বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বাক-স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র

বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ ২০১৬

আবদুর রশীদ

আমাদের দেশের প্রায় সবাই বলে থাকেন- ক) বাংলাদেশের স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা হচ্ছে- গণতন্ত্র। খ) আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতন্ত্রের অনুশীলন না থাকার কারণে সামাজিক বা রাজনৈতিক সমস্যাসমূহের সমাধান করা যাচ্ছে না। গ) আমাদের সমাজের মূল সমস্যা গণতন্ত্রহীনতা। এ কথাগুলোর কোনোটাই সর্বাংশে সত্য নয়। উপরোক্ত বিষয়সমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনার দাবি রাখে।

প্রথমেই দেখতে হবে- গণতন্ত্র বলতে আমরা কি বুঝি? বাক-স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র হচ্ছে- ‘একটা নির্দিষ্ট সময়ের’ এবং ‘নির্দিষ্ট মানব সমাজের’ প্রতিষ্ঠিত বা প্রচলিত সামাজিক আইনকানুন বা নিয়ম মান্য করার বাধ্যবাধকতা, অন্যের অধিকারের বিষয়ে সচেতনতা, উপলব্ধি এবং দায়িত্ববোধও। অন্যভাবে বললে গণতন্ত্র হচ্ছে- পরিমাপক বা দাড়িপাল্লা। সমাজ-পরিমাপক বললে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। আমাদের দেশের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী ‘গণতন্ত্র বলতে’ বাক, ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে বুঝায়। এখানেই আমার প্রশ্ন- সবার বলার স্বাধীনতা থাকতে হবে। স্বাধীনতা দিলাম কিন্তু ‘কি বিষয়ে বলবেন’ এবং ‘কতটুকু বলবেন’? অর্থাৎ প্রথমে আপনাকে বলার ‘বিষয়বস্তু’ ঠিক করতে হবে, আপনি ইচ্ছা করলেই যে কোনো বিষয়ে বলতে পারবেন না। বিষয়বস্তু ঠিক হওয়ার পর ওই বিষয়ে আপনি কতটুকু বলবেন বা বলতে পারবেন? ইচ্ছা করলেই আপনি ‘যা খুশি তা’ বলতে পারেন না।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, অর্থনৈতিক সমতাভিত্তিক ও মৌলিক মানবাধিকার সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য। আপনি যদি বলতে থাকেন বা বলতে চান- বাংলাদেশ হচ্ছে মুসলিম জাতীয়তাবাদী-ইসলামিক প্রজাতন্ত্র, তাহলে কি আপনার বলার অধিকার তথা বাক-স্বাধীনতা থাকবে? নাকি থাকা উচিত হবে? তাহলে বিষয়টি কি দাঁড়ালো? আপনি ‘চলার বা বলার’ অধিকার ভোগ করবেন- এটা এক ধরনের বায়বীয় বিষয়। মূল বিষয় হচ্ছে- আপনি কোন বিষয়ে বলবেন বা বলতে পারবেন এবং কতটুকু বলবেন বা বলতে পারবেন- এটা আগে ঠিক করে নিতে হবে। তারপর অধিকারের বা প্রয়োগের বিষয়টি আসবে।

আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন- এটা আপনার গণতান্ত্রিক এবং নাগরিক অধিকার। কিন্তু আপনি যে সমাজের বা দেশের রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন, সে সমাজের বা দেশের রাস্তা দিয়ে হাঁটার কিছু নিয়মকানুন থাকে- অবশ্যই আপনাকে তা মেনে হাঁটতে বা চলতে হবে। কোনোভাবেই আপনি নিয়ম না মেনে হাঁটতে বা চলতে পারবেন না। যদি তা করেন বা করার চেষ্টা করেন- তাহলে হয় দুর্ঘটনা ঘটবে- নতুবা অন্যের অসুবিধা হবে। এখানে স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র হচ্ছে আপনি যে দেশের রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন সে দেশের রাস্তা দিয়ে হাঁটার নিয়মকানুন মেনে চলার দায়িত্ববোধ। ঠিক একইভাবে আপনি কথা বলবেন বা সমালোচনা করবেন বা আদেশ-উপদেশ দেবেন- কিসের ভিত্তিতে।

যদি প্রশ্ন হয়- কি কি কারণে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল- অর্থাৎ জন্মের উল্লেখযোগ্য কারণগুলো কী কী? সংক্ষেপে এবং সংবিধান অনুযায়ী এখানে উত্তর হবে- বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, অর্থনৈতিক সমতাভিত্তিক ও মৌলিক মানবাধিকার সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য। তাহলে আমরা কি উপরোক্ত বিষয়গুলো মেনে ‘চলা-বলার’ কাজটি করেছিলাম বা বর্তমানেও করছি? এখানে আমার উত্তর হবে- ১৯৭৫ সালের পর থেকে আমরা এর ‘উল্টোটাই’ করে এসেছি এবং বর্তমানেও করে যাচ্ছি। বাংলাদেশের জন্মের পর সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে ‘চলা-বলার’ জন্য কিছু নিয়মকানুন তৈরি হয়েছিল- যাকে ’৭২-এর সংবিধান বলা হয়। আমরা কি এখনো এটা মেনে চলছি? না, আমরা একেবারেই মান্য করিনি বরং এর উল্টোটাই করেছি এবং এখনো করে যাচ্ছি। উপরোক্ত বিষয়গুলোর সঠিক উত্তরের আলোকেই আমাদের দেশে গণতন্ত্রের ব্যবহার বা প্রচলন হতে হবে। অর্থাৎ যে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছিল- তা যথাযথভাবে মেনে চলাই হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্র। গণতন্ত্র কায়েম অথবা বাস্তবায়ন করা যায় না অথবা বাস্তবায়ন করার বিষয়ও নয়। গণতন্ত্র হচ্ছে- নির্দিষ্ট সময়ের, নির্দিষ্ট মানব সমাজ বা রাষ্ট্র কর্তৃক নির্দিষ্ট করে দেয়া নিয়মকানুন বা আচার-আচরণসমূহ সঠিক এবং সুন্দরভাবে মেনে চলা এবং বলা। আমাদের ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের’ জন্মের কারণ, উদ্দেশ্য এবং রাষ্ট্র কর্তৃক নির্দিষ্টকৃত আইন বা নিয়মকানুনসমূহ অর্থাৎ আমাদের ’৭২-এর সংবিধান মেনে চলাই হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্র। স্বাধীনতা অর্জনের ৪০ বছর পরেও আমাদের উচ্চ আদালতের রয়ে একই নির্দেশনা বেরিয়ে এসেছে এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওই রায় মান্য করাই হচ্ছে- বাংলাদেশের জন্য ‘গণতন্ত্র’ এবং অমান্য করা হচ্ছে ‘গণতন্ত্রহীনতা’। গণতন্ত্রহীনতার কথা যারা বলেন তারা নিশ্চয় তাদের ভুল শুধরে নেবেন। বলতে হবে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কর্তৃক নির্দিষ্টকৃত আইন বা নিয়মকানুনসমূহ সঠিকভাবে অথবা সংবিধান মোতাবেক মেনে চলাই হচ্ছে গণতন্ত্র। ওই আইন বা নিয়মকানুনসমূহ সঠিকভাবে মেনে চলা বা বলা হচ্ছে, নাকি হচ্ছে না- এটাই দেখার বিষয়।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতিদের হত্যা করে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুন পরিবর্তন করা গণতন্ত্র নয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাষ্ট্র কর্তৃক নির্দিষ্টকৃত নিয়মকানুনসমূহ অগণতান্ত্রিকভাবে পরিবর্তন করার পরও কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। উল্টো প্রায় সবাই ‘অগণতান্ত্রিক-সামরিক সরকারের’ কাছ থেকে ‘সুবিধা নেয়ার প্রতিযোগিতায়’ লিপ্ত ছিলেন। এখানে আমি অনেক স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সুশীল সমাজ নামধারী ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করতে পারি- যারা বর্তমানে গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত। এত রক্ত ও ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত একটি দেশের চরিত্র বদলে দেয়ার পরও উপরোক্ত বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজ নামধারী ব্যক্তিদের মুখ থেকে কোনোরকম প্রতিবাদ আসতে দেখা যায়নি। ওই ঘটনা এটাই প্রমাণ করে না যে, আমাদের দেশের স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজ নামধারী ব্যক্তিরা প্রকারান্তরে ‘স্বাধীনতা ও মুক্তির চেতনা বিরোধী’ ছিলেন এবং এখনো আছেন? শুধু গণতন্ত্রের মুখোশ পরে নিরপেক্ষতার ভান করছেন মাত্র।

১৯৪৮ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের বাঁকে বাঁকে অর্থাৎ ৫২, ৫৪, ৫৮, ৬২, ৬৫, ৬৬, ৬৮, ৬৯, ৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের অর্জনগুলো নিম্নরূপ- ক) মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিপরীতে, স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ তথা ‘স্বাধীন বাঙালি জাতি-রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা। খ) গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করে অর্থনৈতিক সমতাভিত্তিক তথা সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাওয়া। গ) ধর্মনিরপেক্ষতা তথা অসাম্প্রদায়িক, মানবিকতা সমৃদ্ধ এবং সব ধর্ম-বর্ণের বসবাস উপযোগী ‘বাঙালি সমাজ বা রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা। উপরোক্ত বিষয়গুলোই হচ্ছে- আমাদের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা আকাক্সক্ষা। এর মধ্যে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ হচ্ছে- আমাদের স্বাধীন বাঙালি রাষ্ট্রের বা সমাজ ব্যবস্থার ‘মেরুদণ্ড’। আওয়ামী লীগ উপরোক্ত চেতনার মূল ধারক- বিশেষ করে অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম মূল ধারক এবং স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও কিছু ভুলভ্রান্তিসহ আওয়ামী লীগ এখনো সে চেতনাকে ধারণ করে আছে।

আমাদের সংবিধানের মূল বক্তব্য বা প্রস্তাবনা নিম্নরূপ- (উপরোক্ত ‘খ’ অনুযায়ী) ‘আমরা আরো অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে- গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য- আইনের শাসকগণ, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে’। বর্তমান বাংলাদেশের মূল সমস্যা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নয়। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের উপরোল্লিখিত চেতনাসমূহের বাস্তবায়ন। অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমতাভিত্তিক অর্থব্যবস্থা, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা অসাম্প্রদায়িকতা এবং মানবিকতা সমৃদ্ধ সমাজ গঠন বা বাস্তবায়ন।

‘গণতন্ত্র’ যদি মত প্রকাশের স্বাধীনতা হয়, তাহলে প্রশ্ন আসবে- ক) কোন সমাজে বা দেশে, কী মতামত প্রকাশ করবেন? বাংলাদেশের বা বাঙালি সমাজের মতামত? খ) বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে কোনো মতামত প্রকাশ করা যাবে কি? বা প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত হবে কি? গ) সেই স্বাধীনতা থাকলে- সেটা গণতান্ত্রিক হবে কি? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে ‘গণতন্ত্র’ হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট দেশের বা সমাজের মূলনীতি বা অস্তিত্বকে ‘সুরক্ষা এবং সম্মান’ করে তা বিকশিত করার প্রক্রিয়া, পদ্ধতি বা মতামত। সমাজের বা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ধ্বংস করে বা হুমকিযুক্ত করাকে ‘গণতন্ত্র’ বলে না। এ রকম মতামত বা কর্মকাণ্ড গণতন্ত্র সম্মতও নয়। সুতরাং গণতন্ত্র- সময়, দেশ, জনপদ এবং সত্যের সমন্বয়। ওই সময়, দেশ এবং জনপদের শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ওপরও গণতন্ত্র নির্ভরশীল। অর্থাৎ ক) একটা নির্দিষ্ট সময়ে- সমাজের ক্রমবিকাশের পর্যায় বা অবস্থান। খ) একটা নির্দিষ্ট দেশের- আর্থ-সামাজিক অবস্থান। গ) একটা নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট দেশে বা জনপদের- অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশের পর্যায় বা স্তর। ঘ) মোটকথা বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্র হচ্ছে- বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সত্য, সুন্দর, প্রগতিশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতা, অর্থনৈতিক সমতাভিত্তিক এবং মৌলিক মানবাধিকার সমৃদ্ধ সমাজের পক্ষে কথা বলা বা অবস্থান নেয়া। এর বিপরীতটাই হচ্ছে গণতন্ত্রহীনতা। সুতরাং গণতন্ত্রকে ব্যাখ্যা করতে হলে বা বুঝতে হলে উপরোক্ত বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে বুঝতে হবে। আমাদের দেশে সাধারণত গণতন্ত্র বলতে যে কোনো প্রকার মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভোট প্রদানকেই বুঝানো হয়ে থাকে- অর্থাৎ যার যা খুশি তাই করা বা বলা। এটা মোটেও পরিপূর্ণ গণতন্ত্র নয়। একটা অবুঝ শিশু বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলের হাতে ‘আগুন বা আগ্নেয়াস্ত্র’ প্রদান করলে যে রকম বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে- উপরোক্ত বিষয়সমূহ বিবেচনায় না নিলে সমাজেও একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হতে বাধ্য। বর্তমানে আমাদের সমাজেও সে রকম পরিস্থিতি বিরাজমান। গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে, গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলে বা গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনের বিরুদ্ধে অবলীলায় মিথ্যা প্রচার-প্রপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। সত্য, সুন্দর এবং প্রগতিশীলতাকে প্রতিষ্ঠিত এবং এগিয়ে নিতে শুধুমাত্র ‘অবুঝ গণতান্ত্রিক মত প্রকাশ’ দিয়ে সম্ভব নয়। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে এবং বৈজ্ঞানিক ও তথ্যপ্রযুক্তি সমৃদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের মাধ্যমেই প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চেতনা সমৃদ্ধ করা সম্ভব। তাই প্রকৃত অর্থেই ‘প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চেতনা সমৃদ্ধ’ সমাজ গড়ে তুলতে হলে জাতিকে সামাজিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে এবং এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে- বিজ্ঞানভিত্তিক, তথ্যপ্রযুক্তি সমৃদ্ধ, আধুনিক, সার্বজনীন এবং একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন। ওই পদ্ধতির দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনের মাধ্যমেই সমাজ গণতান্ত্রিক পথে অগ্রসর এবং বিকশিত হতে সহায়ক হবে। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সমাজে একটা নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক করা- যেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করার এবং এগিয়ে যাওয়ার সূচনা করা যায়। ওই স্থান বা বিষয় নির্দিষ্টকরণ ব্যতিরেকে, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা কোনোভাবেই শুরু করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের জন্য সে জায়গাটা হচ্ছে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা- তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং অসাম্প্রদায়িকতাকে ধারণ, লালন এবং বিকশিতকরণ। এক কথায় ’৭২-এর সংবিধানকে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার সূচনা করার মধ্য দিয়েই তা সম্ভব। সংবিধানকে ‘যুগোপযোগী’ করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে তাও করা যেতে পারে।

সর্বশেষে আমার মতে, বর্তমান বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্র হচ্ছে- ক. আফগান-পাকিস্তান মার্কা সনাতনী, ধর্মভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিপরীতে স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ তথা বাঙালি সংস্কৃতিভিত্তিক সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লড়াই। খ. ধর্মনিরপেক্ষতা তথা অসাম্প্রদায়িক এবং মানবতাবাদী বাঙালি সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই বা আন্দোলন। গ. আমাদের সংবিধান মোতাবেক গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করে সমতাভিত্তিক তথা সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাওয়ার লড়াই। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা সম্পর্ক বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।

:: মুক্তিযোদ্ধা, সমাজবিজ্ঞানী।

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj