বাংলাদেশ জন্মের ধারণা ও চেতনা

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৬

** গাজী আজিজুর রহমান **

ধারণা চেতনা বা কল্পনা যাই বলি না কেন, জ্ঞান-শিক্ষা-সংস্কৃতি-সাহিত্য অপেক্ষা তা অনেক জরুরি। বিষয়টি আত্মগত। মন-মস্তিষ্ক জুড়ে তার জঙ্গম-জাল। মানুষ মাত্রই প্রথমে এই বোধগুলো দ্বারা আগে নিজে শাসিত হয়, পরে অপরকে শাসনাধীন করতে চায়। দূর সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ক্রমাগত পাখা বিস্তার করতে করতে এরা এক সময় আছড়ে পড়ে বালিয়াড়ির ওপর। তখন স্থান-কালে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা, নতুনের জন্মাষ্টমী। যে কোনো জন্ম চিন্তাপ্রসূত। সে দেশ, ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, রাষ্ট্র, স্বাধীনতা যাই হোক না কেন। অর্থাৎ কোনো না কোনো ধ্যান-ধারণা-চেতনার অবলম্বন ছাড়া কোনো কিছুর ভিত্তি নির্মিত হয় না। এই নির্মাণ একটি রূপান্তর, পরিবর্তন অথবা সৃষ্টি বলা যায়। এটি কিভাবে, কেমনভাবে হবে বা আসবে সেটি নির্ভর করে সেই সময়ের কালিক হাওয়া, পরিবেশ, পরিস্থিতি, রাষ্ট্র, সরকার ও শাসনব্যবস্থা কি রকম তার ওপর। এর জন্য কি ধরনের বিধি-ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে হবে তার কতগুলো পূর্ব ধারণা আমাদের ধারণ করতে হয়। যার ধারণক্ষেত্র অবশ্যই ইতিহাসে প্রোথিত। ইতিহাসের খণ্ড অখণ্ড সত্যের প্রবণতাগুলো চেতনার রঙে রাঙিয়ে সমকালে তার পুনঃপ্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু তা কখনো পুনরাবৃত্তি নয়। নেপোলিয়ান, গান্ধী, লেনিন, মাও, হো-চি-মি, সেঙ্ঘর কেউ তেমনটি করেননি। বড় রাজনীতিবিদদের তাই কবি ও স্রষ্টা হতে হয়। নইলে ইতিহাসের স্থ‚ল পুনর্জীবন ঘটে। তাহলে সন্নিকট সময় ভারতীয় স্টাইলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পুনরাবৃত্তি হতো। ইচ্ছা করলেই কি একটি ফরাসি কিংবা রুশ বিপ্লব ঘটানো সম্ভব? তবে পরবর্তী কোনো বিপ্লবে উপরোক্ত বিপ্লবেব কার্যকারণসূত্র থাকতে পারে। এর বেশি নয়। মোট কথা বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা, মুক্তি, বিভিন্ন ‘কনসেপ্ট’কে আশ্রয় করে সংঘটিত হয়। এই ‘কনসেপ্ট’ অহিংস হবে না সহিংস হবে, নিয়মতান্ত্রিক না সশস্ত্র হবে সেটি নির্ভর করে সেই ভূখণ্ডের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে জনগণের চেতনার বাস্তবতা কতটা সাযুজ্যপূর্ণ তার ওপর। সেই সঙ্গে নেতৃত্বে অবস্থানকারী নেতাদের বোধ, প্রবণতা, শিক্ষা-দীক্ষা, চরিত্র, চিন্তাধারা কতটা পরিপক্ব ও উন্নত সেটিও বিবেচ্য বিষয়।

বাংলাদেশ জন্মের প্রেক্ষাপট বিচার-বিশ্লেষণে এ সবের অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। ঐতিহাসিক ব্লুখের মতে, ইতিহাসের কাজ বিচার করা নয়, বোঝা। কিন্তু বোঝাটা সহজ নয়। তবে বুঝতে চেষ্টা করা যেতে পারে। বাংলাদেশ সৃষ্টির ধারণা যাদের মাথায় ছিল তারা নিশ্চয়ই কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার মুুখোমুখি হয়ে তার থেকে শিক্ষা লাভ করেছিলেন কী করে কেমনভাবে সেটি এখানে প্রয়োগ করতে হবে। একটি সুদূরপ্রসারী চিন্তা-চেতনা চৈতন্যে লালন করে তারা অগ্রসর হয়েছিলেন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের শীর্ষ চূড়া নির্মাণকল্পে। ভিত থেকে চূড়া তো একদিন বা এক বছরে তৈরি হয় না। বহু বছরের শ্রম, সাধনা, ত্যাগ, কষ্ট, ক্লেশ স্বীকার করেই সেই লক্ষ্যে উপনীত হতে হয়। স্বপ্ন-বাস্তবের ফারাককে এক করতে হয়। তবেই না ইপ্সিত সিদ্ধি। এর জন্য অনেককে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। জীবনের মূল্য, রক্তের মূল্য সব হারানোর মূল্য- তবেই তো সব পেয়েছির দেশ।

দুই.

আজকের বাংলাদেশ এককালের বঙ্গদেশ, গৌড়বঙ্গ, রাঢ়বঙ্গ, সুবাবাঙলা সেতো এই উপমহাদেশের হাজার বছরেরও প্রাচীন একটি জনপদ। এই জনপদের জনগোষ্ঠীর বরাবর একটি স্বাতন্ত্র্য স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, স্বকীয় ধর্ম, লোকাচার, নৃতাত্তি¡ক ও ভাষিক ঐতিহ্য ছিল। দীর্ঘ যুগ ঔপনিবেশিক শাসনে-শোষণে-বঞ্চনার শিকার হয়ে এই জনগোষ্ঠী ক্রমে ক্ষীণ, দুর্বল ও নিষ্প্রভ হয়েছে। ঘটেছে নানা জাতি, ধর্ম, বর্ণ রক্তের সংমিশ্রণ। বাঙালি অনার্য ছিল বলেই সভ্য ও সংস্কৃতবান হওয়ার সুযোগ হয়নি। এক সময় আর্য রক্তের স্পর্শেও যে সে সভ্য ও সংস্কৃতবান হয়ে উঠেছিল এমনও নয়। হয়নি বলেই তার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক চেতনা কখনো শাণিত হয়নি। তবে মধ্যযুুগে চৈতন্য দেবের আবির্ভাবের পর বাঙালি একটি সভ্য ও সংস্কৃতিরূপের শারদ প্রভাতে শুভ পদার্পণ করে। বাঙালি যে প্রেমধর্মে প্রাণবান, ভালোবাসায় সংরক্ত, অহিংসায় ঋষিতুল্য, মিলনে ব্যাকুল, সতত অসাস্প্রদায়িক এই ভিশন বহু শতকের। তারপর নিরন্তর সে পরাধীন। সে মৌর্য-পাল, সেন-তুর্কি-মোগল, সুলতানি আমল-বারো ভূঁইয়ার সময়-ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি আমল যখনকার কথাই বলি না কেন। তাই বাঙালি কখনো আত্মবিকাশের সুযোগ পায়নি। সেটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক যে কোনো ক্ষেত্রেই হোক না কেন। দীর্ঘস্থায়ী কোনো শাসনে-পীড়নে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর আগেই পট পরিবর্তনের কারণে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন, বাঁচার স্বপ্ন, দাঁড়ানোর সংগ্রাম ভেঙে গেছে। তার ওপর বাংলাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করে বিভিন্ন রাজা, নবাব, উজির, লর্ড দিয়ে শাসন করানোর ফলে বাঙালির কোনো ঐক্যই দানা বাঁধতে পারেনি। অতএব হাজার বছরের অতীতের ব্যর্থতাকে দায়ী করার আগে বাঙালি ও বাংলার বাস্তব অবস্থাটি আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে।

বাঙালি একটি পশ্চাৎপদ, অনগ্রসর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, বর্বর জাতি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত। ভিক্ষা, চৌর্যবৃত্তি, পদলেহনকারী হিসেবেও তার পরিচয় স্বীকৃত। আরো আছে, সে পাড় মিথ্যাবাদী, জালিয়াতি, ছলচাতুরী, বিশ্বাসভঙ্গকারী। ঐতিহাসিক মেকলে তো বাঙালির চরিত্রকে এভাবেই অঙ্কন করেছেন, ‘মহিষের যথা শিং, মৌমাছির যথা হুল, বাঘের যথা থাবা, নারীর যথা সৌন্দর্য, বাঙালি জাতির তদ্রƒপ প্রবঞ্চনা।’ এ সব যে একেবারে মিথ্যা এমন নয়, তবে সব সত্যও নয়। সত্যের ইতিহাস বাঙালি লেখেনি বলেই ঘটেছে বিজাতির হাতে ইতিহাস বিকৃতি। বাঙালির যে অনেক গৌরব আছে, অর্জন আছে, ঐতিহ্য আছে, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমের আগে বাঙালি তা জানতো না। সুতরাং বাঙালি তার আত্মানুসন্ধান, শিকড় সন্ধানে উদগ্রীব হয়েছে মাত্র শতবর্ষ আগে। অন্ধকার বিবর থেকে আলোর আকাশে বাঙালি ডানা মেলেছে প্রকৃতপক্ষে শতবর্ষকাল পরিধিতে।

নদী মাতৃক এই সবুজ-শ্যামল সুন্দর দেশটির আনাচে-কানাচে, বনে-জঙ্গলে, নদী ভাঙনের ক‚লে, সমতলে-পাহাড়ে-টিলায় বসাবসকারী মানুষগুলো জীবন-জীবিকা, লৌকিক লোকাচার, মৃত্তিকালগ্ন সংস্কৃতি সে যতই গেঁও বা অসংস্কৃত হোক না কেন তার মূল্য কিন্তু একেবারেই উপেক্ষণীয় নয়। প্রাচীন যুগের চর্যাপদ, দোহাগান, মধ্য যুুগের মঙ্গলকাব্যের ধারা, ময়মনসিংহ গীতিকা, পুঁথি-পাচালী-পদাবলিতে বাংলা ও বাঙালির যে পরিচয় পাওয়া যায় তা যে কোনো জাতির গৌরবগাথার সঙ্গে তুলনীয়। তার যুক্তি-তর্ক-দর্শন, বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান, প্রেম-ধর্ম-উদারতা, সাহস-বীরত্ব-সংগ্রাম, হৃদয় মহিমা ও মানবিক মূল্যবোধ অন্য যে কোনো জাতির জন্য ঈর্ষণীয়। শুধুমাত্র স্বাধীনতার অভাবে, স্বাধীনতার দীপ্ত চেতনায় দাঁড়াতে না পারার অপরাধে আধুনিক পূর্বকাল পর্যন্ত ইতিহাসে বাঙালিকে আত্মরতি সম্পন্ন ধূর্ত, লোভী, স্বার্থপর জাত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সে কর্মহীন ভোগ চায়, কৃতিহীন সুখ চায়, দু’মুঠো খাওয়া আর এতটুকু বাসা পেলে সব ভুলে ক‚পমণ্ডূক সেজে আলস্য বিলাসী হয়ে যায়। এ সব বাঙালির লজ্জার কথা। কিন্তু সত্যিই কি তাই? চণ্ডীদাস, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, প্রীতিলতা, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ক্ষুদিরাম সে ধারণা আমূল পাল্টে দিয়েছে বাঙালির জীবনাচরণে। জয়নুল, সুলতানের ছবির মতো বাঙালি যে শক্ত হাড় আর বলিষ্ঠ পেশির জাতি- ত্যাগে, সংগ্রামে, দেশপ্রেমে সে যে আত্ম-উৎসর্গিত প্রাণ উনিশ ও বিশ শতকের বিশ্ব ইতিহাস তা অবলোকন করেছে। বাঙালি সেজন্য স্বাধীনতা প্রিয় জাতি, আলোক সন্ধানী, শেকড় সন্ধানী এবং আন্তর্জাতিক চেতনা ঋদ্ধ বর্তমান সভ্য জগত সে পরিচয়ও পেয়েছে। তার এই অর্জন মার খেতে খেতে, অত্যাচার-পীড়ন সহ্য করতে করতে গড়ে উঠেছে। সে বুঝেছে শিক্ষা, সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস-দর্শন, রাজনীতি-অর্থনীতি চর্চা ও সাধনা ছাড়া বাঙালির জেগে ওঠা অথবা মাথা তুলে দাঁড়ানোর আর কোনো উপায় নেই। আর এর জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন স্বাধীনতা। এই ধারণা ও চেতনা যেদিন সে আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করলো সেদিন থেকেই উপমহাদেশের ইতিহাসে বাঙালির শুরু হয় উত্থান পর্ব। বাংলা হয়ে ওঠে বিশ্বের বিস্ময়। এ পর্বে বিশ্বের খুব কম জাতিই রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়, অমর্ত্য সেন, শেখ মুজিবুর রহমানের মতো বিশ্ব প্রতিভার জন্ম দিতে পেরেছে। বাংলা যে শুধু চণ্ডীদাস-বিদ্যাপতি, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-মেঘনাথ সাহাকে জন্ম দিয়েছে তাই নয় তিতুমীর, ক্ষুদিরামসহ অনেক সাইমন বলিভার, গ্যারিবল্ডি, চে গুয়েভারার জন্ম দিতে পারে ইতিহাস কি তা অস্বীকার করে?

তিন.

মায়ের মতো মাটিকে যে জাতি ভালোবাসতে জানে, যার ভাষাপ্রীতি ইতিহাসে প্রবাদতুল্য, যার জাত্যাভিমান অদম্য তাকে রুখবে কে। বাঙালির মা-মাটি-মানুষ, ভাষা-সভ্যতা-সংস্কৃতি, অহিংস প্রেমধর্ম এবং জীবনমুখিতাই একদিন বাঙালিকে আপন পায়ে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তারপর সে বুঝেছে বাঁচতে গেলে যুদ্ধ করেই বাঁচতে হবে, বাধা দিলে লড়তে হবে, জোর লড়াই। লড়াইটা হবে মূলত জাতির অস্তিত্ব ও মাতৃভূমির মুক্তির লক্ষ্যে। সে জন্য স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই। স্বাধীনতা ছাড়া বিকাশ নেই, সম্মান-গৌরব নেই। কিন্তু স্বাধীনতা কেউ দিতে চায় না, স্বাধীনতা ছিঁড়ে-ছেনে আদায় করে নিতে হয়। এর জন্য শক্তি চাই, সংগঠন চাই- চাই ঐক্য, আত্মচেতনা, শিক্ষা, ইতিহাসের পাঠ, সংগ্রাম, বিপ্লব কিংবা সশস্ত্র সংহরণ। রাষ্ট্রচেতনা, জনচেতনা, অধিকার চেতনা, জাত্যচেতনা তীব্র তীক্ষè না হলে স্বাধীনতার চেতনা ফিকে হয়ে যায়। এই ধারণাগুলোর স্বচ্ছ উপলব্ধি ও শিক্ষা ছাড়া শুধু ভাবাবেগ স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর। লেলিনও এমন মত পোষণ করতেন, শুধু উৎসাহী ও আবেগী লোক দিয়ে বিপ্লব, মুক্তি, স্বাধীনতার কাজ হয় না, এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও শিক্ষিত কর্মীবাহিনী। যেন যথাসময় তাকে ভাববে না হয় কী করা উচিত। সিদ্ধান্ত হবে নির্দ্ব›দ্ব ও সন্দেহহীন।

স্বাধীন বাংলার চিন্তা আজ নয়, সেই সুদূর গুপ্ত যুগ থেকে বারভূঁইয়াদের আমল হয়ে ব্রিটিশ যুগে বঙ্গভঙ্গ ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে বাঙালির চেতনা ক্রমশ উজ্জ্বল ও উত্তপ্ত হয়েছে। সবশেষে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পূর্ব মুহূর্তে বসু-সোহরাওয়ার্দী, কীরণ শংকর রায়, আবুল হাশিম স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলার প্রস্তাব করেন বাংলা ও বাঙালির স্বার্থে। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। মনে করা যায় তাদের সামনে প্রাচীন গ্রিক স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর গণতান্ত্রিক আদর্শের ধারণা ছিল। যা এক সময় ভারতবর্ষেও প্রচলিত ছিল। কিন্তু দু’একজন আলেকজান্ডার, নেপোলিয়ান কিভাবে সে সব স্বাধীন রাষ্ট্র, গণতন্ত্রের ধারণা ধ্বংস করে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র কায়েম করে আদর্শ রাষ্ট্রতত্ত্বকে বিলুপ্ত করেছিলেন সে ইতিহাসও বাঙালির চেতনায় ছিল। তাদের সামনে আরো ছিল ত্রয়োদশ শতকে ইংল্যান্ড পার্লামেন্টের অভ্যুদয়। এবং ১২১৫-র ‘ম্যাগনা কার্টা’। ১৬২৮ সালের ‘পিটিশন অব রাইট’-এর অধিকার চেতনাও থাকা স্বাভাবিক। তাদের মনকে আরো উত্তপ্ত করতে পারে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সেই বিখ্যাত বাণী, ‘সমস্ত মানুষ এক সমান হয়ে জন্মায়’। এবং ১৮৬২ সালে ‘দাস-মুক্তির ঘোষণাপত্র’ ও চেতনাবহ্নি জ্বালাতে পারে।

আধুনিক ইতিহাসে মূল্যবান প্রসঙ্গই হলো বিপ্লব। সে জাতীয়তাবাদী, সমাজবাদী, সাম্যবাদী যাই হোক না কেন। আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণার সাফল্যের পর ইংল্যান্ডের শিল্প-বিপ্লব এবং একই শতকে অন্যতম ফরাসি বিপ্লব- যা একাধারে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লব নামে পরিচিত, বাঙালির মনকে তা প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল। ভলতেয়ার, রুশো, মঁতেস্ক্যুর বিপ্লবাত্মক চেতনায় জারিত হয়ে বাঙালি প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতে থাকে। ‘সাম্য-স্বাধীনতা-সুখ’ এই ঘোষণায় স্পন্দন জাগে ‘আমিই স্পার্টাকাস’ ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন’। এই সব কল্পনা, চেতনা ছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধের ধারণা গড়ে ওঠা সম্ভব ছিল কি?

উনিশ শতকে ইউরোপে রেনেসাঁর প্লাবন, ডারউইনের বিপ্লবাত্মক বিবর্তনবাদ, মার্কস-এঙ্গেলসের নব মতবাদের তুমুল আলোড়ন, সাধারণ মানুষের জেগে ওঠা, রাষ্ট্র ও মানুষের সার্বভৌম চেতনা, দিকে দিকে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম- এক কথায় বিশ্বের আধুনিকতার ইতিহাস বিপ্লবগন্ধী সাম্যবাদী ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় আন্দোলিত হতে থাকে। এই প্রেক্ষিতে বিশ শতকে দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধসহ ঘটে যায় রুশ বিপ্লব। ইতিহাসের এই সব ঘটনাসমূহের উত্তাপে একে একে খসে পড়তে থাকে রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র, উপনিবেশবাদের ধারণাগুলো। প্রথম মহাযুদ্ধ-উত্তর চুক্তি অনুযায়ী সভ্য দেশগুলো একে একে তাদের কলোনিগুলো ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে থাকে। যেখানে তার ব্যত্যয় ঘটেছে বা বিলম্ব হয়েছে সেখানে দেখা দেয় সংগ্রাম, যুদ্ধ, বিপ্লব। ফলে বিশ শতকে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। শুরু হয় গণতান্ত্রিক উত্তরণ। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ক’টি দেশ সে উত্তরণের মূলে কুঠারাঘাত করে। কিন্তু শেষাবধি সেই ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলোর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সমুন্নত হয় গণতন্ত্রের পতাকা এবং সমাজতন্ত্রের লাল ঝাণ্ডা।

যে কোনো দেশের মানুষের জন্য জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের প্রয়োজন যেমন অনুভব করতে থাকে, তেমনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভিত্তিক সমাজতন্ত্রের আশু প্রয়োজনও মানুষ উপলব্ধি করতে থাকে। কারণ এর চেয়ে ভালো কোনো রাষ্ট্র পদ্ধতি আপাতত তখন মানুষের ধারণাকে পরাস্ত করতে পারছিল না। বিশেষ করে সদ্য ঘটে যাওয়া রুশ বিপ্লবের সাফল্য অধিকার হারা, বঞ্চিত, পীড়িত, স্বাধীনতাহীন জাতিগুলোকে বেশিভাবে প্রণোদনা সৃষ্টি করে। লেনিন হয়ে যান সাধারণ মানুষের স্বপ্ন নায়ক। কিন্তু নেতারা ছিলেন দলভারী গণতন্ত্রের দিকে। সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষা আর নেতাদের প্রত্যাশার মধ্যে তাই সমন্বয় ঘটতে সব দেশে সময় লাগে। দ্ব›েদ্ব, রক্তপাতে অবশেষে অধিকাংশ দেশে পুঁজিতান্ত্রিক গণতন্ত্রের বিজয় হতে দেখ যায়। অবশ্য উভয় পক্ষ যে মুক্তিকামী ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার চিন্তকদের মধ্যে এ ধারণাগুলো যে অত্যন্ত ক্রিয়াশীল ছিল সে কথা বলাই বাহুল্য। তাইতো বাঙালি বিশ শতকের প্রথমার্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ তথা বাংলার মুক্তির মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিল। এ সময় বাংলায় গড়ে ওঠা স্বদেশি ও স্বরাজ আন্দোলন, গুপ্তদল, অনুশীলন দল, ফরোয়ার্ড ব্লুক, সমাজবাদী পার্টি ইত্যাদি বিপ্লবী সংগঠন তৈরি করে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অপরদিকে একই প্রত্যয়ে দক্ষিণপন্থী কংগ্রেস নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে থাকে। শুধু আবেগ নয়, উভয়ের শিক্ষা ছিল ইতিহাসের কর্মকাণ্ডে। তাদের সামনে ছিল যুক্তি-তর্ক, ইতিহাসের অনিবার্যতা এবং বিজয়ের পর বিজয়ের সিংহ তোরণ। যা তাদের ধারণা ও চেতনাকে সাহসী ও সংশাপ্তকী হতে সাহায্য করেছিল।

ইতিহাস বলে কোনো রক্তপাত, আত্মাহুতি বৃথা যায় না। ইতিহাসের সেই অনিবার্য সত্য-স্বরূপে ১৯৪৭-এ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত স্বাধীন হলো। ১৯৫০-এ মাও সে তুং-এর নেতৃত্বে সম্পন্ন হয় সফল চীনা বিপ্লব। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে একে একে স্বাধীন ও মুক্ত হয় ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কিউবা ইত্যাদি দেশ। রক্তে আগুন ধরে যায় বাঙালির। এই সব ধারণা ও চেতনা দিয়ে কি বাংলার মুক্তি ঘটানো যায় না? শুরু হয় পথ ও উপায় খোঁজা। অতীতের বারবার ব্যর্থতা, নেতাদের স্বার্থপরতা, দ্ব›দ্ব, সংশয়, সন্দেহ, দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে তারা জোর দেন ইতিহাসের শিক্ষার ওপর। ঐক্যের যে কোনো বিকল্প নেই আমেরিকার স্বাধীনতা, ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা, ইন্দোনেশিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম বিপ্লব ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বাঙালিকে সঠিক পাঠ নিতে সহযোগিতা করে। কিন্তু ধারণাগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ইসলামতন্ত্র ও চারু মজুমদারের বিপ্লব ব্যাধি। ফলে নানান ধারা-উপধারায় রক্তাক্ত হতে থাকে বাংলাদেশের কনসেপ্টটি। এর মাঝে ১৯৫২-র ভাষা-আন্দোলন, ১৯৫৪-র নির্বাচন বাঙালিকে রাখীবন্ধনে আবদ্ধ করে। ভাষা, সংস্কৃতির ওপর আঘাতকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হতে সাহায্য করে। বাঙালির, বাংলার যে কোনো সার্বভৌমত্ব নেই আইয়ুবের সামরিক শাসন তা নিশ্চিত করলে বাঙালি গোপন ও প্রকাশ্যে আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের নকশা গড়ে তোলে। এই সংক্ষুব্ধি থেকে বাংলা ও বাঙালির নেতৃত্বের কাণ্ডারি হিসেবে আসীন হন হক-ভাসানী, শেখ মুজিব-তাজউদ্দীন, মনি সিং-মোজাফফর ইত্যাদি নেতারা। এদের শিক্ষা-দীক্ষা-অভিজ্ঞতা-মনন-মেধা-রাজনৈতিক প্রজ্ঞা মোটামুটি এ দেশের মাটি-মানুষের ‘নর্ম’ অনুযায়ী আত্ম-অন্বিত ছিল- এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রাণ পুরুষটি সবাইকে ছাড়িয়ে আলবাট্রস পাখির মতো ডানা মেলে বাংলার আকাশকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। আপদমস্তক তাঁর বাঙালি সত্তাকে তিনি পেরেছিলেন সাত কোটি বাঙালি হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে। তারপরও মাঝে মাঝে অন্ধকার নেমেছে, ডানা ভেঙেছে কিন্তু ততক্ষণে আলোক পিয়াসী বাঙালি ইউলিসিসের মতো উচ্চারণ করতে শিখেছে ‘ণবং ও ংধু ও রিষষ ুবং.’।

শেখ মুজিবসহ জাতীয় নেতারা স্বাধীনতা ও মুক্তির লক্ষ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করলেন। কারণ ক্ষেত্র তখন প্রস্তুত। রচিত হলো ছয় দফা, এগারো দফার সুস্পষ্ট দাবিগুলো। যার ভাষা আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, ফরাসি বিপ্লবের ঘোষণাপত্র এবং রুশ বিপ্লবের ইশতেহারসমূহের চেতনার সঙ্গে ঐকতান রয়েছে। অর্থাৎ আমরা বলতে পারি বাংলাদেশ জন্মের চিন্তকরা অত্যন্ত ইতিহাস ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তবে ইতিহাসের পাঠ ও প্রয়োগ কখনো এক হয় না। তাইতো যুগে যুগে তৈরি হয় নতুন ইতিহাস। বাংলাদেশের জন্ম তেমনি পৃথিবীর ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। যার জন্ম যে কোনো দেশের জন্মের সঙ্গে মিল অপেক্ষা অমিলই বেশি। শেখ মুজিব তাই জর্জ ওয়াশিংটন, গান্ধী, সুকর্ন, হো-চি-মিনের মতো একজন ভিন্ন জনক। তাঁর ক্যারিশমাও তাই আলাদা।

চার.

টলস্টয় একবার প্রশ্ন তুলেছিলেন force moves nations? উত্তরে আমরা বলবো অবশ্যই ‘স্বাধীনতা’। স্বাধীনতার জন্য স্বাধীন ও সার্বভৌম বিশ্বাস আস্থাশীল হওয়াই প্রথম শর্ত। এই বিশ্বাস অর্জন করা সহজ নয়। কারণ মানুষ আত্মস্বার্থের ওপর উঠতে পারে না। তবে কেউ কেউ পারে। মানুষের স্বার্থ নানান সংস্কার, লোভ, লালসা, লাভ-ক্ষতির খতিয়ানে পূর্ণ। পুরনো ও অতীতকে আঁকড়ে থাকা এবং নতুন মাত্রই গ্রহণে কুণ্ঠিত থাকা তার স্বভাব ধর্ম। হোক সে স্বাধীনতা, যে স্বাধীনতা ভিন্ন মানুষ বাঁচতে পারে না, সেই স্বাধীনতা চাইতে তার অনেক সময় লাগে। কে চায় ইচ্ছা করে জীবনের ঝুঁকি নিতে, কে চায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে? মানুষ স্বভাবতই মুক্তিকামী। তাই অশান্তি সৃষ্টি করে সে স্বাধীনতার মতো আরাধ্য বিষয়কেও জীবন থেকে দূরে রাখতে চায়। কিন্তু দূর এক সময় নিকট হয়ে যায়। পাড় না চাইলেও নদী যখন পাড় ভেঙে দেয় তখন প্রতিরোধ সংগ্রাম হয়ে ওঠে অনিবার্য।

স্বাধীনতার জন্য তাই আঘাত প্রয়োজন। প্রয়োজন অত্যাচার, অবিচার, পীড়ন, পেষণ, জুলুম, সহ্যাতীত দুর্ভোগ। বাঙালির জীবনে এ সবের অভাব ঘটেনি। আমরা যে যুগের দিকেই তাকাই না কেন বাঙালি বরাবর এসব দুর্দৈবের নির্মম শিকার হয়েছে। এ বিষয় বাঙালির অভিজ্ঞতা যে কোনো জাতির তুলনায় সমৃদ্ধ। এমনকি আমাদের কৈশোরকালেও আমরা বিষয়গুলো বুঝতে শিখেছিলাম। এবং কিছু চেতনা ও ধারণার জন্ম হয়েছিল স্বাধীনতা সম্পর্কে- যা আমরা স্কুলের শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী এবং গুরুজনের কাছে পাঠ নিয়েছিলাম। আবার এরা পাঠ নিয়েছিলেন পূর্বসূরিদের কাছ থেকে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি মনের ভেতর স্বাধীনতার চেতনার আগুন প্রজ্বলিত করতে হলে চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে- ১. স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। ২. স্বাধীনতা ছাড়া ধন, সম্পদ, সম্পত্তির কোনো মর্যাদা নেই। ৩. যে কোনো জাতির বীরত্ব স্বাধীনতার গৌরবের মধ্যে নিহিত। ৪. সাম্য, প্রগতি, সভ্যতা, স্বাতন্ত্র্য, নিজ সংস্কৃতির স্বাধীনতা ছাড়া গড়ে উঠতে পারে না। ৫. স্বাধীন চিন্তা, মত, পথ, প্রকর্ষ স্বাধীনতা ছাড়া নির্মাণ করা অসম্ভব। ৬. উন্নতি, উত্তরণ, ঐক্য স্বাধীনতার ফসল। ৭. যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক ধারা অর্থনৈতিক বিকাশ এবং মানব সম্পদের উন্নয়ন স্বাধীন জাতিই প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ৮. উপনিবেশবাদী মন, হীনমন্য মন, মাথানত না করার চেতনা দূর করতে পারে স্বাধীনতা নামক সোনার কাঠিটি। এসব ধারণার জন্ম, বিকাশ, পোক্ত ও প্রত্যয়ী করে তুলতে শতবর্ষ বাঙালিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। তারপর সে উপনীত হয়েছে অভীষ্ট লক্ষ্যে। যে স্বাধীনতা স্বর্গসমান বলে করেছেন কবি।

বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাস লিখতে আমি বসিনি, বসেছি তার কনসেপ্টগুলো স্মরণ করিয়ে দিতে। স্বাধীনতার কনসেপ্ট ছিল প্রতিটি বাঙালির সাংবিধানিক অধিকার ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালিকে মুক্তি দেয়া। বাঙালি হবে একটি অসাম্প্রদায়িক জাতি। ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মিশ্র আদর্শে গড়ে উঠবে তার বুনিয়াদ। আমরা বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ এই হবে আমাদের জাতীয়তার বৈশিষ্ট্য। কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়, সব দেশের সঙ্গে আমাদের থাকবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আগে আমরা বাঙালি, তারপর মুসলমান অথবা হিন্দু। আন্তর্জাতিক মানবতাবাদ হবে আমাদের উদারনৈতিক ও প্রগতিবাদের স্তম্ভ। যুগোপযোগী একই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চলবে সব দেশে। সবার জন্য চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র। একটি অহিংস, সুখী, সমৃদ্ধ, প্রেমময়, ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে উঠবে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো। এসব সভ্য ও সুন্দর ধারণাবলি ছিল বাংলাদেশ জন্মের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আদর্শ। যা আমরা অর্জন করেছিলাম দীর্ঘ সংগ্রাম ও শিক্ষার মধ্য দিয়ে। জাতির কাছে, স্বাধীনতার কাছে এই ছিল আমাদের রক্ত শপথ এবং অঙ্গীকার। জবাবদিহি তাইতো আমাদের করতেই হবে।

সেই আদর্শ স্বর্গরাষ্ট্রের ধারণা থেকে কি আমরা বিচ্যুত হইনি? কোথায় গেল গ্রিক রাষ্ট্রের চেতনা, জর্জ ওয়াশিংটন, লিংকন, ভলতেয়ার, রুশো, দাঁতো, ম্যাটসিনি, গ্যারিবল্ডি, কাভুর, ফিকটে, বিসমার্ক, লেনিন, মাও সে তুং, হো-চি-মিন, কামাল পাশা, গান্ধী, সুকর্ন, সুভাষ বসু ইত্যাদির শিক্ষা ও আদর্শের চেতনা? আমরা কি আজো ঔপনিবেশিক মানসিকতার অবসান ঘটাতে পেরেছি, পেরেছি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরনির্ভরতা কাটাতে? সাম্প্রদায়িকতা, ফতোয়াবাজি, মৌলবাদের বিষবৃক্ষ কি আজো আমরা উপড়ে ফেলতে পেরেছি? দিতে পেরেছি অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা? মুক্ত হতে পেরেছি দারিদ্র্য, বঞ্চনা, বেকারত্ব, অবিচার, দুর্নীতির অভিশাপ থেকে? এ সবই তো বাংলাদেশ জন্মের ধারণা ও চেতনার পরিপন্থী। ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্তি¡করা এই বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করবেন। সত্য সে যত কঠিন ও নির্মম হোক তার মুখোমুখি আমাদের দাঁড়াতেই হবে। নইলে ‘সকলি গরল ভেল’।

একজন শেখ মুজিবের মহাপ্রয়াণে কি বাংলা ও বাঙালির সব কনসেপ্টের মৃত্যু হবে? তাঁর মৃত্যু কি সব নিয়ে গেল? আমাদের পরাজয়টা এখানেই। কিন্তু আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুর পর পরই তা হয়নি। অবশ্য লেনিন, মাও, হো-চি-মিন, সুকর্ন, জিন্নার মৃত্যুর পর সেসব দেশের কনসেপ্টগুলো অনেকাংশে ভাঙন ধরেছিল। আর আমাদের ফিনিক্স পাখিটি ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গেই ধ্বংস হলো বাংলাদেশে জন্মের সব ধারণা ও চেতনা। যেন অবসান হলো হাজার বছরের সৃজনশীল কল্পনার এক যুগ। যিশু হত্যার পাপ যেমন তার স্বজাতি স্কন্ধে তুলে নিয়েছিল বংশপরম্পরায় তেমনি কি আমরাও সেই পাপ থেকে কোনোদিন মুক্তি পাব না? বাংলা ও বাঙালির এই কি আমোঘ নিয়তি?

:: গাজী আজিজুর রহমান : কথাসাহিত্যক, লেখক।

২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিশেষ আয়োজন-২'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj