গোলটেবিল বৈঠক : জল ও জীবিকা

বুধবার, ৩০ মার্চ ২০১৬

গত ২৮ মার্চ, সোমবার ভোরের কাগজ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে ‘জল ও জীবিকা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ভোরের কাগজ, ওয়াটার এইড, প্রাকটিক্যাল অ্যাকশন, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ওয়াশ অ্যালায়েন্স, ওয়াটার সাপ্লাই এন্ড স্যানিটেশন কোলাবরেটিভ কাউন্সিল, ফ্রেশওয়াটার অ্যাকশন নেটওয়ার্ক-সাউথ এশিয়া বাংলাদেশ যৌথভাবে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্তের সঞ্চালনায় বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফর আহমেদ খান। অনুষ্ঠানে ঢাকা ওয়াসা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা ছাড়াও আয়োজক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা এবং স্থানীয় ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-পরিচালক ড. আনোয়ার জাহিদ।

গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেয়া আলোচকদের বক্তব্যের চুম্বক অংশ দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের বিশেষ ক্রোড়পত্র।

গোলটেবিল বৈঠকের আলোচকবৃন্দ

ড. জাফর আহমেদ খান
সচিব, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়

কামরুল আলম চৌধুরী
উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঢাকা ওয়াসা

খান মোহাম্মদ বিলাল
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন

ড. আনোয়ার জাহিদ
উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড

সুধীর কুমার ঘোষ
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর

হাসিন জাহান
কান্ট্রি ডিরেক্টর, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন

ইমাম মাহমুদ রিয়াদ
কান্ট্রি ডিরেক্টর, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন

শাহ মো. আনোয়ার কামাল
নির্বাহী পরিচালক, ইউএসটি

এস এম এ রশিদ
নির্বাহী পরিচালক, এনজিও ফোরাম

ড. নাসরিন খান
হেড, পলিসি এন্ড এডভোকেসি, ওয়াটার এইড বাংলাদেশ

অলক মজুমদার
কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর, বাংলাদেশ ওয়াশ অ্যালায়েন্স

ইয়াকুব হোসেন
ন্যাশনাল কনভেনার, এফএএনএসএ বিডি

সৈয়দ নূর-এ আলম সিদ্দিকী
প্রকল্প ব্যবস্থাপক, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন

মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান
সদস্য, ইডব্লিউপি

সঞ্চালক
শ্যামল দত্ত
সম্পাদক, ভোরের কাগজ

 

শ্যামল দত্ত
সম্পাদক, ভোরের কাগজ
বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে পানির অবদান অনস্বীকার্য। অসংখ্য মানুষের জীবন ও জীবিকা পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবসহ নানা কারণে বর্তমানে আমাদের দেশে পানি নিয়ে নানামুখী সংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে মানুষের জীবিকার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। জীবনে দুর্ভোগও বাড়ছে। তাই সমন্বিতভাবে এ ক্ষেত্রের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে তার সমাধান করে জল ও জীবিকাকে নিরাপদ করতে হবে।

 

ড. জাফর আহমেদ খান
সচিব, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়
স্বাধীনতার ৪৫ বছরে আমরা অনেক বিষয়ে এগিয়ে গেছি। কিন্তু পানি বিষয়ে আমরা সেভাবে অনেকটাই পিছিয়ে আছি। তাই এ বিষয়ে সমস্যাগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে সেগুলোকে বিশ্লেষণ করে সমাধানের পথ বের করতে হবে। পানি এবং স্যানিটেশনে এখনো আমাদের নানা সমস্যা রয়েছে। পানি ব্যবস্থাপনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। তাই এ বিষয়ে আরো কাজ করতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে পানি নিয়ে দুর্ভোগ বাড়বে। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন শীতলক্ষ্যা নদীতে সারা দিন সাঁতার কাটতাম। গোছল করতাম। কিন্তু কিছুদিন আগে ওই নদী দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। আমাদের শিল্প-কলকারখানগুলো ভয়ানকভাবে নদীর পানিকে দূষিত করে ফেলেছে। জুতা খুলে অনেক ভয়ে ভয়ে পানি লাগিয়েছি। কিছুক্ষণ পরে দেখছি পা চুলকাচ্ছে। দূষণের মাত্রা এতই ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বেশিরভাগ শিল্প-কারখানগুলো এখন ইটিপি ব্যবহার করছে না। আমি যখন পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিজি ছিলাম তখন অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়েছি। সবার আগে সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভেবেছি। কিন্তু সে সময় নানারকম বাধার সম্মুখীন হয়েছি। আমাদের দেশের বেশিরভাগ নদী আন্তর্জাতিক সীমানার মধ্যে পড়েছে। সেসব নদীর পানির সঠিক হিস্যাও আমরা ঠিকমতো পাচ্ছি না। তবে কেবল সমস্যাই যে রয়েছে তাও ঠিক নয়, অনেক অর্জনও রয়েছে। পানি নিয়ে আমাদের আইন হয়েছে। ডেল্টা প্ল্যান হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে অনেক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সমুদ্রভিত্তিক ব্লু ইকোনমি নিয়ে নানা পরিকল্পনা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা পানি নিয়ে অনেক কাজ করছে। সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে সমস্যার সমাধান দ্রুত হবে।

 

কামরুল আলম চৌধুরী
উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঢাকা ওয়াসা
এই সভায় এনজিও ফোরামের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি রয়েছে। তারা জানে যে কিভাবে ঢাকা ওয়াসা পানি সাপ্লাই করে। ঢাকা ওয়াসার ৭৮% পানি গ্রাউন্ড সোর্স থেকে দিচ্ছে। সায়দাবাদ ফেইজ-টু হওয়ার পরে আমরা ২২% পানি সারফেইস ওয়াটার থেকে দিচ্ছি। এই সারফেইস ওয়াটার থেকে পানি দিতে গিয়েও আমাদের আনেক যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে, যদিও ঢাকা সৌভাগ্যবান শহর ছিল তার চারপাশে ৪টা নদী ছিল কিন্তু এগুলোর দূষণের মাত্রা বেড়ে গেছে যার পানি ট্রিট করে দেয়া ঢাকা ওয়াসার পক্ষে দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। এই মৌসুমে নদীর পানিতে শ্যাওলা বেশি হয়, প্রবাহ কম থাকে এবং অ্যামোনিয়া যুক্ত হয়ে আরো শ্যাওলার পরিমাণ বৃদ্ধি হয়েছে। এগুলোকে ট্রিট করতে গিয়েই ঢাকা ওয়াসাকে অনেক কেমিক্যাল ব্যবহার করতে হচ্ছে যার কারণে মানুষ অনেক সময় বলে পানি থেকে ক্লোরিনের গন্ধ হচ্ছে। আর ক্লোরিন না দিয়েও পানিকে আমি দূষণমুক্ত করতে পারছি না। এই তিন মাস সারফেইস ওয়াটার দেয়া ঢাকা ওয়াসার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই ঢাকা ওয়াসা চিন্তা করেছে যে মেঘনা ও পদ্মা নদী থেকে পানি আনার জন্য। ইতোমধ্যেই আমরা একটি ওয়াটার মাস্টার প্ল্যান হাতে নিয়েছি, গ্রাউন্ড ওয়াটার থেকে সারফেইস ওয়াটারে সুইস ওভার করার জন্য তিনটি মেগা প্রজেক্ট ইতোমধ্যে হাতে নিয়েছি। একটি হলো পদ্মা জশোন্দিয়া, এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবল প্রজেক্ট এটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট হবে গন্ধবপুর (টেন্ডার হয়ে গেছে), রূপগঞ্জের দিকে ওয়াসার একটি জায়গা রয়েছে সেখানেও প্রজেক্ট রয়েছে।

 

ড. আনোয়ার জাহিদ
উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড
আজকে আমাদের আলোচনার প্রতিপাদ্য ওয়াটার এন্ড জবস। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে পানির ওপর নির্ভরশীল। তাই পানি নিয়ে সমস্যা হলে জীবিকারও সমস্যা হবে- এটাই স্বাভাবিক। আমার প্রেজেন্টেশনে বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করেছি। অর্থাৎ বাংলাদেশে পানি সংক্রান্ত কী কী সমস্যা রয়েছে এবং তার ফলে এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকায় কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে তা দেখার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশে বর্তমানে যত পানি ব্যবহৃত হয় তার ৭০ শতাংশই কৃষিকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইরি মৌসুমে ৮০ শতাংশ পানি ভূগর্ভ থেকে উত্তালন করা হয়। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ১৫ লাখ টিউবওয়েল রয়েছে যেগুলো প্রতিনিয়ত ভূগর্ভ থেকে পানি তুলছে। তাই ভূগর্ভস্থ পানি দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এটা বিপজ্জনক। অন্যদিকে কৃষিতে বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।

কৃষি পানি বিপণনে অনেক লোক জড়িত রয়েছে। অনেক নারীর জীবিকাও পানির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই পানি একদিকে যেমন জীবন ও জীবিকা অন্যদিকে সেটি দুশ্চিন্তারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীই আন্তর্জাতিক সীমানার মধ্যে। ফলে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমে আমাদের নদীগুলো বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। আবার শুকনো মৌসুমে নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে পানির অভাবে। এটা একটা বড় সমস্যা। এ নিয়ে আমাদের আরো কাজ করতে হবে। বর্তমানে ঢাকায় যত পানি ব্যবহৃত হচ্ছে তার ৭৮ শতাংশ ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে ঢাকার পানির স্তর দ্রুত নামছে। বরেন্দ্র এলাকার পানির স্তরও আশঙ্কাজনক হারে নেমে যাচ্ছে। দেশের ৬১টি জেলার ভূগর্ভস্থ পানিতে কম-বেশি আর্সেনিক রয়েছে। কোথাও কোথাও পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপক‚লীয় অঞ্চলে পানির নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সরকার এসব সমস্যা মোকাবেলায় নানা পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। তবে নানা কারণে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছি না। এখনো দেশের ১২ থেকে ১৬ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি পাচ্ছে না। তাদের পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রাউন্ড ওয়াটারের ব্যবহার কমাতে হবে। পানির অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আমাদের এনভায়রনমেন্ট কনজারভেশন এ্যাক্ট-১৯৯৫ আছে যেটা কিছুদিন আগে রিভিউ হয়েছে। ওখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে প্রত্যেকটি ইন্ডাস্ট্রির ইটিপি থাকতে হবে। আমাদের ব্যবস্থাগুলো আছে কিন্তু আমরা পালন করি না বলে আমাদের সমস্যাগুলো হচ্ছে। আমরা সরকারি অফিসে কাজ করেও কোঅর্ডিনেশনের অভাব অনুভব করি। বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় কোঅর্ডিনেশনের অভাবটা দেখা যাচ্ছে।

 

ড. নাসরিন খান
হেড, পলিসি এন্ড এডভোকেসি, ওয়াটার এইড বাংলাদেশ
গত ৫ বছরেও আইলা দুর্গত এলাকায় পানির গুণগত মানের উন্নয়ন হয়নি। এসব এলাকা থেকে অসংখ্য মানুষ বাধ্য হয়ে শহরে চলে এসে ভাসমান জীবনযাপন করছে। ঢাকার আশপাশের সব জলাধার দূষিত হয়ে পড়েছে। জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো নির্বিচারে পানি ব্যবহার করছে। পানি দূষিত করছে। ইটিপি ব্যবহার করছে না। বায়ার ও ডোনাররা এসব বিষয়ে কনসার্ন। তারা এটা নিয়ে প্রশ্ন তুললে গার্মেন্ট শিল্প ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এসব নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। এসব সমস্যার সমাধান সরকার একা করতে পারবে না। এজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

 

খান মোহাম্মদ বিলাল
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন
গৃহস্থালি ও বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য পড়ে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দূষিত হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশন প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে বর্জ্য অপসারণ করলেও তা যথেষ্ট নয়। আমরা প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করছি। তবে সব বর্জ্য অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে নদীর দূষণ কমাতে আমরা বেশ কিছু নতুন পরিকল্পনা হতে নিয়েছি। দুটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন তৈরি করা হচ্ছে। দখলকৃত নদীর জায়গা উদ্ধার করা হচ্ছে। এছাড়া নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। ওয়াসার সঙ্গে আলোচনা করে হাজারীবাগ ট্যানারি এলাকায় ইটিপি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সিটি কর্পোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেটরাও কাজ করছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে সিটি কর্পোরেশন নদী দূষণ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

 

ইমাম মাহমুদ রিয়াদ
কান্ট্রি ডিরেক্টর, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন
ওয়াটার একটি বড় সেক্টর। এখানে অনেক কিছুই করা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা ছোট্ট একটি অংশ নিয়ে কাজ করি। কিন্তু সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হচ্ছে ওয়াটার সাপ্লাই। আমরা তৃণমূলে ওয়াটার সাপ্লাইয়ের কাজটা করি। এখানে চ্যালেঞ্জ অনেক। সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব না। তৃণমূলে কাজ করতে গিয়ে আমাদের অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমরা দেখেছি যে, ওয়াটার সাপ্লাইয়ের ক্ষেত্রে উপর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কমান্ড মেকানিজমের অভাব দেখা গেছে। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের জন্য। ওয়াটার সাপ্লাইয়ের ক্ষেত্রে আমরা এখন টিউবওয়েল নির্ভর। কিন্তু এটা কোনো সলিউশন না। এটা কাজ চালানোর মতো একটা সলিউশন। টিউবওয়েলে অনেক মহিলার দিনব্যাপী পরিশ্রম হয়। এখানে অনেক শিশুশ্রমের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এসব আমাদের খারাপ লাগে। এর বিকল্প হচ্ছে বাড়ি বাড়ি পাইপ ওয়াটার সাপ্লাই দেয়া।

এতে নারী ও শিশুর শ্রমটা বেঁচে যাবে। আরো অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু এ টাকা কোথা থেকে আসবে। সরকারের এত টাকা নেই। তাহলে টাকা আসবে প্রাইভেট খাত থেকে। কিন্তু ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান এখানে ফাইন্যান্স করতে চায় না। এটার কোনো ভালো মেকানিজমও নেই। তাই তৃণমূল পর্যায়ে ওয়াটার সাপ্লাই একটা চ্যালেঞ্জ। কোয়ালিটি কোয়ান্টিন্টির মতো অবকাঠামোগত অনেক চ্যালেঞ্জও আছে। অপ্রাইভেট খাত বিভিন্ন যোগাযোগ কাঠামো নির্মাণে অনেক ব্যয় করে। কিন্তু ওয়াটার ইনফ্রাক্টার উন্নয়নে কোনো ব্যয় করে না প্রাইভেট খাত।

রাষ্ট্রের পরিকল্পনা পদ্ধতিতেও এ বিষয়টি সেভাবে আসে না। পানিভিত্তিক জীবন-জীবিকাতে এডুকেশনাল স্কিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ওয়াটার ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে আমাদের এডুকেশন সিস্টেম নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। গ্রামে প্রচুর টিউবওয়েল দেয়া হয়েছে। দেখা গেছে, অনেক টিউবওয়েল অনেকের বাড়ির ঘেরের মধ্যে পড়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে কতবার ইনভেস্ট করা যাবে। ওয়াটার রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের জায়গাটা আরো শক্তিশালী করা দরকার।

 

সুধীর কুমার ঘোষ
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর
আমরা সাধারণত সুপেয় পানির বিষয়টাই দেখভাল করে থাকি। বর্তমানে আমাদের ৮৭% সেফ ওয়াটার কাভারেজ আছে। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী যদি সেফ ওয়াটার কভারেজ ১০০% করতে চাই তাহলে আমাদের চ্যালেঞ্জগুলোকে সমানে নিয়ে এগুতে হবে। চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে আমাদের আর্সেনিক দূষণটা নিরসন করা, আমাদের পানির স্তর যে নিচে নেমে গেছে তা আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা, লবণাক্ত এলাকায় প্রযুক্তি ব্যবহার করা ইত্যাদি। সারফেইস ওয়াটার ক্রমান্বয়ের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে এবং তার কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। ১৪৩টি পুকুর পুনর্খনন করা হবে, ২০০টি পুকুর নতুন করে করা হবে। এই প্রজেক্টটি এখন একনেকের অপেক্ষায় আছে।

 

হাসিন জাহান
কান্ট্রি ডিরেক্টর, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন
উপক‚লীয় অঞ্চলে পানির লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সেখানকার পুরুষরা শহরমুখী হচ্ছে। কিন্তু নারীরা ওই এলাকাতেই থেকে যাচ্ছে। ফলে তারা নানারকম আর্থ-সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। নারীরা তাদের কাজের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। পুরুষরা সারা দিনে কাজ করে যেখানে ৩৫০-৪০০ টাকা পায় সেখানে নারীরা পাচ্ছে তার অর্ধেক। এ বিষয়টিতেও সবাইকে দৃষ্টি দিতে হবে।

 

শাহ মো. আনোয়ার কামাল
নির্বাহী পরিচালক, ইউএসটি
বাংলাদেশের পলিসি নিয়ে ডুপ্লিকেশন, কন্সালটেশন এবং এর যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে এ বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। কারণ আমি ভাগ্যক্রমে ওয়ার্কোতে ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানিংয়ে একজন কন্সালট্যান্ট ছিলাম। ওয়ার্কোর মাস্টার প্ল্যানিং যখন করা হয়োছিল তখন আমার বরিশাল অঞ্চলে দায়িত্ব ছিল। ওই এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ এক মহিলা বলেছিলেন, আজকে কোস্টালে যে সমস্যাটা, এই সমস্যাটা হতো না যদি আমাদের ডোবাগুলোকে এভাবে ভর্তি করে না দেয়া হতো। আমতলি-বরগুনা দিয়ে যে পানিটা আসে বেড়িবাঁধগুলো শক্ত করে দেয়ার জন্য। ডোবাগুলো থাকলে বরিশাল অঞ্চলে সারফেস ওয়াটারে ডিফল্ট দেখা দিত না। ওই বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটি বলেছিলেন, আমাদের জমির মধ্য দিয়ে যত ডোবা ছিল আমরা ইচ্ছা করলেই সেখান থেকে পানি নিতে পারতাম। তার মানে আমাদের ঐতিহ্য জ্ঞানকে ইগনোর করে আমাদের প্ল্যানিংগুলো করছি। ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট পলিসিকে কোটি কোটি টাকা দিয়ে প্ল্যান্ট করা হলো তা এ যাবৎকাল পর্যন্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এরপর ওয়াটার এ্যাক্ট পলিসি নতুন করে করা হলো, আমাদের অনুরোধ বিষয়গুলোকে রিভিউ করা। এই প্ল্যানগুলোকে বাস্তবায়ন না করেই আমরা এগুচ্ছি ডেল্টা প্ল্যানের দিকে। আমরা জানি না যে ডেল্টা প্ল্যানে আমরা কি করতে যাচ্ছি? বাংলাদেশের এক্সপার্টদের কমিউনিটি গ্যাপের সমস্যা রয়েছে। টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা পর্যন্ত যত ওয়াটার বেসিন এরিয়া ছিল সব ভর্তি করে ফেলছে বড় বড় শিল্পপতিরা। তার মানে ওয়াটার রিজার্ভ আর আমাদের থাকছে না, কৃষি খাত আমাদের দেশে রিস্ক হয়ে যাচ্ছে। এক্সপার্টদের নলেজ এবং তৃণমূল মানুষদের মতামতের সমন্বয় জরুরি। আমরা কোনো প্রকল্প নিয়ে আর অপচয় চাচ্ছি না।

 

ইয়াকুব হোসেন
ন্যাশনাল কনভেনার, এফএএনএসএ বিডি
এমডিজিতে বলা আছে, সবার কাছে সুপেয় পানি পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু আমরা এটা শর্টকাটে করতে চাচ্ছি। ঢাকায় পানি সরবরাহ করতে গিয়ে আমরা অন্য এলাকাকে বিপদে ফেলছি। ঢাকার আশপাশের চারটি নদীকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছি। অথচ বুড়িগঙ্গার পানির ফ্লো বাড়াতে পারলে এ নদী আবারও জীবন ফিরে পাবে। পদ্মা, মেঘনা থেকে পানি এনে ঢাকায় সরবরাহ করা হলে ওইসব এলাকার পানির স্তর নিচে নেমে যাবে। এতে ওইসব এলাকার মানুষ বিপদে পড়বে। তাই কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক মেগা প্রজেক্ট করলে চলবে না। অন্য এলাকার পানি ও জীবিকার কথাও ভাবতে হবে। বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার আশপাশের নদীগুলোকে আবার আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে সব ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান
সদস্য, ইডব্লিউপি
সমস্যা চিহ্নিত এবং সমাধান কিভাবে করা যায় আমাদের সেদিকে এগুতে হবে। পনি এবং স্যানিটেশন বিষয়ে মিডিয়াই পারে সচেতন করতে ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে। বাজেটের ক্ষেত্রে বিগত ৫ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে এমডিজি লক্ষ্যমাত্রার ৫ ভাগের ১ ভাগ ব্যবহৃত হয়েছিল পানি এবং স্যানিটেশনের ক্ষেত্রে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে ৯৮% ওয়াটার কভারেজ আমাদের আছে কিন্তু তার থেকে ২০ শতাংশ হলো আর্সেনিক সমস্যায় জর্জরিত। ৭৮% জনগণ সুপেয় পানি পাচ্ছেন এবং বাকিরা পাচ্ছেন না।

 

অলক মজুমদার
কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর, বাংলাদেশ ওয়াশ অ্যালায়েন্স
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে সারা বিশ্বের সবাই সাসটেইনেবল গোল এডাপ্ট করেছি। সাসটেইনেবল গোলটা হচ্ছে সবার কাছে সুপেয় পানি পৌঁছে দেয়া। ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা সবাইকে সমানভাবে ওয়াটার সার্ভিস দিতে পারব। কিন্তু কথা হচ্ছে, সরকার এবং এনজিও একসঙ্গে যে সার্ভে করেছে তাতে দেখা গেছে সুপেয় পানি ৭৫% ধনী মানুষের কাছে গিয়েছে এবং ২৫% গরিব মানুষের কাছে গিয়েছে। রাজধানীতে ধনীরা যে দামে পানি পাচ্ছে এরচেয়ে বেশি দামে গরিবদের কিনতে হচ্ছে। যেখানে একজন দিনমজুর ১ হাজার লিটার পানি কিনছে ১০০ টাকা দিয়ে সেখানে একজন ধনী মানুষ তা কিনছেন ৭/৮ টাকা দিয়ে। ইকুইটেবল সার্ভিস দিতে না পারলে সাসটেইনেবল গোল পূরণ করা সম্ভব নয়।

 

সৈয়দ নূর-এ আলম সিদ্দিকী
প্রকল্প ব্যবস্থাপক, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন
পানি নিয়ে আলোচনা কেবল দিবসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পানি ব্যবহারে কোনো সচেতনতা নেই। অপচয় বন্ধ হচ্ছে না। বর্তমানে আমাদের দেশে কৃষিক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পানি অপচয় হয়। এ অপচয় বন্ধ করতে পারলে প্রতি বোরো মৌসুমে এক হাজার কোটি টাকার ডিজেল সাশ্রয় করা সম্ভব। এ জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার।

 

এস এম এ রশিদ
নির্বাহী পরিচালক, এনজিও ফোরাম
আমরা যে মূল ওয়ার্কিং ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করছি তা হলো- যারা দারিদ্র্যপীড়িত, সুবিধাবঞ্চিত সেই ধরনের জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানীয় জল, মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা এবং স্বাস্থ্য পরিচর্যার বিষয়টি নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে আমরা দীর্ঘ ৩ দশক ধরে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা এ পর্যন্ত ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে সুপেয় পানি এবং মৌলিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা দিতে পেরেছি। পানিসম্পদ এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার যে গুরত্ব তা বোঝাতেই সেই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে সংকটগুলোকে এবং সম্ভাবনাগুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ করেই কিন্তু জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৮১ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পানীয়জল এবং স্যানিটেশন দশক বলে ঘোষণা করে এবং ১০ বছর অন্তর দশক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আমরা বর্তমান যে দশকটিতে আছি তার প্রতিপাদ্য বিষয় হলো পানি ও জীবন। খাদ্য সমস্যা সমাধানসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই পনি অপরিহার্য। আমাদের যতটুকু পানিসম্পদ রয়েছে ততটুকুর সদ্ব্যবহার করা জরুরি। ড. আনোয়ার জাহিদের প্রেজেন্টেশন থেকে লক্ষ করেছি বাংলাদেশ ছোট একটি দেশ কিন্তু এ দেশের মধ্যে ভূপ্রাকৃতিক যে বৈশিষ্ট্য সেটা যথেষ্ট বৈচিত্র্যময়।

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj