স্বাধীনতা দিবস এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

শনিবার, ২৬ মার্চ ২০১৬

** প্রফেসর মো. শাদাত উল্লা **

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই কাল রাতটা মনে হলে আজো শিহরিত হই। সে সময় আমি বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট বর্তমান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। থাকতাম সিরাজ-উদ-দৌলা হলের ৪নং কক্ষে। ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৭০-৭১-এ তৎকালীন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আওতায় সব আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলাম। ২৫ মার্চ রাতে আমি হলে ছিলাম। রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে গুলির প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। চারপাশ থেকে মানুষের চিৎকার ভেসে আসে। হলের টিনশেডের ওপর দিয়ে একের পর এক গুলি উড়ে যাচ্ছিল। আমার রুমমেট রেজাউল আহমেদ (ননা) ঘুম থেকে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। আমি তাকে বললাম- ‘চুপ থাক’। এরপর দু’জনেই ভয়ে খাটের নিচে আশ্রয় নিলাম। রেডিও, টেলিফোন সব বন্ধ। রাতটা এভাবেই কাটল। পরদিন প্রায় সারাদিন কারফিউ। রাস্তাঘাটে থমথম অবস্থা। ২৬ মার্চ ভোরে রেজাউলের বাসা মনিপুরিপাড়া গিয়ে উঠলাম। কারফিউ থাকা সত্ত্বেও গণহত্যার সেই দৃশ্য দেখার জন্য ছাত্র-জনতার সঙ্গে আমি রেজাউলকে সঙ্গে নিয়ে ফার্মগেট চলে আসি। রাস্তায় বের হয়ে এলে পাকিস্তানি সেনারা ঘোষণা দেয় যে, ঢাকায় কারফিউ বলবৎ রয়েছে। কেউ রাস্তায় বের হলে দেখামাত্র গুলি করা হবে। পাকিস্তানি সেনাদের এ ঘোষণার পর আমরা সরে পড়লাম। সেদিন সারা শহরে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে পাক বাহিনী। রিকশাওয়ালা, ভিখারি, শিশু, ফুটপাতবাসী কেউই তাদের ভয়াল থাবা থেকে রেহাই পায়নি। রাতারাতি ঢাকা পরিণত হলো মৃত মানুষের শহরে। পরদিন সকালবেলা বাড়ির উদ্দেশে রওনা হই। কোথাও কোনো যানবাহন পাইনি। ফার্মগেট থেকে সদরগাট, তারপর নৌপথে দাউদকান্দি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তখনো চারদিকে চলছিল পাক আর্মির গোলাগুলি। গ্রামগঞ্জ সব দাউদাউ আগুনে জ্বলেপুড়ে ছারখার অবস্থা। বিশেষ করে জোয়ান আর সক্রিয় মানুষদের ধরে ধরে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছিল। নারীরা হলো ওদের চরম পাশবিকতার শিকার। নির্যাতন থেকে সে সময় নিষ্পাপ শিশুরাও রেহাই পায়নি।

পাকিস্তানের এ পৈশাচিক তাণ্ডব দেখে জ্বলে উঠল মুক্তিকামী মানুষের চোখ, গড়ল প্রতিরোধ। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ‘জয় বাংলা’ তীব্র স্লোগান তুলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে এ দেশের সব মুক্তিকামী মানুষ অংশ নেয় মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে। মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অগণিত মানুষ। যারা সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার সুযোগ পায়নি তারা মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে, বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিল। এই মার্চ মাস এলেই সেই ভয়াল উত্তাল দিনগুলোর কথা ভীষণভাবে মনে পড়ে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের উন্মত্ততার শিকার হয় দেশের অগণিত মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ। পাক হানাদাররা এসব দেহ মিরপুর ও রায়ের বাজার বধ্যভূমিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফেলে রাখে। গ্রাম বাংলার নদ-নদী, খালবিলে অগণিত লাশ ভেসে থাকতে দেখেছি। শিয়াল-কুকুর-শকুনেরা ছিঁড়ে খেয়েছে বাংলার মানুষের পচাগলিত দেহ। হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হত্যাযজ্ঞ দেখে সারা বিশ্বের বিবেক কেঁপে ওঠে। খোদ নিউইয়র্কের রেডিসন স্কোয়ারে মার্কিন পপ তারকা জর্জ হ্যারিসন ও ভারতীয় সুর সম্রাট রবিশঙ্কর কনসার্ট করে তহবিল সংগ্রহ করেছিল। বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম সব দেশ থেকে আসতে থাকে সাহায্য-সহযোগিতা। মুক্তিযুদ্ধ বেগবান হয়। ভারতের মিত্রবাহিনী মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সর্বাত্মক সাহায্য করে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আর প্রায় তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। আসে চূড়ান্ত বিজয়। পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান পায় স্বাধীন-সার্বভৌম এক দেশ, বাংলাদেশ।

১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের খুন করে জাতিকে মেধাশূন্য করে দিতে চেয়েছিল পাক হানাদাররা। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতার মাত্র তিন বছর আট মাসের মাথায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সৃষ্টি হয় বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি চরম কলঙ্কজনক অধ্যায়। এরপর বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে দেয়ার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। যেসব যুদ্ধাপরাধী গা-ঢাকা দিয়ে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়েছিল তারা সব পুনর্বাসিত হয়েছে। বন্দুকের নলের মুখে বাংলাদেশের সংবিধান ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। এক পর্যায়ে সাধারণ মানুষের মনে এ ধারণা দেয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে যে, রাজাকার আলবদররাই এ দেশ স্বাধীন করেছিল। তা না হলে চিহ্নিত নামকরা যুদ্ধাপরাধীরা কিভাবে এ দেশের মন্ত্রিত্ব পায়?

এই মার্চেই আমাদের বাঙালিদের জীবনে অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণেই আজকের এই কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে চুক্তি, ২১ মার্চে জিন্নাহর রেসকোর্সের ভাষণ, অপারেশন সার্চ লাইট, ২৫ মার্চের গণহত্যার পথ পরিক্রমায় অবশেষে আসে আমাদের সেই ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতে বর্বর পাকিস্তানি হানানদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। সেই কালরাত থেকেই শুরু হয় মৃত্যু-ধ্বংস-আগুন আর আর্তনাদের পৈশাচিক বর্বরতা। সেই ঘোরতর অমানিশা ভেদ করেই আমরা অবশেষে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে ঠিকই পৌঁছেছিলাম। দেশের আকাশে উদিত হয় চিরভাস্বর স্বাধীনতার সূর্য। আমরা পাই একটি স্বাধীন সার্বভৌম মানচিত্র, বাংলার আকাশে উড়তে থাকে গৌরবময় লাল সবুজের পতাকা।

যে লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, স্বাধীনতার ৪৪ বছরে এই সময়ে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার প্রয়োজন যে আমরা কী করতে পেরেছি, কী পারিনি, মুক্তিযুদ্ধে এত আত্মদান ও ত্যাগ তিতিক্ষার পেছনে আমাদের যে স্বপ্ন ও লক্ষ্য ছিল, সেসব কতটা পূরণ হয়েছে, কতটা হয়নি! আমরা জানি যে, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল গণতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িকতা। আমাদের মুক্তি সংগ্রামের মর্মকথা ছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সব ধরনের অন্যায়-অবিচার, বৈষম্য থেকে মানুষের মুক্তি। বলাবাহুল্য, স্বাধীন দেশে আমরা দেখেছি বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোট গণতন্ত্র রক্ষার নামে হরতাল-অবরোধ দিয়ে পেট্রলবোমা ছুড়ে ছুড়ে গাড়িতে আগুন দিয়ে সাধারণ মানুষ হত্যা করেছে। উন্নতি আর সাফল্যের এ পর্যায়ে একদল অশুভ শক্তি পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে জেগে ওঠার চেষ্টা করছে- যা কোনোভাবেই সফল হতে দেয়া যাবে না। অশুভ শক্তির এসব চক্রান্ত সফল হলে আমাদের প্রিয় সোনার দেশ পরিণত হবে অথর্ব-অরাজক দেশে।

অশুভ শক্তির সব চক্রান্ত থেকে মুক্তি পাক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ- এবারে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে এই হোক আমাদের দৃপ্ত শপথ। নতুন প্রজন্ম একাত্তরের চেতনায় প্রিয় বাংলাদেশকে কাক্সিক্ষত স্বপ্নচূড়ার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাক- এই-ই হোক স্বাধীনতা দিবসের প্রত্যাশা।

:: লেখক : উপাচার্য, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

স্বাধীনতা দিবস : বিশেষ সংখ্যা ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj