জন্মশতবার্ষিকী > বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য : অনন্য ব্যক্তিত্ব

মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০১৫

বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, সমাজের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে প্রেরণার উৎস বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯১৪ সালের এই দিনে (৩ নভেম্বর) টাঙ্গাইল জেলার এলেঙ্গার ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারে। এ বছর তার জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হচ্ছে।

এলেঙ্গার মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে শুরু হয় তার শিক্ষাজীবন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে আইএসসি পাস করেন ১৯৩৩ সালে এবং বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৩৫ সালে। তারপর তিনি কলকাতার ইউনিভার্সিটি ল’ কলেজ থেকে ১৯৩৮ সালে প্রথম শ্রেণিতে আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতেও এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন। কলকাতায় শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি ফিরে আসেন পূর্ববঙ্গে এবং ১৯৪১ সালে আইনজীবী হিসেবে ময়মনসিংহ জেলা আদালতে কর্মজীবন শুরু করেন । ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ হয় এবং পূর্ববঙ্গের প্রতিটি হিন্দু পরিবারকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় দেশত্যাগ করবে কি করবে না সেই সিদ্ধান্তটি নিতে হয়। এর মধ্যে ১৯৪৮ সালের ২৬ নভেম্বর চিত্রা সিংহের সঙ্গে দেবেশ ভট্টাচার্য পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। দেশের এক চরম অনিশ্চয় সময়ে চিত্রা ও দেবেশ ভট্টাচার্য সিদ্ধান্ত নেন দেশ ত্যাগ না করার।

বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে ১৯৪৯-১৯৫০ সালে প্রায় দুই বছর তিনি তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার কর্তৃক ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলে রাজবন্দি ছিলেন। তিনি জেল-জুলুমে অবদমিত হননি। সহকারাবন্দিদের সঙ্গে অধিকার আদায়ের জন্য অনশন ধর্মঘটে অংশ নেন। কারামুক্তির পর দেবেশ ভট্টাচার্য ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৫৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের একজন এডভোকেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬০ সালে তিনি বার কাউন্সিলের সদস্য মনোনীত হন। পরে হাইকোর্টের রুল কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন এবং ঢাকা হাইকোর্টের অবলুপ্তি পর্যন্ত ওই পদে যুক্ত ছিলেন। ক্রমান্বয়ে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের একজন অত্যন্ত যশস্বী আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। সম্পত্তি বিষয়ক আইন তথা দেওয়ানি আইনে তিনি বিশেষ পারদর্শিতার স্বাক্ষর রাখেন। বর্তমানের অনেক যশস্বী আইনজীবীর হাতেখড়ি হয় তার কাছে।

১৯৭১-এর মার্চ মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক গণহত্যা শুরু হলে দেবেশ ও চিত্রা ভট্টাচার্য সবার অজ্ঞাতে তাদের বন্ধু ও সুহৃদ ড. আলীম আল-রাজীর ধানমন্ডির বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কয়েক মাস পরে ড. রাজীর সহযোগিতায় এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনায় ছদ্মবেশে ঢাকা থেকে পালাতে সক্ষম হন।

পাকিস্তান শাসনামলে হিন্দু সমাজ থেকে আগত কোনো ব্যক্তি হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না, সেই সম্ভাবনা উন্মুক্ত হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। বাংলাদেশের স্বাধীন সরকারের আমন্ত্রণে দেবেশ ভট্টাচার্য ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি নবগঠিত হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের জুন মাসে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি নিযুক্ত হন। বিচারক হিসেবে তার লেখা বেশ কিছু সাংবিধানিক ও মানবাধিকার বিষয়ক রায় তৎকালীন প্রেক্ষাপটে নিরপেক্ষ ও সাহসী হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বর্তমানেও সেগুলো দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লিখিত হয়ে থাকে।

১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে অবসর গ্রহণের বয়স কমিয়ে দেবেশ ভট্টাচার্যকে অকালীন অবসরে যেতে বাধ্য করে। এক নতুন অনিশ্চয়তায় দেবেশ ভট্টাচার্য চেম্বার প্র্যাকটিসের মাধ্যমে আইনজীবীদের পরামর্শ দেয়া ও সালিশিতে সাহায্য অব্যাহত রাখেন। এছাড়া এই সময়ে তিনি নানাবিধ সামাজিক কর্মকাণ্ডে সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান।

দেশপ্রেমিক দেবেশ ভট্টাচার্যকে সমাজ সংস্কারক, সমাজসেবী ও আত্মত্যাগী মানুষ হিসেবেও স্মরণ করতে হয়। তিনি বাংলাদেশে হিন্দু নারীদের অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে হিন্দু আইন সংশোধনের জন্য সরব ছিলেন। বাংলাদেশে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যও তিনি প্রয়াস চালান। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকল্যাণমূলক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ব্রিটিশ-ভারতীয় সময়ে গড়ে ওঠা নোয়াখালী গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি আলীম আল-রাজী ল’ কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের সভাপতি, নোয়াখালীর গান্ধী আশ্রমের সভাপতি এবং চট্টগ্রামের প্রবর্তক সংঘের সভাপতি ছিলেন। এলেঙ্গায় বিভিন্ন আর্থসামাজিক সংগঠনের তিনি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি ব্রতচারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুষ্টিভিক্ষার মাধ্যমে এলেঙ্গাতে ‘বাণী মন্দির’ নামে পাঠাগার স্থাপন করেন। আশির দশকে মহিলা সমবায় কেন্দ্র, দাতব্য চিকিৎসালয় এবং শিশুদের জন্য দুগ্ধ বিতরণ কেন্দ্র স্থাপন করেন তিনি। নিজ গ্রাম এলেঙ্গায় তার মায়ের নামে একটি বালিকা বিদ্যালয়সহ দুটি উচ্চবিদ্যালয় এবং একটি কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার আন্দোলনের একজন সোচ্চার কণ্ঠ হিসেবে বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য সবিশেষ প্রশংসা ও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ শত্রু সম্পত্তি আইন প্রতিরোধ কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

দেবেশ ভট্টাচার্য রবীন্দ্র অনুরাগী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতোই জীবনের নানা উত্থান ও পতনে তিনি কখনই নিরাশ হননি, বরং এক নব উদ্যমে প্রতিক‚লতাকে বুঝেছেন। দেশের নানাবিধ সংকটের মুহূর্তে তার কাছে উপদেশের জন্য সমাজের নানাবিধ স্তর থেকে মানুষ ছুটে এসেছে, তিনি কখনই তাদের নিরাশ করেননি। সামাজিকভাবে তিনি যে আদর্শে বিশ্বাস করতেন ব্যক্তিগত জীবনেও সেই আদর্শ থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। সেই জীবন ছিল নিরাভরণ ও নিরহঙ্কার। এক ধরনের সর্বত্যাগী গান্ধীবাদী দর্শন পরোক্ষভাবে তাকে পরিচালিত করেছে।

বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য আইনের শাসন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ব্যয় করেছেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৯২ সালে গঠিত গণআদালতের তিনি ছিলেন অন্যতম বিচারক। তিনি বাংলাদেশ শান্তি কাউন্সিলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং বাংলাদেশ নাগরিক কমিটির কার্যকরী পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৯৮৫ সালের জগন্নাথ হল দুর্ঘটনার গণতন্ত্র কমিশনের তিনি ছিলেন সভাপতি। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা ছিলেন। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ শান্তিপ্রিয় মানুষটি বার্ধক্যেও বিরত থাকেননি মানবাধিকারের আন্দোলন থেকে, সব নাগরিকের সম-অধিকারের আন্দোলন থেকে।

২০০৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি (সোমবার, ২০ মাঘ, ১৪১০ বঙ্গাব্দ) সন্ধ্যা ৭-৩০ মিনিটে ঢাকার শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। পরিবারের পক্ষ থেকে তার নামানুসারে এলেঙ্গায় একটি দাতব্য ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে তার সমাজসেবামূলক কাজের ধারা অব্যাহত রেখেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট ও নোয়াখালীবাসীর পক্ষ থেকে এই ক্ষণজন্মা পুরুষকে তার জন্মশত বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করছি।

গোলাম মহিউদ্দিন নসু : লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj