লবিংয়ের এত টাকা কোথা থেকে এল আর গেলই বা কোথায়?

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৬

** ওয়াহিদ নবী **

একাত্তরে হত্যা-গণহত্যার দায়ে আলবদর বাহিনীর তৃতীয় শীর্ষনেতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে করা তার আপিল আবেদন আংশিক খারিজ করে দিয়েছেন। মীর কাশেম আলী চট্টগ্রামের আলবদর কমান্ডার ছিলেন। একাত্তরে তার নেতৃত্বে চট্টগ্রামে ভয়াবহ নৃশংসতা চালানো হয়েছে। তারমতো একজন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডই তো প্রাপ্য। অথচ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো (এইচআরডাব্লিউ) কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এই কুখ্যাত অপরাধারীর জন্য সাফাই গাইছে। বিস্ময়ের কিছু নেই কারণ ইতোমধ্যে আমরা একটা ধারণা পেয়ে গেছি যে, জামায়াত এই বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এবং তাদের নেতাদের বাঁচানোর জন্য কতো কতো টাকা লবিংয়ে ব্যয় করেছে। সংবাদ মাধ্যমে বারবার প্রকাশিত হয়েছে যে, মীর কাশেম আলী ২৫ লাখ ডলার লবিংয়ের জন্য ব্যয় করেছেন। ২৫ লাখ ডলার বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২০ কোটি টাকার সমান। এই বিশাল অঙ্কের টাকার পরেও তার কিছু ছিল এমন ধারণা করলে অবাস্তব হবে না। বাংলাদেশে টাকার আচরণ সত্যই অদ্ভুত। বহু বছর ধরে গরিব দেশ বলে পরিচিত ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু অনেকেই তীব্রবেগে ধনী হয়েছেন। শূন্য থেকে শুধু কোটি নয়, কোটি কোটির পর্যায়ে পৌঁছেছেন। অবস্থা দেখে মনে হয় যে কোটির চেয়ে বড় অঙ্ক বুঝায় এমন একটা সংখ্যা বের করার সময় হয়েছে।

মীর কাশেম সাহেবের পরিবারের পটভূমি আমার জানা নাই। তাই পরিবারের পূর্বেকার আর্থিক অবস্থার কথাও আমার জানা নাই। যদি তিনি নিজেই এই বিশাল অঙ্কের টাকা উপার্জন করে থাকেন তবে জানতে ইচ্ছা করে কিভাবে তিনি এই বিশাল অঙ্কের টাকা এত কম সময়ে উপার্জন করলেন। এই ব্যাপারে অনুসন্ধান নানাভাবে জাতির কাজে লাগতে পারে। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না যে একজন মানুষ একজনের জীবনে এত টাকা উপার্জন করতে পারেন। তবে আমি সাধারণ মানুষ সাধারণ মানুষের মতো করেই সব দেখেছি। সাধারণ মানুষের ক্ষমতার কথা ভেবেছি। অতি মানবদের কথা আমি কোথা থেকে জানবো। তাই বলছিলাম এই ব্যাপারে একটা অনুসন্ধান হলে ভালো হতো। তদন্তের কথা বলছি না এই জন্য যে তদন্তের জন্য সময়ের সীমা-পরিসীমা কেউ জানে না।

ইসলামী সংগঠনগুলো দেখিয়েছে যে, তারা শুধু পরকালের কথাই ভাবে না। ইহকালের কথাও ভাবে। বলতে হয় যে ইসলাম ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো অর্থ উপার্জনে অনেক ভালো করেছে। সংগঠনগুলোকে মজবুত করেছে। অনেক রকমের সংগঠন গড়ে তুলেছে। লোকে শুধু মাদ্রাসার কথা বলে। একটু ভাবলেই দেখা যাবে যে তারা ক্লিনিক করেছে। হাসপাতাল করেছে। স্কুল-কলেজ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় করেছে। শুনি যে তারা মিষ্টির দোকানও করেছে। অন্যান্য দোকান হয়তো রয়েছে আমরা জানি না। এই সংগঠনগুলোর অনেকগুলোই শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য। কতকগুলো অবশ্য বাহ্যত জনকল্যাণের জন্য। কোনটি লোক দেখানোর জন্য আর কোনটি আসল সেটা বুঝা মুশকিল। তবে ধর্মীয় সংগঠনের অর্থ উপার্জনের সংগঠন রয়েছে এটা দেখতে যেন কেমন লাগে। আর একটি প্রশ্ন মনে আসে আর সেটি হচ্ছে সংগঠনের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক। মালিক কে? মালিক কি সংগঠন? তাই যদি হয় তবে যারা সংগঠনের কাজ করে তারা শুধুই বেতনভুক কর্মচারী? সংগঠন পরিচালনার ব্যাপারে তাদের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি? ব্যবসার লভ্যাংশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কি? সংগঠনের ব্যক্তিগত মালিক না থাকলে মীর কাশেম আলী লবিং করার জন্য এত টাকা পেলেন কোথায়? অন্যান্য যারা যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযুক্ত হয়েছিলেন তাদের জন্য লবিং করতে তো এত টাকা ব্যয় করা হয়নি। অবশ্য যদি গোপনে অর্থ ব্যয় করা হয়ে থাকে সেটা অন্য কথা। আসলেই সংগঠনগুলোর অনেক কিছুই দৃশ্যত স্বচ্ছ নয়।

আমরা শুনেছি যে, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে লবিং করার জন্য বহু অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। লবিং তো বহুভাবে করা যায়। কাশেম আলীর জন্য কী করা হয়েছিল তা আমরা শুনিনি। তারপর প্রশ্ন মনে জাগে কাশেম আলীর অর্থ নিয়ে কারা করেছে লবিং? লবিং কি ব্যক্তি বিশেষ করেছে? না কোনো সংগঠন করেছে? কারা এরা? এরা কি বাংলাদেশের না বিদেশের? বিদেশের হলে কোনো দেশের? বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কয়েকটি দেশ বেশ উৎসাহী। শোনা যায় যে এ ব্যাপারে তারা প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। এইসব দেশ লবিংয়ে নিয়োজিত ছিল কিনা সে সম্পর্কে খোঁজ নেয়া উচিত। বাংলাদেশের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন কোনো দেশের মানুষ জড়িত থাকলে তাদের সাহায্য করার জন্য আমাদের দেশের কেউ জড়িত ছিল কিনা সেটা অনুসন্ধান করা উচিত।

লবিংয়ে কী ধরনের টুল বা কৌশল ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমকে ব্যবহার করে জনমতকে নিজেদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে কি? হলে কি ধরনের সংবাদ মাধ্যম? খবরের কাগজ? টেলিভিশন? রেডিও? রেডিও আজকাল কেউ একটা শোনে না। খবরের কাগজের কথা উঠলে ভাবতে হবে কাগজটি কি একই আদর্শের? এ ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু হয়তো করার নেই। তবু দেখা যেতে পারে যে কাগজটি কি সংগঠনের দিকে না কাশেম আলীর দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে? টেলিভিশন সম্বন্ধে প্রায় একই কথা বলা চলে। একই ভাবাদর্শের নয় অথচ যুদ্ধাপরাধীদের সাহয্য করেছে এমনটা দেখা গেলে ভাবতে হবে যে আর্থিক লেনদেনের ব্যাপার হয়তো কিছু ঘটেছে। এমনটি হলে দুর্নীতিপরায়ণ মানুষদের খুঁজে বের করতে পারলে ভবিষ্যতের জন্য ভালো হয়।

আরো বহুভাবে মামলাটির ক্ষতি করা যায়। এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতির কথা ভাবা যেতে পারে। সত্যি বলতে কি যখন শুনলাম প্রধান বিচারপতি বলেছেন যে, নিম্ন আদালতে নিম্নমানের মামলা পরিচালনা করা হয়েছে তখন এ চিন্তা আমাদের মাথায় এসেছিল। কাগজপত্রের কাজ ভালোভাবে না করে অভিযুক্তদের সাহায্য করা যায়। প্রধান বিচারপতির কথার সূত্র ধরে বিষয়টির একটা তদন্ত করলে ভালো হয়। এ ক্ষেত্রে হয় দুর্নীতি নইলে অযোগ্যতার একটা ব্যাপার ঘটেছে। দুটোই দূর করা উচিত। এত টাকার যখন লেনদেন ঘটেছে সে ক্ষেত্রে কী উপায়ে তা করা হয়েছে সেটিও খুঁজে বের করার চেষ্টা করা উচিত। বিদেশে যদি টাকা গিয়ে থাকে তবে সেটা আইনসঙ্গতভাবে করা হয়েছিল কি? না হয়ে থাকলে আরো অনুসন্ধান করা উচিত।

ব্যক্তি আর সংগঠন যাদের কথা উল্লেখ করা হলো তারা বিশাল অর্থের মালিক। এরা আয়কর ঠিকমতো দিচ্ছে কি?

:: ওয়াহিদ নবী : চিকিৎসক, লেখক। রয়াল কলেজ অফ সাইকিয়াট্রিস্টের ফেলো।

২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিশেষ আয়োজন-২'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj