বাংলাদেশে আদিবাসী ‘আছে’ বনাম ‘নাই’ বিতর্ক!

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৬

** রাহমান নাসির উদ্দিন **

চিন্তাসূত্র

‘আদিবাসী’ আর ‘আদিবাসিন্দা’ এ দুটি শব্দের অর্থ কেবল শাব্দিক কাঠামোর ভেতর, যাকে বলা হয় ইটিমোলজিক্যাল মিনিং, উপলব্ধি করা সম্ভব নয় কেননা এ দুটি শব্দের মর্মার্থ এবং এর রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-নৃতাত্তি¡ক তাৎপর্য এখানে বিবেচনায় নেয়া জরুরি। বিশেষ করে, বিগত তিন দশকে বিশ্বব্যাপী ‘ইন্ডিজেনাস’ (রহফরমবহড়ঁং) শব্দটি বিশ্বপরিমণ্ডলে যে মাত্রায় মনোযোগ অর্জন এবং দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তাতে করে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় এবং সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতর ‘ইন্ডিজেনিটির’ ধারণা কীভাবে গ্রহণ করা হবে, আদৌ গ্রহণ করা হবে কিনা কিংবা গ্রহণ করলে বা না করলে কী ধরনের লাভ বা ক্ষতি কিংবা কী ধরনের সমস্যা এবং সম্ভাবনা রয়েছে তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি একাডেমিক গুরুত্বও বেশ বেড়ে গেছে। এরকম একটি বিতর্ক এবং বৈশ্বিক এক্টিভিজমের সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে কিংবা কাঠামোগতভাবে রাষ্ট্রের বাইরের অংশীজন (স্টেইকহুল্ডার) কীভাবে সংযুক্ত হচ্ছেন এবং এ সংযুক্তি কীভাবে এবং কোন মাত্রায় দেশীয় ইন্ডিজেনাস একটিভিজমকে প্রেরণা ও প্রণোদনা দিচ্ছে তার ফ্রেমওয়ার্কে বাংলাদেশের আদিবাসী, তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং আদিবাসীদের আইনগত অস্তিত্বের বিষয়টি এখানে আলোকপাত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ বিতর্ক

২০১১ সালের পর থেকে বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ বলে কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব আছে, নাকি নেই, পাবলিক পরিসরে, একাডেমিক আলোচনায়, রাজনীতির ময়দানে এবং অধিকার-এক্টিভিজমে সেটা একটি বিরাট জিজ্ঞাসা হিসেবে জারি আছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানান যুক্তি-তর্ক ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হয়েছে এবং হচ্ছে কিন্তু রাষ্ট্রের জায়গা থেকে এ জিজ্ঞাসার সর্বজন গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা এখনো পর্যন্ত আমাদের জানা নেই। অথচ কোনো গ্রহণযোগ্য যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা ছাড়াই এ বিতর্কে রাষ্ট্র একটা সুর্নিদিষ্ট অবস্থান গ্রহণ করে অনড় হয়ে বসে আছে যে, ‘বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই। যারা নিজেরদের আদিবাসী হিসেবে দাবি করছে, তারা আসলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’। সুতরাং আলোচনার আগে প্রথমেই বলে নেয়া ভালো যে, আমি যাদের নিয়ে এ নিবন্ধ লিখছি বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে তাদের কোনো ‘অস্তিত্ব’ নেই। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬ (২)-এ আমরা দেখতে পাই, ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি’, (সংবিধান [পঞ্চদশ সংশোধন] আইন, ২০১১) যার অর্থ দাঁড়ায় যারা বাঙালি নন বা বাঙালি জাতির লোক নন অর্থাৎ যারা আদিবাসী বা সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন যেমন চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমি, খেয়াং, মনিপুরি, সাঁওতাল, গারো, ওঁরাং এরা কেউই বাংলাদেশের নাগরিক নন। এভাবেই সাংবিধান-সম্মতভাবেই বাংলাদেশ একটি ‘এক জাতি-এক রাষ্ট্র’ জাতীয় অদ্ভুত একরৈখিক জাতীয়তাবাদী দর্শনের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠেছে। এভাবেই বাংলাদেশে বসবাসকারী ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১ জন (আদমশুমারি ২০১১ হিসাব অনুযায়ী) আদিবাসী মানুষকে তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে ‘আদিবাসী’ নামে কোনো মানুষের ‘অস্তিত্ব’ নেই। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের বলা হয়েছে ‘এথনিক পপুলেশন’ আর পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ প্রভৃতি শব্দ দিয়ে নির্দেশ করা হয়েছে। এই যে প্রায় ১৬ লাখ আদিবাসী জনগণকে রাষ্ট্র সাংবিধানিক এবং আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে অস্তিত্বহীন করে রেখেছে, এর মধ্য দিয়ে মূলত একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এবং একটি জাতি হিসেবে বাঙালির মেজরিটারিয়ান তথা সংখ্যাগুরুত্বের আধিপত্যবাদী মানসিকতারই প্রকাশ ঘটেছে। তাছাড়া, এই যে আদিবাসী মানুষের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেটা স্বীকার করে না এটিই বলে দেয় রাষ্ট্রের সঙ্গে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক এবং সে সম্পর্কের বিবর্তিত কাঠামোর স্বরূপ কী। বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র হিসেবে যে দর্শনের ওপর ভিত্তি করে জন্ম নিয়েছিল ১৯৭১ সালে, জন্মোত্তর সে দর্শন জাতি-নির্মাণের একরৈখিক প্রকল্পে আর ধারণ করেনি। ফলে সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন জনগোষ্ঠীকে বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বাঙালি মেজরিটারিয়ান জাতি গঠনের প্রক্রিয়ায় রীতিমতো সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরেই ‘অস্তিত্বহীন’ করে দেয়া হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের কাঠামোয় একটি আধুনিক ও উদার-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠার বিপুল সম্ভাবনা এরকম সংকীর্ণ চিন্তার কারণে বেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আদিবাসী ‘অস্তিত্ব’ এবং ‘অস্তিত্বহীনতা’র লুকোচুরি

বাংলাদেশের আদিবাসীদের ‘অস্তিত্ব’ নিয়ে লুকোচুরি খেলা চলছে দীর্ঘদিন থেকেই। আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টি জাতিসংঘের মাধ্যমে ২০০৭ সালেই মোটমুটি মিটমাট হয়ে গেছে। তাও দীর্ঘ আলোচনা, দীর্ঘ বিতর্ক, প্রায় দুই দশকের নানান কার্যক্রমের বিচার বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে জাতিসংঘের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক সনদ তৈরি করা হয়েছে। ১৯৮২ সালে জাতিসংঘে প্রথম আদিবাসী বিষয়ক আলোচনা শুরু হয় এবং এর অস্তিত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকার করা হয়। প্রায় একদশক পরে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রতি বছর ৯ আগস্টকে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়া হয় (রেজ্যুলেশন ৪৯/২১৪)। ৯ আগস্টকে তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করার পেছনে প্রধান কারণ ছিল ১৯৮২ সালের এইদিনেই জাতিসংঘ সর্বপ্রথম আদিবাসীদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়। তারপরের বছর থেকে ১৯৯৫-২০০৪ ‘প্রথম আদিবাসী দশক’ এবং ২০০৫-২০১৪ ‘দ্বিতীয় আদিবাসী দশক’ ঘোষণা করা হয়। ‘প্রথম আদিবাসী দিবসে’র লক্ষ্য ছিল আদিবাসীদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, ভূমি, পরিবেশ, উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা দূরীকরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শক্তিশালীকরণ। ‘দ্বিতীয় আদিবাসী দিবসে’র লক্ষ্য ছিল আদিবাসীদের জীবনের নানান রিসোর্সের কার্যকর প্রয়োগ ও সম্মানের জায়গা নিশ্চিতকরণের জন্য অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা। অবশেষে ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আদিবাসী অধিকার সনদ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে পাস হয়। যেখানে চারটি দেশ (আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড) এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে এবং ১১টি দেশ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখে। দুঃখজনক সত্যি হচ্ছে, বাংলাদেশ সে ১১টি দেশের মধ্যে একটি। তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিল মিলিটারি সমর্থিত সরকার যা ‘ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন’ সরকার নামে পরিচিত। তখন সেই সরকারের পক্ষ থেকে একটা ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছিল যে, এরকম সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য জনগণের সমর্থনপুষ্ট একটি রাজনৈতিক সরকারের প্রয়োজন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে, জাতিসংঘের এ ঘোষণায় স্বাক্ষর না করলেও, প্রতি বছর অত্যন্ত ধুমধাম করে ৯ আগস্ট রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ পালন করতে শুরু করে। তাছাড়া, ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতেও আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০০৮, ২০০৯ এবং ২০১০ সাল পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী বিভিন্ন শুভেচ্ছা বাণী দিয়ে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালনে দেশের আদিবাসী জনগণকে নানানভাবে উৎসাহিত করেছে। স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তিনি তৎকালীনও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব আদিবাসীদের ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে শুভেচ্ছা জানান। কিন্তু ২০১১ সালে এসে কোনো এক ‘অজানা’ এবং ‘রহস্যময়’ কারণে ‘গণেশ’ পুরোপুরি উল্টে যায়। ২০১১ সালে সরকারের পক্ষ থেকে হঠাৎ করে ঘোষণা আসে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই। জাতিসংঘের অধিবেশনে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন ‘বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই।’ কেন এবং কী কারণে তৎকালীন সরকার এরকম একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তার সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা এখনো পর্যন্ত আমরা জানি না। তবে, একটি প্রেস কনফারেন্সে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই। বাংলাদেশে যদি কোনো আদিবাসী থেকে থাকে তবে সেটা হচ্ছে বাঙালি’। এ বিষয়ে আমি অন্যত্র (দেখুন, দৈনিক ভোরের কাগজ ৯/০৮/২০১৫) লিখেছি যে, আমার মনে হয় রাষ্ট্র মূলত ‘আদিবাসী’ আর ‘আদি বাসিন্দা’র মধ্যকার তফাৎ কোথায় সেটা অনুধাবন করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ‘আদিবাসী’ আর ‘আদি বাসিন্দা’ যে এক নয় এটা নিয়ে তেমন কোনো সিরিয়াস রাজনৈতিক এবং একাডেমিক বিতর্কও আমরা লক্ষ করিনি। এখানে মনে রাখা জরুরি যে, ‘ইন্ডিজেনাস’ শব্দের অর্থ ‘আদিবাসী’ যেটা একটি সাংস্কৃতিক ক্যাটেগরি আর ‘আরলিয়েস্ট মাইগ্রেন্টস’ অর্থ হচ্ছে ‘আদি বাসিন্দা’ যা একটি ডেমোগ্রাফিক ক্যাটেগরি যা বসতি স্থাপনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। হাজার বছরের বাঙালির নৃতাত্তি¡ক ইতিহাস বলে এতদঞ্চলের আদি বাসিন্দারা কোনোকালেই বাঙালিও ছিলেন না। এমনকি বাংলার শেষ স্বাধীন রাজা নবাব সিরাজউদ্দৌলাও বাঙালি ছিলেন না। তথাপি যদি ধরেও নিই যে, আদিবাসীদের আগমনের পূর্বেই এ দেশে বাঙালিদের বসতি ছিল অর্থাৎ বাঙালিরাই এতদঞ্চলের আদি বাসিন্দা। তাতে এটা প্রমাণিত হয় যে, বাঙালিরা এতদঞ্চলের ‘আদি বাসিন্দা’ কিন্তু ‘আদিবাসী’ নয়। কেননা, সাধারণত কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অনুপ্রবেশকারী বা দখলদার জনগোষ্ঠীর আগমনের পূর্বে যারা বসবাস করত (এটা উপনিবেশিকতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পৃক্ত যা আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় কেননা এতদঞ্চলের ইতিহাস একে সমর্থন করে না) এবং এখনো করে; যাদের নিজস্ব ও আলাদা সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও মূল্যবোধ রয়েছে; যারা নিজেদের আলাদা সামষ্টিক সমাজ-সংস্কৃতির অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যারা সমাজে সাংস্কৃতিক সংখ্যালঘু হিসেবে পরিগণিত, তারাই আদিবাসী। অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে বসবাসকারী একদল জনগোষ্ঠী যারা সাংস্কৃতিকভাবে সংখ্যালঘু, যাদের নিজস্ব একটি সংস্কৃতি আছে যা জনতাত্তি¡ক সংখ্যাগুরুদের সংস্কৃতি থেকে স্বতন্ত্র এবং যাদের একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার আছে এবং যারা রাষ্ট্রের কাঠামোয় সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক তারাই আদিবাসী হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। এ বিবেচনার ফ্রেমওয়ার্কে বাংলাদেশে বসবাসকারী বাঙালি ছাড়া চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খেয়াং, খুমি, ম্রæ, লুসাই, পাংখোয়া, চাক, মণিপুরি, হাজং, সাঁওতাল, ওঁরাং, পাত্র, জৈন্তা, খাসিয়া প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী আদিবাসী হওয়ার দাবি রাখে। অতএব, বাঙালিরা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠন করেছে এবং তারা বর্তমানে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে এদেশের আধিপতিশীল শ্রেণি। ফলে তারাই রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনর দায়িত্বে নিয়োজিত যেখানে সাংস্কৃতিক সংখ্যালঘু জনগণ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে প্রান্তিক অবস্থানে। নিজেদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা নিয়ে প্রান্তিক অবস্থানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে যদি বিশ্বব্যাপী আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে বাংলাদেশে তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়? রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা আমরা এখনো পর্যন্ত পাইনি। কিন্তু যখন বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের ঘোষণা অনুযায়ী আদিবাসীদের ‘স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং কল্যাণ চিন্তা’ নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক করছে, তখন বাংলাদেশের আদিবাসীরা বাংলাদেশের রাষ্ট্রের কাঠামোই এবং সাংবিধানিক সীমানার মধ্যে নিজের একটি জায়গা খোঁজার চেষ্টা করছে।

বিশ্ব আদিবাসী দিবস এবং বাংলাদেশের আদিবাসী

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের বিশ্ব আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘২০১৫ উত্তর উন্নয়ন লক্ষ্য : আদিবাসী জাতিসমূহের স্বাস্থ্যসেবা এবং কল্যাণ নিশ্চিতকরণ’। যেখানে মূলত সাতটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যথা : ১. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আদিবাসী মানুষের যথাযথ স্বীকৃতি, ২. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক অধিকার নিশ্চিতকরণ বিশেষ করে জমি, চাষযোগ্য ভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানা নিশ্চিতকরণ, ৩. শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতে জাতীয় পর্যায়ে আন্তঃসংস্কৃতিক বা স্বতন্ত্র সংস্কৃতি-বান্ধব নীতি প্রণয়ন, ৪. আদিবাসী নারী, শিশু, যুবক এবং আদিবাসী-প্রতিবন্ধীদের জন্য সহায়ক এরকম বিশেষ বিষয় এবং নীতিগুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ, ৫. সংস্কৃতিকে টেকসই উন্নয়নের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া এবং আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নের আদিবাসী দৃষ্টিভঙ্গিকে অন্তর্ভুক্তকরণ, ৬. আদিবাসীদের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে আদিবাসীদের সম্মতি এবং আদিবাসীদের আগে থেকেই অবহিতকরণের প্রতি গুরুত্বারোপ এবং ৭. আদিবাসী সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন এজেন্ডায় এবং পরিকল্পনায় আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ। সারা পৃথিবীতে যখন এসব এজেন্ডা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের আদিবাসীরা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে লিপ্ত। বাংলাদেশের ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার নিয়ে শত শত বছর ধরে বাস করছে অথচ সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে তাদের কোনো ‘অস্তিত্ব’ নেই। এটা কেবল বাংলাদেশের আদিবাসী মানুষগুলোরই নয়, বরঞ্চ বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্যও লজ্জার। এক ধরনের উদ্ভট স্বজাত্যবোধের প্রতিফল হিসেবে সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে অস্তিত্বহীন করে রাখার মধ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদ আছে কিন্তু একটি উদার-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কোনো মূল্যবোধ নেই। তাই, বাংলাদেশ যেমন অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়ন করছে, সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা শাসক শ্রেণিকে নৈতিকভাবেও উন্নতি করতে হবে। সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের কাঠামোই মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তবেই একটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে এবং নৈতিকভাবে উন্নত হয়। নৈতিক উন্নয়নই অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সত্যিকার অর্থে মজবুত ও টেকসই করে।

উপসংহার

অদ্ভুত এক সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ক আলোচনা সর্বদা নিয়ন্ত্রণ ও রেগুলেট করে। কেননা এখনো সাধারণ্যে আদিবাসী বা ইন্ডিজেনাস এবং আদি-বাসিন্দা বা আরলিয়েস্ট মাইগ্রেন্টসের মধ্যকার ফারাক পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশের মানুষ এখনো বাঙালি ব্যতীত ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষকে উপজাতি বা ট্রাইবাল হিসেবেই জানে কিন্তু এর ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং ঔপনিবেশিক সম্পৃক্ততার কথা যথাযথভাবে জানেন না। ফলে আদিবাসী বিষয়ক ডিসকোর্স কেবল রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে বাজারে জারি হয় যা বেশির ভাগ মানুষ আনক্রিটিক্যালি কোনো ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন না করেই গ্রহণ করে। রাষ্ট্র যেভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে উপস্থাপন করে, আদিবাসী জনগোষ্ঠী জনপ্রিয় বয়ানে এবং পাবলিক পরিসরে সেভাবেই উপস্থাপিত হয়ে এসেছে। তাছাড়া, আদিবাসীদের নামকরণের রাজনীতি নিয়ে কিছু গোলটেবিল বৈঠক, টেলিভিশন টক শো, সংবাদপত্রে কলাম লেখা কিংবা কিছু স্থানীয় বেসরকারি সংস্থার সামান্য নড়াচড়া ছাড়া তেমন কোনো সিরিয়াস একাডেমিক আলোচনা, গবেষণা এবং লেখালেখিও খুব একটা বেশি দৃষ্টিগোচর হয়নি। তবে বাংলাদেশের আদিবাসীদের নামের রাজনীতি নিয়ে কিছু সিরিয়াস একাডেমিক লেখালেখি আছে যার বেশিরভাগই লেখা হয়েছে ইউরোপীয় স্কলার দ্বারা যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে উইলেম ভ্যান সেন্ডেল, এলেন বাল এবং ইভা গেরহার্জ। তাই, বাংলাদেশের আদিবাসী মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে আদিবাসীদের বাংলাদেশের আর দশটা নাগরিকের মতো সমমর্যাদায় করতে হলে আদিবাসী মানুষদের দিয়ে আরো গভীর এবং সিরিয়াস একাডেমিক গবেষণা প্রয়োজন। এরকম সিরিয়াস গবেষণার মধ্য দিয়েই সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে আদিবাসীদের একটি স্বতন্ত্র-সত্তায়, সমতার ও সমমর্যাদার অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।

[বি.দ্র. : এ প্রবন্ধের একটি বিস্তারিত ভার্সন ২০১৬ সালের বইমেলায় প্রকাশিত আমার গ্রন্থ ‘জ্ঞানকাণ্ডের কাণ্ডজ্ঞান : আদিবাসী, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং উপস্থাপনার রাজনীতি’-তে একটি অধ্যায় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।]

:: রাহমান নাসির উদ্দিন : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিশেষ আয়োজন-২'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj