আগামীতে কেমন দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ? : মোহীত উল আলম

বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ ২০১৬

প্রথম কথা হলো, বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের মতো। আগামী দশ বছরে কিংবা আগামী বিশ বছরে, বা তার পরেও। কেন বাংলাদেশ নিয়ে এ প্রশ্নটা সাম্প্রতিককালে বারবার উঠে আসছে? তার কারণ হলো, গত সাত বছরে, অর্থাৎ বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য বিশ্বের জরিপকারী সংস্থাগুলির কাছে বিপুলভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। চোখের দেখা বলে একটা কথা আছে। আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকায় বা ইউরোপে প্রবাসী, তাঁরাও ইদানীং দেশে ঘুরে গেলে বলেন যে বাংলাদেশের রাস্তাঘাট, সেতু, বাঁধ, সেচকার্য, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল, চিকিৎসা কেন্দ্র, অফিস আদালতের ভবনাদি, বাজার ও পণ্যের ভবনাদি, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, নারী-শিক্ষা, শিল্প-কারখানা, বিশেষ করে পোশাক-শিল্পের ভবনাদি, পশু-খামার, মুরগি-হাঁসের খামার, ফুলবাগান, ফলবাগান, মাছের চাষের ব্যবস্থা, প্রকাশনা-শিল্প এবং সর্বোপরি কৃষিভিত্তিক গ্রামগুলোর সার্বিক উন্নতি চোখে পড়ার মতো হয়েছে। আমার এক বড় ভাই, কানাডাপ্রবাসী, একবার দেশে বেড়াতে এলে অসুস্থ হয়ে পড়লে একটি অত্যাধুনিক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সময় হাসপাতালের পরিবেশ, চিকিৎসার মান, শুশ্রƒষার আন্তরিকতা ও সময়ানুবর্তিতা দেখে বিমুগ্ধচিত্তে স্বীকার করলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবা এখন কানাডারই মতো। আমার এক শালী দীর্ঘদিন আমেরিকা-প্রবাসী, এবার দেশে এলে সব ঘুরেটুরে আমার স্ত্রীর কাছে বলে গেছেন, বাংলাদেশের জীবনযাত্রার ধাঁচ তাঁর কাছে আমেরিকানদের মতো মনে হচ্ছে। সবাই কর্মতৎপর, কেউ বসে নেই।

ওপরের সাধারণ তুলনাগুলো দিয়ে আমি বলতে চাইছি না যে বাংলাদেশের আমেরিকা বা কানাডার মতো হওয়া উচিত, আমি বলতে চাইছি যে সাধারণভাবে বাংলাদেশ- যেটি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে একদা আমেরিকার উচ্চপর্যায় থেকে উপহাসিত হয়েছিল- সে বাংলাদেশ সম্পর্কে এখন প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনে যে ইতিবাচক ভাবধারা তৈরি হচ্ছে, তাকে পুঁজি করে বলতে চাই, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আমরা যারা আছি, তারা হয়তো পরিবর্তনটা পুরোটা দেখতে পাই না, যতটুকু প্রবাসী বাংলাদেশিদের চোখে ধরা পড়ে।

আমার এই লেখাটা আমরা যারা পরিবর্তনটা পুরোপুরি দেখতে পাই না, তাদের কাছে পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটার দার্শনিক ভিত্তি ধরিয়ে দেয়ার মানসে লেখা। দেখি চিন্তাটা কীভাবে এগিয়ে নিতে পারি।

১. বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ : ভারসাম্যভিত্তিক দিকনির্দেশনা

এ লেখাটা লিখছি ৬ মার্চ। অর্থাৎ এ লেখাটার প্রান্ত থেকে আগামীকাল হচ্ছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ- ৪৫ বছর আগে বঙ্গবন্ধুর ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণার ভাষণের দিন। সে জন্য, কোথাও বক্তৃতা দিতে হবে বা কোথাও এ মহান সংগ্রামী দিনটি সম্পর্কে লিখতে হবে মনে করে গত পরশু (৪ মার্চ) ভাষণটির কয়েকটি ভিডিওচিত্র দেখলাম ইউটিউবে। ৭ মার্চের ভাষণ আপনি যতবার দেখবেন (বা পড়বেন), ততবারই আপনি এর নতুন নতুন অর্থ কিংবা গুরুত্ব খুঁজে পাবেন।

১৯৭১ সালে আমি চট্টগ্রামের ছেলে হওয়াতে স্বাভাবিকভাবে চট্টগ্রামেই ছিলাম। এবং ৭ মার্চের ভাষণটি পাকিস্তান রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারের কথা থাকলেও, পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের তাৎক্ষণিক নির্দেশে সেটি বন্ধ থাকে, যাঁর দৃষ্টিতে সম্প্রচারের মতলবটি ছিল একটি ‘ননসেন্স’ (সিদ্দিক সালিক, উইটনেস টু সারেন্ডার [ইউপিএল ১৯৭৭], পৃ. ৫৩)। সিদ্দিক সালিক, যিনি সে সময়ে ঢাকায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে সাংবাদিকতার কাজে কর্মরত ছিলেন, তিনি আরো লিখছেন যে তিনি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তটি ঢাকা রেডিওতে টেলিফোনে জানানো মাত্র অপরপ্রান্ত থেকে জনৈক বাঙালি বন্ধু বললেন, ‘আমরা যদি সাড়ে সাত কোটি লোকের কণ্ঠস্বর প্রচার করতে না পারি, আমরা কাজ করতে অস্বীকার করছি।’ তারপর রেডিওর কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু বাঙালি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাপে পাকিস্তান সরকার তারপরের দিন সকালে, অর্থাৎ ৮ মার্চের সকালবেলা সেটি প্রথম সম্প্রচারের অনুমতি দেয়, যার কারণে আমরা চট্টগ্রামে বসে সেদিন সকালে পুরো সম্প্রচারটি শুনি। সে সকালবেলার প্রথম শোনা থেকে ভাষণটি আমি হাজারবার শুনেছি, পড়েছি, কখনো কখনো ভিডিওচিত্র দেখেছি, কিন্তু গত ৪ তারিখের দেখার মধ্যে যেন আমি আবার নতুন করে কিছু পেলাম, যেটা আগে আমি বোধহয় লক্ষ্য করিনি। আর সেটা হলো বঙ্গবন্ধুর অপূর্ব দায়িত্ববোধের কথা- শুধু বাঙালি জাতির প্রতি নয়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী সব অবাঙালি সম্প্রদায়ের প্রতিও।

এ দায়িত্ববোধ থেকে উৎসারিত যে ভারসাম্যবোধ তাঁর সেদিনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠা করলেন তার সম্পর্কে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বলছেন, ‘…দল এবং দলীয় নেতা শেখ মুজিবের ওপর দায়িত্ব এসে পড়েছিল এমন কিছু না বলা, যা পাকিস্তানি পক্ষকে তখনই অজুহাত দেবে অপ্রস্তুত জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার। আবার একই সঙ্গে চাঙ্গা রাখতে হবে আন্দোলন ও জনগণকে। এ ভারসাম্য বজায় রাখা নিতান্ত সহজ ছিল না। এ ছাড়া, আমাদের মনে রাখতে হবে তখনো তাঁকে কাজ করতে হচ্ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে যেখানে তাঁর অবস্থান ছিল সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। এখন আমাদের কাছে ব্যাপারটি যত সহজ মনে হচ্ছে তখন নিশ্চয় তা ছিল না।’ (বঙ্গবন্ধু কীভাবে আমাদের স্বাধীনতা এনেছিলেন, প্রবন্ধ : ‘কেন মনে থাকে ৭ মার্চ,’ [মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০১৩], পৃ. ১৩৯।)

বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতায় বলেছেন যে, তিনি যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, তিনি আক্রমণাত্মক নীতিতে থাকতে পারেন না। ভাষণের ভিডিওচিত্রে তাঁর দেহের ভঙ্গিমায়, তাঁর তর্জনীর বারংবার উচ্চ-নিচ উঠা-নামায়, তাঁর ডান হাতের ডান দিক থেকে বাম দিক, বামদিক থেকে ডানদিকে বারংবার সমান্তরাল আন্দোলন এবং তাঁর বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠস্বর মিলেমিশে- অর্থাৎ তাঁর দৈহিক ভাষায় আমি যে ভাষাটি পড়লাম, সেটি হলো এ মহান নেতা কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে চান না। তাঁর শরীরের ভাষায় মিশে গেছিল ক্ষুব্ধতার সঙ্গে হতাশার একটি চাপা রেশ। ক্ষুব্ধতা, পিতা যখন তাঁর বেড়ে ওঠা যুবক ছেলেকে একটি সংকটময় মুহূর্তে কোন পথটি নেয়া দরকার সেটি বোঝাতে যেয়ে ব্যর্থ হন, বা পুত্র বুঝছে না বলে যে সংক্ষুব্ধতা তাঁর মধ্যে তৈরি হয়, বঙ্গবন্ধুও পাকিস্তানের শিশুমস্তিষ্কসম্পন্ন কিন্তু ক‚টবুদ্ধিতে ধাড়ি সামরিক শাসকবর্গকে কিংবা তার চেয়েও তস্য, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে অবিমৃষ্যকারী শিশু-শয়তান জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বোঝাতে পারছিলেন না যে সত্তরের নির্বাচনের কাঠামো অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতেই পাকিস্তানের শাসনভার যাবে, তখন তিনি বারবার হুঁশিয়ার করে দিচ্ছিলেন যে তাঁদের (পাকিস্তানের সামরিক শাসকবর্গ এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো) মূঢ়তা ও গোয়ার্তুমির পরিণতি হবে ভয়াবহ। এমন যে, আর হয়ত মুখ দেখাদেখি হবে না।

বঙ্গবন্ধুর ধারণায় প্রবিষ্ট ছিল যে আওয়ামী লীগ হলো পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল, কাজেই এ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব থেকে ফাঁকা গুলি ছোড়ার মতো কোনো অসম্পূর্ণ এবং বিপজ্জনক পদক্ষেপ নেয়া যাবে না। এটি হলো তাঁর নিজের দলের প্রতি এবং বাঙালি জাতির প্রতি এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী সকল নাগরিকের প্রতি উচ্চতর দায়িত্ব, যাকে আমরা মানবতা বলতে পারি, সে দায়িত্ববোধই তাঁর মননে সম্পূর্ণত প্রোথিত ছিল বলেই তাঁর ভাষণটি হয়ে গেল রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জনের অভিমুখে মানবতাসম্পৃক্ত সতর্কতার যাত্রা। যদি এরকম হতো যে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিলেন যে সভায় উপস্থিত লাখ লাখ লাঠি-উঁচানো জনতা যেন যেয়ে ঢাকার সেনাছাউনি (কিংবা দেশের অন্যত্র অবস্থিত অনুরূপ সেনাছাউনি বা প্রতিরক্ষার স্থাপনাসহ সব কিছু) আক্রমণ করে, (সিদ্দিক সালিক জানাচ্ছেন, যে ভয়ে ৭ মার্চ শেষ বেলা পর্যন্ত পাকিস্তানি সামরিক চক্র রীতিমতো কাতর ছিল। [উইটনেস টু সারেন্ডার, পৃ. ৫৪।) কিংবা অবাঙালিদের হত্যা করে কিংবা তাদের সম্পত্তি, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুট করে, তা হলে দেশের বাইরেতো বটেই, দেশের অভ্যন্তরেও সাধারণ বাঙালি ছাড়াও আওয়ামী লীগের বিপুল সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হতো, নিশ্চিত সহিংসতা ও অরাজকতার মধ্যে দেশ ডুবে যেত- এবং এর প্রতিক্রিয়ায় দেশের অভ্যন্তরে ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইস্যুটি গেরিলাযুদ্ধধর্মী বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে পরিণত হতো, যেটি করার ফাঁদ ছিল পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের এবং সেসময়, ভুট্টো বহির্বিশ্বের গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রদত্ত বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সেসইশনিস্ট বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে অভিহিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ভুট্টো-অনুপ্রাণিত এবং পাকিস্তানি সামরিক শাসন কর্তৃক ষড়যন্ত্রকৃত এ ফাঁদে কখনো পা দিলেন না। অর্থাৎ একটি নির্বাচিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে কখনো তিনি ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসী-গুপ্তহত্যাধর্মী কর্মসূচি পালন করার মতো গোপন সংগঠনে পরিণত করলেন না। তাঁর ভাষণের মোদ্দা কথা ছিল, বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোটে দেশ শাসন করার সনদ পেয়েছে আর এই অধিকার স্বীকার না করার অর্থ হলো পাকিস্তান সরকার চায় না দেশ অবিভক্ত থাকুক। যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয় এবং সেজন্য যদি মুক্তিযুদ্ধের মতো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে, তা হলে তার দায়ভাগ সম্পূর্ণতই পাকিস্তানি সামরিক চক্র ও ভুট্টো মিলে যে ষড়যন্ত্রের জাল পেতেছে, তারই ওপর পড়বে।

২৫ মার্চে ইয়াহিয়া-ঘোষিত সংসদ সভায় বসার শর্ত হিসেবে এ ভাষণেই বঙ্গবন্ধু চারটি শর্ত দিলেন : ১. সামরিক আইন তুলে নিতে হবে; ২. নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে; ৩. সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে; আর ৪. বাঙালি হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। এ চারটি শর্ত প্রদানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তথা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের পক্ষ থেকে প্রখর রাজনৈতিক মুনশিয়ানার পরিচয় দেয়া হয়েছে বলা যায়। কারণ লক্ষ্য যদি হয় রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, তা হলে এর পরিচালক উপাদান বা চাকাগুলো এমন হতে হবে যে যাতে আন্দোলনের গতি গন্তব্যে সঠিকভাবে পৌঁছায়। আবার বলা যায়, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন বা সেরকম কিছু উপার্জনের জন্য সহিংসতানির্ভর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে প্ররোচিত করা হয়তো সম্ভব যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি কমিটি আগে করেছিল কিংবা আমেরিকাতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে শ্বেতাঙ্গ চরমপন্থীদের গঠিত কিউ ক্লাক্স ক্ল্যান গোষ্ঠী কিংবা শ্রীলঙ্কায় এলটিটিই কিংবা মৌলবাদী ইসলামি জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলো যেমন আল-কায়েদা বা আইএস গোষ্ঠী বা সাম্প্রতিককালে বিএনপি-জামায়াত জোট যেভাবে সহিংস কর্মসূচি দিয়ে জান ও মালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছিল। এ ধরনের সহিংস কর্মসূচি মূলত গৃহযুদ্ধের জন্য পরিচালিত পরিচিত কর্মপন্থা। কিন্তু লক্ষ্য যখন থাকে একটি রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জন, তখন উগ্র-সন্ত্রাসনির্ভর কর্মসূচির চেয়ে শান্তিপূর্ণ আলোচনাভিত্তিক পথটি নিঃশেষ না করে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর্যায়ে নামা কোনোভাবে সমীচীন হয় না। বঙ্গবন্ধুর এ পর্যায়ের দর্শনটি মহাত্মা গান্ধীর অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের মতো প্রতীয়মান হয়।

কিন্তু গান্ধীর অহিংসতা যেমন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মাধ্যমে সহিংসতায় পরিণত হতে দেরি হয়নি, তেমনি বঙ্গবন্ধুর শান্তিবাদী, ধৈর্যশীল, অনাক্রমণপ্রবণ, সংসদীয়, গণতান্ত্রিক ও সর্বোপরি মানবিক যে দর্শন তাঁর ভাষণের শিকড় ছিল তার কোনো গুরুত্বই শিশু-শয়তান-মস্তিষ্কসম্পন্ন ইয়াহিয়া বাহিনী উপলব্ধিতো করতে পারলই না, বরঞ্চ ভুট্টোর মদতে ২৫ মার্চের রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করার মতো স্পর্ধা দেখাল এবং বঙ্গবন্ধু শেষ পর্যন্ত তাঁর নিরীহ বাঙালি ভাইবোনের ওপর যে গণহত্যা ঠেকিয়ে রাখার জন্য ৭ মার্চ সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণার কথা বললেন না, সেটি তারা অপারেশন সার্চলাইট নামক অভিযানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করে, আর তাই বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চের রাত্রির শেষ প্রহরে, অর্থাৎ ২৬ মার্চের রাত্রির প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন, যা তৎকালীন ইপিআর বাহিনীর পিলখানাস্থ একজন প্রকৌশলীর মারফতে সারাদেশে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে প্রচারিত হয়, যেটির একটি সাইক্লোস্টাইলড কপি আমরা চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়িতে বেলা ১টার দিকে হস্তগত করি।

তা হলে ৭ মার্চের ভাষণ, যেটিকে অনেকে কবিতাও বলেন, এ অর্থে একটি যুগান্তকারী ভাষণ যে এটি নিছক ঘোষণাধর্মী আস্ফালনমূলক অবিবেচনাপ্রসূত বক্তৃতা ছিল না, বরঞ্চ এটি দেশপ্রেমের সংহতিমূলক চিন্তা-চেতনায় ঋদ্ধ একটি অতি বাস্তবতাসম্পৃক্ত দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ ছিল, যারই ফলে ত্রিশ লাখ লোকের শহীদানের বিনিময়ে গরিমাপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পৃথিবীর বুকে জায়গা করে নেয়।

২. বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণতা :

আধুনিকতার পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার আলোকে আমরা এর দার্শনিক ভিত্তি আলোচনা করতে যেয়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের বিচার করে এ কথা বলতে চেয়েছি যে তাঁর মধ্যে জাতির ওই সংকটের সময় চূড়ান্ত ভারসাম্যবোধ কাজ করেছিল যার ভিত্তিভূমি ছিল দেশপ্রেম-উদ্বুদ্ধ সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাবোধ।

বঙ্গবন্ধুর ভারসাম্যভিত্তিক রাজনৈতিক দর্শনের কারণে বাংলাদেশ যদি ৪৫ বছরে সফলভাবে পা দিয়ে থাকে, তাহলে বলতে হয় তাঁরই সুযোগ্য কন্যা, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দক্ষ, কুশলী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রী, যাঁর নাম শেখ হাসিনা, তিনিও তাঁর পিতার মতোই জাতির একটি সংকটময় মুহূর্তে একটি অনন্যসাধারণ বাস্তবতার ভারসাম্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন বলে ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়।

আমি পিলখানার ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯-এর তৎকালীন বিডিআর সশস্ত্র সদস্যদের দ্বারা ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭০ জন লোকের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কথা বলছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তখন মাত্র ক্ষমতায় মাসাধিককাল কাটিয়েছেন কিন্তু সংকটের সময় তিনি বুদ্ধি হারালেন না বা কারোর নেতিবাচক পরামর্শে বিভ্রান্ত হলেন না, বরঞ্চ ৭ মার্চের তাঁর পিতার ভাষণের মতোই এ বাস্তব সিদ্ধান্ত নিলেন যে কোনোভাবে বিডিআরের বিপথগামী সশস্ত্র সদস্যদের বিদ্রোহ দমন করতে সশস্ত্র প্রতি-আক্রমণ করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর এ বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের সমর্থন তখন পত্রপত্রিকায় কলাম লিখিয়েদের মধ্যে বিরল যে ক’জন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে এই অধম কলাম লেখকও একজন ছিলেন। কারণ, আমার তখন মনে হয়েছিল এবং এখনো মনে হয়, সশস্ত্র প্রতি-আক্রমণে গেলেই দেশের সর্বত্র প্রতিরক্ষা বাহিনীসহ সব ক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যেত- এবং পেছনে ফিরে দেখলে মনে হয়, বিডিআর বিদ্রোহ মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী নতুন অধিষ্ঠিত সরকারকে অস্থিতিশীল, চাই কি, উৎখাত করার ষড়যন্ত্রেরও হয়তো অংশ ছিল।

মানুষের চরিত্রের যত মাত্রাই থাক না কেন কিন্তু গূঢ়ভাবে সে একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই জীবন্ত থাকে। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো দেশপ্রেম অথবা বড় করে বললে দেশের মানুষের জন্য ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধু যেমন ৭ মার্চ যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হবে একটি বিরাট বিশ্ব-বৈধতার মধ্য দিয়ে, তেমনি শেখ হাসিনাও বিডিআর সংকটের সময় সহিংস থেকে অহিংস, এবং সামরিক পদক্ষেপ পরিহার করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কার্যকারিতায় বিশ্বাসী থেকে বিষয়টির সমাধানতো করলেনই, এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিচারকার্য সম্পন্ন করে অপরাধীদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন পর্যায়ের শাস্তির রায় বের করে আনলেন, যেগুলো এখন কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায়।

ঠিক সেই একই বাস্তবতাবোধ থেকে কিন্তু কৌশলের প্রকরণে ভিন্নতা এনে তিনি আরেকটা সংকট কাটালেন। যেখানে তিনি বিডিআর বিদ্রোহ দমন করেছিলেন রাজনৈতিকভাবে, সেখানে তিনি ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের মতিঝিল দখল সরালেন আধা ঘণ্টার একটি পুলিশি অভিযানে, এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের চরম অরাজক কর্মসূচির সময় ২০১৩ সালের শেষের ছয় মাস, এবং ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাস এমন একটি ধৈর্যপরীক্ষায় নামলেন, যার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ২৩ বছরের পাকিস্তান-জীবনের ধৈর্যের তুলনা চলে মাত্র। তাঁর রাজনৈতিক স্থৈর্যের চূড়ান্ত বিজয় হলো, যখন তিনি প্রায় একক সিদ্ধান্তে- বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের বৃহত্তর অংশের পরামর্শকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে এবং বিশ্ব-মুরব্বিদের শাসানির আঙুলকে অবজ্ঞা করে- ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত করলেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচিত সরকারকে সমর্থন জানাতে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো দেরি করল না।

একই দেশপ্রেমের সঙ্গে বাস্তবতাবোধ মিশ্রিত হয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি তিনি নিলেন যখন পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের প্রতিশ্রæতিবদ্ধ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো- বিশ্বব্যাংক, জাইকা প্রভৃতি তাদের মুখ ফিরিয়ে নিল। বাংলাদেশ তার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করবে- এটিই সিদ্ধান্ত হলো, এবং সে মোতাবেকই কাজ এগিয়ে চলছে।

৩.

আরেকটি প্রসঙ্গের অবতারণা করে বর্তমান লেখাটির উপসংহার টানব। সেটি হলো, বাস্তবতাজনিত দেশপ্রেম শুধু যে বঙ্গবন্ধু বা প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে নিস্তরঙ্গ পুকুরের মতো স্থির হয়ে রইল তা নয়, বরঞ্চ নেতা যেমন সমাজ নির্মাণ করেন তেমনি সমাজও নেতা নির্মাণ করে, এ পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ায় যে সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়, তারই কাঠামোয় ঢুকেছে বাংলাদেশ। এবং সে জন্য আপামর জনসাধারণের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা, উদ্যম, জ্ঞানচর্চা, গণমাধ্যম চর্চা, শিল্পচর্চা, ব্যবসাচর্চা, হোটেল-রেস্টুরেন্ট চর্চা, পর্যটন চর্চা এবং ক্রীড়াচর্চা সবগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক ধরনের দৃশ্যমানতা নিয়ে অগ্রযাত্রা করছে। এক অর্থে, আমাদের ক্রিকেটের উন্নতি সে সামগ্রিক উন্নতিরই সূচিকাসম প্রকাশ।

মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত হয়েছে, সেটিই দার্শনিক অর্থে বঙ্গবন্ধুর অবদান।

:: উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj