একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের খণ্ড স্মৃতি : অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ ২০১৬

২৫ মার্চের রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহাদতপ্রাপ্তদের দীর্ঘ তালিকায় বেশকিছু ছাত্র ও শিক্ষকের নাম এলো। মৃতের তালিকায় আমার নামও এলো। আসলে আমাকে মনে করে পাকিস্তান বাহিনী আমার এলাকার অপর শিক্ষক সরাফত আলীকে সে রাতেই হত্যা করেছিল।

ঘটনা হয়তো তদ্রƒপ ঘটত যদি পাকিস্তানিরা আমাকে হাতের কাছে পেত। আমি ছাত্রাবস্থায় স্বাধীনতা সংগ্রাম ও শিক্ষকাবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক মটিভেটর ছিলাম এবং শিক্ষকদের সপক্ষে ৩ মার্চ সকালেই স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপন করে তা সর্বসম্মতভাবে পাস করিয়েছিলাম। এই ঘটনার মূলেও ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৭১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্নে আমরা বঙ্গবন্ধুকে মোটামুটি হাস্যোজ্জ্বল দেখেছিলাম। সেদিন পূর্বাহ্নে কি দুপুরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড বঙ্গবন্ধুর সাথে তার ৩২ নম্বরের বাড়িতেই একটি একান্তÍ সাক্ষাৎকারে মিলিত হয়েছিলেন। দুপুরের পর তারই ভাগ্নে বিশিষ্ট যুবনেতা শেখ ফজলুল হক (মণি ভাই) আমাকে আওয়ামী লীগ অফিসে নিয়ে যাবার কিছু পরেই সেখানে বঙ্গবন্ধু হাজির হলেন। আমাদের দুজনকে হাত তুলে বললেন, ‘জয় বাংলার জয়।’ আরো বললেন, ‘যে সেনাপতি একটি গুলি খরচ না করেই যুদ্ধে জয়ী হতে পারে তার চেয়ে বড় সেনাপতি কি পৃথিবী কোনো দিন দেখেছে?’ কথাটি আমার মনে খটকা সৃষ্টি করল। তার হাস্যোজ্জ্বল ভাব দেখে ধরে নিলাম নিশ্চয় সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সাথে চূড়ান্তÍ কোনো ফয়সালা হয়ে যাচ্ছে, যেমনটি মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে হয়েছে। মণি ভাইও আমার মতোই অর্থারোপ করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে বঙ্গবন্ধু একটি টেলিফোন পেলেন এবং সাথে সাথে তার চেহারায় একটি অভূতপূর্ব পরিবর্তন দেখলাম। কেননা ফারল্যান্ড শর্তসাপেক্ষে আমাদের স্বাধীনতার ব্যাপারে সম্মত ছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সে শর্ত নাকোচ করে দিয়েছিলেন। উত্তেজিত নয়, প্রায় শান্তÍ কণ্ঠে বললেন, ‘মণি, আগামীকাল যদি ইয়াহিয়া খান কোনো ভাষণ দেয় তাহলে বুঝবি, রক্তপাত আর এড়ানো গেলো না। যুদ্ধ করেই স্বাধীনতা আনতে হবে। আমি তারও ব্যবস্থা রেখেছি।’

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে আমি কুমিল্লায় ছিলাম। সে রাতে আমাদের সাধ্যমতো প্রতিরোধ সত্ত্বেও শুধুমাত্র ক্যান্টেনমেন্টের নৈকট্যের কারণেই কুমিল্লার স্বাধীনতা এক রাতের জন্যও ধরে রাখতে পারিনি। সেনানিবাস থেকে বের হয়ে এসে পাকিস্তানি সৈন্যরা এলোপাতাড়ি গুলি চালায় ও পুলিশ লাইনে পরিকল্পিত হামলার মাধ্যমে কুমিল্লার কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়। কুমিল্লা বিমানবন্দরে পরদিন থেকেই কমান্ডো নামতে শুরু করে। পাকিস্তানিরা বিমানবন্দরের আশপাশে বোমা ও গুলিবর্ষণের মাধ্যমে ত্রাস ও হত্যার রাজত্ব কায়েম করে। তবুও আশপাশের এলাকাগুলোতে সংগঠিত হয়ে পুলিশ, তদানীন্তÍন ইপিআর ও আনসারের সহায়তায় কুমিল্লা উদ্ধারের প্রচেষ্টায় আমরা অনেকে শরিক ছিলাম। ক্রমশ আমরা পিছু হটতে লাগলাম।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের পরই গণপ্রতিরোধ ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং আমরা কেউ কেউ আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলাম বা ভারতের পথে বাড়ালাম।

১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল আমি কয়েকজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে গমন করি। আমাদের ধারণা ছিল সেখানে গেলেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সমর সরঞ্জাম পাওয়া যাবে। আমি একটি লুঙ্গি, কেরোলিনের হাওয়াই শার্ট ও এক জোড়া রাবারের স্যান্ডেল পায়ে ও মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে সোনামুড়া উপস্থিত হলাম। ভারতীয় সমর্থন, অস্ত্র ও ট্রেনিংয়ের জন্য ১১ দিন প্রায় অভুক্ত অবস্থায় বৃথা ছোটাছুটি করে দেশের অভ্যন্তÍরে আবার ফিরে এলাম। কিন্তু শেখ ফজলুল হক মণি আগরতলা পৌঁছেই আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি সহসাই আবার আগতলায় ফিরলাম।

মণি ভাই আমাকে জানালেন যে, পূর্বে গঠিত বিএলএফ এখন মুজিববাহিনী নামে আত্মপ্রকাশ করবে। আরো তিনি জানালেন যে, পূর্বাঞ্চল মুজিববাহিনীর মুখপত্র হিসেবে একটি সাপ্তাহিক প্রত্রিকা আপাতত বের করে তাকে পরবর্তীতে দৈনিকে রূপান্তÍর করা হবে। একটি বেতার কেন্দ্রও চালু হবে। সংবাদপত্র ও বেতার উভয় স্থানে আমাকে কাজ করতে হবে বলে তিনি আমাকে অন্য কোথাও যেতে বারণ করলেন। মণি ভাইয়ের কথাবার্তা থেকে স্পষ্ট বুঝলাম যুদ্ধটা সহসা শেষ হবে না। এরই মাঝে ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জহুর আহমদ চৌধুরী আমার শিক্ষকতার আয়োজন করলেও আমি পূর্বাঞ্চলেই থেকে গেলাম।

মুজিববাহিনীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ জড়ানোর আগে আমার কাজ ছিল ‘বাংলাদেশ’ প্রত্রিকার জন্য খবর সংগ্রহ করা, সম্পাদনা করা, ফিচার বা উপ-সম্পাদকীয় লেখা, প্রæফ দেখা ও মুদ্রণের তদারকি করা। এ সময়ে আমি আবুল হাসান চৌধুরী ছদ্মনামে সম্পাদনা, মোজাম্মেল হক চৌধুরী নামে উপ-সম্পাদকীয় বা ফিচার লিখতাম এবং আবদুল মমিন চৌধুরী নামে ‘বাংলাদেশ’ প্রথমে সোনামুড়া ও পরে আগরতলা থেকে প্রকাশ করতাম।

একদিন মুজিববাহিনীর সদর দপ্তরে ডাক পড়ল। গিয়ে দেখি কাগজে কলমে বিএলএফ থাকলেও অন্তÍরে মুজিববাহিনীর নাম ধরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মণি ভাই, দাদাভাই মানে মরহুম ইলিয়াস আহমদ চৌধুরীসহ অনেকে কাজে লিপ্ত। একদল তরুণ ট্রেনিং এবং আর একদল ইনডাকশনের প্রতীক্ষায় আগরতলায় গøাস ফ্যাাক্টরির পরিত্যক্ত ঘরে উদ্বিগ্ন দিন কাটাচ্ছে। এই প্রথম এক সঙ্গে মুজিববাহিনীর এত যোদ্ধা চোখে দেখলাম।

আগেই আমাদের কয়েকজন অস্ত্র চালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এ প্রশিক্ষণ নিয়ে আমরা এপ্রিল থেকে শুরু করে যোদ্ধা সংগ্রহ, বাছাই, ট্রেনিং, উদ্বুদ্বকরণ, ইনডাকশন, লড়াইয়ের পরিকল্পনা ও পরিচালনা করে আসছিলাম।

পূর্বাঞ্চল মুজিববাহিনীর শীর্ষ নেতা ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি। শেখ মণি তার শীর্ষস্থানীয় সহকর্মী হিসেবে তদানীন্তÍন ঢাকসুর ভিপি আবদুর রব, জিএস আবদুল কুদ্দুস মাখন, প্রাক্তন ছাত্রনেতা ডা. নূরুল হোসেন চঞ্চল, আবদুল মান্নান এবং ছাত্রলীগ নেতা এম এ রশিদকে বেছে নেন। তার টু আই সি বলতে যা বুঝায় তা ছিলেন তারই বায়োজ্যেষ্ঠ খালাত ভাই ইলিয়াছ আহমদ চৌধুরী (দাদা ভাই)। ইলিয়াস আহমদ চৌধুরীর সহকারী হিসেবে মুজিববাহিনীতে আমার প্রবেশ নিশ্চিত হয়। পরবর্তীতে ভাগ্যগুণে কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার থাকার কারণেই ইলিয়াস আহমদ চৌধুরীর অবর্তমানে তার দায়িত্বটি আমাকে দেয়া হয়েছিল।

পূর্বাঞ্চলে দায়িত্ব বণ্টনে কেউ পেলেন রিক্রুটমেন্টের দায়িত্ব, কেউ পেলেন ট্রেনিং, কেউ পেলেন ইনডাকশন, আবার কেউ পেলেন অস্ত্র, অর্থ ও রসদ সংগ্রহের দায়িত্ব। কারো দায়িত্ব হলো মটিভেশন বা প্রেষণা। এসবই ছিল মণি ভাইয়ের ইচ্ছাতে-অনানুষ্ঠানিক দায়িত্ব বণ্টন। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী তিনিই রইলেন। তবে তিনি অর্থ, অস্ত্র সংগ্রহ ও অপারেশন প্ল্যানিংয়ে আমাকে প্রথম থেকে ডাকতেন। আমাদের কিছু কেন্দ্রীয় জনসংযোগমূলক কার্যকলাপও চলত। শরণার্থী শিবির ছাড়াও মাঝে মাঝে যোদ্ধা সংগ্রহ, তদারকি ও সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন এলাকায় যেতে হতো। তদুপরি মণি ভাই কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘বাংলার বাণী’ এবং আমি পূর্বে উল্লিখিত ‘বাংলাদেশ’ সম্পাদনা করতাম। সেলের নিচে বসেও মাঝে মাঝে সম্পাদকীয় লিখতে হতো।

’৭১ সালে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে পূর্বাঞ্চলে রিক্রুট শুরু হয়। ট্রেনিং শেষে আমাদের প্রায় সব যোদ্ধাকে বাংলাদেশে পাঠানো হতো। গভীর রাতে বিভিন্ন গোপন পয়েন্ট দিয়ে আমরা ইনডাকশন করতাম। এসব যোদ্ধাকে শুধু ভারতে তৈরি অস্ত্র দেয়া হতো না। ভিয়েতনামের মতো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কায় আমরা অস্ত্রের অন্যান্য উৎসও খুঁজতে শুরু করলাম। একবার ইসরায়েল থেকে অস্ত্র দিতে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ীরা আমাকে অফার দিয়েছিল।

বিস্তারিত পরিকল্পনাভিত্তিক ট্রেনিংপ্রাপ্তদের বাংলাদেশের অভ্যন্তÍরে প্রেরণ করা হতো। ইনডাকশনের আগে গাইডরা আসত। তারা নিরাপদ আশ্রয়, রসদ ইত্যাদির ব্যবস্থা করে তবে নিয়ে যেতে আসত। অর্থের বিনিময়ে কোনো কোনো রাজাকার ইনডাকশনে সহায়তা করত।

সীমান্তের বিশ মাইলের মধ্যে আমাদের অপারেশনে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তাই অভ্যন্তÍÍরই ছিল আমাদের যোদ্ধাদের কর্মক্ষেত্র। দেশের অভ্যন্তÍরে এসে প্রতিটি দশজনের দলটির প্রথম কাজ ছিল জনগণের মাঝে মিশে যাওয়া। এলাকার প্রাকৃতিক নেতা হিসেবে তাদের জনগণের মন জয়ের ক্ষেত্র আগেই প্রস্তুত ছিল। তারা এখানে এসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করত; রসদ সংগ্রহের জন্য সাহায্যকারী রিক্রুট করত এবং যোগাযোগ উন্নতির জন্য খবর আদান-প্রদানকারী নিয়োগ করত। দশজনের একটি দলকে অপারেট করতে আরো প্রায় দশজন সহযোগীর প্রয়োজন হতো। ধীরে ধীরে দশজনের দল থেকে স্থানীয় রিক্রুট ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের নিয়ে বাইরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১ জনকে নেতৃত্ব দিয়ে দশজনের দশটি দল গঠন করা হতো। তাদের স্থানীয়ভাবে অস্ত্র সংগ্রহের দায়িত্বও দেয়া হতো। আমাদের প্রধান কৌশল ছিল ‘আঘাত কর, কেটে পড়’। ‘আঘাত হান ও পালাও’। আমাদের নির্দেশ ছিল যে প্রতি রাতে অন্তÍত কিছু গোলাগুলি করে হলেও শত্রুর নার্ভের ওপর আঘাত সৃষ্টি করা। নির্দেশ ছিল শত্রুর চর, শান্তিÍ কমিটি, রাজাকার, আলবদর বা এই জাতীয় স্থানীয় বাহিনীকে প্রতিনিয়ত চাপের মুখে রেখে শত্রুর যোগাযোগ ব্যবস্থা অকার্যকর করে তোলা। পুল, কালভার্ট, গ্যাস, বিদ্যুৎ বিনষ্ট, পানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং শত্রুর মনস্তাত্তি¡ক শক্তি ভেঙে দেবার নির্দেশও আক্ষরিকভাবে পালিত হয়েছে। আমাদের গেরিলাদের আরো কাজ ছিল জনমত সৃষ্টি ও তা ধরে রাখা। এসব কারণে অনেক এলাকায়ই অন্তÍত রাতের বেলায় আমাদের পুরোপুরি কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ অর্জিত হয়। প্রতি রাতে গুলির শব্দ, বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ, অতর্কিত হামলা ও দ্রুত অদৃশ্য হবার কারণে শত্রুপক্ষে প্রচণ্ড ভীতি ও কুসংস্কার বাসা বাঁধতে শুরু করে। ধীরে ধীরে শত্রু ও শত্রুর চররাও মুক্তিদের থেকে যতটা দূরে থাকা সম্ভব, ততটা দূরে অবস্থান করল।

সেপ্টেম্বর মাসে হঠাৎ করে আরবান গেরিলা যুদ্ধে বিশেষ প্রশিক্ষণ, কতিপয় অপরিচিত অস্ত্রের সাথে পরিচিতি, কমান্ডো ট্রেনিং এবং মুক্তাঞ্চল সৃষ্টি করে তাতে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের ডেকে পাঠানো হয়েছিল। বিমানে চড়ে গৌহাটি-শিলিগুড়ি হয়ে চারচুয়া বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম। তারপর ইন্দিরার জন্মস্থান শাহরানপুর হয়ে এক বিশাল জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সারা রাত ট্রাকে চেপে দেরাদুনে গিয়ে হাজির হলাম। যমুনার পাড়েই বলতে গেলে আমাদের জন্য তাঁবু ফেলা হলো।

আমাদের দলের সদস্যদের মধ্যে আমি ছাড়াও ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি, চট্টগ্রামের মান্নান, সিলেটের চঞ্চল, আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, আব্দুর রশিদসহ প্রায় ডজন খানেক মুজিববাহিনীর (বিএলএফ) সিনিয়র লিডার। পথে আবদুর রাজ্জাক দলবল নিয়ে একই বিমানে উঠলেন। সিরাজুল আলম খান ও তোফায়েল আহমদ পূর্বেই তাঁদের কেন্দ্রীয় কমান্ডের সদস্যদের নিয়ে দেরাদুনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন।

পরদিন ঘুম থেকে উঠে নাস্তার কাতারে দাঁড়িয়ে দেখি- আমাদের সংখ্যা ৮০ জনের কাছাকাছি। এ স্থানটি থেকে মুজিববাহিনীর সিনিয়র লিডার ট্রেনিং কেন্দ্র কালসি তান্দুয়া আরো দূরে। এপ্রিল থেকে তান্দুয়ায় সিনিয়র লিডার ও হাফলংয়ে জুনিয়র লিডার ট্রেনিং শুরু হয়। আমাদের বলা হতো সিনিয়র-মোস্ট লিডার- যাদের জন্য যমুনার পাড়ে পৃথক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এই দলে দুজন বয়োকনিষ্ঠ লিডার ছিলেন- একজন বঙ্গবন্ধু তনয় শেখ জামাল (মরহুম) ও অপরজন তাঁরই ভাগ্নে শেখ ফজলুর রহমান মারুফ। আমার সঙ্গে জামাল ও মারুফকে একই তাঁবুতে থাকতে দেয়া হলো। আমাদের জন্য মঙ্গোলীয় চেহারার এক যুবককে ব্যাটম্যান হিসেবে পাঠানো হলো। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ব্যাটম্যানের উপস্থিতি আমাকে বিব্রত করল। বিষয়টি আমি কর্নেল দাদার (কর্নেল পুরকায়স্থ) কাছে উপস্থাপন করলে তিনি আমার সামাজিক অবস্থান ও নেতৃত্বের অবস্থানের দোহাই দিয়ে ব্যাটম্যানটিকে রেখে দিলেন। আমাদের এই শর্ট ট্রেনিং শেষ হবার সাথে সাথে আমরা আবারো আগরতলায় ফেরত এলাম।

সেপ্টেম্বর মাসেই প্রতীয়মান হলো যে যৌথবাহিনী গঠিত হচ্ছে। আমাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও যখন বুঝা গেলো যে যুদ্ধে যৌথ কমান্ড গঠিত হচ্ছে তখন আমাদের অধিনায়ক শেখ ফজলুল হক মণি মুজিববাহিনীকে দিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের একটি এলাকা দখল করে সেখানে মুজিবনগর সরকারকে নিয়ে আসার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। সে মোতাবেক শীর্ষস্থানীয় ও সুশিক্ষিত এক বাহিনী নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশের সিদ্ধান্তÍ হয়। এই অভিযানে যেতে আমি জেদ ধরে বসি। মণি ভাই আমাকে নিতে নারাজ ছিলেন। তার কতিপয় অকাট্য যুক্তি ছিল। তর্ক-বিতর্ক শেষে তিনি একটি যুক্তিতে আমাকে ঘায়েল করলেন। যুক্তিটা হলো তুমি তোমার বিধবা মায়ের একমাত্র পুত্রসন্তÍান, অতএব তোমাকে আমরা হারাতে পারি না। অন্তÍত যুদ্ধ জয়ের পর তোমাকে আমাদের অনেক প্রয়োজন। আমাকে সেক্টর দেখাশুনার দায়িত্ব ও যৌথ কমান্ড গঠিত হলে তাতে মুজিববাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করার নির্দেশ দিয়ে গেলেন। এই সময় থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্তÍ আমি পূর্বাঞ্চল মুজিববাহিনীর দায়িত্বে ছিলাম ও যৌথবাহিনীর সাথে সমন্বয়ের কাজটিও করেছি।

৮ তারিখে কুমিল্লা শহর মুক্ত হবার সাথে সাথে আমরা গুপ্তহত্যা, লুটতরাজ বা দালাল ধরে টাকাপয়সা আদায়ের পথগুলো বন্ধ করতে তৎপর হলাম। শহরের প্রবেশ পথগুলোতে আমাদের ছেলেদের দিয়ে চেকপোস্ট বসানো হলো। আমি, তাহের, রুস্তম, পাখী, আলী ইমাম, কেনু ভাই, হিরন, কাশেম ও সেলিমসহ অনেককে নিয়ে চেকপোস্টগুলো পরিদর্শন করতাম। সেনানিবাসকে ঘিরে থাকা আমাদের গেরিলা ইউনিটগুলোকে রাতের বেলা দেখতে যেতাম। একদিন নিজেদের বাহিনীর অ্যামবুশে নিজেরা পড়ে গিয়ে প্রায় শেষ হবার জোগাড় হয়েছিল। ভারতীয় বাহিনীর সাথেও দু’এক জায়গায় ভুল বুঝাবুঝির সূচনা হলো।

মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা যখন শহরে ঢুকল তখন জাতিধর্মনির্বিশেষে তাদের দেখার জন্য মানুষের ঢল রাস্তায় নামল। মানুষের ভালোবাসা ও ঘৃণা যে কত গভীর হয় তা এই যুদ্ধে দেখলাম। দোকানগুলোতে ভারতীয় মুদ্রায় কেনাবেচা শুরু হলো। ৮ তারিখে সিভিল প্রশাসন প্রতিষ্ঠা হবার কথা থাকলেও তা বিলম্বিত হলো। তখন থানাতে বা পুলিশ লাইনে পুলিশ ছিল না। ভয়ে ভয়ে সরকারি কর্মচারীরা গৃহে অবস্থান নিল। প্রশাসন না থাকলেও চুরি-ডাকাতি-হার্মাদি দেখা গেলো না। আমরা কুমিল্লার রাজবাড়ীতে আমাদের সহযোগী ভারতীয় ইউনিটটির অফিসের ব্যবস্থার করলাম ও নিজেরা আকবর কবিরদের বাড়িতে অফিস স্থাপন করলাম। এখানে অফিসে অনবরত লোকজন আসতে লাগল। চলাচলের জন্য পাস ইস্যুর প্রয়োজন ছিল। কবির কোনো এক প্রেস থেকে আমার নামে একটি প্যাড ছাপিয়ে আনল। সে প্যাডে বিভিন্ন নির্দেশ, পরামর্শ বা চলাচলের হুকুম দিতে শুরু করলাম। এভাবে একটা সিভিল প্রশাসন নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা হলো। আনুষ্ঠানিকভাবে এডভোকেট আহমদ আলীকে সিভিল প্রশাসনের দায়িত্ব দেয়া হলেও তিনি সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িত ছিলেন না বলে সশস্ত্র ব্যক্তিদের সামলিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা তার জন্য দুষ্কর হলো। তিনি আমাকে সাথে নিলেন। কুমিল্লাতে আমি খুব পরিচিত না হলেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একটা পরিচয় গড়ে উঠেছিল। প্রশাসনের লোকরা শ্রেণি নৈকট্যের কারণে আমার কাছ থেকে পরামর্শ নেয়া পছন্দ করতেন। কয়েকদিনের মধ্যে জেলা প্রশাসনের সব ধরনের কর্মচারীদের এক সভায় আমি ও আহমদ আলী সাহেব ভাষণ দিলাম। আমাদের মতো করে স্বাধীন দেশে সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব কি তা উল্লেখ করে বক্তব্য রাখলাম। বিস্তারিত দায়দায়িত্ব তখন সবাইকে বুঝাতে পারিনি বলে সেদিন থেকে তাদের কাছ থেকে অনবরত টেলিফোন কল পেতে লাগলাম। শেষ পর্যন্তÍ রাজবাড়ীর পুকুর পাড়ে আকবর কবিরদের বাসাটি প্রশাসনিক সদর দপ্তরে পরিণত হলো। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে কয়েকদিনের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটিতে পুনরায় যোগ দেই।

:: মুক্তিযোদ্ধা ও উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj