যশোর অঞ্চলের লাইব্রেরিগুলোতে নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের ছড়াছড়ি : ব্যাহত হচ্ছে সরকারের শিক্ষানীতি

মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

আলমগীর কবীর, যশোর থেকে : শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ঢাউস আকৃতির নিষিদ্ধ গাইড বই কিনতে যশোর অঞ্চলের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিভাবকরা দিশাহারা হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন প্রকাশনা, অসাধু শিক্ষক ও শিক্ষক সমিতি এ ব্যবসার সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। শিক্ষর্থীদের বাধ্য করা হচ্ছে নিষিদ্ধ গাইড বই কিনতে। নিষিদ্ধ নোট গাইড ও গ্রামার বইয়ের উচ্চ মূল্যের কারণে ¤øান হচ্ছে সরকারের বিনামূল্যে পাঠ্য বই বিতরণের সাফল্য। এদিকে প্রশাসনের নাগের ডগায় শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিনা সংকোচে দেদার নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা চললেও নেই কোনো তদারকি। মাঝেমধ্যে ওই লাইব্রেরিগুলোতে শিক্ষা-সংক্রান্ত অফিসের কতিপয় লোককেও মালিকপক্ষের পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে খোশগল্পে মশগুল থাকতে দেখা যায়। এ ছাড়া, প্রতিবছর এ সময়ে বই নিয়ে কমিশন ব্যবসায় নামে কতিপয় শিক্ষক সংগঠন। যার ফলে সাধারণ অভিভাবক এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীরা চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মন্তব্য, গাইড বইয়ের কারণে ভেস্তে যাবে সরকারের সৃজনশীল শিক্ষার মান।

বছরের প্রথম দিন দেশের সব স্কুলে প্রথম থেকে নবম শ্রেণির চার কোটি ৪৪ লাখ ১৬ হাজার ৭২৮ জন শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেয়া হয়েছে ৩৩ কোটি ৩৭ লাখ ৬২ হাজার ৭৭২টি নতুন বই। এ ছাড়া প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির ৩২ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য আরো তিন কোটি ২৮ লাখ ৮ হাজার ৫৩টি বই ও অনুশীলন খাতা বিতরণ করা হয়েছে।

যশোরের আট উপজেলার সব প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও দাখিল পর্যায়ের প্রায় সোয়া সাত লাখ শিক্ষার্থীর মাঝে মোট ৫৯ লাখ ৩২ হাজার ৫১৬ কপি বই বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, প্রাথমিকে ১৬ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪৬, ইবতেদায়িতে চার লাখ ৮৬ হাজার ৪০০, মাধ্যমিকে ২৯ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫০, দাখিলে সাত লাখ ৯২ হাজার ৫৭৫ ও ভোকেশনাল পর্যায়ে ৪৯ হাজার ৯৪৫ কপি।

কিন্তু এর মধ্যে নতুন শিক্ষা বর্ষের শুরুতেই যশোর অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি স্কুলে কতিপয় অসাধু প্রকাশনা, অসাধু শিক্ষক ও শিক্ষক সমিতির সহায়তায় শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে বিভিন্ন পাবলিকেশনের শ্রেণিভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন কালার পেপারের সহায়ক বুক লিস্ট।

অভিযোগ রয়েছে, যশোরের বিভিন্ন স্কুলে ইতোমধ্যে প্রকাশকর তাদের প্রকাশিত গাইড বই শিক্ষার্থীদের কিনতে বাধ্য করাতে অসাধু শিক্ষক ও শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে। সে হিসেবে স্কুলগুলো থেকে তাদেরই বই কেনার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। সহায়ক বই নিষিদ্ধ থাকলেও ওই বুকলিস্টে দেখা যায় তারকা চিহ্নিত করা বোর্ড প্রকাশিত

বইগুলো সরকার কর্তৃক বিনামূল্যে স্কুল থেকে সরবরাহ হয়। এর পরই এনসিটিটিবি বইয়ের সহায়ক বই হিসেবে তাদের প্রকাশিত মোটা অক্ষরে লেখা বইয়ের নাম। এদের কৌশল থেকে রক্ষা পায়নি প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীর অভিভাবকরাও।

সূত্র জানায়, নোট গাইড ও গ্রামার বইয়ের ওপর সরকার বিধি-নিষেধ জারি করেছে। সরকারি তালিকাভুক্ত ছাড়া অন্য কোনো নোট গাইড ও গ্রামার বই পাঠ্য তালিকায় আনা যাবে না। শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা ও সৃজনশীলতা বিকাশে সরকার বদ্ধপরিকর। এ ছাড়া শিক্ষা যাতে পণ্য না হয়, সে জন্য সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তার পরও থেমে নেই শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ। এক শ্রেণির অতিলোভী পুস্তক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ম্যানেজ করে অতি গোপনে সুকৌশলে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন এসব বই। বিনিময়ে লুটে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর, নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জননী, জুপিটার, লেকচার, পাঞ্জেরীসহ বিভিন্ন সিরিজের বই ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে। শিক্ষার্থীদের এসব বই কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অনেক প্রকাশনীর পক্ষ থেকে পুস্তক ব্যবসায়ীরা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে আর্থিক সুবিধা দিচ্ছেন।

সূত্র আরো জানায়, শিক্ষক সমিতির উন্নয়নের নামে একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। সমিতির সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠান বই পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে সমিতির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। এসব বিষয়ে জেলার শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, আনীত অভিযোগ তারা অস্বীকার করেন।

শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেধা বিকাশের জন্য সরকার যে সৃজনশীল প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিচ্ছে তা গাইড বইয়ের কারণে ভেস্তে যাবে। কেননা শিক্ষার্থীরা গাইড বই পড়লে সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না।

অভিভাবকদের অভিযোগের ভিত্তিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর অঞ্চলের লাইব্রেরিগুলোতে নিষিদ্ধ গাইড বই অবাধে বিক্রি হচ্ছে। সরকার প্রথম শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত গাইড বই নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, যশোর অঞ্চলের অধিকাংশ স্কুলের শিক্ষার্থীদের গাইড বই কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।

প্রতিদিন শহর ও গ্রামের শত শত শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা শহরের দড়াটানায় অবস্থিত লাইব্রেরিগুলোতে গাইড বই কিনতে ভিড় করছেন। এসব বইয়ের দামও চড়া। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২য় গাইড বই বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা, তৃতীয় ২২০ টাকা, ৪র্থ ২৫০ টাকা, ৫ম ৫৫০ টাকা, ৬ষ্ঠ ৭৫০ টাকা, ৭ম শ্রেণির ৭৮৫ টাকা ও অস্টম শ্রেণির গাইড বই প্রতি সেট বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। শুধু গাইড নয় শিক্ষকরা এনসিটিবির বাংলা ও ইংরেজি গ্রামার বই নির্ধারিত থাকলেও শিক্ষার্থীদের সহায়ক বই কিনতে বাধ্য করছেন। আর এসব গ্রামার বই ২৪০ টাকা থেকে সাড়ে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুব পার্থক্য না হলেও ভিন্ন ভিন্ন পাবলিকেশন্সে বইয়ের দামও ভিন্ন। এতে বই কিনতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে গরীব অসহায় শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের।

সরকার বিনামূল্যে পাঠ্য বই বিতরণ করলেও তা এসব নিষিদ্ধ নোট গাইড ও গ্রামার বইয়ের (উচ্চ মূল্যের) কারণে ¤øান হচ্ছে সরকারের উদ্দেশ্য। সর্বস্তরের মানুষ সরকারের বিনামূল্যে পাঠ্য পুস্তক বিতরণ কার্যক্রমকে স্বাগত জানালেও নিষিদ্ধ নোট গাইড ও গ্রামার বইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়ায় দুঃখ প্রকাশ করছেন।

শহরের হাসান বুক ডিপোতে গাইড বই কিনতে আসেন সদরের বলাডাঙ্গা কাজীপুর এলাকা আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, তার মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। স্কুলের শিক্ষকরা বলেছেন হাসান বুক ডিপো থেকে জননী প্রকাশনীর গাইড কিনতে। কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় নিতে পারেননি। তিনি আরো বলেন, সরকার বিনামূল্যের বই দিলেও গাইড বই কিনতে আমাদের মতো গরিবদের খুব কষ্ট হচ্ছে। এদিকে সরকার নজর দিলে ভালো হতো। শুধু আফজাল নয়, এরকম শত শত শিক্ষার্থীর দরিদ্র অভিভাবককে ধার দেনা করে গাইড বই কিনতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আব্দুল মজিদ বলেন, গাইড বই পড়ে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ। গাইড বই পড়লে সরকারের শিক্ষানীতি সফল হবে না। গাইড পড়ে কখনো প্রকৃত শিক্ষা লাভ করা যায় না। তাই প্রশাসনসহ সবাইকে নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

এ ব্যাপারে যশোর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, সরকার গাইড বই নিষিদ্ধ করেছে। গাইড না পড়াতে বিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দেয়া আছে। গাইড পড়ে কোনো লাভ নেই। মূল বই না পড়লে সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাবে না। যদি কোনো স্কুল গাইড বই পড়ায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিষয়টি নিয়ে যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পারভেজ হাসান জানান, শিক্ষকদের নিষিদ্ধ গাইড বই না পড়াতে ও কিনতে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ না করতে বলা হয়েছে। যদি কেউ এ কাজ করেন তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। জেলা শিক্ষা অফিসারকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে জানানো হবে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj