খুব প্রশান্তি সহকারে শুনছিলাম নিজের মৃত্যু সংবাদ

শনিবার, ২৬ মার্চ ২০১৬

** আলমগীর সাত্তার **

মুক্তিযুদ্ধে যাব বলে একাত্তর সালের এপ্রিল মাসে বরিশালের স্বরূপকাঠি গেলাম আমার স্ত্রী এবং পুত্র-কন্যার সঙ্গে দেখা করতে। ঢাকায় ফিরে আসার জন্য ২৯ এপ্রিল স্বরূপকাঠি থেকে লঞ্চযোগে বরিশাল শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম। পরিকল্পনা ছিল বরিশাল থেকে রকেট স্টিমারে ঢাকা আসব।

দুপুর বেলা বরিশাল পৌঁছলাম। ওখান থেকে ঢাকার পথে স্টিমার ছাড়বে বিকেল পাঁচটায়। বরিশালের মূল লঞ্চঘাটে নামতে গিয়ে দেখলাম, ‘আল্লাহ আকবর’, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ লেখা স্টিকারের মতো ছোট আকারের ছাপানো কাগজ বিক্রি হচ্ছে। বিক্রি হচ্ছে ওই একই আকারের পাকিস্তানি পতাকাও। যাত্রীরা যারা লঞ্চ থেকে নামছিলেন, তাদের সবাই সেসব কিনে জামার সঙ্গে বুক বরাবর পিন দিয়ে আটকে নিচ্ছে। তাছাড়া তাদের মাথায় টুপি তো ছিলই।

লঞ্চ থেকে নেমে আমিও অন্যদের মতো ছোট আকারের ‘পাকিস্তানি পতাকা’, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ লেখা কাগজ কিনে বুকের ডানদিকে একটা আর একটা বাম দিকে লাগিয়ে নিলাম। একটা গোল টুপি কিনে সেটা চাপালাম মাথায়। এবার আমি হয়ে গেলাম দাড়িবিহীন মাদ্রাসার ছাত্র। ভাবছিলাম, বড় একখানা আয়না থাকলে দেখে নিতাম নিজেকে কেমন দেখায়? তারপর সঙ্গে থাকা কাপড়ের বোঁচকাটা কাঁধে চাপিয়ে রিকশায় চড়ে গেলাম বরিশালের গির্জা মহল্লায়। ওখানে আমার মায়ের এক মামাতো ভাইয়ের বাসা ছিল। ওই বাসায় গিয়ে দরজা দিয়ে আর ভেতরে প্রবেশ করলাম না। জানালা দিয়ে দৃষ্টি গলিয়ে দেখলাম, বাসার বৈঠকখানায় অনেক লোক। আমার সম্পর্কের ওই মামা বরিশাল জেলা শান্তি কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। ২৫ এপ্রিল পাকবাহিনী বরিশাল শহরের দখল নিয়েছে। তাই পাকিস্তানপন্থীরা খুশিতে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। মামার বাসার বৈঠকখানায় খুব মিষ্টি খাওয়া-খাওয়ি হচ্ছিল। খুশিতে ডায়াবেটিক রোগীরাও মিষ্টি খাচ্ছিল। বাসার ভেতরে প্রবেশ করলে আমাকেও মিষ্টি খেতে হবে। মামা হলেও একজন পাকিস্তানি দালালের বাসায় মিষ্টি খেতে ইচ্ছে হলো না। তাই একটু দূরে গিয়ে গির্জা মহল্লারই একটি হোটেলে সময় কাটানোর ব্যবস্থা করলাম। ঢাকাগামী স্টিমার ছাড়বে বিকেল পাঁচটায়। তাই বিকেল চারটা পর্যন্ত হোটেলেই ছিলাম।

বিকেল সাড়ে চারটায় মাদ্রাসার ছাত্রের পোশাকে গিয়ে স্টিমারের তৃতীয় শ্রেণির যাত্রীদের ভিড়ের মাঝে বসার ব্যবস্থা করে নিলাম। আমার কাপড়ের বোঁচকার মধ্যে একখানা আরবি-বাংলায় লেখা ধর্মীয় কেতাব ছিল। ওই কেতাবখানা বের করে খুব মনোযোগ সহকারে পড়ার ভান করছিলাম।

বিকেল পাঁচটায় স্টিমার ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু দেখলাম, ওই সময় একদল সশস্ত্র পাকসেনা স্টিমারে চড়ে তল্লাশি চালাচ্ছে, কোনো দুষ্কৃতকারী অর্থাৎ সম্ভাব্য মুক্তিযোদ্ধা যেন যাত্রীবেশে ভ্রমণ করতে না পারে। পাশ দিয়ে অস্ত্র হাতে যাওয়ার সময় আমাকে মাদ্রাসার ছাত্র মনে করে কোনো প্রশ্ন করল না। প্রায় আধঘণ্টা তল্লাশির পর পাকসেনারা পাঁচ-ছয়জন যুবককে গ্রেপ্তার করে নিয়ে নেমে গেল।

ঢাকায় পৌঁছে আমি আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ক্যাপ্টেন রফির শ্বশুরের মগবাজারের বাসায় উঠলাম। রফির শ্বশুরের পরিবারের সবাই আমাকে নিজেদের পরিবারের একজন সদস্য বলেই মনে করতেন। মগবাজারের বাসায় পৌঁছানোর পর রফির শ্বশুরই আমাকে দরজা খুলে দিলেন। মাদ্রাসা ছাত্রের পোশাক দেখে তিনি প্রথমটায় আমাকে চিনতেই পারলেন না। অথচ তিনি আমাকে প্রায় নিত্যদিনই দেখেছেন।

রফির শ্বশুরের বাসায় দুপুরে খানিকটা ঘুমিয়ে নিলাম। বৈঠকখানা ঘরের পাশের রুমেই আমি ঘুমিয়েছিলাম। বিকেল বেলা ঘুম ভাঙার পর বিছানায় শুয়ে থেকে চায়ে চুমুক দিচ্ছিলাম। তখন পাশের বৈঠকখানা ঘর থেকে পরিচিত কয়েকজনের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। পরিচিতজনরা ছিলেন হালিম, ক্যাপ্টেন মফিদুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ (বীরোত্তম)। তাদের আলোচনার বিষয় ছিলাম ক্যাপ্টেন শাহাবউদ্দিন এবং আমি। এ ছাড়া ছিলেন যে চারজন পিআইএর বাঙালি পাইলটদের পাকবাহিনী হত্যা করেছিল তারা। আমার বন্ধুরা শুনেছিল, ক্যাপ্টেন শাহাব এবং আমি ঢাকার বাইরে পাকবাহিনীর হাতে ধৃত হয়ে নিহত হয়েছি। ক্যাপ্টেন মোগল নামের একজন পশ্চিম পাকিস্তানি পাইলটের সঙ্গে পাকবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল। মোগলই এসব গুজব ছড়িয়েছিল।

যেহেতু আমার বন্ধুরা মনে করেছিল শাহাব এবং আমি মৃত তাই তারা কেবল আমাদের প্রশংসাই করেছিল। মৃতব্যক্তি সম্পর্কে নাকি সমালোচনামূলক কথা বলতে নেই। বন্ধুরা আমার সম্পর্কে এমন সব ভালো কথা বলছিল যে, আমি নিজেই আমার এত গুণের কথা জানতাম না। গরম গরম চা পান করতে করতে জীবিত অবস্থায় নিজের মৃত্যু সংবাদ শুনতে ভালোই লাগল। নিজের মৃত্যু সংবাদ নিজের কানে শুনতে পাওয়া খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। বন্ধুদের কণ্ঠস্বর শুনে সঙ্গে সঙ্গে আমি বৈঠকখানায় উপস্থিত হলাম না। ভাবলাম, দেখি না বন্ধুরা আমার চারিত্রিক গুণাবলি সম্পর্কে আর কি কি বলে?

শেষ অবধি আমি বৈঠকখানায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। অনেকদিন আগে একজন বিখ্যাত লোকের লেখায় রসিকতাপূর্ণ একটি বাক্য পড়েছিলাম। তিনি লিখেছেন, ‘ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর এই পৃথিবীটাকে দেখে আমি এমনই বিস্মিত হয়েছিলাম যে, এক বছর পর্যন্ত কথাই বলতে পারিনি। আমি চা পান করে বন্ধুদের সামনে গিয়ে যখন উপস্থিত হলাম, তখন তারা এক বছর নয়, এক মিনিট কোনো কথাই বলতে পারেনি।

দুই.

১৯২০-২১ সালে জগদ্বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বেশ দীর্ঘদিন চীন দেশে ছিলেন। ওই সময় তার সঙ্গে ডোরা ব্লু্যাক নামের তার বান্ধবী ছিলেন। বার্ট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে তখন অতিশয় সুন্দরী বলে খ্যাত তার প্রথম পক্ষের স্ত্রী অ্যালিসের ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল। ডোরা ব্লু্যাক তার গার্লফ্রেন্ড এবং তারা লিভিং-টুগেদার করতো। পরবর্তীকালে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হলো। মিস ব্লু্যাক বিয়ের আগেই গর্ভবতী হন। মিসেস রাসেল হিসেবে তিনি বার্ট্রান্ড রাসেলকে জন নামের একটি ছেলে এবং কেইট নামের একটি মেয়ে- এই দুটি সন্তান উপহার দিয়েছিলেন। তারপর বার্ট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে তারও ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল।

চীনে অবস্থানকালে বার্ট্রান্ড রাসেল খুব অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন শয্যাগত ছিলেন। তার কঠিন নিমোনিয়া রোগ হয়েছিল। তিনি কিছুদিন সম্পূর্ণ অচেতন ছিলেন। একটা সময় এমন হয়েছিল যে, ডাক্তাররা প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা আশঙ্কা করতেন যে পরের দিন সকাল বেলা পর্যন্ত হয়তো বাঁচবেন না। এরপর আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

বার্ট্রান্ড রাসেল যখন খুব অসুস্থ ছিলেন তখন ডোরা ব্লু্যাক তাকে সেবা-শুশ্রƒষা করেছিলেন। দেশ-বিদেশের সাংবাদিকরা সারাক্ষণ বার্ট্রান্ড রাসেলের সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার সংবাদ সংগ্রহ করার চেষ্টা করতেন। এ বিষয়ে উত্তর দিতে দিতে মিস ব্লু্যাক ক্লান্ত এবং বিরক্তবোধ করতেন। সারা রাত জেগে রোগীর সেবা করে দিনের বেলায় না ঘুমিয়ে সারাক্ষণ তার পক্ষে সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দেয়া সম্ভব ছিল না।

একদিন সকাল বেলা কিছু জাপানি সাংবাদিক দরজার কড়া নেড়ে মিস ব্লু্যাকের কাছে বার্ট্রান্ড রাসেলের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি বিরক্ত হয়ে কোনো উত্তর না দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। জাপানি সাংবাদিকরা মনে করলেন, দার্শনিক রাসেল নিশ্চয়ই মারা গিয়েছেন। তাই মিস ব্লু্যাক কোনো উত্তর দেননি। জাপানি সাংবাদিকরা তাদের জাপানের পত্রিকা অফিসে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন, দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল মারা গেছেন। জাপান থেকে এ সংবাদ পৌঁছে গেল আমেরিকায়। আমেরিকা থেকে সে সংবাদ আবার পৌঁছে গেল ইংল্যান্ডে। পরদিন ইংল্যান্ডের পত্রপত্রিকায় বড় বড় শিরোনামে প্রকাশিত হলো ওই সংবাদ। মারা যাওয়ার পরিবর্তে বার্ট্রান্ড রাসেল তখন থেকে একটু একটু করে সুস্থ হতে শুরু করেন।

তখনকার দিনে লন্ডন থেকে বেইজিং সপ্তাহে একদিন মেইল সার্ভিস পৌঁছাতো। এক সপ্তাহ পর যখন লন্ডনের মেইল গিয়ে চীনে পৌঁছাল তখন বার্ট্রান্ড রাসেল অনেকটা সুস্থ। নিজের দেশের পত্রিকা পড়ে রাসেল জানতে পারলেন, তিনি মারা গেছেন।

ব্যাপারটা রাসেলের কাছে যতটুকু কৌতুককর মনে হয়েছিল, তারচেয়ে বেশি কৌতুককর মনে হয়েছিল তার ভাইয়ের লেখা চিঠি। বার্ট্রান্ড রাসেলের ভাই ফ্র্যাংক রাসেলের কাছে বার্ট্রান্ডের মৃত্যুর সংবাদটি তেমন বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। ব্যাপারটা সত্য হলে ডোরা ব্লু্যাক এবং চীন সরকার টেলিগ্রাফ করে তা জানাত। ভাইয়ের মৃত্যুর বিষয়ে সন্দিহান হয়ে ফ্র্যাংক লেখলেন ভাই, তুমি যদি মরে গিয়ে না থাক, তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে ফিরে এসো। মারা যাওয়ার জন্য চীন দেশ তেমন ভালো জায়গা না।

তিন.

একাত্তরের মে মাসের ৯ তারিখ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য আমি ঢাকা থেকে ভারতের আগরতলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। তখনকার ইপিআরটিসির কোচ সার্ভিসে কুমিল্লার চান্দিনা পর্যন্ত গেলাম। ওখানে পৌঁছেছিলাম দুপুর বেলা। ওখানকার রাস্তার পাশে ছোট একটি রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেলাম। এরপর গোমতী নদী পেরিয়ে আরও অনেকের সঙ্গে ভারতের হাতীমারা চেকপোস্টের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। চান্দিনা থেকে হাতীমারার দূরত্ব ১১ মাইল।

হাতীমারা থেকে তখনো ২ মাইল দূরত্বে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আমরা। হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেল পিআইএর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট বিভাগের মি. চৌধুরীর সাথে। তার ভালো নামটি ভুলে গিয়েছি। মি. চৌধুরী বলেই সবার কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন। ওখানটাতে ছিল তার বাড়ি। তিনি চা-মুড়ি দিয়ে আমাদের কয়েকজনকে আপ্যায়ন করালেন। হাতীমারা চেকপোস্টে পৌঁছুতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। ওখানে পৌঁছানোর পর শরণার্থীদের দেখাশোনা করার দায়িত্বে যিনি ছিলেন, আমার পারিচয় পেয়ে তিনি খুব সমাদর করলেন। তার অফিস বাবদ খুব ছোট অস্থায়ী একখানা ঘর ছিল। ঘরখানায় ঘুমানোর জন্য ছিল একখানা চৌকি, একটি টেবিল এবং একখানা চেয়ার। ক্যাম্প কমান্ডার ভদ্রলোক ঘুমানোর জন্য তার বিছানা আমাকে ছেড়ে দিলেন। প্রশ্ন করলাম, আপনি ঘুমাবেন কোথায়? উত্তরে বললেন, চেয়ারের ওপর বসে বসে ঘুমিয়ে নেব। এরপর একজন লোককে দিয়ে ক্যাম্পের মেসে খাবার খেতে আমাকে পাঠালেন। মেসে গিয়ে মোটা চালের দলা পাকানো ঠাণ্ডা ভাত আর পানির মতো পাতলা ডাল দেখে খেতে ইচ্ছা করল না। ভাবলাম, একটা রাত না হয় না খেয়েই কাটিয়ে দিলাম।

তখনকার সময় একটানা এগারো-বারো মাইল হাঁটার অভ্যাস ছিল না। তাই রাত দশটার মধ্যে শুয়ে পড়ার ব্যবস্থা করলাম। আর ঠিক এমন সময় দেখলাম ভারত সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দু’মাইল দূরত্বের বাড়ি থেকে মি. চৌধুরী অন্য একজন লোককে সঙ্গে করে নিয়ে আমার জন্য কোরমা-পোলাও রান্না করে নিয়ে এসেছেন। চৌধুরী সাহেব যে খাবার এনেছিলেন তার পরিমাণটা ছিল তিন-চার জনের জন্য যথেষ্ট। ক্যাম্প কমান্ডার তার একজন সহযোগী এবং আমি খুব তৃপ্তি সহকারে রাতের আহার-পর্ব সমাধা করলাম। আমার এই দীর্ঘ জীবনে ঐ দিন চৌধুরী সাহেব যেভাবে আমাকে আপ্যায়ন করেছিলেন, তেমনটা আমার জীবনে আর কোনোদিন ঘটেনি। মনে হয় ভবিষ্যতেও ঘটবে না।

পরদিন সকাল ১০টায় হাতীমারা বাজারের কাছের বাসস্টপ থেকে আগরতলাগামী বাসে চড়ে বসলাম। ওই বাসে যারা আগরতলা যাচ্ছিলেন, তাদের মাঝে ঢাকার কলেরা রিসার্চ সেন্টারের ডাক্তার রায়ও ছিলেন। দুপুরবেলা আমরা গিয়ে পৌঁছলাম আগরতলায়। ওখানে ডা. রায়ের এক আত্মীয়ের বাসায় দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে খানিকটা সময় বিশ্রাম নিয়ে বিকেল বেলা নিজের জন্য একটি আস্তানা খুঁজে পেতে বেরোলাম। গিয়ে উপস্থিত হলাম শ্রীধর ভিলায়। ওখানে অবস্থান করছিল ছাত্রলীগের ছেলেরা, মুজিব বাহিনীর সেনারা এবং মুজিব বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু শেখ ফজলুল হক মনি।

ফজলুল হক মনির কাছেই জানতে পারলাম আমার আগেই পিআইএর পাইলট ক্যাপ্টেন শাহাব উদ্দিন (বীরোত্তম) এবং ক্যাপ্টেন খালেক (বীরপ্রতীক) আগরতলায় এসে অবস্থান করছে।

শাহাব উদ্দিনকে খুঁজতে গিয়ে উপস্থিত হলাম আগরতলার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সুজিৎ দের রবীন্দ্র পল্লীর বাসায়। ওখানে গিয়ে দেখলাম, ঢাকায় থাকাকালে যে শুনেছিলাম ক্যাপ্টেন শাহাব উদ্দিন পাকবাহিনীর হাতে ধৃত হয়ে নিহত হয়েছে, সে খবর সম্পূর্ণ মিথ্যা। শাহাব ডা. সুজিৎ দের বাসায় সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরেই অবস্থান করছে।

আগরতলায় আমার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাটার খুব ভালো ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু ওখানে আমার বেশি দিন থাকা হয়নি। কলকাতা-দিল্লিতে কিছুদিন ধরে অবস্থান করার পর ক্যাপ্টেন খালেক, শাহাব উদ্দিন এবং আমি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে গিয়ে পৌঁছলাম নাগাল্যান্ড রাজ্যের রাজধানী ডিমাপুর।

আমি পৃথিবীর বহু দেশে গিয়েছি। যদি কেউ প্রশ্ন করেন বসবাস করার জন্য সবচেয়ে সুন্দর দেশটির নাম কি? উত্তরে নাগাল্যান্ড শহরের বাইরে গভীর জঙ্গল এবং পাহাড়ে ঘেরা কোনো একটি স্থান।

লর্ড বায়রন লিখেছেন,

‘THERE IS A PLEASURE IN THE PATHLESS WOODS,

THERE IS RAPTURE ON THE LONELY SHORE

BY THE DEEP SEA, AND MUSIC ON ITS ROAR

I LOVE NOT MAN LESS, BUT NATURE MORE.’

গভীর জঙ্গল এবং পাহাড় ঘেরা নাগাল্যান্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনো তুলনা নেই।

মৃত্যুর জন্য শ্রেষ্ঠ হলো নিজ দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য রণক্ষেত্রে মৃত্যু। এমন মৃত্যুর চেয়ে গৌরবময় আর কিছু হয় না।

:: লেখক : মুক্তিযোদ্ধা; অবসরপ্রাপ্ত বৈমানিক।

স্বাধীনতা দিবস : বিশেষ সংখ্যা ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj