পরীক্ষা-ভীতি

শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৬

যে কোনো পরীক্ষা নিয়েই কিছুটা উদ্বেগ বা চিন্তা থাকাটা স্বাভাবিক। এই চিন্তাই পরীক্ষার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নেয়ার মূল চালিকাশক্তি। পরীক্ষা নিয়ে যার কোনো ভাবনাই নেই, সে তো প্রস্তুতিই নেবে না ঠিকভাবে। কিন্তু পরীক্ষার এই ভাবনাই যখন স্বাভাবিকতার সীমা অতিক্রম করে চরম দুর্ভাবনা আর অতিরিক্ত উদ্বেগে রূপ নেয়, পরীক্ষা ব্যাপারটি হয়ে দাঁড়ায় ভীতিকর বিষয়, মানসিক চাপ বিপর্যস্ত করে তোলে পরীক্ষার্থীকে- সেটা উল্টো পরীক্ষার প্রস্তুতি বা পারফরম্যান্সের জন্য হয়ে দাঁড়ায় নেতিবাচক। পরীক্ষাজনিত উদ্বেগে আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা আবেগজনিত সমস্যায় ভোগে। তারা চরম অসহায়ত্ব, ক্রোধ, ভয় বা হতাশা বোধ করে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, আত্মবিশ্বাস কমে যায়। অনেকে বিষণœতায় আক্রান্ত হতে পারে। পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়, অস্থির ভাবনারা ছোটাছুটি করতে থাকে মনের ভেতর, একই পড়া বারবার পড়লেও মনে থাকে না, হঠাৎ হঠাৎ মাথার ভেতরটা শূন্য মনে হয়। প্রভাব পড়ে শরীরের ওপরও। বারবার মুখ শুকিয়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা, খাবারে অরুচি, অনিদ্রা, বমি বমি ভাব, পাতলা পায়খানা, মাথাব্যথা, শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তন, অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরানো, শ্বাস নিতে কষ্ট প্রভৃতি নানান উপসর্গ দেখা যায়, এমনকি মাঝে মাঝে অজ্ঞানও হয়ে যায় শিক্ষার্থী। ভীতির কারণে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি পর্বে যেমন এ পরীক্ষা-ভীতিতে আক্রান্ত হতে পারে শিক্ষার্থী, তেমনি এসব উপসর্গ-লক্ষণ দেখা যেতে পারে পরীক্ষার হলে ঢোকার বা প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পরও।

কেন পরীক্ষা-ভীতি?

পরীক্ষা নিয়ে অহেতুক ভীতি ও উদ্বেগ গড়ে ওঠার নানা কারণ রয়েছে। অন্যতম প্রধান কারণ পারিপার্শ্বিকতার চাপ। পরীক্ষা নিয়ে সমাজ, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব বা শিক্ষকের চাপ অনেক সময় শিক্ষার্থীর পক্ষে অসহনীয় হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মার অযৌক্তিক প্রত্যাশা এবং তার প্রতিক্রিয়াই শিক্ষার্থীর পরীক্ষাভীতির অন্যতম কারণ। বাবা-মা চান, সন্তান পরীক্ষায় তাদের চাহিদামাফিক ভালো ফলাফল করবে। বাস্তবতা বা শিক্ষার্থীর প্রকৃত ক্ষমতা-যোগ্যতা অনুধাবন না করেই তাদের ওপর প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দেন। অনেক বাবা-মাই তাদের জীবনের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে চান। এর অন্যথা হলে তারা হতাশায় ভোগেন। সন্তানের পরীক্ষার ফলাফল বাবা-মা নিজেদের সামাজিক অবস্থানের নিয়ামক হিসেবে ভাবেন। সবার যোগ্যতা ও ক্ষমতা যে একরকম নয়- এই সত্যটি যেন তারা বুঝতে চান না। ফলে, তাদের দৃষ্টিতে সন্তানের প্রত্যাশিত ফলাফলের সামান্য বিচ্যুতিও ক্ষমার অযোগ্য। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ‘খারাপ’ ফলাফলের জন্য সন্তানকে বকাবকি, নেতিবাচক সমালোচনা, অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে সব সময় পড়াশোনা ও ফলাফল নিয়ে কটাক্ষ করতে, এমনকি শারীরিকভাবে প্রহার করতেও দেখা যায় অনেককে। বাবা-মার ধারণা- তারা সেটা করেন সন্তানের ভালোর জন্যই। কিন্তু ফল হতে পারে উল্টো। পরীক্ষার ফলাফলের প্রেক্ষিতে বাবা-মা বা আত্মীয়দের প্রতিক্রিয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীর ভেতর ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ সৃষ্টি করে, যা পড়াশোনায় সহায়তা না করে উল্টো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরীক্ষার পড়া নিয়ে না ভেবে ফলাফলে বাবা-মার প্রতিক্রিয়াই হয়ে ওঠে মূল ভাবনা। দেখা দেয় পরীক্ষা-ভীতির লক্ষণ। একই ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে শিক্ষকের অতিরিক্ত শাসন, অবাস্তব প্রত্যাশা ও বন্ধুবান্ধবদের মাঝে নিজের অবস্থান বজায় রাখার দুশ্চিন্তা থেকেও। এসএসসি-এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষাগুলোর আগে এই চাপ বেড়ে যায় আরো কয়েক গুণ। কেননা, শিক্ষার্থীর মাঝে পাবলিক পরীক্ষা সম্পর্কে সমাজ বা পরিবারের বিভিন্ন স্তর থেকে জানতে বা অজান্তে অহেতুক ভয় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এর আগে বহুবার বহু পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেও বা স্কুলে টেস্ট বা প্রি-টেস্টে এসএসসি পরীক্ষার চেয়েও কঠিন প্রশ্নপত্র পার করে এলেও জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা অনেকের কাছে মৃত্যুদণ্ডের আদেশের সমতুল্য ভীতিকর হয়েই দেখা দেয়।

শুধু পারিপার্শ্বিকতার চাপ-ই নয়, শিক্ষার্থী নিজেও তার পরীক্ষা-ভীতির কারণ হতে পারে। সারা বছর যথাযথভাবে পড়াশোনা না করলে শেষ সময়ে এই বিশাল পরিমাণ পড়া আয়ত্তে আনতে গিয়ে ভীতি জাগাই স্বাভাবিক। আগে পরীক্ষায় খারাপ করার ইতিহাস থাকলে পরবর্তী কোনো পরীক্ষার আগে সেই খারাপ ফলাফলের চিন্তা বারবার মনে এসে যেতে পারে। এছাড়া অনেকের ব্যক্তিত্বই এমনভাবে গড়ে ওঠে যে, যে কোনো বিষয়েই তারা অহেতুক উদ্বেগ বা ভীতিতে আক্রান্ত হয়, সব বিষয় নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে, আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে সব সময়ই। এমন ব্যক্তিত্বের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাজনিত উদ্বেগ ও ভীতিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

উদ্বেগ-ভীতি কাটাতে

পরীক্ষা নিয়ে অহেতুক উদ্বেগ থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন যথাযথ প্রস্তুতি। নিয়মিত পড়াশোনায় নিজেকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করলে আত্মবিশ্বাসী থাকা যায়। এর সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে আরো কিছু প্রয়োজনীয় বিষয়।

** রুটিনমাফিক পড়াশোনা করতে হবে। পড়াশোনার জন্য উপযুক্ত নির্দিষ্ট সময় ভাগ করে নিতে হবে। রাত জেগে পড়াশোনা করাটা অনেকে কঠোর ও কার্যকর প্রস্তুতির নির্দেশক মনে করলেও আদতে সকাল, দুপুর এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা- এ সময়টুকুই পড়াশোনার জন্য বেছে নেয়া ভালো। রাত হবে ঘুমের জন্য। দিনরাত টানা পড়াশোনা করা উচিত নয়। মস্তিষ্কেরও বিশ্রাম প্রয়োজন। তাই পড়ার মাঝে মাঝে বিরতি দিতে হবে মস্তিষ্ককে সচল রাখার স্বার্থেই। লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শুধু পড়লেই হবে না। সময় ধরে উত্তর লেখার চর্চা করতে হবে। সুযোগ হলে অন্যের সঙ্গে আলোচনা করে পড়া যেতে পারে, অন্যের পড়া শোনা এবং পঠিত বিষয় নিয়ে আলোচনা পড়া মনে রাখতে সহায়তা করে।

** কিছুটা সময় রাখতে হবে সুস্থ বিনোদনের জন্যও। বিশ্রাম-বিনোদনহীন একঘেয়ে পড়াশোনা মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে তোলে, একটা সময় শুধু বই নিয়ে বসে থাকাই সার হয়, পড়া মাথায় ঢোকে না কিছুই।

** শারীরিক সচলতার দরকার আছে। প্রতিদিন নিয়ম করে কিছুটা সময় হালকা শরীরচর্চা করা উচিত। এই শরীরচর্চা দেহের অভ্যন্তরে উপকারী নানা হরমোনের নিঃসরণ ঘটিয়ে শারীরিক ও মানসিক চাপ কমাতেও সহায়তা করে।

** নিয়মিত সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে। মস্তিষ্ককে সুস্থ ও কার্যকর রাখার জন্য শাকসবজি, ফল, দুধ, ডিম খাওয়া যেতে পারে। চাঙ্গা থাকার জন্য অনেকেই অতিরিক্ত চা-কফি পান করে এ সময়। অতিরিক্ত চা-কফি নিদ্রাহীনতা, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রভৃতি সমস্যার সৃষ্টি করে। কফির ভেতরকার ক্যাফেইন অতিরিক্ত মাত্রায় শরীরে প্রবেশ করলে তা চিন্তাশক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই অতিরিক্ত চা-কফি এড়িয়ে চলতে হবে।

** অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা-ভীতি ও মানসিক অস্থিরতা কমাতে ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। তবে নিজের ইচ্ছামতো বা বন্ধুর উপদেশে ওষুধ খাওয়া বিপদের কারণ হতে পারে। অবশ্যই এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

পরীক্ষা-কেন্দ্রে

** পরীক্ষার হলে ঢোকার আগে নতুন কোনো বিষয় পড়তে যাওয়া ঠিক নয়। এ সময় অন্য শিক্ষার্থী বা বন্ধুবান্ধবদের প্রস্তুতি কেমন, কে কি পড়েছে, প্রশ্ন কেমন কঠিন হতে পারে- এসব বিষয় আলোচনা বা এ সংক্রান্ত চিন্তা-ভাবনা করা উচিত হবে না। এ সব কাজ পরীক্ষা সংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে।

** খুব বেশি টেনশন বা উদ্বেগ হলে পরীক্ষার হলে ঢোকার আগে, প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকার সময়টায় বা উত্তর লেখা শুরু করার আগে ধীরে লম্বা, গভীর করে কয়েকবার শ্বাস নেয়া যেতে পারে। সহজ এই কাজটি উদ্বিগ্ন ব্যক্তিকে রিল্যাক্সড হতে সাহায্য করে।

** কঠিন প্রশ্ন দেখে ঘাবড়ে যাওয়া চলবে না। কঠিন প্রশ্নগুলো নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট না করে যেসব প্রশ্নের উত্তরদান সহজতর, সেগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে শেষদিকে। ইতোমধ্যে বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া হয়ে যাওয়ায় আত্মবিশ্বাস বাড়বে, মস্তিষ্কও কার্যকর থাকবে পুরোদমে, ফলে উত্তর লেখাটা সহজ হবে।

** পরীক্ষার হলে নিজের খাতার ওপর পূর্ণ মনোযোগ রাখতে হবে। অন্যরা কি করছে, কেমন দ্রুতগতিতে লিখছে, কে কত আগে কতগুলো অতিরিক্ত পৃষ্ঠা নিল- এসব ব্যাপারে মনোযোগ দেয়ার দরকার নেই।

** এক বিষয়ের পরীক্ষা শেষে কি কি ভুল হলো তা বন্ধুদের সঙ্গে মিলিয়ে বের করার প্রয়োজন নেই। কারণ, যা লিখে আসা হয়েছে, পরীক্ষা শেষে তা আর পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। সুতরাং, বাড়ি ফিরে পরবর্তী বিষয়ের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেয়াই মঙ্গল।

বাবা-মার করণীয়

পরীক্ষা-ভীতি কাটাতে বাবা-মাই হতে পারেন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় সহায়। সন্তানকে সময় দিন, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন, দুর্বলতা-ভীতি কাটিয়ে নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে তাকে উৎসাহ দিন, সহায়তা করুন। সন্তানের যোগ্যতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিন, সেই মতো প্রত্যাশা করুন, ভালো করতে তাকে সহযোগিতা করুন কিন্তু অতি-প্রত্যাশার বোঝা ঘাড়ে চাপিয়ে নয়। সন্তানের সুষম খাদ্য নিশ্চিত করুন। কিন্তু এ ব্যাপারে অতিরিক্ত মনোযোগ দেখাতে গিয়ে অতিভোজনে বাধ্য করে তার শরীরকে অলস ও নিদ্রাকাতর করে তুলবেন না। এ সময় বেশি খেলেই মেধা বাড়বে- এ ধারণা ঠিক না। বারংবার সন্তানের নেতিবাচক সমালোচনা ও অন্যের সঙ্গে তুলনা করবেন না। এতে তার আত্মবিশ্বাস কমে যায়। ইতিবাচক থাকুন। সন্তানকেও ইতিবাচকভাবে ভাবতে শেখান। এক বিষয়ের পরীক্ষার পর সেই বিষয়ে কি কি ভুল করল, সেসব খুঁটিয়ে বের না করে পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিতে সাহায্য করুন।

পরীক্ষা জীবনের স্বাভাবিক এবং বলা যায় অবিচ্ছেদ্য অংশ। চলমান জীবনের ধাপে ধাপে কোনো না কোনোভাবে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। নিজের ওপর আস্থা নিয়ে, ইতিবাচক থেকে, মানসিক চাপ দূরে রেখে স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে, তাহলেই প্রস্তুতির যথাযথ প্রতিফলন ঘটানো যাবে পরীক্ষার খাতায়।

হ ডা. মুনতাসীর মারুফ

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj