পঠন-সংস্কৃতি ও বিকারগ্রস্ততার ছায়াপথ

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৬

** শহীদ ইকবাল **

দীর্ঘায়িত ইতিহাসে ঋদ্ধ আমাদের বাঙালি জাতিসত্তা। বাঙালির উৎসব ঐতিহ্য এবং তার পূর্ণাঙ্গ প্রাণশক্তি মাতা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমিকেন্দ্রিক। সেজন্য আমাদের বাঙালিয়ানা প্রচণ্ড উৎসাহ-উদ্দীপনামুখর, ভাবব্যঞ্জনার তীব্রতায় আবিরাচ্ছন্ন। হাজার বছরের রচিত সাহিত্যে উল্লিখিত প্রাণনার সংবাদ আছে। প্রাসঙ্গিক এ সংবাদে মধ্যযুগের সময়সীমায় সাংস্কৃতিক তাৎপর্য একভাবে উচ্চারিত আবার আধুনিক কালপরিসরে তার প্রবহমান প্রসার অন্যরকমের। কারণে বলবো, সময় ও সমাজ বিবর্তন ইঙ্গিত এবং সঙ্গে রাষ্ট্র যোগ মানুষের শ্রেণিস্তর। যেখানে আইন, শাসন ও বিচার তাৎপর্য পরিবেষ্টিত ব্যক্তিমানুষের সঙ্গে- যার প্রভাবে বৈষম্য, শাসন, ক্ষমতা বা প্রতিপত্তি কখনো আচ্ছন্ন, কখনো দোর্দণ্ডতায় মূর্ত আবার কখনোবা স্বার্থ-আদিষ্ট বুর্জোয়া প্রকৃতির ধাঁচে রূপায়িত। রাষ্ট্র-রাজনীতি সাপেক্ষে এগুলো তৈরি হয়েছে আধুনিক সময়ে এবং সাম্রাজ্যবাদ প্রসারে। প্রসঙ্গত, সাম্রাজ্যবাদ এখনকার সময়ে বিলুপ্ত হলেও তার আগ্রাসন অন্য প্রণোদনায়- বিশেষত মনোপোলার বিশ্বে পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা ইরাকের পর্যুদস্ত পরিকাঠামোর বৃত্তান্তে উল্লেখনীয়। এক সময়ে লেনিনগ্রাদ বেঁচে থাকলেও তার নিপতিত বিশ্বের প্রতি অনাস্থা স্বীকার্য। সুতরাং রুশ বিপ্লব পরবর্তী সময় বিশেষত স্ট্যালিন-ক্রুশ্চেভ আধিপত্যের বিশ্বেও মানবতার লঙ্ঘন অনাহুত- তবে মনোপোলার বা গ্লোবাল ভিলেজের নৃশংস প্রকৃতি-প্রণোদনা তারা তাড়িয়েছিল- তাড়াতে পেরেছিল। ব্রিটিশ আধিপত্যবাদ বিষয়ে আধুনিকতার যাত্রা আমাদের সংস্কৃতিতে ইতিবাচক- বৃহত্তর অর্থে। এ প্রসঙ্গে স্বীকৃতি আছে রামমোহন বা বঙ্কিমচন্দ্রের। মানতে দ্বিধা নেই ইতিহাসের অনিবার্যতার সংস্কৃতির বিচ্ছুরিত ধারা কলোচ্ছ¡াসে প্রবাহিত; ইয়ং বেঙ্গল, ডিরোজিও প্রভৃতি সাপেক্ষে ধর্ম-সমাজ-সংস্কৃতি ও সাহিত্যে। চিরন্তন অধ্যাত্ম সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রায়োগিক ও প্রগতির বার্তা আনেন চর্চিত ধর্মের ভেতরে বা বাইরে; রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ উদাহরণ; আর সমাজে ঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা, বঙ্কিমচন্দ্র, অক্ষয়কুমার দত্ত। এমন মানুষদের স্পর্শে গ্রহণীয় ও আদরনীয় বিবেচনা-অবিবেচনা প্রসঙ্গ বা রবীন্দ্রনাথের ‘বড় ইংরেজে’র কৃতকর্ম প্রয়াস। আধুনিকতার আগে সামন্ত সমাজে বিচ্ছুরিত সংস্কৃতি এবং ব্যক্তি ও শাসন পরিকাঠামোর সম্পর্ক সরল বা স্থবির অধ্যাত্মদোষে দুষ্ট। গড়ে ওঠেনি যথোচিত সংস্কৃতির পাদপীঠ- যদিও সমাজ ও উৎপাদন আবিষ্ট মানুষ স্পষ্টরূপে পরিচয় মেলে কিন্তু কারণ সে অর্থে তা ছিল আহারাদি ও আশ্বাসপ্রসূত। জীবনবাদের প্রতিষ্ঠা প্রচলিতের মধ্যেই বন্দি- আর ছিল না ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। কিন্তু পরে রামমোহনের সমাজে তৈরি হলো রূপান্তরিত সংস্কৃতি বহন করল ঐতিহ্যাদৃষ্ট সংস্কৃতি। যেমনটা আগে বলেছি : চলন একমতো- ঊনবিংশ শতাব্দীতে পরে বিংশ শতাব্দী; ‘বণিকের রাজদণ্ড’ ছাড়ার পর আজকের বাংলাদেশ। গোড়াতেই যে প্রাণনার উৎস প্রসঙ্গে উচ্চারণ হয়েছে মাতৃভাষা- বায়ান্ন, অভূতপূর্ব সাফল্য- যে সংস্কৃতি আমাদের বলে দিয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধের কথা- বৈষম্যহীন রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পুনরুত্থান প্রসঙ্গের কথা। আমরা জিতে যাই, পৌঁছে যাই সীমানায়, পেয়ে যাই আমার পতাকা ও কাক্সিক্ষত দেশ।

উল্লিখিত বার্তা- ইতিহাস কিংবা তার পুনর্গঠিত প্রত্যয়ে প্রতিনিয়ত প্রজন্মান্তরকে সামনে পাঠানোর ঠিকানা- আমাদের উচ্চারণ ও কারণ মুক্তিযুদ্ধ। মরণজয়ী ও শিহরণ কাঁপানো- তারপর কেন যেন চলে আসে বিভাজ্য-বিভাজন আর ওই জীবনানন্দের শকুন- শেয়ালতুল্য অন্ধদের প্রলয়োল্লাস। বাংলাদেশও আর যথোচিত থাকে না। ইতিহাসের মহানায়ক হত্যা হয় এদেশীয়দের হাতে- সৃষ্টি হয় বিপথগামী শক্তি আর তাদের অবলম্বনে উঠে আসে বায়ান্ন, ঊনসত্তর আর রবীন্দ্রনাথের পরশ্রীকাতর অভিমুখী শত্রুরা। ইসলামের বৃত্তে ও ব্যবসায় ঢুকে পড়ে জাতি-উৎসবের বিপরীতমুখী দুর্বৃত্তরা। আমাদের সংস্কৃতি যে উৎসবে একাত্তরে প্রতিষ্ঠা পায়, যে নিগড় থেকে মুক্তি পেয়ে উল্লসিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে তা আবার অনিশ্চিত যাত্রায় পড়ে- শঙ্কায় পড়ে বললে বলতে হয় মৃত্যুর মুখে পতিত আর রাজনৈতিক বিনাসের আচ্ছন্নতায় রাষ্ট্র আবদ্ধ হয় দুর্বৃত্তায়নের বেড়াজালে। সাতের দশক খুব উল্লসিত অবস্থায় উজ্জীবিত শুধুমাত্র নাটক, থিয়েটার মঞ্চ- কেননা মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশেই তার কাঠামো বিনির্মাণ- উজানের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া সবকিছুর- ওই একাত্তরের মধ্য দিয়ে; তবে সাহিত্য ষাটের সময়ের চেয়ে ক্ষয়িষ্ণু, আঙ্গিক অপরিপক্ব আর বৈশ্বিক প্রচ্ছন্নতায় এলডিসির তালিকায় বাংলাদেশ দিশাহারা, পতোনোন্মুখ, বৈপরীত্যের দোলায় ভারাক্রান্ত। রাষ্ট্রের চালক ধর্মভিত্তিক- আমলাতান্ত্রিক-প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিচ্ছবিতে মাঠ দখল করতে থাকে। নিরন্তর যেন নিঃস্বতর হয় বাংলাদেশ; নীরবে কাঁদতে থাকে সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতান্ত্রিক আদর্শ। আর সবচেয়ে বড় প্রকোপে পড়ে সংস্কৃতি। প্রধানত স্বাধীনতার অতি তাড়াতাড়ি রাষ্ট্র শাসকদের হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে- ফৌজি কর্তারা শাসক বনে গিয়ে সংবিধান আমূল বদলে ফেলে- ফলত চোখে পড়ে ঐ পূর্বোক্ত প্রতিক্রিয়াশীল ধারা যা জাতিত্ব ও বঙ্গীয় সংস্কৃতি-বিরোধী তা সোলাসে পুনরুজ্জীবিত প্রতিষ্ঠা; তার জন্য রষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তির প্রয়োগ- মিডিয়ায়, কর্মকাণ্ডে আর সে কারণে সদ্য শিশুরাষ্ট্রের জন্ম নেয়া প্রজন্ম প্রারম্ভিক পাঠ্য থেকে শুরু করে প্রতি স্তরে বিশ্বাসের সঙ্গে যে সুরের ঐকতান পায় তা সংশয়ের, অন্ধ মূল্যবোধের, সূ² আর্থ-রাজনীতি সম্পৃক্ত দুর্বৃত্তায়ন প্রক্রিয়ার- সেখানে ক্রমশ স্বাভাবিক প্রত্যয়গুলো বিলীন হতে থাকে। বিলীয়মান এ পটভূমে উঠে আসে বেগানা সংস্কৃতি-স্বদেশ আর ভুঁইফোড় অন্তর্কাঠামোয় চাকচিক্যময় জৌলুশপূর্ণ বহিরাবরণ। আধুনিকতার নামে, ধর্মের নামে, যুগ বদলের হাওয়ায়, প্রচেষ্টার নামে- এসব চলতে থাকে। বেড়ে ওঠা প্রজন্ম তখন সুপুষ্ট হওয়ার পরিবর্তে উপর্যুক্ত চাকচিক্যের নামে সংশয়ের পরিচয়কে ধারণ করে। পরিচয়হীন পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্মে-প্রজন্মান্তরে। সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি, বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার বদলে বৈষম্যযোগ্য পরিবেশ তৈরি, ধর্মের নামে অপধর্ম, পুঁজিকে কেন্দ্র করে ব্যবসা, নারীকে পণ্য বানানো, সমষ্টির স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ এসব ওই পরিচয়হীনতার জায়গা থেকে চলছে প্রভূত পরিমাণে। আটের দশক জুড়ে চলতে থাকে ক্রমপরিসরে ব্যক্তিমানসস্তরের পরিবর্তন।

আলোচিত এ বিষয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বিশ্ব পরিস্থিতির উল্লম্ফিত সংস্কৃতি ও রাজনীতির প্রকোপ। খুব আগ্রাসী হয়ে পড়ে শক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলো। এবং ছোট ও দরিদ্র রাষ্ট্রেও ঘটে তার অনুপ্রবেশ। তথ্যপ্রবাহে প্রয়োজন-অপ্রয়োজন, দরিদ্র-অদরিদ্র, শিক্ষা-অশিক্ষা না মেনে স্বদেশের তৈরি রাষ্ট্রপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে উল্লাসী-উচ্চকিত ‘সবকিছু’। ‘সবকিছু’ আমাদের রাষ্ট্রে হজম প্রক্রিয়ায় না থাকুক তবুও বন্ধ থাকে না। আমরা পড়ে যাই অতলে কিন্তু ওই প্রাণনা রক্তে, বাঙালিত্বের মধ্যে তাই সঙ্গে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াই- শক্ত ও ঋজু পায়ে দাঁড়ানো চলে, ফলে রক্ষে এবং টিকে থাকা। বিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির উল্লাস সৃষ্টি করে আধিপত্য। আধিপত্যবাদ প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু প্রশ্ন, এগুনোর পথ কোথায়? কীভাবে আমাদের নিজস্বতার ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধি ঘটবে। আধিপত্যের যুগে স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের সুযোগ কোথায়? সম্প্রচারের মধ্যে অন্যের অনুকরণের বদলে নিজেদের ভূসংলগ্ন সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা কীভাবে ঘটবে? সাম্প্রতিকতা যতই প্রবল হোক আধুনিকতার মাত্রিকতা নানামুখী হবে না কেন? ইত্যাকার এসব প্রশ্নই আমাদের প্রতিবন্ধকতা। এবং হারায়ে খুঁজে ফেরার চেতনাই- আমাদের সচেতনতা ও সমাজ বাস্তবতার নির্মাণ প্রয়াস। আর প্রয়াসী হতে চাওয়াটাও কি প্রশ্ন নয়?

আজকাল অবাধ তথ্যপ্রবাহে অনেক কিছু দেখি- প্রশ্নসংকুলতা তৈরি হয়- আমাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের জায়গাটি দেখলে। মাঝেমধ্যে ভাবি শিক্ষার ‘অপ্রকাশের ভারে’ই ব্যক্তির সবকিছু ন্যুব্জ হয়ে আছে! প্রাণরস নেই যেন কোথাও কিছুতেই। মুক্তিযুদ্ধ হওয়ার আগে আকাশপ্রতিম স্বপ্ন ছিল- বাস্তবতা তাকে ফারাক করতে পারেনি। মঞ্চনাটকের ভিত্তি ও প্রতিষ্ঠা পায়- দর্শনীর বিনিময়ে নাটক দেখা শুরু হয়- সাহিত্যে আত্মত্যাগের প্রতিষ্ঠা লক্ষ্যগোচর হয় যাঁরা ষাটে ছিলেন তাঁরা আরো সুশোভিত- প্রাণবন্ত হয়ে উদ্ভাসিত হন। সংস্কৃতি অহঙ্কার ও গর্ব করতে শেখায়- সে প্রত্যয়ে লেখক সকল সমবায়ী হয়ে ওঠেন। যতই প্রতিক‚লতা থাক, বাধা আসুক নানা কৌণিক তবুও এতটুকু মাথা নোয়াবার নয়- কিছুতেই বিলীন হওয়া চলে না- সেটা সম্ভবও না- প্রকারান্তরে তা ইতিহাসের অনুগামীও নয়। তাই সাকল্যে হয়তো ঐ ধারারই জিত হয়। সময়সাপেক্ষ চিত্রে মূলধারা উঠে আসতে বাধ্য। কিন্তু ক্ষয় হয় অনেক, অপেক্ষার প্রহর অনেক বেশি। গত ক’বছরে মিডিয়া আমাদের মননচর্চা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্রীভূত করেছে, ঊর্ধ্বশ্বাসে চালিত করেছে নিজেদের স্টাব্লিশমেন্ট, সুনাম ও প্রতিষ্ঠার পেছনে। অনেকগুলো নাটকের ভাষা, ভাবনা একরকম, তুলতুলে মধ্যবিত্ত আবেগ, আর ন্যূন বয়সী ছেলেমেয়েদের ‘অপ্রেম’ বিষয়ক ক্যারিকেচার। অপরাধ, সন্ত্রাস, প্রতিষ্ঠা প্রবণতার জৌলুশ নাটকে কম নয়। অনেক কিছুও হিন্দি প্রভাবিত, অনুগত। অনুষ্ঠানের অনুকরণ এখন তুঙ্গে। এসবের অনুকরণে সবকিছুই গোচরে-অগোচরে পণ্য হিসেবে গণ্য বলা চলে। বাংলাদেশের নারীরা মিডিয়ায় কাজ করছে- এগুচ্ছে সামনে কিন্তু অপ্রচ্ছন্নরূপে নিজেদের উপস্থাপিত করছে পণ্যের মতো- কখনো তারা প্রতিষ্ঠাকে বিক্রি করছে, কখনো শরীরসর্বস্ব রূপকে বিক্রি করছে এক সময় এ উদ্ভাসন (হোক তা রুচি বা অরুচিকর) তাকে সহজপথে অন্য অনুষ্ঠানে জায়গা করে দিচ্ছে। একই অঙ্গিভঙ্গি, নড়ন-চড়নে যখন তফাৎ নেই- তখন যেমনটা হয় তাই করা চলে। এক সময় পৌঁছে যাচ্ছে লক্ষ্যে (?), আসলে তাই কি লক্ষ্য! প্রতিটি চ্যানেলের অধিকাংশ কর্মসূচিই এভাবে প্রতিপালিত। প্রকৃত মানুষ, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, শ্রেণিস্তরের মানুষ- তাদের পরিচয়, সংকট, অন্তরের সমস্যা, সাংস্কৃতিক পরিচয় পাওয়া যায় না। রচনাকারের জীবনদর্শন নেই, নেই কোনো মেসেজ- ক্ষুদ্র ও ধৈর্যহারা পরিশ্রমে যা হয় তাই সম্বল। চটজলদি শীর্ষে ওঠা- প্রতিপত্তি ও প্রতিষ্ঠা- এটা এখন নৈমিত্তিক প্রবৃত্তি। সে কারণে আমরা বিচ্ছিন্ন, একাকী, সমষ্টির স্বার্থে উত্তীর্ণ নই। লজ্জা, শ্লাঘা, নির্বাসনে নিজের ও নিজেকেই; ভালোবাসার স্বাদকেই নিরন্তর রপ্তানি করে যাচ্ছি। এ পর্যায়ে দায়বদ্ধ কলাকুশলী, রচনাকার নেই- লুপ্তপ্রায়ই মনে হয়। কারণ কি, সে প্রশ্নগুলো এখানে আগেই এসেছে। রাষ্ট্র যখন সর্বজ্ঞ-স্বভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে তখন প্রত্যেক ক্ষেত্রে আঘাত আসে; আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার প্রথম জায়গা সংস্কৃতির বিনাশ ও লঙ্ঘন। ফলে কমিটমেন্টের ক্ষেত্রটি হয়ে যায় দুর্বল আর তখনই স্বেচ্ছাচারিতা, স্বার্থান্ধতা, উচ্চাকাক্সক্ষী হওয়ার ব্যাপারগুলো তীব্র হয়ে ওঠে। ক্ষেত্রবিশেষে তাতে করে যুক্তির প্রতিউত্তর হয় আধুনিকতার অংশবিশেষ বা বুদ্ধির যোগ্যতা। কেউবা বলেন ভাগ্যবান মানুষ বা সমকালীন অনিবার্যতা। এরূপেই আমাদের গ্রহণ-বর্জনগুলো চলতে থকে। কিন্তু এমনটাইতো কাজের স্বীকৃতি নয়। প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার পরপরই মঞ্চ থেকে উঠে আসা শিল্পীরা তীব্র কমিটমেন্টে দেশ ও জাতিসত্তাকে সবার উপরে ধারণ করেছিলেন। আর এ মতেই চলতে থাকে অনেক… অনেক জগতের উদ্ভাসন। নাটকে অনুবাদ হলো, লৌকিক সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত হলো- শিল্পসম্মত সাহিত্য মঞ্চে উঠে এলো। চলল নানা রকমের নিরীক্ষা। আর এ শিল্পীরাই হয়তো ইদানীং মিডিয়াতে এসেছে, লোভে আপাদমস্তক ডুবিয়েছেন, পঙ্কিলতার শেষ সীমায় পৌঁছেছেন। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে এটা সত্য যে, তাদের দায়বদ্ধতার ও শিল্পী হওয়ার জায়গাটার ভিত্তি ভীষণ শক্ত। এবং দীর্ঘ সময় ও ত্যাগে অনেক পথ ও প্রতিক‚লতা অতিক্রম করতে হয়েছে। তারা পেরেছিলেনও। সে শক্তি ও স্বপ্ন দেখার সময়টা ছিল। হয়তো তা একটা সময়েরও প্রতিশ্রæতি। এ প্রতিশ্রæতিটা তারা আত্মস্থ করতে পেরেছিল, অনেক পড়াশোনায় তারা ছুঁতে পেরেছিলেন মানব মহিমার কৌতূহলকর জগতটাকে। তাদের প্রতিশ্রæতি রচিত হয়েছিল দেশ ও জাতির জন্য। অন্যদিকে এখনকার প্রজন্ম সস্তা জনপ্রিয়তা ও প্রত্যয়হীন দলাদলির ভেতরে নিরঙ্কুশ নিমজ্জিত (নিশ্চয়ই পুরোপুরি সবার ক্ষেত্রে নয়)। একই ব্যক্তি কখনো ডান্স, কখনো অভিনয়, কখনো বিজ্ঞাপনের চিত্রে বা রান্নাবান্না-ঘরকন্নার অনুষ্ঠানে নানা জায়গায়। সর্বপারদর্শী (?) এ ব্যক্তি কোনটা জানেন আর কোনটা জানেন না সেটা বোধ্য হয় না সাধারণ্যে। উপর্যুক্ত মন্তব্যে এমনটা বোঝাতে চাই না সবাই এরূপ কাজে আছেন- প্রথমোক্তরা এখন বাণিজ্য করছেন না তা নয়, নিজেদের বাণিজ্যিক করে তুলছেন না তাও নয় আবার অপর অংশ কেউ ভালো নয়, ত্যাগী, পরিশ্রমী না এমনটাও নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ মূল্যবোধহীনতার জগতে আমরা ক’জন কাজ করছি। কি করছি?

আমি মিডিয়া তথা নাট্যকারের কথা প্রধানত বলছি কারণ, এর সঙ্গে সাহিত্য, রাজনীতি, বাণিজ্য- প্রত্যেকটির যোগ আছে; আবার প্রত্যেকটির সঙ্গে অবধারিতভাবে যুক্ত আছে সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো। কারণ সংস্কৃতিই মানুষ, সংস্কৃতিই মূল্যবোধ ও সততা। এটা নানাভাবেই আমাদের মধ্যে অবিরত। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। শেখ মুজিবের কণ্ঠ কীভাবে যুদ্ধে নামিয়ে দিল সাত কোটি জনতাকে। আর সেই মুক্তিসংগ্রাম কীভাবে প্রত্যেককে প্রাত্যহিকতায় জড়ায়! সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতির ভেতরের যে প্রাণপ্রাচুর্য তাই তাকে নানাভাবে গ্রহণীয় করে তোলে; বলা চলে প্রতিনিয়ত প্রাণস্পর্শী এবং প্রত্যেকের মাঝে তা চলছেই। কেননা মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস নয়। মুক্তিযুদ্ধ প্রাত্যহিকতার। একই তীব্রতায় ও অনিবার্যরূপে এটাকে গ্রহণ করার লোকও কম নয়। যা স্বতঃস্ফূর্ত তবুও তা কেন বিশেষ দিনক্ষণ ধরে প্রচারিত হয়। আবার শাসক বদল হলে তা বন্ধ হয়; আবির্ভূত হয় বিপরীতরূপে। কিংবা একপাক্ষিক ঘটনাপ্রবাহ রচিত হয়। কারণ, সূ² গবেষণা ও নিবিড়তা নেই। কৌত‚হল না থাকলে আগ্রহ ও ধৈর্যও তৈরি হয় না। সাহিত্যে প্রকৃত মানুষ পাই না- এখানে ক্ষণকাল পূর্বে মিডিয়া প্রসঙ্গে যা বলেছি। নিশ্চিত বলি, একাত্তর-পূর্ব সাহিত্য যতটা সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে তা ততটা নয়। কারণ, পাকিস্তানি শাসনামলে চিহ্নিত শত্রুর প্রতিরোধে যে সাংস্কৃতিক শক্তি আমাদের তৈরি হয়েছিল তাই আমাদের দেশের প্রতি আত্মত্যাগী করে তোলে- দেশকে প্রাত্যহিকরূপে নতুন করে ভালোবাসতে শেখায়, রবীন্দ্রনাথকে বাঁচিয়ে রাখার প্রত্যয় ঘোষণা করে কিন্তু স্বাধীনতার পর এ দায়বোধের জায়গার বিনষ্টি পর্যবসিত- আমরা ভোগে, স্বার্থে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছি। ফলে সাহিত্যচর্চা হলেও তা সফল কিছু তৈরি করতে পারে না- আবার তার সমৃদ্ধিও তাৎপর্যমুখর মনে হয় না। অনভিজ্ঞ চিন্তা, মূল্যবোধ সৃষ্টির শূন্যতা, দায়বোধের দুর্বলতা- নিজেদের চেতনাকে মুষড়ে দিয়েছে আর একই সঙ্গে রাজনীতির নিরন্তর দুর্বৃত্তায়ন যেন ভষ্মে ঘি ঢালার জোগাড়। এরূপ কার্যকারণের জায়গায় একাত্তর-পরবর্তী সাহিত্য যার বয়স তিন দশক তা যথোচিত মনে হয় না। নিশ্চয়ই এমন প্রস্তাবনায় কিছু লেখক বাদ পড়বেন হয়তো কিন্তু সামগ্রিক আলোচনায় বর্তমান সাহিত্যের গতিবিধির পরিক্রমায় এর ব্যত্যয় কি?

উল্লিখিত নানা অব্যবস্থার পেছেনের কারণ আমাদের সংস্কৃতির জৈব ক্ষেত্রটির অনাচার অবহেলা- দুর্বল পানসে ও অসুস্থ বিকাশ। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নৈমিত্তিক পুনর্ব্যবহার, প্রতœ-পরিচর্যা, নৃতত্ত্বের মাত্রিকতা- আমাদের মনুষ্যত্ব ও মূল্যবোধকে জন্ম দেয়। তা প্রজন্মান্তরে সৃষ্টিশীল হয়ে নিত্যকর্ষিত হতে থাকে। সেটাই জগৎ-জীবন ও দর্শন সম্পর্কে জিজ্ঞাসু এবং সংশয়বাদী করে তোলে। যার পেছনে থাকে অনেক প্রশ্নের উত্তর। কিন্তু তা না হয়ে কালের চাকা ঘুরছে পেছনে। সাংস্কৃতিক শূন্যতার পথ ধরে সমাজে মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদের উত্থান একদিকে যেমন ঘটছে অন্যদিকে তেমনি নিজেদের পুঁজিবাদের কাছে পণ্য করে স্বার্থান্ধতায় সমর্পিত করেছে ব্যক্তিমানুষ নিজেকে। এমন প্রতিপার্শ্বে নিষ্ঠুরতা ও ক্রুরতা ছড়াচ্ছে দিগি¦দিক। বিভীষিকাময় পরিবেশে সবাই, সব শ্রেণিস্তরের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। গ্রাসকৃত নিরাপত্তাহীনতা অর্থনৈতিক সমাজে সৃষ্টি করছে বিরূপ প্রভাব। ভৌগোলিক ভূখণ্ডের মধ্যে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হচ্ছে মানুষ, পর্যুদস্ত হচ্ছে মানবতা- ক্ষোভ ও বিবমিষা উগরে দিচ্ছে মানুষকে। বিবেক নয়, হননের পথকেই মূলত মুখ্য করে তুলছে। সামরিক শাসন-আদৃত বীভৎস দেশও যেন সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সময়কে হার মানিয়েছে। ক্রুদ্ধ এ সময়ে মানুষকে বাঁচানোর ও অপশক্তিকে রোখার পথ কোথায়? কার পাপে আমরা সবাই পাপী! কিন্তু নিয়তি-নির্ভর হলে তো সে পথ আরো বিপদসঙ্কুল। প্রকৃত বিশ্বাস ও সংস্কার আমাদের এগিয়েই দেয় হয়তো কিন্তু তার ওপর কার্যকারণ যৌক্তিকতার মীমাংসা চলে না। সুতরাং ধর্ম বা অধ্যাত্মবিশ্বাস রবীন্দ্র বা রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ শিবিরে এক আদর্শ। কারণ সেখানে আছে : মূলে বস্তুবাদী দর্শন আর বাইরে ভাববাদের খোলস। তাই প্রকৃত অর্থে আমাদের চালনা পূর্বোক্ত খ্যাতদের আদর্শ ধরে ধর্মবুদ্ধি ও স্বার্থবুদ্ধির বাইরে এসে প্রায়োগিক চিন্তাকে কার্যকর করা। এ সময়ে এর ব্যত্যয় হলে তার ট্র্যাজিক পরিণতি অনিবার্য। কেননা জয় আসে প্রতিরোধী যুদ্ধের পথে; সে পথেই মানুষ বিজয়ী হয়। আমাদের সময়ের রক্ষাকবজ রবীন্দ্রনাথসহ বড় মনীষীরা; আমাদের প্রেরণা বায়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তরে সবই বলিষ্ঠ উদাহরণ। বৎসরান্তে আমরা এসব উদযাপনের মাধ্যমে উৎসবমুখর হয়ে পড়ি; মহামিলনের বারতার যে উৎসব সেখানে আমরা নিজেদের প্রাত্যহিকতার জন্য তৈরি করি- আবিষ্কার করি।

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব একটা আগ্রাসী ও উন্মত্ত বিশ্ব, সন্দেহ নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটেছে বটে- এর ফলে একপক্ষে সৃষ্টি হয়েছে উগ্র আধিপত্যবাদ। মানুষ বিজ্ঞানকে ব্যবহার করছে- তা সত্য কিন্তু এই বিজ্ঞানই আবার মানুষকে অবরুদ্ধ করে ফেলছে। সন্ত্রাস, হত্যা, শোষণ এখন একক বিশ্বে মদদ দেয়া চলছে- সেখান থেকে মুক্তি পাচ্ছে না বিবেক, সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও মূল্যবোধ। মিডিয়া ক্যু করে ইউনিপোলার আমেরিকা নিভৃতে চালিয়ে যাচ্ছে স্বার্থবুদ্ধির কর্মকাণ্ড। দেশে দেশে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র অস্থিরতা। বিবেক বিপর্যস্ত- ইরাকে, আফগানিস্তানে, পাকিস্তানে, মিসরে, প্যালেস্টাইনে। বিস্ময়কর আগ্রাসনের ইন্ধনে ইউরোপও কম যায়নি। আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের বলয়ের প্রভুরা আইন-শাসন-বিচারের নামে মানবতাকে পর্যুদস্ত করেছে। নির্মম হত্যা করছে মানুষকে। নারকীয় নির্যাতনের প্রমাণ স্পষ্ট। আজকের বিশ্বে দেশে দেশে এর প্রকোপ বাড়ছে। তোপের মুখে তৃতীয় বিশ্বও। একই সঙ্গে এসব অবিবেকি কর্মকাণ্ডকে ইহুদি কর্মকাণ্ড বা বিধর্মী আখ্যা দিয়ে জঙ্গিবাদ হিংস্রতার তীব্রতায় উদ্ভাসিত। বিশ্বের দেশে দেশে ইসলামি প্রোপাগান্ডায় মৌলবাদ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে- এরূপ পরিস্থিতি মধ্যযুগীয় বললে ভুল হবে না। বাংলাদেশের যে পরিস্থিতি ও অবক্ষয়ের ফিরিস্তি বলেছি তা নিশ্চয়ই বিশ্ব-ব্যবস্থার বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে যে কোনো মূল্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় যোগ্যতার পরিচয় দিতে হবে। বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে তার অবস্থান মজবুত করা জরুরি। এজন্য শিক্ষার কার্যক্রমকে প্রকৃত ও শুদ্ধ করে তুলতে হবে। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড এ উপলব্ধি সর্বস্তরের মাঝে পৌঁছাতে হবে সৎ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। কর্তাব্যক্তিদেরও হতে হবে পরিশোধিত। প্রকৃত ইতিহাস ও যুগোপযোগী শিক্ষার জন্য সত্বর কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি- দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে, দলাদলির বৃত্ত থেকে, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন থেকে দেশকে, গণমানুষকে মুক্তির পথে চালিত করতে হবে; নইলে নয়।

এ পর্যায়ের ছবক, আমাদের পঠন ও বিবেচনার কৃষ্টি নিয়ে। সেটি এই দেশে কিছুটা গড়ে উঠেছিল, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। উপনিবেশ, সাম্রাজ্যচেতনা দমন করে অনেক প্রতিজ্ঞার ভেতর দিয়ে। এখন তার ঢেউ হয়তো বন্ধ নয়। কিন্তু আগ্রাসীরা তো পরাস্ত নয়, নতুন আঙ্গিকে তারা চলমান। গ্লোবালাইজেশনের নামে কী রূপ- আমরা কী এ নিয়ে শঙ্কিত নই! মারণাস্ত্র বিক্রি তো আছেই, ভূমি-মাটি ব্যবহার, সমুদ্র দখল, ভাষা দখল, এলাকা দখল, বাজার দখল, সুন্দরবন দখল তো দৃশ্যমান, অদৃশ্যমানও তো অনেক। এসবের জন্য বিস্তর আলাপের অপেক্ষা দরকার। তবে এটুকু বলি, পঠন-সংস্কৃতি তৈরি করুন, বিকশিত করুন, নবীন প্রজন্মকে তার মতো বাড়তে দিন- তার ভেতর দিয়েই চলতি ভাসমান বিকার ঠেকান, প্রতিরোধ করুন- নতুন বিকারের জন্ম না দিয়ে। তাতে আমরা অস্তিত্ব নিয়ে বাঁচার শ্বাসটুকু পেতে পারি। কারণে বলি, এখন তো শ্বাস নিতেই পারছি না, স্বাস্থ্য-শক্তি ও বল নিয়ে বাঁচবো কীভাবে, আর কখনো কী আমরা ততোদূর পৌঁছাতে পারবো?

:: শহীদ ইকবাল : লেখক ও অধ্যাপক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিশেষ আয়োজন-২'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj