ওরা পারছে, আমরা পারছি না কেন?

শনিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৫

যারা হত্যার এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নেমেছে, তারা পারছে। আমরা যারা বাঁচতে চাইছি- আমরা পারছি না। কেন পারছি না? অনেক কিছুই ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। গোটা বিশ্বজুড়ে একই অবস্থা। প্যারিসে নারকীয় হামলা হয়েছে। হতাহতের সংখ্যা গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া অলন্দ বলেছেন, আমরা এর কঠিন মোকাবেলা করব। ফ্রান্স কেবল ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) দমনই করবে না বরং এ গোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দেবে বলেও জানান তিনি। পার্লামেন্টের দুই কক্ষের যৌথ এক বিরল অধিবেশনের এ ভাষণে তিনি আরো বলেন, হামলার পর জারি করা জরুরি অবস্থা তিন মাস বাড়ানোর জন্য তিনি একটি বিল উত্থাপন করবেন। জঙ্গিরা আগামী দিনগুলোতে আবারো আঘাত হানতে পারে বলে এরই মধ্যে সতর্ক করেছেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী। এ হামলা মোকাবেলায় সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলেন তিনি। ওদিকে প্রেসিডেন্ট অলন্দ আইএসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা করবেন বলে জানিয়েছেন।

গত ৭ জানুয়ারি ২০১৫ প্যারিসে সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘শার্লি এবদো’র দপ্তরে তিন মুখোশধারী হামলা চালিয়েছিল। হামলার দায়ভার স্বীকার করে আইএসের (ইসলামিক স্টেট) তরফে জানানো হয়েছিল, হজরত মোহাম্মদকে (সঃ) নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের প্রতিশোধ নিয়েছে তারা। এরপর গেল ১৩ নভেম্বর। এবার তারা আঘাত হেনেছে ফুটবল খেলা দেখতে আসা, রক ব্যান্ডের কনসার্ট শুনতে যাওয়া সাধারণ মানুষ। কেন পরপর সন্ত্রাসের নিশানায় ফ্রান্স? সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের কড়া অবস্থানই তার প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। অতীত বলছে, কয়েক দশক আগেও আফগানিস্তান এবং ইরাক নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি উত্তাল, তখন ফ্রান্সকে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। আলকায়েদার রোষানলেও পড়তে হয়নি ফ্রান্সকে। ইউরোপে লন্ডন বা মাদ্রিদ যেভাবে বিস্ফোরণে কেঁপেছে, ফ্রান্সে তার আঁচ পড়েনি। সে তুলনায় এখন সন্ত্রাস দমন অভিযানে অনেক বেশি সক্রিয় ফ্রান্স। লিবিয়ার যুদ্ধ কিংবা আইএসবিরোধী অভিযান- সবটাতেই তারা আগে ছিল। এমনকি পশ্চিম আফ্রিকায় সাবেক ফরাসি ঔপনিবেশগুলোতে সন্ত্রাসবাদের বিরোধিতাতেও বড় ভূমিকা নিয়েছে ফ্রান্স। তাই জঙ্গিদের নজর পড়েছে শিল্প-সংস্কৃতি, সাম্য ও স্বাধীনতার দেশে। ওরা একের পর এক আঘাত করেই যাচ্ছে। এর প্রতিকার কি? বিশ্ব কি তবে আরেকটি বড় যুদ্ধের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে? এই কয়েকদিনেই পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট দ্রুত। সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের (আইএস) অবস্থানগুলোতে ফ্রান্সের বিমান হামলার সঙ্গে যোগ দিয়েছে রাশিয়া। প্যারিস হামলার কড়া জবাব দিতে ফ্রান্স আইএসের ওপর জোর বিমান হামলা শুরু করার পর রাশিয়াও মিসরের সিনাইয়ে তাদের বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার জবাব দিতে একযোগে এ বিমান হামলা শুরু করেছে। প্যারিসে হামলা চালিয়ে ১২৯ জনকে হত্যা এবং ৩১ অক্টোবরে মিসরের সিনাইয়ে রাশিয়ার বিমান বিধ্বস্ত করা- দুটো ঘটনারই দায় স্বীকার করেছে আইএস জঙ্গিরা। ইরাক এবং সিরিয়ায় ফ্রান্স এবং রাশিয়ার বিমান হামলার প্রতিশোধ নিতেই এ হামলা করা হয়েছে বলে জানায় আইএস। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন তাদের বিমানে হামলার জন্য দায়ীদের ‘খুঁজে বের করে শাস্তি’ দেয়া এবং সিরিয়ায় আইএস অবস্থানে হামলা জোরদার করার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এ হামলা এমনভাবে বাড়াতে হবে যাতে অপরাধীরা বোঝে যে এ প্রতিশোধ হামলা এড়ানো যাবে না।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কোন ভূমিকা নেবে- তা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সিরিয়ায় স্থলসেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ভয়াবহ হামলার পরও ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্থলসেনা পাঠাবে না যুক্তরাষ্ট্র।

ওবামা বলেছেন, আইএসের সঙ্গে লড়তে যুক্তরাষ্ট্র স্থলসেনা পাঠালে সেটি ভুল হবে। তবে ইরাক এবং সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের হামলা আরো জোরদার করার ইঙ্গিত দেন তিনি। তুরস্কে জি-২০ নেতাদের সম্মেলনে বক্তব্যের পর সংবাদ সম্মেলনে ওবামা বলেন, আমরা বর্তমান কৌশলেই কাজ চালিয়ে যাব। তিনি আরো বলেন, আইএসের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনা না পাঠানোর মতটি কেবল তার একার নয়। তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সামরিক ও বেসামরিক উপদেষ্টারাও এর পক্ষে।

এদিকে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন ও ব্রিনন্যান বলেছেন, তাকফিরি গোষ্ঠী আইএসআইএল সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে সিআইএ আগে থেকেই জানত। বিশেষ করে ইউরোপে এ হামলা চালানো হবে সে তথ্যও সিআইএর কাছে ছিল। ওয়াশিংটন ডিসিতে গ্লোবাল সিক্যুউরিটি ফোরাম ২০১৫-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে এ মন্তব্য করেন তিনি। সিআইএ পরিচালক বলেছেন, কয়েকদিনের মধ্যে এ পরিকল্পনা করা হয়নি। বরং মাসের পর মাস ধরে ভাবনা চিন্তা করে এ পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, হামলায় কারা জড়িত থাকবে, কি ধরনের অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং আত্মঘাতী হামলার বেল্ট ব্যবহার করা হবে সে বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভাবনাচিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্যারিসের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলাই শেষ নয় বরং আরো সন্ত্রাসী হামলা হবে বলে ধারণা ব্যক্ত করেন ব্রিনন্যান। এ সময়ে প্যারিস হামলার ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতিতে পশ্চিমা নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, দায়েশের সঙ্গে জড়িতদের ধরার জন্য এখন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রচণ্ডভাবে তৎপর রয়েছে।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে সিএইএ যদি তা জেনেই থাকে- তাহলে তারা মিত্রদেশ ফ্রান্সের পক্ষে কোনো ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে আসেনি কেন? ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে হামলার পর এবার ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গি গ্রুপ ইসলামিক স্টেট (আইএস) রোম, লন্ডন ও ওয়াশিংটনে হামলার হুমকি দিয়েছে। হামলার কিছুক্ষণ আগে আইএসের করা একটি টুইট বার্তায় এমনটাই বলা হয়েছে। সন্দেহভাজন একটি একাউন্ট থেকে করা ওই টুইটে ইতালির রোম, যুক্তরাজ্যের লন্ডন এবং সম্ভব হলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতেও হামলা করা হবে বলে দাবি করা হয়েছে।

বিশ্বকে যুদ্ধমুখী করে তোলা হচ্ছে সম্পূর্ণ মিথ্যা অজুহাতে। মনে রাখা দরকার, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি আগ্রাসন, ইরাকে শিয়া-সুন্নি দ্ব›দ্ব, আলজিরিয়ায় গোত্র সংঘাত এসব বিষয়ের প্রতিবাদ গোটা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষই করেছেন। করছেন। তারপরও একটি গোষ্ঠী বলছে প্যারিসের হামলার প্রতিবাদ যারা করছেন- তারা নাকি ইসরায়েলিদের দ্বারা ফিলিস্তিনে গণহত্যার প্রতিবাদ নাকি হয়নি! এরা মূলত সেই জঙ্গিবাদকে সমর্থন করছে পরোক্ষভাবে।

বাংলাদেশে যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ হচ্ছে এর মূল হোতা কারা? ঢাকায় একটি মানববন্ধন সমাবেশে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছেন, ‘আমরা কখনো ভাবতে পারিনি যে স্বাধীন এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য বক্তব্য-বিবৃতি দিতে হবে, মুক্তমনাদের আত্মরক্ষার্থে পথ খুঁজতে হবে। কখনো ভাবিনি যে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বাধা দেখা যাচ্ছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। ’কয়েকদিন আগেই জঙ্গিবাদীদের হুমকি পেয়েছেন তিনি। ‘সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন’ ও ‘বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও’ এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে যুদ্ধাপরাধের বিচারের গতি বাড়ানোর দাবিও জানানো হয়েছে। রাজু ভাস্কর্যের সামনে এই মানববন্ধনে অধ্যাপক অজয় রায়ও ছিলেন, যার ছেলে অভিজিৎ রায়কে এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওই স্থানটিতে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

মানববন্ধনের সময় সমাবেশে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি অজয় রায়, সাংবাদিক আবেদ খান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারোয়ার আলী, অধ্যাপক এম এম আকাশ, সা¤প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চের যুগ্ম সমন্বয়ক জিয়াউদ্দিন তারেক আলী, খেলাঘরের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল মতিন ভুঁইয়া, নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর, আইইডির নির্বাহী পরিচালক নুমান আহম্মদ খান, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদসহ দেশের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিই উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের মানুষকে আজ আবার জিম্মি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টি পুরোই রাজনৈতিক। কেউ কেউ ক্ষমতার ধারে কাছে যেতে না পেরে এখন ভিন্নপথ অবলম্বন করছে। এরা লেলিয়ে দিচ্ছে না না ধরনের সন্ত্রাসী।

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও নানা বিষয়ে উদ্বিগ্ন। আইএসের হামলার হুমকি আমলে নিয়ে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে রাজ্য সরকারগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। বলা হয়েছে ‘আইএস ভারতে কোনো উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে না পারলেও কিছু তরুণকে তারা মৌলবাদী করতে সফল হয়েছে। ভারতের অধিবাসী বা দেশের বাইরে অবস্থানরতদের একটি নির্দিষ্ট অংশকে তারা তাদের কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত হতে উদ্বুব্ধ করতে পেরেছে।’ সংবাদটি বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই শুভ নয়। আবারো বলি- ওরা পারছে। আমরা পারছি না কেন? কেন আজও ধরা পড়ছে না দেশের বিভিন্ন আলোচিত হত্যার আসামিরা? এই লেখাটি যখন লিখছি, তখনই খবর এসেছে দিনাজপুরে একটি চার্চের ইতালিয়ান পাদ্রিকে গুলি করা হয়েছে। কি চলছে এসব? ফ্রান্স যুদ্ধে নেমে গেছে। বাংলাদেশকে তেমন যুদ্ধে যেতে হবে না। কিন্তু দেশের ভেতরে যে অপশক্তি মাথাচাড়া দিচ্ছে- তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিচ্ছে কি?

এমন কিছু ভাবার সুযোগ নেই- ওরা কাউকে ছেড়ে কথা বলবে। তাই যা করার তা করতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে। মানুষকে বুঝাতে হবে- মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ কিভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের প্রতিবেশ, আমাদের বিশাল পৃথিবী।

ফকির ইলিয়াস : কবি ও সাংবাদিক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj