চরিত্র গঠন ও মানবিক বিকাশে শিক্ষা

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৬

** মনওয়ার সাগর **

মানুষের জ্ঞান ও চিত্তের উৎকর্ষের জন্য, মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশের জন্য, চরিত্র গঠন ও মানবীয় মূল্যবোধের জন্য, সর্বোপরি মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষা হচ্ছে প্রধান নিয়ামক। শিক্ষা মানুষের চিন্তা ও মননকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে, জ্ঞানী করে। জ্ঞানকে সুপ্রয়োগ করলে তা হয় বিজ্ঞতা। বিজ্ঞতা সাফল্য নিশ্চিত করে। বিখ্যাত চীনা দার্শনিক কুয়ানৎসু বলেছিলেন “যদি এক বছরের পরিকল্পনা মতো ফল পেতে চাও শস্য রোপন কর, যদি দশকের ফল পেতে চাও বৃক্ষ রোপন কর, যদি সমগ্র জীবনের জন্য পরিকল্পনা করে ফল পেতে চাও তবে মানুষের সুশিক্ষার ব্যবস্থা কর।” এ একটি কথা থেকেই বুঝা যায় শিক্ষা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়, জীবনকে সফল ও সার্থক করার জন্য শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষার মান দেশের মানুষের জীবনের মানের সাথে সম্পর্কযুক্ত। জীবন তাহলে কী? জীবন মানেই হচ্ছে অদৃশ্য স্পন্দনের দৃশ্যমান বিকাশ, এ অদৃশ্য স্পন্দনের উৎসের কাছাকাছি যেতে হলে অনুভুতির গভীরে যেতে হবে, আত্মাকে স্পর্শ করতে হবে। আত্মার কোন মাত্রা নেই। আত্মা হচ্ছে বিশুদ্ধ শক্তি। ব্যক্তির মনোগত দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই আত্মা বিকশিত হয়। আর এ জন্যই জনৈক মনিষী বলেন “দৃষ্টি ভঙ্গি বদলান, জীবন বদলে যাবে।” দৃষ্টি ভঙ্গি বদলাতে না পারলে আত্মা পুরোনো শৃঙ্খলেই শৃঙ্খলিত থাকবে। আর এ দৃষ্টি ভঙ্গি বদলানোর জন্য যে অনুশীলন প্রয়োজন তাও শিক্ষা। সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষা বলতে আমরা বুঝি লেখা এবং পড়ার দুটি কৌশল আয়ত্ব করা কিন্তু ব্যাপক অর্থে চরিত্র গঠন, ব্যক্তিত্বের বিকাশ, চিন্তা, যুক্তি, কল্পনা ইত্যাদি শক্তির যথার্থ স্ফুরণও শিক্ষার অন্তর্ভূক্ত। শিক্ষা এমন একটি ব্যবস্থা যা সমাজের চাহিদা, উৎকর্ষ ও মূল্যায়নের নিরিখে সমাজ মানসের গতিপথ নির্দেশ করে। ইংরেজী ঊফঁপধঃরড়হ শব্দটি খধঃরহ ভাষার দু’টি শব্দের বফঁপবৎব এবং বফঁপধৎব যে কোন একটি থেকে উদ্ভুত হয়েছে বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। প্রথম শব্দটির দু’টি অর্থ আছে ‘ব’ এবং ‘ফঁপড়’ ‘ব’ শব্দটির অর্থ ‘মধ্য হতে’ এবং ফঁপড় শব্দটির অর্থ আমি বাহিরে আনি” অর্থাৎ বফঁপধৎব শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় “আমি ভিতর থেকে বাহিরে আনি” মানুষের অন্তর্নিহিত জ্ঞানকে বাহিরে আনা বা স্ফুরিত করা। কিন্তু শিক্ষা শুধু ভিতরের বস্তুকে বাহিরে আনা নয়। এ প্রক্রিয়ায় অনেক কিছু যেমন তথ্য, প্রবৃত্তি ও প্রক্ষোভ অনুপ্রবেশ করানোর ও পূর্ণগঠনের প্রয়োজন আছে সুতরাং নৈতিক দিক থেকে এ ধারণাটি ত্রুটিযুক্ত মনে হয়। দ্বিতীয় শব্দটি বফঁপধৎব, যার অর্থ “মানুষ করে তোলা” ঞড় নৎরহম ঁঢ়, ঃড় ৎবধৎ, এ ধারণাটি বেশ সমৃদ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ, কেননা শিক্ষা শিল্প সৃজন মূলক দিকের প্রতি ধারণাটি যথাযোগ্য দৃষ্টি আকর্ষণ করে। “ঙীভড়ৎফ উরপঃরড়হধৎু”র মতে ঊফঁপধঃরড়হ শব্দটি ঊফঁপধৎব থেকে উদ্ভুত বলে নির্দেশ করে। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ জন ডিউইও একই মতবাদে বিশ্বাসী। প্রচলিত অর্থে শিক্ষা শব্দটি ৪ (চার) প্রকারের অর্থে ব্যবহৃত হয়। ঊফঁপধঃরড়হ বা ‘শিক্ষা’ বলতে বুঝায় যে কোন বস্তু বা ব্যক্তির মাধ্যমে মানব আচরণের পরিবর্তন সাধন, এটাই শিক্ষার ব্যাপকতম অর্থ। ঊফঁপধঃরড়হ বা ‘শিক্ষা’ বলতে বুঝায় মানুষের দ্বারা জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতে মানবাচরণের পরিবর্তন সাধন। ঊফঁপধঃরড়হ বা ‘শিক্ষা’ বলতে বুঝায় মানুষের দ্বারা জ্ঞাতসারে পরিকল্পনা মত মানবাচরণের পরিবর্তন সাধন। ঊফঁপধঃরড়হ বা ‘শিক্ষা’ বলতে বুঝায় বিদ্যালয়ে সংগঠিত মানবাচরণের পরিবর্তন সাধন।

গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের (৮৭৩-৪০০ খ্রীঃ পৃঃ) মতে শিক্ষা হলো জিজ্ঞাসার মাধ্যমে সত্যের সন্ধান, আর এ সত্য উদঘাটনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সমপথের সহযাত্রী।

প্লেটো ‘দি রিপাবলিক’ গ্রন্থে শিক্ষাকে (ক) জানা (খ) বিশ্বাস (গ) স্বরূপ অন্বেষা (ঘ) সমাধান ও নিশ্চয়তা এ চারটি স্তরে ব্যাখ্যা করেছেন। অ্যারিস্টটল মানুষের সুপ্ত চিন্তা চেতনার বিকাশের পন্থাকে শিক্ষা বলেছেন। দার্শনিক জাঁ জাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) শিক্ষাকে সকল কৃতিমতা মুক্ত স্বাভাবিক পথে মানুষের মনুষ্যত্বের বিকাশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। জার্মান শিক্ষাবিদ ফ্রেডরিক ফ্রোয়েবল (১৭৮২-১৮৫২) শিক্ষা ক্ষেত্রে শিশুর স্বাধীন বিকাশে তার আগ্রহ ইচ্ছা আর ক্রীড়া প্রবৃত্তির উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ইংরেজ কবি Jhon Milton শিক্ষা প্রসংগে বলেছেন :Education is the harmonious development of body, mind and soul অর্থাৎ শিক্ষা হচ্ছে শরীর মন ও আত্মার সুষম উন্নয়ন। পাশ্চাত্য শিক্ষাবিদ Professor Herman H, Horne Gi g‡Z Education is the eternal process of superior adjustment of the physically and mentally developed, conscious, human being to God as manifested in the intellectual emotional and volitional environment of man. শাব্দিক অর্থে শিক্ষা হচ্ছে শারিরীক ও মানসিকভাবে মুক্ত সচেতন মানব সত্ত্বাকে স্রষ্টার সঙ্গে উন্নত ও ঐচ্ছিকভাবে সমন্বিত করার একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া। মোট কথা মানুষের চিন্তা চেতনা, সুকুমার বৃত্তি ও সৃজনশীল প্রতিভার উন্মেষ সাধন ও ক্রমবিকাশ করে মনুষ্যত্ব মানবিকতার উচ্চাসনে পৌঁছে দেবার মাধ্যম হলো শিক্ষা। মানুষের আত্মচেতনাবোধ ও মৌলিকত্ব সৃষ্টি করা শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মার্কিন শিক্ষাবিদ জন ডিউই (১৮৬৯-১৯৫২) বলেছেন, শিক্ষা শুধু ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নয়, বর্তমান জীবন যাপনের প্রণালীও তার অন্তর্ভূক্ত। মানব জীবনের চলমান অভিজ্ঞতাকে অর্থপূর্ণ করে তোলা এবং সে অভিজ্ঞতা থেকে তাৎপর্য আহরণ করাই হলো শিক্ষার উদ্দেশ্য।

মানবিক বিকাশ বলতে আমরা কি বুঝি? মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে, সমাজে সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করতে গিয়ে তাকে বিভিন্ন চাহিদা পূরণ করতে হয়। এ সকল চাহিদা পূরণের মাধ্যমে মানুষ তার দৈহিক বৃদ্ধি ও বিকাশ, মানসিক শান্তি এবং সামাজিক জীবনের উৎকর্ষতা সাধন করে থাকে। এই অপরিহার্য চাহিদা পূরণের মাধ্যমে যে বিকাশ সাধিত হয় তাকেই আমরা মানবিক বিকাশ বলতে পারি। মানুষের বেঁচে থাকা, জীবনের বিকাশ এবং সভ্য সামাজিক জীবন যাপনের জন্য যে সকল উপকরণ একান্তই অপরিহার্য্য, যার কোন বিকল্প নেই তাদের সমষ্টিকে মৌল মানবিক চাহিদা বলা হয়। সমাজ বিজ্ঞানী ঞড়বিষ তার বিখ্যাত ইধংরপ ঐঁসধহ ঘববফং গ্রন্থে ছয়টি প্রয়োজনকে মৌল মানবিক প্রয়োজন বলে উলে­খ করেছেন। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সবকয়টি দেশে এ ছয়টি প্রয়োজন সাংবিধানিক ভাবে মৌল মানবিক প্রয়োজন বলে উলে­খ করেছেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সবকয়টি দেশে এ ছয়টি প্রয়োজন সাংবিধানিক ভাবে মৌল মানবিক প্রয়োজন হিসেবে স্বীকৃত। সেগুলো হচ্ছে (১) খাদ্য (Food) (২) বস্ত্র (Cloth) (৩) বাসস্থান (Shelter) (৪) শিক্ষা (Education) (৫) স্বাস্থ্য (Health) (৬) চিত্ত বিনোদন (Recreation) তন্মধ্যে যে সকল মানবিক প্রয়োজন মানুষকে অন্যান্য প্রসারের চেয়ে আলাদা সত্তা দান করেছে তার মধ্যে শিক্ষা হচ্ছে অন্যতম। শিক্ষা হচ্ছে মানুষের সকল বিষয়ে জ্ঞান লাভের প্রধান উপায়। শিক্ষার অভাবে অধিকাংশ জনগণ অজ্ঞ, নিরক্ষর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও রক্ষণশীল মনোভাবের হওয়ায় জনসংখ্যা স্ফীতি, স্বাস্থ্য ও পুষ্ঠিহীনতা, যৌতুক প্রথা, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। শিক্ষার অভাব ও অজ্ঞতা আমাদের দেশের জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনক্ষম জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করে না, সেজন্য মানবীয় চিন্তা ভাবনা ও আচরণ কল্যাণমুখী না হয়ে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ মানবীয় চিন্তা ভাবনাকে কল্যাণমুখী করার জন্য, চিন্তার সমৃদ্ধির জন্য, চরিত্র গঠন ও মানবিক বিকাশের জন্য শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।

জগদ্বিখ্যাত মনিষীদের বক্তব্য থেকে বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট হবে। আলোচনার সুবিধার্থে নিম্নে কিছু মনিষীর বক্তব্য উপস্থাপন করা হল। ফরাসী মনীষি মন্টেইন (গড়হঃধরহ) এর মতে শিক্ষার উদ্দেশ্য হল নৈতিক চরিত্র গঠন। তাঁর মতে নৈতিক চরিত্র গঠিত হলে মানুষ সমস্ত সদ্ব্যবহার করতে পারে এবং প্রয়োজনে সবকিছু ত্যাগও করতে পারে।

জন লক (ঔড়যহ খড়পশ) এর মতে শিক্ষার লক্ষ্য হল আদর্শ মানুষ তৈরি করা এবং এই আদর্শ মানবের চারটি গুণ হল নৈতিক উৎকর্ষ (ারৎঃঁব), বিজ্ঞতা (রিংফড়স), সামাজিক সদাচার (নৎববফরহম) এবং বিদ্যা (ষবধৎহরহম)। লকের মতে এ চারটি গুণের মধ্যে নৈতিক উৎকর্ষ হল সর্বপ্রধান। রুশোও (জড়ঁংংবধহ) শিক্ষার দ্বারা ব্যক্তির সর্বাঙ্গীন বিকাশ সাধনের মাধ্যমে সমাজের সর্বাঙ্গীন বিকাশ সাধন করতে চেয়েছিলেন। ফ্রোয়েবেল (চৎড়বনধষ) এর মতে শিক্ষার লক্ষ্য হল একটি সুষম পূর্ণ প্রস্ফুটিত ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করা, যার সমস্ত শক্তি সমাজের সেবায় নিযুক্ত হবে। হার্বাট (ঐবৎনধৎঃ) এর মতে নৈতিক চরিত্র গঠনই হল শিক্ষার চরম লক্ষ্য। তাঁর মতে সৎ চরিত্রের বৈশিষ্ট হল অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা (রহহবৎ ভৎববফড়স), কর্মদক্ষ (বভভরপরবহপু) বা পূর্ণ বিকাশ (ঢ়বৎভবপঃরড়হ), উদারতা (নবহবাড়ষবহপব) বা সৎ প্রকল্প (মড়ড়ফ রিষষ), বিচার বোধ (লঁংঃরপব) এবং ন্যায়বোধ (বয়ঁরঃু)। জন ডিউই (ঔড়যহ উববিু) এর মতে শিক্ষার লক্ষ্য হল সর্বাঙ্গীন ও অপ্রতিহত বৃদ্ধি সাধন করা। এই সর্বাঙ্গীন বৃদ্ধি ও বিকাশ সাধন বলতে বোঝায় মানব ব্যক্তিত্বের সামাজিক দিক, সৌন্দর্য্যানুভূতির দিক, বৌদ্ধিক দিক, কর্ম দক্ষতার দিক ও নৈতিক দিকের পূর্ণ বিকাশ সাধন। পার্শিনান (চবৎপু হঁসহ) এর মতে ব্যক্তির সৃজন ক্ষমতার বিকাশের মাধ্যমেই সমাজে নুতন বস্তুর আবির্ভাব হয়। তাই তিনি মনে করেন এ শিক্ষার লক্ষ্য হল ব্যক্তির ব্যক্তিতার পূর্ণ বিকাশ সাধন। হোয়াইট হেড (ডযরঃব ঐবধফ) এর মতে শিক্ষার চরম লক্ষ্য হল এমন সব ব্যক্তি সৃষ্টি করা যারা একই সঙ্গে সংস্কৃতিবান এবং কোন বিশেষ বিশেষ জ্ঞান সম্পন্ন হবে। সংস্কৃতিবান বলতে তিনি চিন্তার সক্রিয়তা, সৌন্দর্য ও মানবতা সুলভ অনুভূতির প্রতি অনুরক্তিকে বুঝিয়েছেন। স্বামী বিবেকানন্দের (ঝধিসর ঠরাবশধহধহফধ) এর মতে শিক্ষার লক্ষ্য হল মানুষের অন্তর্নিহিত পরমোৎকর্ষের বহিঃপ্রকাশ সাধন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে শিক্ষার চরম লক্ষ্য হল ‘মুক্তি’। এ মুক্তি ৩ (তিন) প্রকার। (ক) মনের মুক্তি (ভৎববফড়স ড়ভ সরহফ) (খ) হৃদয়ের মুক্তি (ভৎববফড়স ড়ভ যবধৎঃ ) (গ) সংকল্পের মুক্তি (ভৎববফড়স ড়ভ রিষষ)। প্লেটো বলেছেন মানুষ যে পূর্ণতা নিয়ে ধরাধামে আগমন করে তার যথাযথ বিকাশই শিক্ষা। সক্রেটিসের মতে শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সত্যের আবিস্কার ও মিথ্যার বিতাড়ন। উপরোক্ত দার্শনিক ও শিক্ষাবিদদের বক্তব্য থেকে এ কথা স্পষ্ট হয় যে শিক্ষা একটি সার্বজনীন প্রথা যার কার্যকারিতা আমৃত্যু অক্ষুন্ন থাকবে। একটি সুন্দর, পবিত্র, বিশ্বাসযোগ্য জীবন গড়ার জন্য, নৈতিক চরিত্রের উৎকর্ষ সাধনের জন্য মানব জ্ঞানের সামগ্রীক চর্চা ও অনুশীলনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ শক্তি ও মনুষ্যত্বে বিকশিত হওয়ার জন্য শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। ড. আহমদ শরীফ বলেছেন যা জানা যায় তাই জ্ঞান, যা জানতে হয় তাই বিদ্যা আর যা শেখা বা শেখানো হয় তাই শিক্ষা। এই শেখানো শব্দটির সাথে শিক্ষকের প্রসঙ্গটি স্বাভাবিকভাবে এসে যায়। শিক্ষকই শিক্ষার প্রধান প্রাণশক্তি। শিক্ষকের পেশাকে বলা হয় একটি সৃজনশীল পেশা। ছাত্রের দৃষ্টিতে সে শিক্ষকই ভালো শিক্ষক যিনি তাঁর পড়ানোর বিষয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ। শিক্ষকতার জন্য অবিচ্ছিন্নভাবে জ্ঞান চর্চা অপরিহার্য কিন্তু যে শিক্ষকের জ্ঞানের বুনিয়াদ দূর্বল, যিনি সর্বক্ষণ জীবন সংগ্রামে পর্যুদস্ত, যে শিক্ষককে বাড়ী বাড়ী গিয়ে ছাত্র পড়িয়ে অর্থ উপার্জন করে সংসার চালাতে হয়, তার পক্ষে সৃজনশীলতা প্রকাশ করার সুযোগ বা অবকাশ কোথায়। তাই শিক্ষকের অনাড়ম্বর জীবন ও মহৎ চিন্তার অনুকূল পারিবারিক আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। অবশ্য একজন ঐশ্বর্য্যবান শিক্ষকের আন্তরিক ঐশ্বর্য্য বাহ্যিক দরিদ্রতাকে ম্লান করে দিতে পারে। আর্থিক অনটন, ঐতিহ্যের অভাব, সুযোগের সীমাবদ্ধতা, ব্যক্তিগত অনাগ্রহ প্রভৃতি কারণে বহুশিক্ষকের জ্ঞানের পটভূমি আশানুরুপ বিস্তৃত নয়। অনেকের পেশাগত নীতি বোধও দৃঢ় নয়। বলা যায় এ সকল কারণে শিক্ষকের ভাবমূর্তি আজ নি®প্রভ। নি®প্রভ ভাবমূর্তি নিয়ে শিক্ষক কী শিক্ষার পরিবেশকে পর্যাপ্ত ভাবে প্রভাবিত করতে পারবেন? ছাত্রের চেতনা বোধকে উদ্ভূদ্ধ করতে পারবেন? জ্ঞান ও বিদ্যা অর্জনের প্রেরণা না থাকলে যেমন কাউকে তা দান করা যায় না তেমনি শিক্ষক প্রাত্যহিক কর্মসূচি অনুসরণ না করে কেবল তার কর্তব্যের দায় সমাধা করতে চাইলে শিক্ষার লক্ষ্যও অর্জিত হয় না মানও বজায় থাকেনা। আমাদের এ কথা ভুলে গেলে চলবেনা যে শিক্ষকের মানের চেয়ে শিক্ষার মান উঁচু হতে পারে না। সমাজের চোখে শিক্ষক হবেন সকল গুণের আধার। যে কোন শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিক উপাদান উলে­খযোগ্য স্থান দখল করে এবং তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আর শিক্ষকই হচ্ছেন অতি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক উপাদান। তাই শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষকের জীবন যাত্রার স্বীকৃতি মান থাকা চাই। আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি শিক্ষকদের মর্যাদা প্রয়োজন। তাদের বেতন কম, সেটাও সত্য। তা নিয়ে তারা আন্দোলন করেন। কিন্তু এ ধরনের আন্দোলন তারা করেন না তাদের শিশুরা সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, তাদের সুযোগ দিয়ে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। একজন শিক্ষকের প্রধান কাজ হল শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীন বিকাশ সাধন করা অর্থাৎ তাকে জ্ঞান দান করা, তাকে প্রয়োজনীয় নৈপূণ্য অর্জনে সহায়তা করা, তাকে সৎ আদর্শ দান করা, তার সৎ মনোভাব তৈরি করা, তার সংকল্পের (রিষষ) পুর্ণগঠন করা এবং চরিত্র গঠন করা। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ জন অ্যাডামস (ঝরৎ ঔড়যহ অফধসং) বলতেন যে, শিক্ষা প্রক্রিয়া হল দুই মেরু বিশিষ্ট প্রক্রিয়া এ দু’টি হল শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। তাঁর মতে শিক্ষাক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর উপর আপন চরিত্রের প্রভাব বিস্তার করে শিক্ষক তার আচরণিক পরিবর্তন সাধন করেন। অবশ্য এ পরিবর্তন সাধনের ব্যাপারে শিক্ষক জ্ঞানের বিভিন্ন রুপকে ব্যবহার করেন। শিক্ষাবিদ অ্যাডামসন (অফধসংড়হ) অ্যাডামসের মতের প্রতিবাদ করে বলেছিলেন যে, শিক্ষা হল তিন মেরু বিশিষ্ট প্রক্রিয়া আর এই তিন মেরু হল শিক্ষার্থী, পরিবেশ ও শিক্ষক। তাঁর মতে শিক্ষার মূল কথা হল শিক্ষার্থীকে তার পরিবেশের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক আনা এবং শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার সম্পর্ক হল শিক্ষার মৌলিক সম্পর্ক। অ্যাডামসের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রয়োগবাদীরাও একমত। শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজন একটি সপ্রাণ সজীব পরিবেশ, সম্পূর্ণতর মনুষ্যত্বে ও উন্নতর আনন্দে জেগে ওঠার পরিবেশ।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী বস্তুনিষ্ঠ দিক নির্দেশনা থাকতে হবে- যা শিক্ষার্থীদের মাঝে উন্মেষ ঘটাতে পারে আত্মপ্রত্যয়, নিয়মানুবর্তিতা, ঐতিহ্যের চেতনাবোধ, স্বাধীনতার মূল্যবোধ, আদর্শিক স্পৃহা, সৎ ও সুস্থ সাংস্কৃতিক উন্মেষ এবং বৈষয়িক বুদ্ধিবৃত্তির সাথে আত্মিক উৎসর্গ সাধনের প্রয়োগমুখিতা। দেশের জাতীয় অধ্যাপক প্রখ্যাত দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বলেছিলেন- “শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে যদি নৈতিক মানসম্পন্ন নাগরিক সৃষ্টি করা না যায় তাহলে শিক্ষা থেকে সুফল লাভ হবে না। শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তি বিশেষের চরিত্রে যদি কাঙ্খিত গুণাবলী প্রবিষ্ট করা না যায় তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ প্রমাণিত হবে। ব্যক্তি তথা প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে সত্যবাদিতা, সাধুতা, ন্যায়বোধ, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, কর্তব্যজ্ঞান, দেশ সেবা, মানবিকতার মত মহৎ গুণাবলীর সমাবেশ ঘটাতে হলে শিক্ষার্থীর মনে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ সৃষ্টির উপযোগী অন্যান্য শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটানো প্রয়োজন।

প্রস্তাবনা

১। শিক্ষানীতি একটি জাতির মানবীয়, নৈতিক, আত্মিক বৈষয়িক ও সামাজিক মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের বৃহত্তর জনগণের ধ্যানধারণা, দর্শন, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা উচিত। ২। জাতীয় উন্নয়নকে ত্বরান্বিতকরণ এবং শিক্ষাকে প্রকৃতার্থে স¤প্রসারিত ও গণমুখী করতে হলে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাকে ত্বরান্বিত করতে হবে। ৩। সম্রাট নেপোলিয়নের মতে শিক্ষিত জাতি গঠনে শিক্ষিত মায়ের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। শিশুর পড়ালেখার প্রাথমিক পরিবেশ গড়ে ওঠে পরিবারের মধ্যে মা’কে ঘিরে। তাই নারী সমাজকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। ৪। শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক ত্রুটি সমূহ চিহ্নিত করে এমন শিক্ষা নীতি চালু করা উচিত যাতে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি দেশপ্রেমবোধ ও মানুষের মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। ৫। শিক্ষার চারটি মূল উপকরণ হচ্ছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠ্যসূচী। এ উপকরণ যদি ভাল হয় শিক্ষাও ভালো হবে। উপকরণ যদি খারাপ হয় শিক্ষার মানও খারাপ হবে। তাই উপকরণ ভালো করার জন্য পরিকল্পনা, কমৃসূচী প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও ফলাফলের মধ্যেকার সামঞ্জস্যতা বিধান করতে হবে। ৬। অভিভাবকদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। অভিভাবকদের অনেকেই মনে করে থাকেন যে শ্রেষ্ঠ মানুষ মানেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথও একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ, নজরুল, জীবনানন্দ, জসিমউদ্দিনও শ্রেষ্ঠ মানুষ, এরিষ্টটল প্লেটোও একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ। শ্রেষ্ঠ মানুষ হতে হলে বড় মানুষের গুণাবলী ধারণ করতে হবে। এজন্য পারিবারিক পরিবেশ থেকেই ছেলে-মেয়েদের নৈতিক গুণ সম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হবে। ৭। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যাবার আগে একটা প্রাক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষায় পরিবার অথবা মা বাবা অথবা ওইটুকু দিয়ে একটা স্কুল প্রসেসিং এ আনতে হবে। এরপর ক্রমান্বয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে, প্রাতিষ্ঠানিকের পরে সামাজিক পর্যায়ে আসতে হবে। ৮। প্রতিটি স্কুলে লাইব্রেরী ও সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম থাকা প্রয়োজন। যাতে করে ছাত্ররা পাঠ্য বইয়ের বাইরের জ্ঞান অর্জন করতে পারে। ৯। একটি জাতীয় ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে হলে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা রাখতে হবে। তাই দেশের ঐতিহ্য আশ্রিত সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশের পরিকল্পনা গ্রহণ ও অপসংস্কৃতি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ১০। বিদ্যা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান এমন হওয়া উচিত- যেখানে একজন ছাত্রের আত্মিক ও মানসিক বিকাশ প্রকৃতির সহচর্যে পূর্ণতা পায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য প্রাণ সৃষ্টি করতে হবে, আনন্দলোক তৈরি করতে হবে।

:: মনওয়ার সাগর : কবি, গবেষক।

২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিশেষ আয়োজন-২'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj