সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বেপজার সাফল্যগাথা

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৬

** নাজমা বিন্তে আলমগীর **

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবরূপ প্রদানে দীর্ঘ দিন নিরলস ও নিবেদিত কর্মযজ্ঞের উজ্জ্বল উপাখ্যান হচ্ছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। বেপজার সাফল্যগাথা বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারে গর্বিত ও সম্মানিত করেছে। আধুনিক শিল্পাঞ্চলের অগ্রযাত্রায় বেপজা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে গতানুগতিক বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে এগিয়ে চলছে তার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে। সুরক্ষিত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, কর্মসংসংস্থান, শিল্পায়ন তরান্বিতকরণ এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইত্যাদির মাধ্যমে বেপজা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধশালীকরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা বাংলাদেশে ইপিজেডের পথিকৃত। বর্তমানে বেপজার অধিন ৮টি ইপিজেড চালু রয়েছে যার অধিকাংশই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদক্ষ নেতৃত্বে সরাসরি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত বেপজা দেশের একটি অন্যতম সফল সংস্থা।

দেশের শিল্প জগতে বহু প্রতিক‚লতার মাঝেও ইপিজেডের চিত্র উজ্জ্বলতর হচ্ছে; তাই স্বল্পতম উৎপাদন ব্যায়ে শান্তিপূর্ণ শিল্পবান্ধব কর্মপরিবেশের কারণে বিশ্ববাজারে বেপজা একটি ব্র্যান্ড। আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তাদের কাছে বাংলাদেশ ইপিজেড বিনিয়োগের সাফল্যভূমি বা স্বর্গরাজ্য হিসাবে স্বীকৃত।

বিগত সাত বছরে বেপজার সাফল্য

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিগত ৭ বছরে বেপজা অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। ২০০৯-১৫ এ বেপজা ২,২৩৮.৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে ১৪৭.৭৬% প্রবৃদ্ধি অর্জিত, ৩১,৭২৪.৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি নিয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮৭.৪৭% এবং ২,৩৩,১১৭জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি ১২৩.২৯% ও ১৬০টি শিল্প চালুকরণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৪.১৪%। উল্লেখ্য পূর্ববর্তী ৭ বছরে অর্থ্যাৎ ২০০২-২০০৮ সময়ে বিনিয়োগ এসেছিল ৯০৩.৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, রপ্তানি হয়েছিল ১১,০৩৫.৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, কর্মসংস্থান হয় ১,০৪,৩৯৭ জনের ও চালু শিল্প সংখ্যা ছিল ১১১টি।

কেপিআই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেপজার সম্মাননা

রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের মুখ্য কর্মসম্পাদনা সূচক (কেপিআই) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেপজার শতভাগ সাফল্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কর্তৃক বেপজাকে শ্রেষ্ঠ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব জনাব মোঃ আবুল কালাম আজাদ বেপজার সকল পর্যায়ের কর্মচারীবৃন্দকে এই প্রশংসনীয় সাফল্যের জন্য আন্তরিক অভিনন্দন জানান। ২৪ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মুহম্মদ হাবিবুর রহমান খান, এনডিসি, পিএসসি, কে এই স্বীকৃতি সন্মাননা স্মারকপত্র প্রদান করা হয়।

২০১৪-১৫ অর্থ বছরে বেপজার অর্জন

২০১৪-১৫ অর্থ বছরে বেপজায় বিনিয়োগ এসেছে ৪০৬.৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে রপ্তানিতে বেপজা অর্জন লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। ৫৭০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বেপজার অধীন ৮টি ইপিজেড হতে গত অর্থ বছরে রপ্তানি হয়েছে ৬১১৩.৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য। অর্থাৎ ইপিজেডসমূহ হতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪১৩.৪৯ মার্কিন ডলার বেশি রপ্তানি হয়েছে। এই সময় বেপজাধীন আটটি ইপিজেডে ৩১,০৮৪ জন বাংলাদেশী নাগরিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ক্রমপুঞ্জীভূত চিত্র

৫৬,৯৭৭ বর্গ মাইল অধ্যুষিত বাংলাদেশে মাত্র ৩.৭১ বর্গমাইল এলাকা সম্বলিত আটটি ইপিজেড জাতীয় রপ্তানি ও বিনিয়োগে প্রায় ২০ ভাগ অবদান রাখছে। বর্তমানে ইপিজেডর এই ক্ষুদ্র পরিসরে ৪৫৪টি শিল্পে ৪,৪৫,৭৮৬ জন দক্ষ শ্রমিক কর্মরত যার ৬৫ শতাংশ নারী। এ পর্যন্ত বেপজার নিয়ন্ত্রনাধীনে ইপিজেডসমূহে মোট বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, রপ্তানি ৫০.৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে হয়েছে । ইপিজেডে ৩৮টি দেশের বিনিয়োগকারিগণ বহুমুখী-বৈচিত্র্যময় ও বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড পণ্য তৈরি করছে। উৎপাদনশীল শ্রমগোষ্ঠী, বিচক্ষণ বিনিয়োগাকরী এবং বেপজার সুদক্ষ ব্যবস্থাপনার ঐকতান বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষকে দেশের অন্যতম সাফল্যময় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত করেছে।

ইপিজেডসমূহে শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ

বাংলাদেশের ইপিজেডসমূহের ভৌগলিক অবস্থান বিশ্ববাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধাজনক স্থানে রূপান্তর করেছে। ইপিজেডের বিনিয়োগের মূল আকর্ষণ হচ্ছে স্বল্প মজুরিতে উৎপাদনশীল ও সহজে প্রশিক্ষণযোগ্য প্রচুর শ্রমগোষ্ঠী। সকল ইউটিলিটি ও অবকাঠামোগত সুবিধাসহ পরিমিত খরচে শিল্প প্লট ও কারখানা ভবন ইপিজেডে সহজ লভ্য।

ইপিজেডে পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন পরিবেশবান্ধব সেবামূলক শিল্প প্রতিষ্ঠান তথা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, পানি পরিশোধনাগার, সৌর বিদ্যুৎ রয়েছে। সম্প্রতি ইপিজেডে লো-কার্বন গ্রিন জোন উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে বনায়নসহ সোলার প্যানেল, সোলার স্ট্রিট লাইট, বয়লার নিঃসরিত বাষ্প থেকে বিদ্যুতের ব্যবহার প্রবর্তন করা হয়েছে।

শ্রমিক কল্যাণে বেপজার কার্যক্রম

বেপজা কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও শ্রমিক কল্যাণে বদ্ধ পরিকর। সৌহার্দ্যপূর্ণ দলবদ্ধ কর্মসংস্থান ইপিজেডের কর্মপরিবেশের মূল চালিকা শক্তি। বেপজা কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইপিজেডের মোট কর্মসংস্থানে দুই-তৃতীয়াংশ নারী। এছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারী শ্রমিকদের জন্য ডরমেটরী নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছেন।

ইপিজেডস্থ শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে শ্রমিকদের বর্তমান কর্মপরিবেশ ও বেতন ভাতাদি উন্নততর হয়েছে। তাদের জীবন যাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি বিবেচনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত ৭ বছরে দুইবার অর্থাৎ ২০১০ ও ২০১৩ সালে ইপিজেডের শিল্প শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করেছেন। এর ফলে বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদি ৩২% – ৯৩% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইপিজেডসমূহে শ্রমিক ও কর্মচারীদের পড়া লেখা, ফ্রি মেডিকেল সার্ভিস, নিরাপত্তা, কল্যাণমূলক সুবিধা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কয়েকটি জোনে স্কুল-কলেজ, ডে-কেয়ার সেন্টার, মেডিকেল সেন্টার, ফায়ার স্টেশন, পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করেছে। উল্লেখ্য, কোম্পানি থেকে বিভিন্ন সময়ে শ্রমিকদের বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানো হচ্ছে, ফলে ইপিজেডে কর্মরত শ্রমিকরা আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছে।

সরকার ইপিজেডে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং কল্যাণের জন্য জাতীয় সংসদে ঞযব ঊচত ডড়ৎশবৎং ডবষভধৎব অংংড়পরধঃরড়হ ধহফ ওহফঁংঃৎরধষ জবষধঃরড়হং অপঃ, ২০১০ আইন পাস করেছে। এই আইন অনুযায়ী জুন, ২০১৫ পর্যন্ত দেশের ৮টি ইপিজেডসমূহের চালু শিল্পের মধ্যে শ্রমিক কল্যাণ সমিতি গঠনের যোগ্য ৪০৩টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৯৬ টির গণভোট সম্পন্ন হয়েছে এবং ২২০টি শিল্পে শ্রমিক কল্যাণ সমিতি গঠিত হয়েছে। ইপিজেডের শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত ও বিরোধ নিস্পত্তিতে মীমাংসাকারী ও সালিশকারী বিনামূল্যে পরামর্শ দিচ্ছে। এছাড়াও শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে লেবার ও অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। সম্প্রতি ইপিজেড শ্রম আইন ২০১৬ এর খসড়া মন্ত্রী পরিষদের সভায় অনুমোদিত হয়েছে।

প্রত্যেক ইপিজেডে শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা অর্থাৎ কমপ্লায়েন্স ৯৫% নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বেপজা শতভাগ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বেপজা নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতের লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ কাজে নিয়োজিত বেপজার নিবেদিত প্রাণ শিল্প-সম্পর্ক বিভাগের কর্মীবৃন্দ এবং দক্ষ সামাজিক ও পরিবেশ কাউন্সিলর কাম পরিদর্শকবৃন্দ। এছাড়াও বেপজার রয়েছে সুদক্ষ অগ্নি নির্বাপনকারী দল, যারা নিয়মিতভাবে অগ্নি নির্বাপন সচেতনতা পর্যবেক্ষণ ও মহড়ার আয়োজন করে। ইপিজেডের প্রকৌশল বিভাগ নিরাপদ কর্মক্ষেত্রে স্বার্থে জোরালোভাবে বিল্ডিং কোড অনুসরন করছে।

বেপজার স্বীকৃতি

দেশের শিল্পায়নে বিকাশের পাশাপাশি বিনিয়োগ উপযোগী পরিমণ্ডলসহ দ্রারিদ্র্য বিমোচন, বেকারত্ব হ্রাস, প্রযুক্তির ব্যবহার, শ্রমগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি, নারী ক্ষমতায়ন প্রভৃতি সূচকে উন্নয়নের ক্ষেত্রে বেপজা প্রত্যক্ষভাবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে। এ কারণেই বেপজা বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে-

*  IFC Regional ২৭টি দেশের মধ্যে IFC-CEO Gender Award Second Runner Up মর্যাদা লাভ; * FDI, The Financial Times, London জরিপে চট্টগ্রাম ইপিজেডের স্বীকৃতি; * Best Economic Potential 2010-11 Category ‡Z 4th Position; * ৭০০ ইকোনমিক জোনের মধ্যে Cost Effective Zone ‡Z 3rd Position; * FDI Global Free Zone of the Future 2012-13 Category 9th Position.

ইপিজেডসমূহে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে
যার মধ্যে রয়েছে- ক্যামেরা যন্ত্রাংশ, মডেল খেলনা, চশমা, লাগেজ, ফ্যাশন উইগ ও লেডিস ব্যাগ ইত্যাদি।

উপসংহার
দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বেপজা প্রসংশনীয় এবং অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রচলিত বিভিন্ন সৃজনশীল পদ্ধতি ও তা বাস্তবায়নে কর্মকর্তা/কর্মচারীদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষিতকরণে বেপজা সর্বদা তৎপর। বেপজা দেশি-বিদেশি উদ্যেক্তাদের বিনিয়োগে আহ্বান জানায়, কারণ বাধাহীন উৎপাদনমুখী শান্তিপূর্ণ কর্মপরিবেশ, শিল্প বান্ধব পরিমন্ডল, বিনিয়োগ অনুক‚ল আবহ ইপিজেডে বিদ্যমান। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ব্রতে নিয়োজিত বেপজা সাফল্যের চূড়ায় যেতে প্রত্যয়ী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নে বেপজা তার সাফল্যের ধারা বজায় রাখতে সংকল্পবদ্ধ।

২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিশেষ আয়োজন-২'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj