খবরের কাগজের দায়বদ্ধতা ও স্বাধীনতা : ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ ২০১৬

একটি কথা আমরা সবাই স্বীকার করবো যে, আগে যা-ই থাকুক না কেন নতুন আঙ্গিকে নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচার পতনের পর তৎকালীন দেশের ইতিহাসের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শুরু হওয়া পত্রিকাগুলো বেশ স্বাধীনভাবেই কাজ করে আসছিল। সেই সময় বেশকিছু পত্রিকা একসঙ্গে তাদের যাত্রা শুরু করেছিল। এরই মধ্যে যে অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের ভেতর দিয়েই এগোতে হয়েছে সংবাদপত্রকে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বেশ কয়েকদিন যাবৎ স্বাধীন সাংবাদিকতা, সংবাদপত্র ও এর দায়বদ্ধতা সম্পর্কে মিডিয়াতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। আর সেটি শুরু হয়েছে সম্প্রতি ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকার ২৫ বছর পূর্তির সময় পত্রিকাটির সম্পাদক মাহফুজ আনামের একটি বক্তব্য থেকে। সংবাদপত্র জগতে প্রচার সংখ্যার শীর্ষে থাকা দৈনিক প্রথম আলোর প্রকাশক এবং ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে মাহফুজ আনামকে অনেক দায়িত্বশীল ও নির্ভীক সাংবাদিক মনে করতেন দেশের বেশিরভাগ মানুষ। কিন্তু সাম্প্রতিককালে তার একটি ভুল স্বীকার জাতির সেইসব সংবাদপত্র পাঠককে হতাশ করেছে। ভুল স্বীকার অবশ্যই ভালো জিনিস কারণ ভুল যে কোনো সময় যে কারো হতে পারে, কিন্তু সেই ভুলের মাশুল যদি অনেক বড় হয় তবে সেটা মেনে নেয়া কঠিন বৈকি।

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী এবং সে সময়কার প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায় যে, ২০০৭ সালের জরুরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের জন্য দুই নেত্রীকে (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়া) রাজনীতি থেকে সরানোর জন্য ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো মিথ্যা তথ্য দিয়ে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশ করেছিল। যার ফলে তাদের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে তখন। এখানে সে সময়কার কয়েকটি মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য সংবলিত খবরের উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে। সেগুলো হলো- ১. ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ফ্রিগেট বসে আছে পাঁচ বছর (দৈনিক প্রথম আলো, ৩ জুন ২০০৭), ২. চাঁদা নেয়ার খবরে দলে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন (দৈনিক প্রথম আলো, ৩ জুন ২০০৭), ৩. হাসিনার বিরুদ্ধে দুটি চাঁদাবাজি মামলা (দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ জুন ২০০৭), ৪. ফ্রিগেট বেচতে হাসিনাকে কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছিল দাইয়ু, জিজ্ঞাসাবাদে মিন্টু (দৈনিক প্রথম আলো, ২ জুন ২০০৭), ৫. ভয় দেখিয়ে তিন কোটি টাকা চাঁদা নিয়েছিলাম (দৈনিক প্রথম আলো, ২২ জুন ২০০৭), ৬. Hasina faces growing pressure from within outside party (The Daily Star, 02 June 2007), 7. Hasina regularly took money from magnates (The Daily Star, 03 June 2007), 8. Frigate torpedoed by mean politics (The Daily Star, 03 June 2007), 9. Hasina got taka 1 cr in MiG-29 deal, Businessman Noor Ali claims he also gave 3 flats to Sheikh Helal (The Daily Star, 13 June 2007), 10. Selim shared extortion money with Hasina (The Daily Star, 22 June 2007), 11. Two more extortion cases against Hasina (The Daily Star, 14 June 2007)। ডেইলি স্টার সম্পাদক জানিয়েছেন সে সময় সত্যতা যাচাই ছাড়াই সেনা গোয়েন্দা সংস্থা সরবরাহকৃত তথ্য দিয়ে ঐসব সংবাদ ছাপা হয়েছিল। এটি তার ভুল ছিল।

এখন স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই তখন ওইসব খবর ছাপানো হয়েছিল। এ সংক্রান্ত আলোচনায় সেটিও বেরিয়ে এসেছে যে, তখন অপর একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক কিন্তু সেনা গোয়েন্দা সংস্থা সরবরাহকৃত তথ্যপূর্ণ খবরদ ছাপাননি। এসব খবর বেরোনোর প্রায় এক দশক পরে এসে ক্ষমা চাওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এখানে এ দুটি সংবাদপত্রের দায়িত্বশীলতা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করছেন দেশের রাজনৈতিক মহল। দেশের মিডিয়া জগৎ যখন এসব নিয়ে আলোচনা মুখর এরই মাঝে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে দেশের একটি অন্যতম দৈনিক ভোরের কাগজ তার প্রকাশনার দুই যুগ পার করে ২৫তম বছরে পদার্পণ করলো। কালের আবর্তে সময়ের হিসেবে ২৫ বছরকে রজতজয়ন্তী বলা হয়ে থাকে। সেই হিসেবে ২০১৬ সালজুড়ে চলবে শুরু পত্রিকাটির রজতজয়ন্তীকাল।

আগেই বলেছি, নব্বই দশকের আগে বিশেষ করে স্বৈরশাসনের সময়জুড়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কয়েকটি এবং সরকারের অন্যায় বিষোদগারে লিপ্ত দুয়েকটি পত্রিকা ছাড়া বাদ বাকি যে পত্রিকাগুলো চালানো হতো, সেগুলোকে খুবই চ্যালেঞ্জ ও নির্যাতনে মধ্য দিয়ে চালাতে হয়েছিল, যা আমরা সবাই জানি। তারপর সে সময় নব্বই পরবর্তী স্বৈরাচার পতনের পর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বেশকিছু পত্রিকা একবারে শুরু হওয়ার প্রয়াস পেয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালে সৎ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক সাবের হোসেন চৌধুরীর মালিকানায় প্রথমে খুবই জাঁকজমকপূর্ণভাবে দৈনিক ভোরের কাগজ তার গৌরবময় শুভযাত্রা শুরু করেছিল। সেখানে মনে পড়ে, একবারে বেশকজন প্রথিতযশা ও প্রতিষ্ঠিত দক্ষ সাংবাদিক আজকের কাগজ ছেড়ে সাংবাদিকতার প্রকৃত দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে এসে নতুন সম্ভাবনাময়ী ভোরের কাগজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সে পত্রিকাটি বাংলাদেশের স্রষ্টা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কথা বলে। পত্রিকাটি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, স্বাধীনতা বিরোধীদের সমর্থন করে না, দেশকে ভালোবাসে, মুক্তচিন্তাকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে, গণতন্ত্রের কথা বলে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জনমত গঠনে সবাইকে সংগঠিত করার কাজে লিপ্ত থাকে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে, শহীদদের কথা বলে, দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বধীনে পরিচালিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের ভালো ও গঠনমূলক কাজের প্রশংসা করে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিছু মিডিয়া মনে করে থাকে যে, তাদের কাজই হলো নেগেটিভ নিউজ বের করে আনা। অর্থাৎ সরকারের সমালোচনা করতে না পারলে, চটকদার কোনো খবর চাঞ্চল্যকরভাবে উপস্থাপন করতে না পারলে তাদের পত্রিকা চলবে না। শুধু গতানুগতিক খবরাখবরের বাইরেও একটি পত্রিকার কিছু না কিছু সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে। সেই দায়বদ্ধতার বিবেচনায় ভোরের কাগজ একবারেই স্বতন্ত্র। তার প্রমাণ হিসেবে বলা চলে তাদের চারণ সাংবাদিক শরীফা বুলবুল কর্তৃক ধারাবহিক মুক্তিযুদ্ধের ওপর নারী মুক্তিযুদ্ধাদের নিয়ে ‘বীরাঙ্গনা নয়, মুক্তিযোদ্ধা’ শিরোনামে প্রমাণ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করা। এর মাধ্যমে প্রজন্মান্তরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সমৃদ্ধি ঘটছে। শুধু তাই নয়, এ খবর পড়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহেনা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুমিল্লার এক বীরাঙ্গনাকে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা দেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। একই সাংবাদিক কর্তৃক বাঙালির গৌরবের ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে নারী ভাষা সৈনিকদের নিয়ে ‘ভাষাপর্বে নারীর লড়াই’ শিরোনামে সেইরকম আরেকটি ধারাবহিক ইতিহাসের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। বাঙালির আরেক প্রাণের উৎসব বইমেলা সম্পর্কেও প্রতিদিন থাকছে গুরুত্ব তথ্যাবলি সংবলিত একাধিক প্রতিবেদন। পত্রিকাটির সামাজিক ও মানবিক আরো কিছু দায়বদ্ধতার সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো এবারের তীব্র শীতে দেশের উত্তরাঞ্চলের পাঁচটি জেলায় ভোরের কাগজের উদ্যোগে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা। তাছাড়া লক্ষ্য করা গেছে, দেশে যখনই কোনো ক্রাইসিস শুরু হয় তখন ভোরের কাগজ নিজ উদ্যোগে সেটি সমাধানের ভূমিকা রাখতে উদ্যোগী হয়। তারই অংশ হিসেবে সময়োচিত গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে বিশেষজ্ঞ পরমর্শ সহকারে তা সমাধানের চেষ্টা করে থাকে।

ভোরের কাগজ এখন অনলাইনে ই-পেপার হিসেবেও একই সঙ্গে বের হচ্ছে নিয়মিত যা সারাবিশ্বের পাঠকদের জন্য অবারিত থাকছে। এভাবে নির্দিষ্ট কিছু শব্দের মধ্যে একটি নিবন্ধের ভেতর পত্রপত্রিকার দায়-দায়িত্ব কিংবা কোনো কাগজের গুণের কথা বলে শেষ করা কঠিন। কাজেই উপরের বর্ণনা থেকেই কিছুটা হলেও পরিষ্কার হয় যে, এ জন্যই সংবাদ প্রকাশে পত্রিকাকে হতে হয় প্রকৃত অর্থেই দায়িত্বশীল, সাময়িক উত্তেজনা ছড়ানোর জন্য লোক দেখানো কোনো কিছু কখনোই ভলো নয়। সেই হিসেবে দেখতে গেলে স্বল্প বাজটের মধ্যে ভোরের কাগজ পত্রিকাটি তার সুনির্দিষ্ট কলেবরের মধ্যেই জাতীয়, আন্তর্জাতিক, অর্থনৈতিক, সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক, সারাদেশ, কৃষি, পরিবেশ, শিল্প, বাণিজ্য, খেলাধুলা, বিনোদন, সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষাসহ সব ধরনের হালনাগাদ খবরাখবর সুদক্ষ লেখকদের সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, মুক্তচিন্তায় নিয়মিত সমসাময়িক বিশ্লেষণধর্মী লেখা প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত। তাছাড়াও বিশেষ বিশেষ দিনে বিশেষ বিশেষ ফিচার, বিশ্লেষণ, ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হতে দেখা যায়। এখন যেভাবে যে আঙ্গিকে ভোরের কাগজ প্রত্রিকাটি অকুতোভয় হিসেবে তার প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে সে ধারাতেই চলতে থাকুক অনাদি-অনন্তকাল করে। কাজেই আমার বিবেচনায় ভোরের কাগজই হতে পারে বর্তমান সময়ে অন্য অনেক পত্রিকার জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। কারণ সে সময় উল্লিখিত পত্রিকা দুটি তখন দায়িত্বশীল ভূমিকা নিলে আজকের বাংলাদেশের ইতিহাস আরো সুন্দর হতে পারত। আর এখানেই এসে যায় খবরের কাগজের দায়বদ্ধতা ও স্বাধীনতার বিষয়টি।

:: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj