মিলবে কবে ‘নারীমুক্তি’

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০১৫

নবম থেকে সবে দশম শ্রেণিতে উঠেছে তিতলী। এরকম একটা সময়ে তার সরকারি কর্মকর্তা বাবার সৌদি আরবে চার বছরের একটা পোস্টিং হয়। নতুন জায়গায় রোমাঞ্চকর অনুভূতি নিয়ে তিতলী আরব দেশ গিয়ে হতবাক। প্রতিটি ভিলাতে মেয়ে এবং ছেলেদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা। সেখানে খাবার খাওয়ার সময়ে নিয়ম হলো প্রথমে ছেলেরা, এরপর ছোট বাচ্চারা এবং সবার শেষে বেঁচে যাওয়া খাবার খাবে মেয়েরা। সেখানে বসবাসরত অধিকাংশ বাংলাদেশি এই নিয়ম মেনে চলেন। কালো পর্দার আড়ালে নিজেকে ঢেকে রাখা নিয়ম।

নিজের পছন্দ বা ইচ্ছা হতে পারে, তবে এর ভেতর যে একজন মানুষের আত্মসম্মানবোধও ঢেকে যেতে পারে, সেটা বুঝতে বা নিজেকে বোঝাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল তিতলী। আল-খোবার নামে একটি শহরে বেড়াতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া কিছুটা বন্ধ হলো। তিতলী শুনেছে ওখানে হাফ-মুন বলে একটা সমুদ্র সৈকত আছে। সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোর কথা চিন্তা করে কিছুটা স্বস্তি, কিছুটা ভালো লাগা কাজ করে মেয়েটির। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে আবিষ্কার করল আবায়া বা বোরখা খুলে সমুদ্রে নামার কোনো নিয়ম নেই, যে সমস্ত মেয়ে সমুদ্রে নামছেন, বোরখাটা উঁচু করে শুধুমাত্র পায়ের পাতা ভেজাচ্ছেন।

আসলে মেয়েরা কি বিশেষ কোনো স্থানে বা কালে আটকে পড়া মানুষ? নাকি এরা একেক স্থানে একেকভাবে বন্দি। হলিউড ছবিতে ‘গার্লস নাইটস আউট’ বলে একটা চর্চা রয়েছে। ছেলেদের মাঝেও এটা আছে। এখানে মেয়েরা একসঙ্গে বের হয়, ঘুরে বেড়ায়, নিজেদের মাঝে গল্প গুজব করে।

এই সংস্কৃতিটা বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের মেয়েদের মধ্যেও দেখা যায়।

ঘুরে বেড়ানো বা মেয়েলী কথা আদান-প্রদানের জন্য নিজেদের আলাদা করে দেয়ার মধ্যেও কেমন যেন একটা ছিটকে পড়া, বৈষম্যের গন্ধ পাওয়া যায়। যেসব কথা আর দশটা কথার মতো স্বাভাবিক কথোপকথনে স্থান পাওয়ার কথা ছিল সেটাকে আমরাই ‘মেয়েলী কথা’ নাম দিয়ে নিজেদের ‘গার্লস নাইটস আউট’ এর মতো ইংরেজি নাম দিয়ে আলাদা করে ফেলি। নিশাতের স্বামী নিশাতকে রান্নাবান্নায় সাহায্য করে। এ ঘটনায় তার প্রতিবেশী খালাম্মা বেশ ক্ষিপ্ত।

মেয়ে মানুষের কাজ করা ছেলেদের তার একেবারেই অপছন্দ। অথচ খালাম্মার নিজের মেয়ের জামাই যখন তার মেয়েকে সংসারের কাজে সাহায্য করে, তখন সেই জামাইয়ের মতো ভালো ছেলে এই দুনিয়াতেই খুঁজে পাওয়া যায় না। মানসিকতা এভাবেই নিচে থেকে আরো নিচে নেমে মাটির তলায় চলে যায়। একজন পুরুষের ঘাড়ে দোষ চাপানো সহজ হলেও নিজেদের নিচ মানসিকতাকে শনাক্ত করা কঠিন। ছেলেবাচ্চারা যখন ব্যথা পেয়ে কান্না করে, অনেক মাকেই বলতে শোনা যায়, ছি বাবা, মেয়েদের মতো কাঁদতে হয় না। কান্না কষ্ট বা বেদনা বহিঃপ্রকাশের একটা উপায় মাত্র, এটা কোনো মেয়ের বৈশিষ্ট্য নয়।

কান্না করাকে মেয়েদের একান্ত সম্পত্তি বানিয়ে যখন আপনি আপনার ছেলেকে বকবেন, তখন ওই শিশু মনের ভেতরই একটু একটু করে তৈরি হয়ে যাবে ছেলে আর মেয়ের মধ্যেকার পার্থক্য শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া। তার চেয়ে বরং আপনার ছেলেকে প্রাণ খুলে কাঁদতে দিন, যেন সে বড় হলে একটা মেয়ের কান্নাকে বেদনা প্রকাশের একটা মাধ্যম হিসেবে দেখতে পায়, শুধুমাত্র মেয়েদের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবে নয়। অনেক অনেক আগে পাত্রী দেখতে এসে মেয়েদের হাঁটতে বলা হতো, চুল খুলে দেখাতে বলতো। এখন, এই সময়ে, যখন কিনা নারী মুক্তি নিয়ে এত আন্দোলন, এত যুদ্ধ, তখন যদি কোনো মেয়েকে হেঁটে দেখাতে বলা হয়, সে ক্ষেত্রে মেয়েটির অথবা মেয়েটির মা-বাবার কি করা উচিত?

নিজের সন্তানকে পণ্য দেখার মতো করে যখন ছেলের মা-বাবা হেঁটে দেখাতে বলবে, চুল খুলে দেখাতে বলবে, তখন কি সেই মেয়ের মা-বাবার ভ্রƒক্ষেপহীন চোখজোড়া মেয়েটির ভেতর তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মানবোধের আশ্রয় দিবে? বাজারের ফ্রিজ, টেলিভিশন বা কাপড়-চোপড় দেখার মতো করে আপনাকে যখন দেখতে চাওয়া হয়, তখন যদি আপনার নিজের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না হয়, তবে কারোর কিছুই আসবে যাবে না। নানান মানুষকে জিজ্ঞেস করেছি নারীমুক্তি বলতে আপনি কি বোঝেন? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া এক মেয়ে জবাব দিলেন, ‘বাবা যথেষ্ট হাত খরচ দেয় না, যার কারণে বন্ধুদের সঙ্গে ভালো ভালো জায়গায় খেতে যেতে পারি না, মাঝে মাঝে মনে হয় একদম স্বাধীনতা নেই।’

একজন গৃহিণী বললেন, ‘সারাদিন রান্নাবান্না করে ক্লান্ত থাকি, এসব প্রশ্নের জবাব দেয়ার সময় নেই।’ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া আরেক মেয়ে বললেন, ‘যেদিন গভীর রাতে একা একা রাস্তায় চলতে পারব, সেদিনই ঘটবে নারীমুক্তি।’ এসিসিএ করছেন একজন পুরুষকে জিজ্ঞেস করেছিলাম নারীমুক্তি ব্যাপারটা আপনার কাছে কি? সে বলল ‘ছেলেরা যা করে কোনো বাধা ছাড়া, মেয়েরা ঠিক সেসবই কোনো বাধা ছাড়া করতে পারলেই হবে নারীমুক্তি’ একেকজনের দর্শানুপাত হয়তো একেক রকম, তবুও মূলটা কোথাও মজবুত, কোথাও অদ্ভুত, কোথাও হয়তো অদৃশ্য।

লোকাল বাসের ‘মহিলা আসন’ নিয়ে আমরা মোটামুটি সবাই কোথাও না কোথাও কিছু না কিছু পড়েছি, ভিড়ের মধ্যে এদিক ওদিক দিয়ে গুঁতো দেয়া, ইচ্ছা করে ঠেলাঠেলি করা কোনো নতুন ঘটনা নয়। বুকে, পিঠে গুঁতো দিলে যে কি পরিমাণ ব্যথা লাগে এটাও হয়তো অজানা তথ্য নয়। তবুও এসব হয়ে আসছে, হতে থাকবে।

মহিলা আসন সংখ্যা যেদিন পুরুষ আসন সংখ্যার সমান হবে, যেদিন এ ধরনের গুঁতোগুঁতির স্বভাবের অন্ত হবে, গরম ইঞ্জিনের ওপর বসে থাকার যন্ত্রণা ছাড়াই যেদিন একটি মেয়ে নিশ্চিন্তে বাসে উঠতে পারবে, সেদিনই হয়তো নারীমুক্তি ঘটবে, কিছুটা ঘটবে।

নারীমুক্তি হয়তোবা নিজের চেতনার মুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি শব্দ। আশপাশের পুরুষের মুক্তচিন্তার পাশাপাশি নারীরও দরকার তার গোঁড়ামিতে ভরা মগজকে মুক্তি দেয়া। মাথার ভেতর খাঁচায় আটকে থাকা পাখিটাকে ছেড়ে দেয়া, আত্মমর্যাদাকে উপলব্ধি করা এবং যথাযথ স্থান দেয়া। আমাদের জায়গা আমাদেরই বানিয়ে নিতে হবে, যদিও হয়তোবা ক্ষেত্রবিশেষে আমাদের কিছু বলার থাকে না।

তবুও যার যার মতো করে চেষ্টা করতে দোষ কি? আল- খোবারের হাফ মুন সমুদ্র সৈকতে ভিজতে না পারা তিতলী অপেক্ষা করছিল বাংলাদেশে ফিরে কক্সবাজারের সমুদ্রে নামার। নবম শ্রেণিতে পড়া তিতলী এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্রী। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে ফিরে আসার পরেও তিতলীর সমুদ্র দেখতে যাওয়া হয়নি, একলা মেয়ে, যদি কিছু হয়ে যায়?

:: নিকিতা নন্দিনী

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj