চা শ্রমিকদের ভূমি রক্ষায় আন্দোলন : মোহন রবিদাস

বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ ২০১৬

বাংলাদেশের ১৫ লাখ চা জনগোষ্ঠী প্রায় ১৮০ বছর ধরে বাংলাদেশে বসবাস করলেও এখন পর্যন্ত ভূমির অধিকার পায়নি। বলা যায়, নিজভূমে পরবাসী। চা শ্রমিকরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাত্র ৬৯ টাকার বিনিময়ে কাজ করে, যা দিয়ে তাদের সংসার চলে না। তাই তাদের ধান ও শাকসবজি চাষাবাদ বাড়তি রোজগার। কিন্তু তাদের কোনো জমির কাগজপত্র বা রেজিস্ট্রেশন না থাকার কারণে এই কৃষি জমিগুলো দেশের প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে। যেখানে চা বাগানগুলোতে জমি দখলের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে।

হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার চান্দপুর-বেগমখান চা বাগানের ১২৫০ জন চা শ্রমিক পরিবারের ৫১১.৮৩ একর কৃষি জমিতে ‘স্পেশাল ইকোনমিক জোন’ স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ’ (বেজা)। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এ ব্যাপারে চা শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন তো দূরের কথা তাদের ন্যূনতম জিজ্ঞাসাবাদও করেনি বেজা।

যে কারণে চান্দপুর-বেগমখান চা বাগানের চা শ্রমিকরা ‘স্পেশাল ইকোনোমিক জোন’ স্থাপনের প্রতিবাদে আন্দোলন-সংগ্রাম করছে।

যেখানে ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশে এই ‘স্পেশাল ইকোনোমিক জোন’ স্থাপন বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে সেখানে কেন নিরীহ চা শ্রমিকদের কৃষি জমিকে ধ্বংস করে এই জোন স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। ভারতের সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, গুরগাঁও, মুম্বাই, গোয়া, মহারাষ্ট্র, উড়িষ্যার আন্দোলনগুলো এবং বাংলাদেশের আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর বানানো ও ফুলবাড়ি কয়লাখনি থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রতিবাদে যে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠেছিল সেটিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চা শ্রমিকদের জমি কেড়ে নিয়ে জোর-জবরদস্তি স্থাপন করছে এই ইকোনমিক জোন। বেজা হয়তো বা মনে করেছিল চা শ্রমিকরা যেহেতু নিরীহ প্রকৃতির, অধিকারের প্রশ্নে উচ্চকণ্ঠ হয় না এবং তারা সচরাচর আন্দোলন-সংগ্রাম করে না তাই তারা (বেজা) প্রস্তাবিত ১০০টি ইকোনমিক জোনের প্রথম জোনটি চা শ্রমিকদের জমির ওপর করতে সফল হবে। কিন্তু চা শ্রমিকরা আজ তাদের দাবি আদায়ে সোচ্চার হয়েছে। ‘আমার মাটি, আমার মা কেড়ে নিতে দেবো না’- স্লোগানকে বুকে ধারণ করে তারা গণ-প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে বেজা তাদের বলছে ‘উন্নয়নবিরোধী’। নিজের কৃষি জমি ও বসতবাড়ি অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয়া রোধ করা কি ‘উন্নয়নবিরোধী’ কর্মকাণ্ড?

চান্দপুর-বেগমখান চা বাগানের যে ৫১১.৮৩ একর কৃষি জমিকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার ভূমি অফিসের দখলনামায় অকৃষি, খাস ও পতিত জমি হিসেবে দেখানো হয়েছে সেই জমিতে বছরে ৪.৫ কোটি টাকা মূল্যমানের ধান উৎপাদিত হয় এবং প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যমানের অন্যান্য ফসল উৎপাদিত হয়। তাই দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলে এই ইকোনমিক জোন করা হলে তা দেশের পুঁজিপতিদের স্বার্থই রক্ষা করবে, সাধারণ চা শ্রমিকরা এর সুফল ভোগ করা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে। রশিদপুরে গ্যাসক্ষেত্র স্থাপন, লাক্কাতুরায় স্টেডিয়াম নির্মাণসহ চা বাগানের অনেক জমি-জমা দখল করে সরকারি-বেসরকারি বহু শিল্প-কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। এসব শিল্প-কারখানা স্থাপনের আগে চা শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের যে প্রতিশ্রæতি দেয়া হয়েছিল তা পরবর্তীতে পাওয়া যায়নি। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশ্বাস দিলেও পরে একটা পিয়নের চাকরিও চা শ্রমিকরা পায়নি। তাই চান্দপুর-বেগমখান চা বাগানে ‘স্পেশাল ইকোনমিক জোন’ হলে সেখানে যে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে না তা চা শ্রমিকরা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। কেননা, চুনারুঘাটের পাশের উপজেলা মাধবপুরে সাম্প্রতিককালে গড়ে উঠা কলকারখানায় স্থানীয় জনগণের চাকরি হয়েছে খুব সামান্যই; কিন্তু কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যরে কারণে গাছপালা, পশুপাখি, পুকুরের মাছ ধ্বংস হয়ে গেছে। চর্মরোগসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধিতে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। আবার ভারতে ১২টি রাজ্যের ‘স্পেশাল ইকোনোমিক জোন’ (এসইজেড)-এর মাধ্যমে ৩৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের কথা বলা হলেও দীর্ঘ দুই দশকে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৮৪ হাজার, যা ঘোষিত কর্মসংস্থানের মাত্র ৭ শতাংশ। যেসব এসইজেড সেখানে চালু রয়েছে তার মাত্র ৯.৬ শতাংশ ম্যানুফ্যাকচারিং খাতভিত্তিক যেখানে সাধারণ শ্রমিকরা কাজ করতে পারে, আর ৫৬.৬৪ শতাংশই আইটি সেক্টরভিত্তিক। বাংলাদেশেও যেহেতু একই মডেল অনুসরণ করে এসইজেড করা হচ্ছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই চা শ্রমিকরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে না।

বাংলাদেশের আইনে এসব অঞ্চলকে শুধু ‘অর্থনৈতিক অঞ্চল’ বলা হলেও এগুলো ভারতীয় মডেলের ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ বা স্পেশাল ইকোনমিক জোনই। ভারতে তাও অধিগ্রহণকৃত জমির কমপক্ষে ৫০ শতাংশ জমিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রসেসিং ইউনিট (শিল্প/সেবা) স্থাপনের শর্ত থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন ২০১০-এ এরকম কোনো কিছুই নেই। এরকম শর্ত থাকার পরও ভারতে খুব কম পরিমাণ জমিই প্রসেসিং কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। ভারতের মহাহিসাব নিরীক্ষকের অডিট রিপোর্ট অনুসারে, ৮টি রাজ্যের ১৮টি এসইজেডে জরিপ করে দেখা গেছে, মোট ৪১৮৫ হেক্টর জমির মাত্র ১৬.২৯ শতাংশ জমি প্রসেসিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে!

চান্দপুর-বেগমখান চা বাগানে ইকোনমিক জোন স্থাপন করা হলে তা পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলবে। মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে অত্র এলাকার চা শিল্প, কৃষি সমাজ। তাছাড়া সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, রঘুনন্দন অরণ্য, রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। কারখানার বর্জ্য সুতাং নদী দিয়ে নিষ্কাশিত হলে, এই এলাকার পুকুর-নালা, হাওর-বাঁওড় প্রবল দূষণের শিকার হবে, ধ্বংস হবে মৎস্যভাণ্ডার। এই সুতাং নদী একটি আন্তর্জাতিক ও অভিন্ন সীমান্ত নদী। উত্তর-পূর্ব হাইড্রলজিক্যাল অঞ্চলের এই নদীটির আইডি নম্বর-২৮৬। দেশের নদীগুলোকে বাঁচাতে ‘বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। যেখানে ৫ বছর কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সরকারের ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে বিধান প্রণয়নকল্পে আইন, ২০১৫’-এর খসড়ার ধারা-৪ এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০১৩ অনুযায়ী শিল্প কারখানা কর্তৃক কোনো নদীদূষণ, দুই বা তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণ ও নদীর অবৈধ দখল আইনত দণ্ডনীয়। এ ছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) পরিচালনা পর্ষদের তৃতীয় সভায় বলেছিলেন- ‘কৃষিজমি রক্ষা করেও আমরা কিন্তু শিল্পের জন্য জমি নির্দিষ্ট করতে পারব এবং আমরা সেটাই করে দিচ্ছি। আমরা এখন এই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বেছে নেয়ার সময় মাথায় রাখছি যে, আমার কৃষি নষ্ট হবে না কিন্তু আবার শিল্পায়নটা হবে।’ (সূত্র : এটিএন নিউজ, ২২ অক্টোবর ২০১৫) অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, চান্দপুর বেগমখান চা বাগানের কৃষি জমিতে ইকোনমিক জোন স্থাপনের মধ্য দিয়ে বেজা দেশের আইন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে লঙ্ঘন করছে।

আমরা শিল্পের বিরুদ্ধে নই। আমরা কৃষি জমি ধ্বংসের এবং আমাদের আবাদি জমি কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ করছি। চুনারুঘাট উপজেলায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ১ লাখ ২২ হাজার ৩৯৩ একর, খাস জমির পরিমাণ ৪ হাজার ৪৩৬ একর, পতিত জমির পরিমাণ ১৬ হাজার ৫৪৪ একর। ফলে আমাদের ৫১১.৮৩ একর কৃষি জমি ধ্বংস করার দরকার কী?

চান্দপুর-বেগমখান চা বাগানের কৃষি জমিতে ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ স্থাপনের প্রতিবাদে আজ দেশের ২৪১টি চা বাগানের ১৫ লাখ চা-জনগোষ্ঠী জেগে উঠেছে, মরণপণ আন্দোলন করছে। তারা জীবন দিতে প্রস্তুত, তবু তাদের মাটি-মাকে অন্যায়ভাবে কেড়ে নিতে দেবে না। তারা স্লোগান তুলেছে- ‘রক্ত দেব, জীবন দেব কৃষি জমি দেব না।’ তাই কৃষি জমি ধ্বংস না করে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, পরিবেশ-প্রতিবেশকে সুরক্ষিত রাখতে ও চা শ্রমিকদের বাঁচাতে এই স্পেশাল ইকোনমিক জোন স্থাপনের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক।

:: চা-শ্রমিক সন্তান; চান্দপুর-বেগমখান ভূমি রক্ষা আন্দোলনের কর্মী।

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj