‘আমি শেখ মুজিব শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাঙালির স্বাধীনতা চেয়েছি’

শনিবার, ২৬ মার্চ ২০১৬

** অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী **

বাংলাদেশে প্রতিটি ঘটনা বা রটনা হচ্ছে এক একটি ছোট গল্প যা শেষ হয়েও শেষ হয় না। এ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা হয়, টানাহেঁচড়া হয়, লাঠালাঠি-ফাটাফাটি পর্যন্ত হয়। গায়ের জোরে ইতিহাস বদলে ফেলা হয় আবার তারই পুনর্নির্মাণ হয়। এমনি একটি ঘটনা হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা।

এখন নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বঙ্গবন্ধুই ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এ নিয়ে বিতর্কে হাজার হাজার নয়, লাখ লাখ কথন ঘণ্টা ব্যয়িত হয়েছে, লাখ লাখ পৃষ্ঠা লিখে কাগজ ভরে দেয়া হয়েছে, ইন্টারনেটের বদৌলতে কাগজের সাশ্রয় হলেও বিতর্কের অবসান হয়নি বা হচ্ছে বলে মনে হয় না। এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়া বাঞ্ছনীয় হলেও কেউ কেউ এমনি কথা বলছেন যা হয়তো আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কিন্তু বিতর্ক অবসানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে স্বাধীনতার প্রসঙ্গ নিয়ে বহুদিন কেউ কোনো কথা বলেননি, এমনকি ১৯৭৫ সালের বিয়োগান্তক ঘটনার পর থেকে খালেদা জিয়ার ক্ষমতারোহণের পূর্ব পর্যন্ত তেমন তেজোদীপ্ততা অর্জন করেনি। পরবর্তী ধাপে অবস্থা এমন বেগতিক অবস্থায় পৌঁছল যে সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রয়োজন হলো। তারপরও রায় উপেক্ষা করে অনেকেই ঘোষক বিতর্কে অবতীর্ণ হলেন। বঙ্গবন্ধু যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি সে কথাও কিছু মানুষ নির্দ্বিধায় অস্বীকার করলেন। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য অভিধা নিয়ে প্রশ্নবাণ ছোড়া শুরু হলো। এই সেদিনও তারেক রহমান তাকে নিয়ে কট‚ক্তি নয় পরিকল্পিত ইতিহাস বিকৃতি ও চরিত্র হননের মতো কাজ শুরু করে দিলেন। সঙ্গে যুক্ত হলো শারমিন আহমদের অনেকটা অবিবেচক উক্তি।

শারমিন আহমদ তার বাবা তাজউদ্দিন আহমদকে উদ্ধৃত করে প্রমাণ করতে চাইলেন যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি; এমনকি তাজউদ্দিন আহমদের পীড়াপীড়ি ও রাগারাগিও তাকে তার অনড় অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ তাজউদ্দিন নিজেই রাস্তায় নেমে পড়লেন, ব্যারিস্টার আমিরুল ও ড. কামাল হোসেনকে নাকি তার উষ্মার কথা জানালেন। এহেন উক্তির ক্রেতা বা গ্রহীতা একেবারে কম ছিল না বলা যায়। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে কেউ কেউ একথা তুড়ি মেরে উড়িয়ে না দিয়ে সংশয় নিয়ে তার বিশ্লেষণ শুরু করলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও এমন মোক্ষম সুযোগ হেলায় ফেলে দিতে চাইলেন না। এক জনসভায় তিনি বলে বসলেন যে, তাজউদ্দিন কন্যা শারমিন আহমদও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার কোনো ঘোষণা দেননি।

আগেই বলেছি, শারমিন আহমদও অসমর্থিত সূত্র উল্লেখ করে তার বইয়ের প্রথমাংশে লিখেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধুর নামে যে ঘোষণার কথা বলা হয়ে থাকে তা তাজউদ্দিন আহমদ প্রণীত ঘোষণার অনুরূপ যা তিনি বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে করাতে চেয়েছিলেন। শারমিন আরো বললেন যে, তাজউদ্দিন আহমদ প্রণীত ঘোষণাটি পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর নামে বেতারে পঠিত হয়েছিল। তবে এখন প্রমাণিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্বলিখিত স্বাধীনতার ঘোষণাটি স্বকণ্ঠে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই ঘোষণা আকারে প্রকাশ করেছিলেন।

শারমিনের লেখা নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন। আমার মনে পড়েছে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সোহরাব হাসান ও অধ্যাপক মইনুল ইসলামের কথা। আমিও প্রতিবাদীদের কাতারে দাঁড়িয়েছিলাম। শারমিনকে উদ্ধৃত করে খালেদা জিয়ার বক্তব্য বরং ‘শাপে বর’ হয়ে আবির্ভূত হলো। শারমিন নিজেই এবারে মঞ্চে আবির্ভূত হলেন। তিনি নিজেই তথ্য-প্রমাণ, যুক্তি ও বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে এ কথা তুলে ধরলেন যে তার বইয়ের প্রথমাংশে যে কথা বলা হয়েছে, শেষাংশে পরিবেশিত তথ্য-উপাত্ত প্রমাণ করে যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা নিজেই দিয়েছিলেন। তবে তিনি প্রশ্ন রাখেন যে যদি তিনি ঘোষণা দিয়েই থাকেন তাহলে তাজউদ্দিনের মতো বিশ্বস্ত সহচরের কাছে সে কথা বলেননি কেন? তাজউদ্দিনকে না বলেও যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারেন, তা আমরা কি উড়িয়ে দিতে পারি? হতে পারে বঙ্গবন্ধু মোক্ষম সময়টার অপেক্ষা ছিলেন এবং ঘোষণাটি যখন দেন তখন তাজউদ্দিন তার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করেছিলেন। হয়তো বলছি কেন, ইতিহাস তো সে কথাই প্রমাণ করে। ইতিহাস সে কথাও প্রমাণ করে যে, তার প্রেরিত ঘোষণাটি অন্য কেউ পাঠের আগেই তা পৃথিবীর গণমাধ্যমে চলে গিয়েছিল।

এত সবের পরও বিরুদ্ধ রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবীদের তৃপ্তি হয়নি। বুদ্ধিজীবীরা আদালত অবমাননার চিন্তায় ক্ষণিকে মিইয়ে গেলেও রাজনীতিকরা কোর্টের সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা করেই গেলেন। তারা তাদের কল্পিত ঘোষকের কথা এখনো সুযোগ পেলেই বলে যাচ্ছেন। এরই প্রেক্ষাপটে আইনি বিধান জরুরি হয়ে পড়েছে। আজকে (২৩/০৩/২০১৬) আমার লেখাটা যখন শেষ করতে যাচ্ছি তখন সে আইনি উদ্যোগের অংশবিশেষ ছাপার হরফে দেখলাম। কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখলাম যে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করলে পাঁচ বছরের জেল ও সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রেখে একটি আইন প্রণীত হতে যাচ্ছে। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনে বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রচারিত বা প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংক্রান্ত দলিলসমূহ এবং ওই সময়ের যে কোনো ধরনের প্রকাশনার অপব্যাখ্যা বা অবমূল্যায়ন করা হলে পাঁচ বছরের দণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে।’ যুদ্ধাপরাধীর বিচারও প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না।

এটি একটি প্রশংসনীয় ও স্বাগত পদক্ষেপ। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যাবে যে, এই আইন প্রণীত হলেই কি সব বিতর্কের অবসান হবে?

এই সময়ের ঘটনাপঞ্জি নিয়ে অসংখ্য দলিলপত্র রয়েছে, তার সব কটিকে গ্রহণ করলে ইতিহাস বিকৃতি প্রারম্ভেই থেকে যাবে। উদাহরণস্বরূপ স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের কথা বলা যায়। এই শিরোনামটি প্রশ্নবোধক ও অসাংবিধানিক। বাংলা ভাষায় স্বাধীনতা ও মুক্তি শব্দদ্বয় সমার্থক হলেও বাংলাদেশের বিশেষ ইতিহাস ও প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা ও মুক্তি একার্থক নয়, দ্ব্যর্থক ও বিশেষ অর্থবহ। আমাদের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ ও আর বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর, দুটো পালনই সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক। সংবিধান অনুযায়ী ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস যার ঘোষণা বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন। তাই তার আগে তথাকথিত ঘোষক দাবিদারদের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র থেকে হটিয়ে না দিলে প্রশ্নটি বিতর্কিতই থেকে যাবে। প্রকৃত প্রস্তাবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ২৩ বছরব্যাপী নিরন্তর স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল; ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালের ঘোষণার প্রেক্ষিতে আমাদের স্বাধীনতা এসে যেত যদি না হানাদার পাকিস্তান বাহিনী আমাদের বুকে চেপে বসে না থাকত। ২৬ মার্চ থেকে তাদের পরাস্ত, বিতাড়ন ও উচ্ছেদের জন্য আমাদের সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করতে হলো। ৯ মাসব্যাপী এই যুদ্ধটা হলো মুক্তিযুদ্ধ, সুস্পষ্টভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্ব। এই যুদ্ধের ১ম পর্বের বিজয় হিসেবে আমরা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস হিসেবে পালন করি। স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র শিরোনামটি তাই অগ্রহণযোগ্য শিরোনাম ও মতলববাজিতায় আকর্ণ নিমজ্জিত। অতএব, এইসব প্রকাশনার শিরোনাম হতে হবে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিলপত্র’। এসব দলিলপত্র থেকে অন্য দাবিদারদের হটিয়ে দিতে হবে, সর্বাধিনায়ক বিতর্কের অবসান ঘটাতে হবে এবং এসবের মধ্যে বঙ্গবন্ধু যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি তা সন্নিবেশ করতে হবে। আইনি বিধানে সময়টা যদি ১ মার্চ ১৯৭১ সাল থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেঁধে দেয়া হয় তাহলে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা বলা গেলেও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বলা যাবে না। যাক, ওইসব হচ্ছে সবেমাত্র হিমবাহের শীর্ষদেশ। এমনি আরো বহু প্রসঙ্গের চূড়ান্ত সমাধানের পরই আইনটিকে চূড়ান্ত করা বাঞ্ছনীয় হবে।

তারপরও প্রশ্ন থাকবে আইনি বিধান কি সব সমস্যার সমাধান আনবে? সব বিতর্কের অবসান ঘটাবে? আমার ধারণা তা করবে না। অতিসম্প্রতি একটি কথা উচ্চারিত হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আসন ছেড়ে দিলে তিনি কি স্বাধীনতার স্বপ্ন ও সংগ্রাম বিসর্জন দিতেন? প্রশ্ন আসছে উত্থাপিত আইন দিয়ে প্রশ্নকারীকে নিবৃত্ত করা যাবে কি? এর জবাব কঠিন। আমার কাছে তিনটি পথ খোলা আছে। এক. প্ল্যানচেট করে বঙ্গবন্ধুর আত্মাকে এনে জানতে হবে তিনি কী চেয়েছিলেন। দুই. পরকালের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সেখানে গিয়েই তাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। তিন. তাকে স্বপ্নে জিজ্ঞেস করতে হবে। আমার সঙ্গে তার বেশ কয়েকবার স্বপ্নে দেখা হয়েছে। সে সব কথা ভুলে যাওয়ার আগে ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলাম। আবার ১৯৯৬ সালের মার্চ কি এপ্রিলে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল; তেমন কোনো কথা হলো না, তবে বঙ্গবন্ধুকে হাস্যোজ্জ্বল দেখলাম। আমি সে কথা সেলিমকে (শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি) বললাম। সেও আমি স্বপ্নের এরকম ব্যাখ্যা করলাম যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। সেটা সঠিক হয়েছে কি? আর একবার দেখলাম তিনি অতি বিমর্ষ, আমাকে দেখে না দেখার মতো করে তাকিয়ে আছেন। মনে হলো আমার প্রতি কোনো কারণে বিক্ষুব্ধ। জবাবটা খুঁজে পেয়েছিলাম পরে। আর একবার দেখলাম দোয়েল চত্বর হয়ে দুজনে এক রিকশা করে মেডিকেলের দিকে যাচ্ছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠটির কাছে এসে তিনি বললেন, ‘মাঠটিকে তো আগে এমন দেখিনি?’ এক পর্যায়ে আমাকে বললেন, ‘নেমে পড়, তোমাকে সাভারে স্মৃতিসৌধে যেতে হবে’। আমি ধড়পড় করে জেগে দেখলাম স্মৃতিসৌধে যাওয়ার সময় প্রায় যাই যাই করছে।

তবে যেখানেই তাকে পাই না কেন, কিছু মানুষের প্রশ্নের জবাব তার কাছ থেকে চেয়ে নেব। জবাবটা অবশ্য আমার জানা আর তা হলো- ‘আমি শেখ মুজিব শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাঙালির স্বাধীনতা চেয়েছি’।

:: লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ।

স্বাধীনতা দিবস : বিশেষ সংখ্যা ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj