আইএস মার্কিনিদের সৃষ্টি!

শনিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৫

বর্তমান বিশ্বে সবচাইতে আতঙ্কের নাম আইএস। আর কাউকে ধরে নিয়ে আটক করে মুক্তিপণ আদায় করা, শিরñেদ করে ভিডিও প্রকাশ, নারীদের জোর করে নিয়ে নিজের প্রবৃত্তির চাহিদা মোটানো এবং নারী পাচার করে যৌন জীবনে বাধ্য করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়া, যখন আইএসের প্রকৃতি তখনই কথিত এই ইসলামধারী জঙ্গি সংগঠনটিকে নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয় কেননা, এসব প্রকৃতির কোনোটিই ইসলাম সমর্থন করে না। ইতোপূর্বে ইসলামিক যেসব যোদ্ধা আর দলের নাম ইসলামিক ইতিহাসে এসেছে এদের কেউ এদের প্রকৃতির আওতাভুক্ত ছিল না। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে এসব অপকর্ম করে কেন ইসলামিক বলে নামধারণ করেছে? আবার কারাই বা এর পেছনে দায়ী? কি বা তাদের মূল উদ্দেশ্য? অর্থ আর অস্ত্রের জোগানই বা আসে কোথা থেকে? যেখানে আলকায়েদার মতো সংগঠন গোপনে বহুদিন পরে অজ্ঞাত কোনো স্থান থেকে মাঝেমধ্যে তাদের খবরাখবর উপস্থাপন করত আর সেখানে কথিত এই ইসলামের নামে এই সংগঠনটি প্রতিনিয়ত তাদের বীভৎস কৃতকর্ম পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে অবলীলায় উপস্থাপন করে যাচ্ছে! আর এতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে সেই পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো। তবে এই প্রচার আর মার্কিন জোটের বারংবার পরিচালিত আইএসের বিরুদ্ধে পরিচালিত নিস্ফল আক্রমণ বহু প্রশ্ন মানব বিবেকে উত্থাপিত হয়। যার প্রথম প্রশ্নই হলো আইএস কাদের সৃষ্টি?

আইএসের সৃষ্টি সম্পর্কে বলতে গেলে বলা যায় আইএস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সৃষ্টি। আর এতে প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষভাবে মদদ দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রে স্পষ্ট করেই বলেছেন আইএসের উত্থানের পেছনে স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলই দায়ী। আবার গত কয়েকদিন ধরে আমেরিকান ফ্রি প্রেসে যে তথ্য বেরিয়ে এসছে তাতে আইএসকে মোসাদের সৃষ্টি বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। যে উদ্দেশ্যে ইঙ্গ-মার্কিন ইরাকে হামলা করেছে সেই একই উদ্দেশ্যকে আরো বিস্তৃত করে পুরো ইসলামকে বিশ্বের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ আর জঙ্গি হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করতে এক ধরনের কৌশলী পদক্ষেপ হাতে নেয় এই গোষ্ঠী। ইরাক কিংবা আফগানিস্তানে হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এসব দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ তথা তৈলকে আহরণ করা এবং নিজেদের বানানো পুতুল বসিয়ে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি শক্তি আরো বৃদ্ধি করা। কিন্তু যখন পুতুল বসিয়েও তাদের সব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে পুরোপুরি গ্রাস করে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশসমূহকে ভিক্ষুকে পরিণত করতে পারেনি তখনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ তাদের যাবতীয় অস্ত্র আর সরঞ্জাম দিয়ে তৈরি করল আজকের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সম্পদশালী জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসকে।

আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় দেখা যায় আইএস যে ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে তা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধে ও আমেরিকা-আফগান যুদ্ধে ব্যবহার করেছে এবং অন্যান্য যেসব অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে তা কেবল আমেরিকা কিংবা ইসরায়েলের কাছেই রয়েছে সুতরাং এসব লক্ষণ থেকে বুঝা যায় যে আইএস আমেরিকার ও ইসরায়েলের সৃষ্টি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে এ ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে পারে তা আলকায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের ২১ পৃষ্ঠার চিঠিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাকে হত্যার পর পাকিস্তানের এবোটাবাদের বাসভবনে এই চিঠিটি পাওয়া যায়। যাতে তিনি এইএস ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সম্পর্কে আলকায়েদাকে সতর্ক থাকতে বলেছেন।

আইএসের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আরব বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদ তেলকে পুরোপুরি আরোহণ করে আরব বিশ্বকে ভিক্ষুকে পরিণত করা এই উদ্দেশ্য আইএস ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে কেননা তারা এই উদ্দেশ্য সফল করতে প্রথমত ইরাক ও সিরিয়ার যেসব অঞ্চলে তেলের ক‚প ও শোধনাগার রয়েছে সেসব অঞ্চলকে তারা প্রথমেই দখল করে সেখানকার তেলকে তাদের মিত্রদের কাছে বিক্রি করত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে আইএস সিরিয়া ও ইরাকের মোট ১৪টি তেল ক‚প ও শোধনাগার দখল করেছে দখল করা এসব তেলের ক‚প থেকে প্রতিদিন উৎপাদিত হয় ৫২ হাজার ব্যারেল তেল! আর ব্যারেল প্রতি দাম ১০০ ডলারেরও বেশি কিন্তু তারা এসব তেল বিক্রি করছে মাত্র ২৫-৫০ ডলারে! আর এই হিসাবে আইএসের তেল বিক্রি থেকে দৈনিক আয় প্রায় তিন মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং অন্যান্য দেশ থেকে প্রাপ্ত সাহায্য প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার। বিভিন্নভাবে নারীদের সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন দেশে যৌন জীবনে বাধ্য করার জন্য পাচার করে দৈনিক অর্থ আয় করে প্রচুর। এছাড়া ইরাক আফগানিস্তান ও সিরিয়ার প্রতœতাত্তি¡ক বিভিন্ন নির্দশাবলী বিক্রি করে তারা প্রচুর পরিমাণ টাকা উপার্জন করেও চলছে। এসব অর্থ দিয়ে সাধারণ মানুষকে লোভে ফেলে তাদের দলে ভিড়ায় এই আইএস। সম্প্রতি প্যারিস হামলার তিনজনের একজন এ ধরনের আর্থিক লোভের বিষয়টির মাধ্যমেই আইএসে যোগদান করার বিষয়টি স্বীকার করেছে।

এই বছরের অক্টোবরের শুরুর দিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট আইএস দমনে সিরিয়া ১৩০ বারেরও বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে কিন্তু আইএসের লক্ষ্যবস্তুতেই তারা আঘাত করতে পারেনি, যে উদ্দেশ্যে অর্থাৎ আইএসকে দুর্বল করার জন্য হামলা চালালেও উপরন্তু আইএস শক্তিশালীই হয়েছে অর্থাৎ তারা আইএসের লক্ষ্যবস্তুতেই হামলা করতে পারেনি আর পারবেই বা কিভাবে কারণ তাদের এই হামলা তো কেবল লোক দেখানো ছিল। রাশিয়া আইএস দমনে বারবার স্থল অভিযান চালানোর আহ্বান জানালেও তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সায় দেয়নি এমনকি গত ১৮ অক্টোবর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পুনরায় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তাব দিলে তাতেও তিনি রাজি হননি! কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য আইএস দমন নয় বরং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে নিঃশেষ করা একই সঙ্গে পুরো সিরিয়ার অবকাঠামো ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করে তাদের ওপর নির্ভরশীল বানানো। আমেরিকার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ইসলামকে বিশ্ববাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে আমেরিকা ও ইউরোপে মুসলমানদের বৃদ্ধি রোধ করা এ হিসেবে ওবামা তার দেশে মসজিদ নির্মাণ নিষিদ্ধ করেছেন এবং সব মসজিদ বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। অন্যদিকে ফ্রান্সকেও মসজিদগুলো বন্ধের পরামর্শ দিয়েছেন।

আমেরিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন ইসরায়েলের একনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে সমাদৃত সম্প্রতি এবিসি টিভি ও সিএনএনের একটি ভিডির স্নাপশটে তার সঙ্গে কথিত খলিফার যে বৈঠকের চিত্র দেখা গেছে তাতে আইএসের উত্থানের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভূমিকার যে কথা ফিদেল কাস্ত্রে ও মাহমুদ কাইয়ুম বলেছেন তা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো। তবে যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রকৃতি ইতোমধ্যে বিশ্ববাসী দেখেছে তাতে মনে হয় এই আইএস দমনে তারাও সহায়তা করবে কারণ তারা আজ যার বন্ধু কাল তার শত্রু! ওসামা বিন লাদেন, গাদ্দাফি, সাদ্দাম হোসেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এসব রাষ্ট্রনায়ক যুক্তরাষ্ট্রেরই বন্ধু ছিল কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব নেতা যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডা বাস্তবায়ন না করার কারণে তাদের রক্তচক্ষুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং এদের নিঃশেষ করতে তারা আরবে আরব বসন্তের নামে গুটি বসন্ত রেখে আসছে আবার আর আফগানদের বন্ধু সেজে গিয়ে তাদের পঙ্গু বানিয়ে রেখে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসব প্রকৃতি দেখে মানুষ প্রবাদ তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু হয় তার আর শত্রুর দরকার পড়ে না! মার্কিন-আইএসের নিগূঢ় সম্পর্ক স্পষ্ট হলেও বর্তমানে ফ্রান্স সবাইকে আইএস বিরোধী জোট গঠন করার যে আহ্বান জানাচ্ছেন প্রত্যেক মুসলিম ও মানবতাবাদী দেশগুলোর উচিত ফ্রান্সের ডাকে সাড়া দেয়া। সন্ত্রাস লালনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে পুরো বিশ্বকে যুদ্ধবাজ আর সন্ত্রাসবাদী দেশসমূহকে মুক্ত করে বিশ্ববাসীকে শান্তিতে রাখা।

মো. শরীফুর রহমান আদিল : শিক্ষক ও লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj