সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭ দফা আমলে নেয়া জরুরি : নিতাই চন্দ্র রায়

বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ ২০১৬

ত্রিশাল পৌর এলাকার শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ জমির মালিক ছিল গোয়াল পাড়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। গোয়ালরা ছিল অলস ও দুর্বল প্রকৃতির। তারা নিজেরা নিজেদের জমি চাষাবাদ করত না। আশপাশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা এসব জমি বর্গা নিয়ে আবাদ করত। বর্গা চাষিরা উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক নিজেরা নিত, বাকি অর্ধেক দিত জমির মালিকদের। গোয়ালদের নেতা ছিলেন অবিনাশ মোড়ল। অবিনাশ মোড়লকে এলাকার মানুষ খুব শ্রদ্ধা করতেন ও ভালোবাসতেন। তিনি ছিলেন প্রচুর জমিজমা ও টাকাপয়সার মালিক। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তার বিরাট প্রভাব ছিল। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর গোয়ালদের মনোবল ভেঙে পড়ে। তারা ভারতে পারি জমানোর জন্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করতে শুরু করে। এই সুযোগে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের স্থানীয় নেতারা তাদের জমিজমা ও বাড়ি-ভিটা পানির দামে কিনে নেয়। সামান্য টাকাপয়সা হাতে ধরিয়ে গলা ধাক্কা দিয়ে ভারতে পার করে দেয়। এ কারণে অবিনাশ মোড়ল ভারত যাওয়ার প্রাক্কালে তার বসতবাড়ি আওয়ামী লীগের নেতা আবুল হোসেনকে দলিল করে দিয়ে যান। ফলে ওই বাড়ির দখল নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা আবুল হোসেন ও মুসলিম লীগের নেতা আব্দুর রশিদ চেয়ারম্যানের লোকজনের মধ্যে শুরু হয় প্রচণ্ড সংঘর্ষ। আমি স্বচোখে সেই সংঘর্ষ, মারামারি ও হানাহানির দৃশ্য দেখেছি। জমির জন্য মানুষ যে এত হিংস্র হতে পারে, নিষ্ঠুর ও নির্দয় হতে পারে। দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রতিবেশীর সঙ্গে এত খারাপ আচরণ করতে পারে তা আমার জানা ছিল না। গোয়ালদের মধ্যে দুই সহোদর; পরিমল ও গৌরাঙ্গ গোপের ছিল অনেক জমাজমি। মুসলিম লীগের সন্ত্রাসীরা একদিন পরিমল ও গৌরাঙ্গ গোপকে পিস্তলের মুখে হাইজ্যাক করে নিয়ে যায়। গোপন স্থানে আটকে রেখে সব সহায়-সম্পত্তি দলিল করে নেয়। তারপর এক কাপড়ে হাতে কিছু টাকাপয়সা দিয়ে ভারতে পার করে দেয় তাদের পরিবার-পরিজনকে। তারা এখন সব সহায়-সম্পদ হারিয়ে কোচবিহারের ময়নাকুড়িতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ ধরনের ঘটনা ভূতপূর্ব পূর্ব পাকিস্তানে যে কত ঘটেছে তার হিসাব নেই। এই ছিল হিন্দু-মুসলিম মিলনের অগ্রদূত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রে হিন্দুদের স্বাধীনতা ও সমঅধিকার। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে কি এভাবে ভূমিপুত্রদের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করা হয়? তারপরের ইতিহাস আরো বর্বর আরো নিষ্ঠুর আরো মর্মান্তিক। ধর্মের নামে অন্যায়ভাবে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষগুলোকে সর্বস্বান্ত করার জন্য ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত সব হিন্দুদের জমি শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার। এতে হিন্দুদের মেরুদণ্ড একেবারে ভেঙে যায়। তারা অর্থনৈতিকভাবে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তারপর ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে হানাদার পাকসেনা, আলবদর ও রাজাকারদের হাতে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয় হিন্দুরা। জানা যায়, স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের মধ্যে ২৩ লাখই ছিল হিন্দু এবং ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটি শরণার্থীর শতকরা ৬০ ভাগ ছিল সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।

পাকসেনাদের মনে এরকম এক ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, ভারতের প্ররোচনায় আওয়ামী লীগ ও হিন্দুরা এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের নামে নাশকতা সৃষ্টি করছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, প্রভাতফেরি ও শহীদ মিনারে ফুল দেয়ার এই সংস্কৃতির জন্য হিন্দুরাই দায়ী। তাই শহর-বন্দর ও গ্রামগঞ্জ খুঁজে খুঁজে হিন্দুদের হত্যা করেছে, ধর্ষণ করেছে হিন্দু নারীদের পাকপশুরা। রাজাকার আলবদররা অসহায় হিন্দুদের বাড়িঘর, দোকানপাটে আগুন দিয়েছে এবং লুটপাট করেছে তাদের সহায় সম্পদ।

১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে এ দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সমতল ও পাহাড়ের সব মানুষ জীবনবাজি রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে পাকিসেনাদের বিরুদ্ধে। শরণার্থী শিবিরের এক তাঁবুর নিচে বাস করেছে নয় মাস। ১৬ ডিসেম্বরে বিজয় দিবসে আনন্দে আত্মহারা হয়ে এক সঙ্গে উল্লাস করেছে সব সম্প্রদায়ের মানুষ। তখন এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ভাবতে পারেনি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু নির্যাতন হবে। চিরিরবন্দরের বলাই বাজারে মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের শত শত বাড়িঘরে আগুন দেয়া হবে। রামুর বৌদ্ধবিহার পুড়িয়ে দেয়া হবে। যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘুদের ওপর নেমে আসবে নারকীয় নির্যাতন? কেউ কি ভাবত ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সারা দেশে হিন্দুদের ওপর এমন তাণ্ডব মেতে উঠবে বিএনপি ও জামায়াত। কেউ কি জানত ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও সাতক্ষীরায় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালাবে নোংরা রাজনীতির নামে দুর্বৃত্তরা?

একটি স্বাধীন দেশে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। এর অবসান হওয়া প্রয়োজন। সময় এসেছে এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। ১৯৬৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া প্রমুখ নেতারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে রুখে দাঁড়ানোর জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়ে ছিলেন। মহাত্মা গান্ধী অনশন করে ছিলেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধের জন্য।

আর এবার সেই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক নির্যাতন বন্ধ করে রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যথাযথ অংশীদারিত্ব ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাসহ ৭ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। সে সঙ্গে সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের কল্যাণে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠারও দাবি জানানো হয়। গত ৪ ডিসেম্বর (২০১৫), ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সমাবেশ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সমাবেশে সাত দফা দাবি পেশ করেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর জন্য ৬০টি আসন বরাদ্দ করা, সাংবিধানিকসহ প্রশাসনের সর্বস্তরে ২০ শতাংশ পদ রিজার্ভ রাখা, সংবিধানের ১২নং অনুচ্ছেদ বিলোপ করে ১৯৭২-এর সংবিধানে ফিরিয়ে আনা, সংখ্যালঘুদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করা, সংখ্যালঘুদের উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা, আদিবাসী ও নিম্ন সংখ্যালঘুদের জন্য ভূমি ও কাজ নিশ্চিত করা, সংখ্যালঘুদের সমস্যা সমাধানে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা এবং দেবোত্তর সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়া ইত্যাদি।

সমাবেশে বক্তাদের অভিযোগ ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ছিল মোট জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ, ১৯৭১ সালে ছিল ২১ শতাংশ এবং বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। দেবোত্তর সম্পত্তি জোর করে দখল করে নিচ্ছে। জমিজমা জবরদখল করা হচ্ছে। মন্দির, গির্জা, মণ্ডপে ভাঙচুর চালাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। কিন্তু প্রশাসন এসব দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তার করে আইনের আশ্রয়ে আনছে না। ফলে সংখ্যালঘু নির্যাতন দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে একদিন সংখ্যালঘুরা এ দেশে চরম নিরাপত্তাহীনতা বোধ করবে। সংখ্যালঘু-শূন্য হয়ে যাবে বাংলাদেশ। এ ব্যাপারে সাবেক মন্ত্রী ও সাংসদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৪ বছর পার হলেও আজো সংখ্যালঘুদের আকাক্সক্ষা পূরণ হয়নি। এখনো তারা প্রতিনিয়ত নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। বিষয়টি সরকার ও রাজনীতিবিদরা জানে না এমন নয়। আইয়ুব, জিয়া ও এরশাদ সরকারসহ প্রতিটি সামরিক সরকারের মন্ত্রিসভায় সংখ্যালঘুদের থেকে মন্ত্রী থাকলেও বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারে তা নেই।’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অপমৃত্যুর কারণে দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর প্রতিবিপ্লবীরা যে চেতনা প্রতিষ্ঠিত করে গেছে, সেই চেতনায়ই চলছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু কন্যা সাত বছর ক্ষমতায় থাকার পরও সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়ন হয়নি। সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অর্পিত সম্পত্তির সুরাহা হয়নি। তাই রাষ্ট্রের বৃহত্তর কল্যাণে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়ন ও সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাত দফা দাবির বিষয়টি সরকারকে সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করতে হবে। সেই সঙ্গে দেশে সংঘটিত সব সাম্প্রদায়িক হামলার বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। প্রতিটি জেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের জানমাল ও সহায় সম্পদ এবং মানসম্মান রক্ষার জন্য পুলিশ, বিডিআর ও র‌্যাবের যৌথ উদ্যোগে স্ট্রাইকিং ফোর্স গঠন করতে হবে। দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সাম্প্রদায়িক হামলার সময় সাহসের সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে এবং দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের এসব ঘটনা প্রতিরোধের দায়িত্ব দিতে হবে। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াকে রাখতে হবে যথাযথ ভূমিকা।

:: কৃষিবিদ, লেখক।

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj