বাংলাদেশের ক্রিকেট ষড়ষন্ত্রের শিকার নয় কি?

সোমবার, ২১ মার্চ ২০১৬

মনে হলো ক্রিকেটে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাই তাদের জন্য কাল হচ্ছে। না হলে ২০১৫ সালের আগে কোনো বাংলাদেশির বোলিং নিয়ে কেউ কখনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের অভিযোগ আসছে। এটা একটা ষড়ষন্ত্র মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বাংলাদেশের আরাফাত সানি কিংবা তাসকিন আহম্মেদ কি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে নতুন মুখ? তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নেই যে, এদের বোলিংয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে এত ম্যাচ খেলার পর কেন? এসব বোলার তো অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছেন। তখন তো কোনো আম্পায়ার এ ধরনের সন্দেহের কথা বলেননি? তাছাড়া এরপর আরো অনেক সিরিজে এরা বল করেছেন, তখন কেন আম্পায়াররা এই সংশয় উত্থাপন করেননি? আসল কথা হলো তখন বা তার পরে ক্রিকেটের তিন মোড়ল দেশের সঙ্গে খেলা হয়নি। অথবা তারা তখন এতো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেনি! এক কথায় বলা চলে, আইসিসি আজ তার আওতাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কয়েকটি দেশ ছাড়া বাকিগুলোর প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। আমাদের কাছে এটি একটি প্রতারণাপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।

আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে- বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত সিরিজে ভারতের সিরিজ হারার পেছনে তাসকিনের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। এই কারণে কি তাসকিনকে ভারতে তার বোলিং পরীক্ষা দিতে হচ্ছে? তবে বাংলাদেশের যে ক্রমান্নতি হচ্ছে এতে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াসহ কটি দেশ যে খুবই ঈর্ষান্বিত হয়েছে তা গত বছর কোনো অজুহাত ছাড়াই সিরিজ বাতিল করার পরিপ্রেক্ষিতেই বুঝা গিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ যেকোনা দলকে হারানোর এমন কি সিরিজ জেতার সার্মথ্য রাখে যা গত নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান কিংবা ভারতের সঙ্গে সিরিজ জয়ে প্রমাণিত হয়েছে। আর এই বাংলাদেশের সঙ্গে খেলে যদি অস্ট্রেলিয়া হেরে যায় তবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার মান-সম্মান যে একেবারে তলানিতে পৌঁছাবে। এ কারণেই কি বাংলাদেশ সফর বাতিল করেনি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া? বাংলাদেশের তাসকিন ও আরাফাত সানির বিরুদ্ধে ভারতের ক্ষোভ সৃষ্টি হয় মূলত বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সিরিজ চলাকালে। কেননা ওই সময় তাসকিনের করা বলগুলো ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা ভালো মতো খেলতে পারেননি বিশেষ করে রোহিত শর্মা। গত বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত যত ম্যাচই হেরেছে, প্রায় সব কটিতে রোহিত শর্মার উইকেট নিয়েছেন এই তাসকিন আহম্মেদ! তার এই নজরকাড়া পারফরমেন্সই এখন তাকে অবৈধ অ্যাকশনে অভিযুক্ত হওয়ার খোরাক জুগিয়েছে।

বোলারদের বোলিং অ্যাকশনকে সন্দেহের তালিকায় আনা তাদের পারফরমেন্স থেকে এবং বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট থেকে বিরত রাখার এক কৌশলমাত্র। তা না হলে এসব বোলারদের যদি বোলিং অ্যাকশন অবৈধই হতো তবে কেন এই বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের আগে এই প্রশ্ন উত্থপান করা হয়? এই তিন মোড়দের সঙ্গে কোনো সিরিজ হলে অথবা কোনো ত্রিদেশীয় সিরিজে যদি এই তিন মোড়ল থাকে তখন অথবা কোনো দ্বিপক্ষীয সিরিজি শেষে পরবর্তী সিরিজ যদি বিগ থ্রির সঙ্গে থাকে তবে দ্বিপক্ষীয় সিরিজের এমন সময় এই বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, যে সময় অভিযুক্ত বোলার তার বোলিং পরীক্ষা কিংবা তা প্রমাণিত হওয়ার সময়ের মধ্যে বিগ থ্রির সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য সিরিজটা শেষ হয়ে যায়।

এ কাজটি করা খুবই সহজ হয় যখন তিন মোড়লের পছন্দসই আম্পায়ার দিয়ে যখন খেলা পরিচালনা করা হয়। তখন তিন মোড়লের দেয়া বুলি এসব আম্পায়াররাও গাইতে থাকেন। আর তা না হলে গত বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে মাহমুদুল্লার ছক্কা হয়ে যাওয়ার পরও আউট দেয়া অথবা, রোহিত শর্মা আউট হলেও নো বল ডাকা হবে কেন? এসবই বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিরুদ্ধে ষড়ষন্ত্রের অংশ নয় কি?

এই ষড়যন্ত্র কেবল যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তা কিন্তু নয় বরং বিগ থ্রি বাদে বাকি সব টেস্ট প্লেয়িং দেশের বিরুদ্ধেই। তিন মোড়লের দেশ ছাড়া অন্য দেশের যেসব বোলার এসব দেশের ক্রিকেটারদের জন্য ভয়ঙ্কর মূলত ওইসব ক্রিকেটার কিংবা বোলারদের নিয়ে আইসিসি সন্দেহ কিংবা সংশয়। অনুসন্ধানে বের হয়েছে আইসিসি এই পর্যন্ত যতজন ক্রিকেটারের বোলিং নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে তা কেবল বিগ থ্রির বাইরের দেশগুলোর। অর্থাৎ সংশয়ের তালিকায় ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কিংবা ইংল্যান্ডের কোনো বোলার নেই! শ্রীলঙ্কার সেনানায়েকা, পাকিস্তানের সাইদ আজমল, কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের সুনীল নারিনের বিরুদ্ধে আইসিসির অভিযোগও এ নোংরা খেলার অংশ। আমরা সবাই জানি উল্লিখিত দেশের ওই বোলাররা স্পিনে খুবই শক্তিশালী তাই এসব বোলারের প্রতি এই বিগ থ্রির যত অভিযোগ। তবে বিগ থ্রি কিংবা তিন মোড়ল অন্যান্য দেশের প্রতি যে ষড়ষন্ত্রের জাল বুনছে তার চাইতেও বেশি জাল বুনছে সুপার রাইজিং বাংলাদেশের প্রতি।

আবার অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে মুস্তাফিজ বর্তমানে কাটার্র মাস্টার বলে পরিচিত হলেও তাকে কেন অবৈধ অ্যাকশনের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে না। মুস্তাফিজকেও হয়তো এ রকম বোলিং পরীক্ষা দিতে হবে, তবে তা এখন নয় কারণ মুস্তাফিজ আসন্ন আইপিএলে খেলতে যাবেন। এখানে ভারতীয়রা তাদের ব্যবসাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আর ব্যবসাকে প্রাধান্য দেয়ার অন্যতম আরেক উদাহরণ হলো সোহাগ গাজী। সোহাগ গাজী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যত ম্যাচই খেলেছেন প্রায় ম্যাচেই তিনি ক্রিস গেইলের উইকেটটি নিয়েছেন। তাও আবার দুই অঙ্কের কোটা পূরণের আগেই! এতেই ভারতের আইপিলে ব্যবসা ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেয় কেননা গেইল যে ভারতীয় আইপিএলে একজন আইকন প্লেয়ার! আর তখনই আইসিসি সোহাগ গাজীর বোলিং অ্যাকশন নিয়ে সন্দেহ করল। যার ফল সোহাগ গাজী আর তার ফর্মে ফিরে আসতে পারেনি।

আইসিসি যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হবে তবে এই তিন মোড়লের কোনো বোলার কেন সন্দেহের আওতায় আসেন না? তবে ভাগ্য ভালো যে, আইসিসি ব্যাটসম্যানের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করছে না। না হলে সাকিব, তামিম কিংবা মুশফিক, সাব্বিরদের ক্যারিয়ার একেবারেই শেষ হয়ে যেত! আইসিসিতে ভারতীয় প্রভাব এতই বেশি যে, এখন বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষা দেয়ার জন্য ভারত রাতারাতি ২-৩টি প্রতিষ্ঠান খুলে বসল এমন কি প্রায় সব বোলারের পরীক্ষা এখন এখানে দিতে হয়। আগে আইসিসির এ ধরনের বোলিং পরীক্ষা দিতো অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ায়। কিন্তু আইসিসির সঙ্গে বিরোধের জেরে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আইসিসি তাদের চুক্তি বাতিল হয়। তবে গুঞ্জন আছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিন বোলার সুনীল নারিনের বোলিং অ্যাকশনকে অবৈধ ঘোষণা দেয়ার জন্য জোর চাপ ছিল এই তিন মোড়লের কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাতে না করে দেয়ায় বিরোধের সৃষ্টি হয়।

যাই হোক, আমাদের চাওয়া- ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা সবার ক্ষেত্রে সমান আচরণ করবে এবং এই ধরনের বিগ থ্রির অন্যায় আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়ে অন্যদের হয়রানি থেকে মুক্ত রেখে ক্রিকেটকে সবার মাঝে উন্মুক্ত করবে।

মো. শরীফুর রহমান আদিল : শিক্ষক, লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj