার মানুষ বিরোধী রাষ্ট্রীয় আচরণ- যার উপলব্ধি থেকেই সাধারণ মানুষ প্রতিরোধ যুদ্ধ দিয়ে শুরু করে, শেষ পর্যন্ত তা একটি গণযুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। এই বিষয়গুলো ইতিহাস ও দর্শনগতভাবেই বুঝতে হবে। একই সঙ্গে ১৯৭১ সালে সাধারণ মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্র চরিত্রের নগ্ন চরিত্র বুঝতে পেরে যে স্বাধীন রাষ্ট্রটি জন্ম দিতে প্রাণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেটি হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থা- যেখানে মানুষ পরিচিত হবে তার নাগরিকতার পরিচয়ে, রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেবে না। ১৯৭১ সালে মানুষ উপলব্ধি করেছিল যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি আগাগোড়া সাম্প্রদায়িক। এমন সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে কোনো মানুষের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ থাকতে পারে না। মানুষের এমন উপলব্ধিই হচ্ছে আধুনিক রাষ্ট্র চেতনার ফসল। বাংলাদেশকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে, হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এ হচ্ছে আমাদের পবিত্র ধর্ম বিশ্বাস এবং পরিচয়। ধর্ম পরিচয়ের বাইরেও আমাদের জাতিসত্তাগত পরিচয়ও রয়েছে- তা হচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বাঙালিরা এই চার ধর্ম সম্প্রদায়ের। এটি বাঙালি জাতির বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য। হাজার বছর ধরে বাঙালি এ ধরনের ধর্ম সম্প্রদায়ের বাস্তবতায় সম্প্রীতির মাধ্যমে বেড়ে উঠেছে, আপন ইতিহাস ও ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে। বাঙালির বাইরেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃজাতিগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছে তাদের জাতিগত পরিচয় এবং ধর্মীয় পরিচয় কখনো এক বা অভিন্ন ছিল না। তবে তারাও পূর্ব বাংলার সমাজ, সংস্কৃতিতে বসবাস করে এসেছে, নাগরিক হিসেবে তাদেরও পরিচয় তারা পূর্ববাংলার জনগণ। পূর্ব বাংলার এত সব জাতিগোষ্ঠী পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিতে পাকিস্তানের শত্রু, ভারতের মিত্র তথা পাকিস্তানিদের ভাষায় হিন্দু বা ‘হিন্দুস্তানি’।

এটি পাকিস্তানিদের অজ্ঞতা, মূর্খতা, সামন্ত-মানসিকতার সমস্যা, আধুনিক কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চিন্তার ধারণা থেকে পরিচালিত বিশ্বাস নয়। পাকিস্তান রাষ্ট্র শুরু থেকে যে চরিত্রের শাসক দ্বারা শাসিত হয়েছিল তার ফলে আধুনিক কোনো রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা ছিল না। পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন অংশ পাকিস্তান মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে দেয়, ন্যাপ-কমিউনিস্টরাও অনেক ঝেড়ে ফেলে দেয়, তবে কিছু বাম দোদুল্যমানতায় দীর্ঘদিন ছিল, জামায়াত-নেজাম এবং মুসলিম লীগসহ কিছু অংশ পাকিস্তানকে বিনা প্রশ্নে সমর্থন করে গেছে, তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের বাঙালি বিরোধী আচরণকে নিজেদের সংকীর্ণতার কারণে অন্ধভাবে সমর্থন করেছিল। ফলে বৃহত্তর জনগণ পাকিস্তানের অন্ধ সমর্থক এবং দোদুল্যমান অংশকে ত্যাগ করে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পেছনে একত্রিত হয়। জনগণের এই উপলব্ধি রাষ্ট্র চরিত্রের বাস্তবতাবোধ থেকে উৎসারিত। এটি অগ্রসর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা। সেই চিন্তা থেকেই মুক্তিযুদ্ধের শুরু হয়, ত্রিশ লাশ মানুষের প্রাণ উৎসর্গ করার মতো ঘটনা। সুতরাং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব বাংলার বেশির ভাগ মানুষের রূপান্তরের এক বিশাল চেতনাযজ্ঞকাল যখন মানুষ অসাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ, শোষণমুক্তির আদর্শ হিসেবে সমাজতন্ত্রকে সম্মুখে রাখার কথা বলেছেন, পূর্ব বাংলার মানুষ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধকালে অসাম্প্রদায়িকতাকে অনেক বড় করে দেখেছে, ভারতের মাটিতে এক কোটি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে ছয় কোটি মানুষ পাকিস্তানিদের কাছে মানুষ বা মুসলমান হিসেবেও নিরাপত্তা পায়নি। ফলে মানুষ রাষ্ট্রকে ধর্ম সম্প্রদায়ের নয়, বরং সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থাকার মতো একটি ভূখণ্ডও ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে চেয়েছে। মানুষ দেখেছে পাকিস্তান রাষ্ট্র পূর্ব বাংলার জন্মগ্রহণ করার বিষয়টিকে তাদের চোখে আমাদের জন্য ‘অপরাধ’ হিসেবে দেখে আমাদের হত্যা করাটি তাদের ‘ঈমানি’ কর্তব্য হিসেবে নিয়েছে, বিশ্ব বাস্তবতায় আরব দেশগুলো পাকিস্তানিদের গণহত্যাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে গেছে। পূর্ব বাংলার জনগণ অধিকন্তু দেখেছে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়সহ পৃথিবীর গণতান্ত্রিক শক্তি, মানবতাবাদী শক্তি আমাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, আমাদের ন্যায় যুদ্ধকে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছে। এ হচ্ছে আদর্শের জায়গা। সেই আদর্শ তখন আমাদের জনগণের বাস্তব প্রতিদিনের যুদ্ধ জীবনে ফুটে ওঠে, নতুন অভিজ্ঞতায় মানুষ সমৃদ্ধ হয়। সেখান থেকেই আমরা মানবিক ভাবাদর্শের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার পক্ষে আমাদের অবস্থানকে সংহত করতে চাই। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সম্মুখে শুধু বাঁচা-মচার লড়াই ছিল না, এটি হয়ে ওঠে একটি আদর্শেরও লড়াই- যে আদর্শের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উপাদান বড় হয়ে দেখা দেয়। মানুষ অনেক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তা করতে শেখে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা তখনই আধুনিক হয়ে উঠবে যখন সেটি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ানোর নীতি অনুসরণ করে। সে কারণেই আমরা বলি, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ কতগুলো মৌল আদর্শ আমাদের মধ্যে তখন বেছে নেয়ার বাস্তবতায় আমাদের দাঁড় করায়। এর একটি হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। রাষ্ট্র যদি অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শকে ধারণ করে তাহলে অন্য আদর্শগুলোকে আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। গণতন্ত্র মানেই হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ মানেই হচ্ছে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ওঠা, নিজ নিজ জাতিসত্তার বিকাশ ঘটিয়ে রাষ্ট্রকে আধুনিক করে তোলার ক্ষেত্রে অবদান রাখা। সমাজতন্ত্রও হচ্ছে শোষণহীনতা, বৈষম্যহীনতার সমাজ যেখানে মানুষে মানুষে সাম্য, মৈত্রী ও সৌহার্দ্য বিরাজ করবে। সাম্প্রদায়িকতার উৎকট ভাবাদর্শকে ধারণ করে পাকিস্তান শুরু থেকেই একটি সংকীর্ণ পশ্চাৎপদ রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে- যার অবস্থান আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থায় মোটেও সম্মানজনক নয়। তখন পাকিস্তান একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী রূপে পৃথিবীব্যাপী পরিচিত।

পাকিস্তানে ইসলামও এখন বেশ বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে, মানুষ মসজিদেও ধর্ম পালনে নিরাপদ থাকতে পারছে না। বস্তুত ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে কোনো রাষ্ট্র বেড়ে উঠলে সেখানে মানুষের জীবন, ধর্ম, সম্পদ, মানসম্মান- কোনোটিই গৌরবের জায়গায় উঠতে পারে না- সেটির প্রমাণ হচ্ছে- পাকিস্তান। এই বিষয়গুলো ১৯৭১ সালে আমরা জীবন দিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম বলেই তখন আমাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাবাদর্শ ও চরিত্র থেকে বের করে আনতে ধর্ম নিরপেক্ষতার আদর্শের কথা বলেছেন- যা মূলত হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা। অসাম্প্রদায়িকতা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র আধুনিক হতে পারে না, গণতান্ত্রিকও নয়। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে ১৯৭১-এর বাস্তবতার সামগ্রিক ধারণা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, এর রূপান্তরের সমগ্রতা নিয়েই এই চেতনা তখন নির্মিত হচ্ছিল, বিরাজ করছিল। তখন অবশ্য স্বতঃস্ফ‚র্ততার একটা অবস্থানও ছিল, বাস্তবতা বোধ ও ধারণ করার চাইতে আবেগ ও বিশ্বাস অনেক দ্রুত কাজ করেছিল। তাই মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিশালতা হৃদয়ঙ্গম করার মতো জ্ঞানার্জন তখন ছিল না।

স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং যুদ্ধকালে চেতনা নির্মাণ ও গঠনের প্রক্রিয়া প্রধানত এমনই হয়। ধীরে ধীরে রাজনৈতিক উপলব্ধি তৈরি হয়, বেড়ে ওঠে এবং রাষ্ট্রের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি হিসেবে পরিগ্রহ করে। বাংলাদেশে স্বাধীনতা-উত্তরকালে মুক্তিযুদ্ধে চেতনা নির্মাণের একটি উদ্যোগও ছিল। আমাদের সংবিধান এবং রাষ্ট্রের মৌলনীতিতে এর প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টাও হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র যদি নিরবচ্ছিন্নভাবে রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর হতে পারত, যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক রাজনীতি সর্বত্র ক্রিয়াশীল থাকত তাহলে এতদিনে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ঊর্ধ্বে দেখা যেত। সেই সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। ১৯৭৫-এর পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রকে একটি শক্তি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার জন্য যা যা করা দরকার ছিল তাই তারা তখন করেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় চার মৌল নীতিকে সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যায় পরিবর্তন করা হয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষতার ভুল ব্যাখ্যা সংবিধানে সংযোজন করা হয়, জাতীয়তাবাদেরও ভুল সংজ্ঞা দেয়া হয়, সমাজতন্ত্রকে ভিন্নভাবে প্রচার করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্বাধীনতা লাভের সাড়ে তিন বছর থেকে ক্রমাগতভাবে ভূলুণ্ঠিত হতে থাকে। রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতাকে ঊর্ধ্বে তুলে আনা হয়।

১৯৭১ সালে যে পাকিস্তানি ভাবাদর্শ পরিত্যাজ্য হয়েছিল তাই ১৯৭৫-উত্তরকালে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হলো। এর ফলে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়া হলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও আদর্শ নিয়ে, নেতৃত্ব নিয়ে। অসাম্প্রদায়িকতাকে অনেকটাই আড়াল করা হলো, রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা স্থান করেনি, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বৈজ্ঞানিকতা থাকেনি, সাম্প্রদায়িকতা জায়গা করে নিতে থাকে। গোটা সমাজকে আবার ধর্মীয় ইস্যুতে বিভক্ত করার পুরনো খেলায় নামিয়ে দেয়া হলো। এভাবে একটি রাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই আধুনিক আদর্শমুখী হতে পারে না, জনগণের মধ্যেও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-আদর্শ ও রাষ্ট্র-রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতির চিন্তা খুব একটা বিকশিত হতে পারে না। বাংলাদেশ অন্তত দুই দশকের অধিক সময় ধরে এভাবে চলার ফলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়ে। কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতভাবে বিশ্বাস করে তাহলেই তো তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে গণ্ডগোল দেখা দিতে পারে। কেউ যদি সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে, রাষ্ট্র রাজনীতিতে এর প্রকাশ ঘটায় তা হলেও তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যথার্থ নয় বলে বিবেচিত হবে। বাংলাদেশে এ ধরনের বাস্তবতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা খুব স্বস্তির জায়গায় নেই। একটি বড় ধরনের মেরুকরণ। বাংলাদেশের সমাজ এবং রাষ্ট্র রাজনীতিতে যেভাবে ঘটে গেছে তাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রকৃত নাম বিকৃত ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকৃত ধারাকে বহন করেন তারা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনে সহায়ক না হয়ে বরং সাম্প্রদায়িক ধারার সহায়ক শক্তি রূপে ভূমিকা রাখেন। রাজনীতির এসব সূ² দিক কতজন জেনে বা বুঝে শুনে করেন তা বিচার্য বিষয়। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন সাম্প্রদায়িক ধারার বিস্তার ঘটতে দেয়ার কারণে সমাজে এখন এমন একটি পরস্পরবিরোধী বিভাজিত অবস্থা বিরাজ করছে। এটি মোটেও কাক্সিক্ষত নয়। আধুনিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আমরা চেতনাগতভাবে এমন দুর্বল অবস্থানে রয়েছি। এটি কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব নয়, তবে মোটেও সহজ নয়। কেননা, সাম্প্রদায়িক মনোজগতের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা অনেক ব্যক্তি মানুষের পক্ষে মোটেও সহজ কাজ নয়। রাজনীতিতে সেটি মস্তবড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ এখন মুক্তিযুদ্ধের বিভাজিত চেতনার মধ্যখানে অবস্থান করছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় সমাজ, রাষ্ট্র রাজনীতিকে গড়ে তোলার যে জটিল কাজ সেটি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, দল সামষ্টিক ও ব্যক্তিগতভাবে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। সেই ভূমিকা রাখার জন্য সবাইকে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস এবং আদর্শ ধারণ করতে হবে, সেভাবেই রাজনীতির চর্চা করতে হবে। তবেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমকালীনতা এবং প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ধরা দেবে। সেখান থেকেই এর চর্চা সবাইকে করতে হবে, অন্য কোথাও সময় নষ্ট করে কোনো লাভ হবে না।

:: মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিশেষ আয়োজন-২'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj