আমি একুশ দেখিনি, তবে…

শনিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

এখনই সচেতন হওয়া জরুরি : সুষমা সরকার

আমরা অর্থাৎ আমাদের প্রজন্ম একুশ কিংবা বাংলা সংস্কৃতির চেতনা ধারণ করেই বড় হয়েছি। ছোটবেলায় স্কুল থেকে দল বেধে শহীদ মিনারে যেতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন হল থেকে র‌্যালি নিয়ে প্রভাতফেরিতে যেতাম। তখন তো প্রচণ্ড শীত থাকত। সেই ভয়ানক শীতে শাড়ি পড়ে খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে যেতে কি যে ভীষণ ভালো লাগত তা বলে বোঝানোর নয়। আজকাল আমার মনে হয়, আগামী প্রজন্ম একটি মিশ্র সংস্কৃতির মধ্যে বড় হচ্ছে। সত্যিকারার্থে আমাদের পুরো সংস্কৃতিই এখন হুমকির মুখে। পৃথিবীর অন্যতম শ্রæতিমধুর ভাষাটির এই যে বিরামহীন বিকৃতি-

তা কিন্তু এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনেরই অংশ। ব্যাপারটা নিয়ে এখনই সচেতন হওয়া জরুরি। আমি মনে করি, একুশ এখন আমার জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আগামী প্রজন্মটির জন্য। তাই আমার একুশ ফেব্রুয়ারির পুরোটা জুড়েই আমার মেয়ে। সকালে ওকে নিয়ে শহীদ মিনারে যাই। এরপর যাই উইমেন্স কমপ্লেক্সে একুশের অনুষ্ঠানে। সেখানে একুশের গান, বর্ণমালা নিয়ে বিভিন্ন আয়োজন থাকে। সন্ধ্যার দিকে যাই বইমেলায়। অর্থাৎ আমি সারা দিনই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ওর ভেতর একুশের চেতনা গড়ে দিতে চেষ্টা করি।

শহীদ মিনার হয়ে উঠুক চেতনার প্রাণকেন্দ্র : -সুজাত শিমুল

আগে খুব একটা নিয়মিত শহীদ মিনারে যাওয়া হতো না। গত কয়েক বছর ধরে প্রভাতফেরিতে তো বটেই, বছরের অন্যান্য বিভিন্ন সময়েই শহীদ মিনারে যাই। আমার কাছে মনে হয়, আমাদের সামগ্রিক জাতিসত্তার প্রাণকেন্দ্র ওই শহীদ মিনার। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারিতে নয়, আমাদের জাতীয় সংকটের প্রতিটি মুহূর্তে শহীদ মিনার হয়ে উঠতে পারে চেতনা আর প্রতিবাদের প্লাটফর্ম। নির্দিষ্ট করে যদি একুশের দিনটির কথা বলি তাহলে মোটা দাগে এ দিনকে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। সকালে প্রভাতফেরি, এরপর সারা দিনে একুশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলোতে যোগদান; আর দিনের যে কোনো একটা সুবিধামতো সময়ে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা। এদিন ওর জন্মদিন। ওর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে অন্য অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়ে যায়। মূলত এই ব্যস্তজীবনে এই দিনটির মাধ্যমে কিছু মানুষের কাছাকাছি আসি। এই দিনটি যেন প্রাণ সঞ্চারের দিন। নিজের প্রাণব্যাটারিতে যেন সারা বছরের জন্য চার্জ করে নেয়া।

ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে তো আমি মানুষই নই : শ্যামল মাওলা

একুশ নিয়ে বলতে গিয়ে এই মুহূর্তে আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা ঢাকার শাহবাগে। ছোটবেলায় একুশ ফেব্রুয়ারি এলেই রীতিমতো একটা উৎসবের আমেজ টের পেতাম নিজেদের ভেতর। একুশের আগের দিন সব বন্ধুবান্ধব মিলে বের হতাম ফুল চুরি করতে। তখন তো রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী পার্ক ফুলে ফুলে

ভরা ছিল। সারাদিন ফুল সংগ্রহ করতাম।

সন্ধ্যায় কলাগাছ, শলার ঝাড়– জোগাড় করতাম। এরপর নিজেরাই নিজেদের মতো করে তোড়া বানাতাম। পরদিন ভোরে প্রভাতফেরিতে যেতাম সেই তোড়া নিয়ে।

এখন তো শহরে ফুল নেই। পার্কগুলো ফুলশূন্য। নিজ হাতে তোড়া বানিয়ে শহীদ বেদিতে ফুল দেয়ার যে আনন্দ তার আসলে তুলনা হয় না। তবে এখনো প্রভাতফেরিতে যাই প্রতিবছর। কাজের যত চাপই থাকুক এইদিন সকালে প্রভাতফেরিতে না যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি না। আর ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বা দায়বদ্ধতার কথা যদি বলেন তাহলে বলব, শহীদ মিনারের প্রতি, ভাষা শহীদদের প্রতি, ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, দায়বদ্ধতা না থাকলে তো আমি মানুষই থাকব না। এবারের একুশ নিয়ে আমার একটা ভাবনা আছে। বন্ধুরা মিলে একুশের রাতে বের হব। শহরের বিভিন্ন জায়গায় একুশ উদযাপনের প্রস্তুতি দেখব। কোথাও কোনো প্রস্তুতিতে যদি সহায়তার দরকার হয় আমরা নিজেরা সাধ্যমতো করব।

আমার অনেক অভিযোগ আছে : স্পর্শিয়া

কিছুদিন আগে আমি সিলেটে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে একটি নোটিশ দেখলাম। নোটিশের মূল বক্তব্য হচ্ছে, স্কুলে অবস্থানকালে কেউ বাংলা বলতে পারবে না। এরকম নোটিশ ঢাকার অনেক প্রতিষ্ঠানেও দেখেছি।

কোথাও ঘোষিত কোথাও অঘোষিত। এসব দেখে মাথার ভেতর এক ধরনের যন্ত্রণা হচ্ছে। অনেকগুলো প্রশ্ন, অনেকগুলো অভিযোগ তৈরি হয়েছে। একদল বাংলা ভাষাকে সর্বত্র যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহার করে যাচ্ছে।

আরেকদল ভাষার ব্যবহারকেই নিষিদ্ধ করে দিচ্ছে। আমি বুঝি না, ‘মা’কে মা ডাকা শেখার আগে খালাকে মাসি ডাকার মধ্যে কোনো বাহাদুরি আছে কিনা। একটি আন্তর্জাতিক ভাষা রপ্ত করতে গিয়ে নিজের মাতৃভাষার প্রতি এমন অবহেলার কি কারণ থাকতে পারে আমার বুঝে আসে না। আর বাংলা সংস্কৃতি? তার অবস্থাও ব্যতিক্রম কিছু নয়। ধর্ম থেকে সংস্কৃতি- সবক্ষেত্রেই আমরা আসলে দিনসর্বস্ব, অনুষ্ঠানসর্বস্ব হয়ে গেছি। রমজান মাস এলে যেমন সবাই মুসল্লি, সারা বছর খবর নেই। তেমনই ২১ ফেব্রুয়ারি এলে ভাষাপ্রেমিক, ২৬ মার্চ-১৬ ডিসেম্বর এলে দেশপ্রেমিক বাঙালি হয়ে যাই। ব

াকি সময়গুলো না আমরা বাঙালি, না ইন্ডিয়ান, না ওয়েস্টার্ন। আমরা যে কি- নিজেরাও জানি না। বাঙালিকে সবার আগে শিখতে হবে যে, আমি বাঙালি এবং এই পরিচয়টিকে ভালোবাসতে হবে।

:: শ্রæতিলিখন- কবীর হোসেন

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj