লোকজ জনমাধ্যম হিসেবে যাত্রাগানের গুরুত্ব

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৬

** ড. তপন বাগচী **

আমাদের বিশাল বাংলাজুড়ে রয়েছে লোকমাধ্যমের সজীব উপস্থিতি। লোকমাধ্যমের নানান আঙ্গিক রয়েছে, যা থেকে যথার্থ আঙ্গিকটি খুঁজে নিয়ে আধুনিক গণমাধ্যমের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়। উন্নয়ন-যোগাযোগে ব্যবহারের উপযোগিতাও নিরূপণ করা যায়। লোকমাধ্যম গণমানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য বলে নিরপেক্ষভাবে বার্তা প্রেরণ করা যায়। তাই বিলুপ্তপ্রায় লোকমাধ্যমগুলোকে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

গণমাধ্যমের চতুর্থ উদ্দেশ্যটি হলো- জনমানসে প্রভাব বিস্তার করা। বিজ্ঞাপন দেখে মানুষ প্রভাবিত হয় এবং পণ্য কিনতে উৎসাহিত হয়। তাই গণমাধ্যমকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো পণ্য বিক্রির কাজেও ব্যবহার করে। যাত্রামাধ্যম পণ্য বিক্রি করতে না পারলেও মানুষকে নীতি ও মূল্যবোধ নির্মাণে প্রভাবিত করতে পারে। নতুন আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। যাত্রা দেখে বা শুনে মানুষ আপ্লুত হয়, ঘটনার সঙ্গে একাত্ম হয়। তাই করুণ দৃশ্যে দর্শকের চোখেও অশ্রæ নামে।

মুকুন্দ দাসের যাত্রা যে মানুষকে স্বদেশি আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছিল, সে কথা আজ ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত সত্য। যাত্রাগানে মুকুন্দ দাসের অবদান সম্পর্কে নাট্যকার মন্মথ রায় বলেছেন- ‘আবার এক নতুন সুরে নতুন ভাবোচ্ছ¡াসে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে দেশবাসীকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করল।’ (মন্মথ রায়, লোকনাট্য যাত্রাগান, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ১৯৭৬, পৃ. ২৫) ব্রিটিশ সরকার তা বুঝতে পেরেই তাঁর স্বদেশি যাত্রা একর পর এক নিষিদ্ধ করল। মুকুন্দ দাসকেও জেলের ঘানি টানিয়ে ছাড়ল। এতে করে যাত্রার প্রভাবকেই স্বীকার করে নিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী সরকার। রঙ্গমঞ্চকে বা যাত্রামঞ্চকে ব্রিটিশ সরকার ভয় পেয়েছিল। কিন্তু যাত্রামঞ্চ বাঙালির বড় প্রিয় মাধ্যম। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র পূর্বোক্ত নিবন্ধ থেকে জানা যায়-

রঙ্গভূমি জনভূমি জনসমাজের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিরূপ; ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য এই যে, উহা আমাদের অনুকরণ করে এবং আমরাও উহা অনুকরণ করি। রঙ্গভূমির নিকট আমরা কত আদর্শ-চরিত্র সাধুর জন্য ঋণী। রাম একটি ধীর ও উদার নায়ক। তাঁহার পিতৃমাতৃভক্তি, ভ্রাতৃবাৎসল্য, স্ত্রীর প্রতি অকতৃত্রিম প্রণয়, গুরুজনে গৌরব, মিত্রস্নেহ, দীনে দয়া, সত্যনিষ্ঠা, বীরত্ব, অধ্যবসায় ও সরলতা প্রভৃতি বিস্তর সদগুণ আছে। এইরূপ নায়কের অভিনয়-ক্রিয়া অকৃতাত্মাকেও জাগ্রত করিয়া তুলিতে পারে। … রঙ্গস্থলে জানকীর ন্যায় পতিব্রতার সুদীর্ঘ দুঃখ-নিশ্বাসে কাহার কোমল হৃদয় না স্ফীত হয়? পবিত্রতা ও ধর্ম্মের দিকে কাহার মন না আকৃষ্ট হয়? (‘রঙ্গভূমি’, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, পৌষ ১৭৯৭ শক, ৩৩৯ সংখ্যা [উদ্ধৃতি : বিনয় ঘোষ, সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, পঞ্চম খণ্ড, প্যাপিরাস, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ ১৯৮১, পৃ. ১৮২-৮৩)

যাত্রা টিকে আছে সুদীর্ঘ কাল ধরে। এর সামজিক প্রভাব রয়েছে বলেই এত দীর্ঘকালেও বিলুপ্ত বা বর্জিত হয়নি। স্থায়িত্ব এবং গ্রহণযোগ্যতাও এর সামাজিক প্রভাবের ল²ণ। যাত্রার প্রাচীনত্ব, সমাজে এর গুরুত্ব এবং এর সুদীর্ঘ স্থায়িত্বের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক ডক্টর মুহম্মদ মজির উদ্দীন বলেছেন-

যাত্রা আমাদের দেশে প্রাচীনকাল থেকেই ছিল। … আজকের যাত্রায় বাস্তব জীবনের স্পর্শ কোথাও কোথাও লক্ষ করা যায়। সম্ভ্রান্ত থিয়েটার-নাটক বা সিনেমা-নাটকের কাছে যাত্রা-নাটক অপাঙক্তেয় শূদ্র শ্রেণির আর কি! লোককাহিনী, কিংবদন্তি এবং লেখকদের কল্পকাহিনী নিয়ে আজো অনেক নাটক-জাতীয় রচনা লেখা হচ্ছে- সাহিত্যের অঙ্গনে কদর নেই, তবু বাংলার স্নিগ্ধতা, মাটির রসতায় তার প্রাণ তাজা। সাহিত্যিক-বিপব এবং মননশীলতার মাঝে এর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়নি- হয়তো বা হবেও না।’ (মুহম্মদ মজিরউদ্দীন, বাংলা নাটকে মুসলিম সাধনা, নর্থবেঙ্গল পাবলিশার্স, নওগাঁ, ১৯৭০, পৃ. ৫৬১-৫৬২)

যাত্রার মতো সনাতন মাধ্যমের সামাজিক প্রভাব আছে বলেই সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের মতো গণমাধ্যমের গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও মালয়েশিয়া লোকমাধ্যমের প্রতি নজর দিয়েছে। সত্তর দশকের শুরুতেই সরকারের তথ্য বিভাগ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে বার্তা পৌঁছে দেয়ার জন্য লোকমাধ্যমকে ব্যবহার করেছে। ‘ওয়াং কুলিট’ নামে লোকনাট্যে রামায়ণের পৌরাণিক চরিত্রের মাধ্যমে তারা নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কিংবা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মতো ভারী বিষয়ের তথ্যও পৌঁছে দিয়েছে। আঞ্চলিক গান ‘বোরিয়া’-র মাধ্যমে তারা সরকারি প্রচারণা চালিয়েছে।

গণমাধ্যমের প্রধানত যে চারটি উদ্দেশ্যের কথা বলা হয় লোকসংস্কৃতি বা লোকমাধ্যম, বিশেষত যাত্রার উদ্দেশ্যও তার থেকে দূরে নয়। আধুনিক গণমাধ্যমের গতির কাছে, যাত্রা হার মানতে বাধ্য। কাজের ক্ষেত্রে ধীরগতি হলেও লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষমতা তার আছে। তাই পশ্চিমা সংজ্ঞার্থের কাছে আটকা না পড়ে আমরা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারি। আমাদের দেশে এখনো সর্বাধিক মানুষ নিরক্ষর। তাই মুদ্রণ মাধ্যম সর্বস্তরে পৌঁছাতে পারবে না। বেতার এবং টেলিভিশনের গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

যাত্রাকে আপাতদৃষ্টিতে লোকমাধ্যম হিসেবেই গণ্য করা হয়। যুগ-যুগ ধরে এই মাধ্যমটি টিকে আছে মানুষের জীবনযাত্রা এবং সংস্কৃতিকে ধারণ করে। ১৯৭৫ সালে ওয়াশিংটনে প্রকাশিত ‘ফোক মিডিয়া ইন ডেভেলপমেন্ট ইনস্ট্রাকশনাল টেকনোলজি’ শীর্ষক রিপোর্টে সাংস্কৃতিক প্রথাসিদ্ধ লোকমাধ্যমের যে সংজ্ঞার্থ প্রদান করা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে- Cultural traditional folk media have been defined as “living expressions of the lifestyle and culture of a people evolved through the years. It is a blend of music, song, poetry, mime, gesture and dialogue”. (`Folk Media in Development Instructional Technology’, Report, Information Centre on Instructional Technology Academy for Educational Development, Washington DC, September, 1975 [Cited by Josefina S Patron, Role of Traditional Media and Art Forms in Films, Media Asia, Vol 8, No 4, 1981, p. 191.)

এই নিবন্ধের ভাষায় ‘ট্রাডিশনাল ড্রামাটিক ফর্ম’ বলতে যে আঙ্গিকটির কথা বলা হয়েছে, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তা যাত্রা হিসেবেই বিবেচ্য। এটি শুধু যোগাযোগের একটি মাধ্যম মাত্র নয়, এটি মানুষের সমন্বিত আবেগ, মূল্যবোধ, আদর্শ এবং স্বপ্ন বিনিময়ের শিল্প হিসেবেও গণ্য। এ ধরনের শিল্প দেশ ও জাতির সংস্কৃতির শেকড় পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে।

আমরা জানি যে, আধুনিক যান্ত্রিক যুগে বেতার, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, চলচ্চিত্র, বই প্রভৃতি গণমাধ্যমের মাধ্যমে এই শিক্ষা দেয়া হয়। কিন্তু বিজ্ঞানের উন্নতির আগেও মানুষের শিক্ষাগ্রহণের প্রয়োজন ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপদ্ধতির আগে মানুষ নৈতিক শিক্ষা গ্রহণের জন্যে সনাতন জ্ঞাপন পদ্ধতি ব্যবহার করত। আমাদের অঞ্চলে সেই প্রাচীন যুগ থেকেই প্রচলিত পাঁচালি, কীর্তন, গীতাভিনয়, যাত্রা, কবিগানের মাধ্যমে ধর্মকথার মাধ্যমে নীতিশিক্ষা প্রদান করা হতো। অর্থাৎ এসব প্রথাসিদ্ধ মাধ্যমই কালের বিচারে গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রফেসর আসমা হাজি ওমর অবশ্য আরো বলেছেন যে, মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিবেচনায় ইতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র কোনটা বেছে নেবে, তার ওপরই নির্ভর করে আমাদের চাওয়া-পাওয়া। তবে গণমাধ্যমের সুবিধার দিকটাও কাজে লাগানো উচিত। ইস্ট-ওয়েস্ট কমিউনিকেশন ইনস্টিটিউট সনাতন মাধ্যম বিষয়ক মাসব্যাপী এক সেমিনারে (জুলাই ১৯৭৫) আয়োজন করে। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা উন্নয়নশীল দেশে সনাতন মাধ্যমের কৌশল সম্পর্কে ধারণা বিনিময় করেন।

এশিয়া ও আফ্রিকার সনাতন মাধ্যমগুলো আধুনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে এবং ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে প্রচলিত কবিগান, লাবণী, যাত্রা, তামাশা, ভাবাই, কথা প্রভৃতি সনাতন মাধ্যম বিনোদন মাধ্যম তো বটেই ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে গণচেতনা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। জাম্বিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় সনাতন মাধ্যমকে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

নমনীয় মাধ্যম হিসেবে ‘পুতুলনাচ’ এবং ‘কথা’কে বিবেচনা করা হয়েছে। এ দুটির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বার্তা সংযোজন করে প্রচার করা যায়। ‘কথা’র মতো ‘কবিগান’ ও ‘যাত্রাগান’ নমনীয়। এদের মাধ্যমেও বার্তা প্রেরণ করা যায়। কবিগানের মাধ্যমে রমেশ শীল এবং যাত্রার মাধ্যমে মুকুন্দ দাস রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারেও সফল হয়েছিলেন। অনমনীয় মাধ্যমগুলো ধর্মীয় চেতনা বিকাশে এবং বিনোদন প্রদানের কাজেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আবার অনমনীয় আঙ্গিকের মধ্যে নমনীয় উপাদান ব্যবহার করে বার্তা প্রচার করা যায়। এ ধরনের যোগাযোগের ক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতে যে ‘যক্ষগানে’র কথা বলা হয়েছে, তা আমাদের যাত্রার সমতুল্য। তাই যাত্রার মাধ্যমে বার্তা প্রদান যে সম্ভবপর, তা নিয়ে আর বিতর্ক থাকার কথা নয়।

যাত্রার মতো পরিবেশনা-আঙ্গিকের সনাতন মাধ্যমের প্রভাব নিয়েও বেশ কিছু গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, সরকার তার নিজস্ব উন্নয়ন-পরিকল্পনা এবং ধারণাকে ছড়িয়ে দিতে এবং জনপ্রিয় করতে এ ধরনের মাধ্যমকে ব্যবহার করতে পারে। বয়স্ক শিক্ষা, স্যানিটেশন ব্যবহার, পরিবার পরিকল্পনা প্রভৃতি কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই সনাতন মাধ্যমগুলোর বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

বাংলাদেশের এক সময়ের ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও ধর্মবিষয়কমন্ত্রী শামসুল হুদা চৌধুরী জনমাধ্যম যাত্রার শক্তিকে অনুধাবন করে দেশের উন্নয়নে একে কাজে লাগানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন-

মাস কমিউনিকেশনের সবচেয়ে পাওয়ারফুল মিডিয়া যাত্রা এবং কবিগান। তার সাহায্যের জন্যে আমাদের মন্ত্রণালয় যতটুকু সম্ভব সাহায্য দেবে। আমরা আগামী পাঁচ বৎসরে যাত্রা আন্দোলনকে বাংলাদেশের সত্যিকার সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসাবে গড়ে তুলতে চাই।১১ শামসুল হুদা চৌধুরী, প্রথম জাতীয় যাত্রা উৎসবের পুরস্কার বিতরণী উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণ, জাতীয় যাত্রা উৎসব ১৯৭৯-৮০ স্মরণিকা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৭৯, পৃ. ১৮

এটি কেবল মন্ত্রীর ভাষণ হিসেবেই রয়ে গেছে। এই ঘোষণা বাস্তবায়নে সরকারের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।

জনমাধ্যম নিয়ে পৃথিবীব্যাপী যত গবেষণা কিংবা সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে, তার প্রায় সবাই রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও চলচ্চিত্র নিয়ে। এশিয়া অঞ্চলে লোকমাধ্যম নিয়ে কিছু কিছু গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। যাত্রা যেহেতু কেবল ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এবং বাংলাদেশে প্রচলিত লোকমাধ্যম, সেহেতু এ নিয়ে খুব বেশি গবেষণা পচিালিত হয়নি। তবে চীনের ‘এমেচার গ্রাম্য থিয়েটার’, জাপানের ‘কাবুকি’, মালয়েশিয়ার ‘ওয়াং কুলিট’ নিয়ে যে গবেষণা হয়েছে, আমাদের যাত্রা নিয়ে গবেষণায় একই ফল প্রত্যাশিত। সনাতন মাধ্যম হিসেবেই তো বটেই আমরা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে যাত্রাকে জনমাধ্যম হিসবেই বিবেচনা করতে চেয়েছি।

অডিট বুরো অব সার্কুলেশনের (এবিসি) রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, দেশে ৩৪৬টি দৈনিক পত্রিকা, ৬১৫টি সাপ্তাহিক পত্রিকা, ১৭১টি পাক্ষিক পত্রিকা, ৩১৬টি মাসিক পত্রিকা এবং ৪২টি চতুর্মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। দেশে প্রকাশিত পত্রিকার মোট প্রচারসংখ্যা ৪.৬৫ মিলিয়ন এবং দৈনিক পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ২.২ মিলিয়ন মাত্র। (এবিসি রিপোর্ট ১৯৯৮, ডিএফপি, তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার)। সচেতন লোক মাত্রই জানেন যে, এই সংখ্যা কতটা বাড়িয়ে বলা হয়ে থাকে। একই সময়ের হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট ৫ লাখ ৭২ হাজার ১০৮টি টেলিভিশন সেটের লাইসেন্স রয়েছে। বেতারের লাইসেন্স আছে ২ লাখ ৩৪ হাজার সেটের। অবশ্য এর প্রায় দ্বিগুণ বেতার সেট আছে যার লাইসেন্স নেই। এই হচ্ছে বেতার, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রের গ্রাহকসংখ্যা। অনুক‚ল পরিবেশে একটি যাত্রাদল মাসে ২০ দিন চালু থাকে এবং প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার দর্শকের সামনে পালা পরিবেশন করে। এভাবে একটি দল ৬ মাসের মৌসুমে প্রায় ২৪ লাখ লোকের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। দেশে চালু প্রায় ৬০টি দল বিবেচনা করলে দেশের জনসংখ্যার সমান প্রায় ১৪ কোটি মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে যায় সহজেই। অথচ পশ্চিমি সংজ্ঞার্থের সীমাবদ্ধতাকে আমলে নিতে গিয়ে আমরা এরকম বিশাল অডিয়েন্সের মাধ্যমকে জনমাধ্যম হিসেবে বিবেচনা না করায় আমরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। উন্নয়নের একটি বড় মাধ্যমের শক্তি থেকে সরকার ও জনগণ উভয় পক্ষই বঞ্চিত হচ্ছে। দেশ-কাল বিবেচনায় যাত্রাকে অন্তত লৌকিক গণমাধ্যম হিসেবেও গুরুত্ব দেয়া হলে সামগ্রিক অর্থেই দেশের কাজে লাগানো যেতে পারে।

:: ড. তপন বাগচী : কবি-প্রাবন্ধিক। উপ-পরিচালক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিশেষ আয়োজন-২'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj