রাষ্ট্রে বিরোধী দল কি এমনই ভূমিকা রাখবে : কামাল লোহানী

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

রাষ্ট্র এখন কোন পথে চলেছে। দুস্তর কোনো বন্ধুর পথ পেরিয়ে চলেছে, নাকি মধুর ছলে দোদুল আনন্দে? প্রশ্নটা সচেতন যে কোনো নাগরিকের। কারণ দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির এক মহাজোট রাষ্ট্রকে পরিচালনা করছে। কিন্তু তাদের কোনো উল্লেখ করার মতো কোনো বিরোধী শক্তি এখন চোখে পড়ছে না। জাতীয় সংসদে যারা বিরোধী দল বলে চিহ্নিত, তাদের বলা যায়- ‘না ঘারকা না ঘাটকা’। এদের তেমন কোনো জনসমর্থন নেই। স্বৈরশাসক এরশাদের দল হিসেবে সবার কাছে গৃহীত হয়েছে প্রায় ২৫ বছর হলো। যাকে দিনরাত রাজপথে অনন্য এক গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করেছিলেন এ দেশের জনগণ, সেই এরশাদ অথবা তার দল জাতীয় পার্টি এখন বিরোধী দলের ভূমিকায়, তবে এরশাদ নয় রওশন এরশাদের নেতৃত্বে। এখানে নাকি গণতান্ত্রিক চর্চাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তাই দলীয় নেতৃত্ব এরশাদকে ছাড়তে পারার কোনো কারণ নেই বলে জেনারেল এরশাদ দল প্রধান থাকলেও তার প্রথমা স্ত্রী (অবশ্য এখন বুঝি একজনই) রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছেন জাতীয় সংসদে। এরা যেহেতু মহাজোটে আছেন, বিরোধী দলের তকমায় ওই যোগ্যতা পেয়েও ওই মহাজোটে থেকে বিরোধী দল। আবার মন্ত্রিসভার অংশ, কজন মন্ত্রীও রয়েছে এই বিরোধী দলের। এমনি এক নব আবিষ্কার ‘গণতান্ত্রিক’ সহঅবস্থান করছে জাতীয় পার্টি। তবে পার্টির নেতা তো জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার আস্ফালন দাম্ভিক বক্তব্য, আবদারি ‘জনপ্রিয়তা’ ইত্যাদি দাবি ও দম্ভ বগলদাবা করে একা হোক, দোকা হোক কিংবা জোটবদ্ধ হোক, তিনি নিজের গলা কিন্তু সোচ্চার রেখে চলেছেন। কখনো মহাজোটে থাকেন আবার চলে যাওয়ার হুমকি দেন মাঝে মাঝে। রাজনৈতিক বক্তব্যে এত কনট্রাডিকশন যে মানুষ তাকে বিশ্বাস করতে পারে না, নির্বাচনে যাওয়ার জন্য মহাজোটে গেলেও অনেকে স্বৈরাচারকে নেয়ার প্রশ্নে বিরোধিতা করেছিলেন, তারপর তাকে নিলেন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনারই অনুরোধে, অথচ সেই হাসিনাকে কতভাবে বিপদে ফেলতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। তবু তার তড়পানি কমেনি। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করবেন কিনা তা নিয়ে দলে বিরোধ, বিতর্ক, নানা অশোভন উক্তিও সচরাচর শুনতে হয়েছে। এরশাদ এই বলছেন নির্বাচন করবেন, পরক্ষণে বলছেন করবেন না। দাবি বলব না আবদার, তাই ধরছেন কখনো আবার মহাজোট আগের হুমকি দিচ্ছেন। কর্মীদের নিয়ে যখন সভা করে, তখন এরশাদ গলা চড়িয়ে ধমকের সুরে ঐক্যকে ধুলোয় লুটিয়ে দেন, আবার দলের চাপে এককভাবে আবার ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নও দেখান ভদ্রলোক। তার এই বহুরূপী চরিত্রধারণ ও প্রকাশ সম্পর্কে জানে না এমন কেউ দেশে নেই। … এখন ভদ্রলোকের সাংসারিক বা পারিবারিক সম্পর্কোচ্ছেদ নয়, তবে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কিছুটা মার খেয়েছেন রওশনের কাছে। এ জন্য তার প্রচুর যন্ত্রণা আছে। প্রকাশ করতে পারেন না আবার সইতেও পারেন না, তাই ‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া’ যান মাঝে মাঝে, এখনো বোধহয় রওশন তার চক্ষুশূল দলগত লড়াইয়ে। ওদের অন্তর্কলহ মাঝে মাঝে প্রকট হয়ে সাংবাদিকদের ‘রাজনৈতিক রঙ্গ’ বিষয়ক সংবাদ রচনায় উপাদানের জোগান দেন। দলকে পুনর্গঠনে স্বামী-স্ত্রীতে লড়াই। দলীয় নেতা জেনারেল এরশাদ আর সংসদীয় নেত্রী হলেন রওশন এরশাদ। তবে নেতৃত্বের লড়াই বলা যাবে না কারণ রওশন দলপ্রধান হওয়ার চেষ্টা করেন না, নিজের সীমাবদ্ধতা স্মরণে রেখেই। আর এরশাদ সংসদীয় দলের নেতা হবেন না, তিনি তো যত যাই হোক, দশ বছর রাষ্ট্রপতি ছিলেন, এ অহংবোধটা তো তার আছে। দুজনের দুটো জায়গা নিশ্চিত থাকা সত্ত্বেও নিজেদের মধ্যে এক নিদারুণ দ্ব›দ্ব, বিরোধ বিতর্ক, কথা কাটাকাটি আছে কারণ দুজনই দলে নিজ নিজ প্রাধান্য রাখার জন্য প্রকাশ্যে ও গোপনে কাজকর্ম করেন সে সব বাইরে এলে এরশাদ, রওশন ও দলীয় অপরাপর নেতৃত্ব সম্পর্কে লোকজনের বিরূপ ধারণা তৈরি হয়। এখন তো দলে দুটো প্রধান উপদলীয় কোন্দল চলছে, সেক্রেটারি জেনারেল আর চিফ হুইপ নিয়ে। পদে পদে ঘাটে ঘাটে যদি কোনো দলের ভেতরে-বাইরে এমন লড়াই হরহামেশা চলতেই থাকে লোকে তাকে রাজনীতি হিসেবে নয়, তামাশা হিসেবে দেখে থাকেন, এতে কি দল পুষ্ট হয়, এই রাজনৈতিক এরশাদীয় রঙ্গরস এখন আর জনগণ দেখতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নন। জনগণকে মনে রেখে যদি কেউ রাজনীতি না করেন তবে সে মুসলিম লীগের মতো অদ্বিতীয় দলও কিন্তু নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আমাদের দেশে যারাই রাজনীতি করেন, জাতীয়তাবাদী বা সাম্যবাদী, তারা সবাইকে বুঝতে হবে, অভিজ্ঞতাও তো কম নয়, সেও বলছে জনগণ সম্পৃক্ত না হলে সে রাজনীতি আলটিমেটলি দেশবাসী গ্রহণ করে না। ক্ষমতা দিয়ে জনগণকে সমর্থনে পাওয়া যায় না, এটা তো এরশাদই প্রমাণ করে দিয়েছেন।

বিএনপিকে আমি তথাকথিত বিরোধী দলই বলব কারণ রাষ্ট্রে বা সংবিধান অনুযায়ী বিরোধী দল রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে যারাই বিরোধী দলে থাকবেন, তাদের রাষ্ট্র সরকারের অংশ হিসেবে আচরণ করতে হবে। আমাদের দেশে যে যখন বিরোধী দলে থাকে, তারা সেভাবে ব্যবহার করে। এখনো বিরোধী দল বলতে লোকে বিএনপিকেই বোঝে, অথচ আমার ধারণা, ওরা নিজেরা ওই মূল্যায়নটা বোঝে না। ফলে জনগণের সঙ্গে ওদের রাজনৈতিক কোনো যোগাযোগ নেই। তাই ওদের রাজনীতিতে জনগণ অবহেলিত যেহেতু জামায়াতে ইসলামীর ওপরে ওদের নির্ভরতা প্রচণ্ড ফলে জামায়াত যেভাবে চালাতে চেয়েছে, সেভাবেই তারা চলেছে। দীর্ঘদিনের ‘অসৎ সঙ্গ’ দলে অনেকেই গ্রহণ করতে পারেননি কিন্তু আওয়ামী বিরোধিতার কারণে সোচ্চারও হননি। নেগেটিভ রাজনীতির কারণেও হতে পারে। কারণ ওই দলে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিলেন এবং এখনো সেই মানসিকতা পরিবর্তন করতে পারেনি। তার পেছনে একটা বড় কারণ হলো তাদের অটোক্রেটিক বা বংশপরম্পরা নেতৃত্বে বিশ্বাসী দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। কারণ তার কোনো পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড নেই সামরিক বাহিনীর অফিসারের স্ত্রী ছিলেন তিনি, সেই পরিবেশ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি স্টাইলেই জীবন কাটিয়েছেন সে কারণে তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যেতে চাননি বলে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হেফাজতে থাকতে পছন্দ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকে তোয়াক্কাই করেননি। তিনি আজ বিরোধী দলের নেতা এবং তিনবার নাকি দেশের প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময় থাকা না হয় ছেড়েই দিলাম। তার স্বামী যেখানে ছিলেন, তা তার পছন্দ ছিল না বলেই পাকিস্তানি ক্যান্টনমেন্টে বাস করে পরে যখন মুক্তি পেয়ে জিয়ার ঘরে যেতে চান, তখন জিয়া কেন আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং ঘরে তুলতেই চাননি। প্রথমে আওয়ামী লীগ নেতা ফরিদ গাজীকে ধরাধরি করে কোনো লাভ না হলে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে আসার পর তার কাছে গিয়ে উদ্ধারের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর ধমকেই জিয়া তাকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছিলেন।… সে কথা ভুলে গিয়ে সেই বঙ্গবন্ধুর হত্যা দিবসে খালেদা তার ভুয়া জন্মদিন পালন করেন! কী লজ্জা! এই কি কৃতজ্ঞতা? যিনি ‘মেয়ে’ সম্বোধন করে ঘরে তুলে নিতে হুকুম দিয়েছিলেন, সেই ব্যক্তিত্বকে এভাবে অপমান করার ধৃষ্টতা, ঔদ্ধত্য কিংবা সাহস কাদের কাছ থেকে পেলেন খালেদা জিয়া… এমনই অকৃতজ্ঞ, দেশের প্রতি যার কোনো আনুগত্যই ছিল না, মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করেন না, সেই মহিলাই তার স্বামী জেনারেল জিয়ার মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে দলবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন। মজার ব্যাপার, লাজ নম্র বধূ ছিলেন যিনি তিনি মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানিদের সঙ্গে বাস করে ‘মিথ্যাচারের বেসাতি’ করতে শুরু করেছিলেন। জিয়া যা দাবি করেননি তাই এখন তিনি দাবি করেন কি করে। তিনি তো জানেনই না জিয়া কি করেছেন কিভাবে পালিয়ে যেতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জড়িত হয়ে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করার সুযোগ পেলেন বেলাল মোহাম্মদের সুবাদে। এর অন্যথা করেননি, দাবিও করেননি তার লেখায়ও, সেটা খালেদা দাবি করছেন ‘জিয়াই নাকি স্বাধীনতার ঘোষক’। এমনই বানোয়াট কাহিনী ছড়িয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের উন্মেষ লজ্জাকে বিতর্কিত করতে কেন চান, কাদের উদ্দেশ্য ও আদর্শের লক্ষ্যে? আমরা যারা শব্দসৈনিক, স্বাধীনতা বাংলা বেতারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম, তারা তো আদত কাহিনীটি সবিস্তারে জানি, জিয়া তো প্রথমে রাজিই হতে চাননি, বেলাল তাকে বুঝিয়ে এনেছিলেন, এ তো ইতিহাস।

ক্র্যাকডাউনের পরও পাকিস্তানি জাহাজ থেকে অস্ত্রশস্ত্র খালাস করতে গিয়ে খবর পেয়ে পালিয়ে যেতে গিয়ে গ্রামবাসীর বাধায় পটিয়ায় আটকে গিয়েছিলেন। হ্যাঁ, প্রথমে যখন জিয়া হচ্ছিলেন তখন বেলাল মোহাম্মদ তাকে অনেক যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে ছিলেন যে, এই সময় বেঙ্গল রেজিমেন্টের অথবা বলা যায় বাঙালি সেনা সদস্যদের এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো প্রয়োজন এবং সেটা বাঙালি কোনো সেনা অফিসারের কণ্ঠ থেকে হলে কার্যকর হবে। কিন্তু তার মাথায় যে ভিন্ন চিন্তা ছিল সেটা প্রথমে বেলাল বা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কারো প্রত্যাশা ছিল না। সে ক্ষেত্রে মেজর জিয়া ভেবেছিলেন, এটা একটা ক্যুর সুযোগ তার সামনে এসে গেছে। একে হেলায় হারানো যায় না। তখন তিনি বেতারে গিয়ে সন্ধ্যা বেলায় এক বেতার ভাষণ দিয়ে নিজেকে অস্থায়ী সরকার প্রধান ঘোষণা করেন, যেমন আর্মি ক্যুতে হয়ে থাকে। এই ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সচেতন নাগরিকদের মধ্যে দারুণ বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বেতার বিদ্রোহীদের মধ্যে তো বটেই। কারণ বেতার বিদ্রোহী কলেজ উপাধ্যক্ষ আবুল কাশেম স›দ্বীপ মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা বেতারে প্রচার করেছেন। আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নান স্বাধীনতার ঘোষণাই দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে।… যা হোক জিয়ার ওই ঘোষণা শোনার পর চট্টগ্রামের শিল্পপতি এবং ফিল্ডমার্শাল আইয়ুব খানের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন এ কে খান। তিনি তার জামাতা আওয়ামী লীগ নেতা এম আর সিদ্দিকীকে ডেকে বলেছিলেন, ‘ওকে বলো, এটা আর্মি ক্যু নয় এটি একটি পলিটিক্যাল ওয়ার।’ বেতার কর্মী এই ঘোষণা প্রচার বন্ধ করে মেজর জিয়াকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন। হয়তো কাজ হয়েছিল এবং ক্ষমতা লোভের ঘোর থেকে বেরিয়ে এসে মেজর জিয়া অনেক চিন্তার পর ইংরেজিতে লিখলেন, মমতাজ উদ্দিন আহমদ (তখন বেতার কর্মীদের সঙ্গে ছিলেন) তার যে যথার্থ বঙ্গানুবাদ করেছিলেন, তাতে বলা হয়েছিল আমি মেজর জিয়াউর রহমান আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।…. এই বক্তব্যটি অনেকেই শুনেছিলেন এবং বিদেশি বেতার প্রতিনিধিদের মধ্যে সেদিনই প্রচার হয়ে গিয়েছিল। জিয়া জীবদ্দশায় এ কথা কখনই অস্বীকার করেননি। কিন্তু জিয়ার মৃত্যুর পর লাজ নম্র বধূ খালেদা জিয়া পলিটিক্সে এলেন তখন ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় ক্যুর নেতার ঘোষণাকে গ্রহণ করে পুঁজি বানিয়ে বঙ্গবন্ধুকে টপকে জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বানানোর কোশেশ শুরু করলেন সেই পাকিস্তানি মানসিকতা থেকেই।… মুশকিলটা হলো খালেদা তো তখনো জানেন না মুক্তিযুদ্ধ কি? কারণ জিয়ার মৃত্যুর পর দলে শূন্যতা পূরণে মৃতের স্ত্রীকে এগিয়ে দিলে সাধারণ মানুষের মমত্বকে জয় করা যাবে। তাই জিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাত্তারকে যখন সামরিক বাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ যখন অপসারণ করলেন, তখন খালেদা জিয়া দলে ‘ক্যু’ করে বিচারপতি সাত্তারকে সরিয়ে নিজেই দলীয় প্রধানের দায়িত্ব নিলেন। নির্বাচিত বিচারপতি সাত্তারকে সরালেন জেনারেল এরশাদ এক ক্যুর মাধ্যমে এবং খালেদা দলপতিত্ব থেকে ক্যু করে নিজেই প্রধান সাজলেন। তারপরের লম্বা রাজনৈতিক ইতিহাসে না গিয়ে বর্তমানে চলে আসি।

খালেদা জিয়াকে পেয়ে জিয়ার পেছনে যারা জুটেছিলেন তাদের ভাসানী ন্যাপ, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম এ ধরনের আওয়ামী বিরোধীর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ব্যক্তিবর্গ বিএনপির ব্যানারে আসলেন। ধর্মীয় ছোট ছোট গোষ্ঠীর লোকজনও জমা হলেন, অনেকটা ‘জগাখিচুড়ির’ মতো হলো। তারা তাদের দলকে এবং দলের প্রতিষ্ঠাতা সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সমকক্ষ’ নেতা বানাতে গিয়েই গোল বাধালো, জনগণ গ্রহণ করলেন না। ফলে জিয়ার অবদানকেও তারই লোকজনরা খাট করে জিয়াকে বঙ্গবন্ধুর ‘প্রতিদ্ব›দ্বী’ বানিয়ে দলকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে উঠেপড়ে লাগল। এ ছিল অবাস্তব উদ্যোগ। লোকে এটা তো মানবে না। হলোও তাই। এখন অবশ্য দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। ফলে ভেবেছিল, খালেদা জিয়া যা বলবেন, দেশের লোক তাই মেনে নেবে। ২০০৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল থেকেই তাদের অনুধাবন করা উচিত ছিল, দেশের মানুষ কি চায়?

পাঠক মাত্রই নিশ্চয়ই মনে রেখেছেন, ওই নির্বাচনের আগে সেনা প্রভাবিত রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থা আমাদের ওপর চেপে বসল কারণ তৎকালীন বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের দলপ্রীতি এবং সংকীর্ণ মানসিকতা এবং ক্ষমতালিপ্সা চরিতার্থ করে বিএনপি-জামায়াতকে খুশি করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি পদটিকে কলঙ্কিত করলেন। নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়ে দলীয় স্বার্থ রক্ষার নগ্ন প্রয়াস চালালেন। ফলে মার্কিন লবি এবং সামরিক বাহিনী ক্ষুব্ধ হয়ে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করল ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান করে। পাশে রইলেন সেনা প্রধান মঈনুদ্দিন আহমেদকে (লিখতে পছন্দ করতেন মঈন-ইউ আহমদ)। এরা দুবছর থেকে গেল সামরিক জোরে। ওদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারত না। ফলে এই সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দীনরা দেশে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে যে অবস্থার সৃষ্টি করল মানুষ বিরক্ত হয়ে নীরব ক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকল। অবশেষে একদিন এরাই ভোটার তালিকা পুনঃপ্রণয়ন করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করল। সে নির্বাচনে বিপুল ও স্বতঃস্ফ‚র্ত গণসমর্থনে আওয়ামী লীগ তার সহযাত্রীদের নিয়ে জয়ী হলো। দুই-তৃতীয়াংশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল ১৪ দল বা মহাজোট। বিএনপি-জামায়াত জোট স্বাভাবিক কারণেই জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হলো। স্বল্পসংখ্যক সদস্য নিয়ে জাতীয় সংসদ ‘বিরোধী দল’ আখ্যা পেল। কিন্তু তাদের এই সময়ের সংসদীয় আচরণ বা ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ কেবলই সংসদে অনুপস্থিতি এবং অধিবেশন বর্জনের মধ্যেই সীমিত রেখেছিল। তবে সরকারের সমালোচনা করার রেওয়াজটা বজায় রেখেছিল, সব সরকারি সিদ্ধান্ত কিংবা কাজে। বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে জনগণকে বিভ্রাট করার চেষ্টা করেছিল নানাভাবে। কিন্তু কোনো লাভই তাদের হয়নি সেদিন। রাজনৈতিক আন্দোলনের অজুহাতে বিএনপি-জামায়াত প্রগাঢ় সম্পর্ক আরো গভীর হওয়ার কথা থাকলেও জামায়াতের মধ্যে একটা নতুন সন্দেহ ঢুকে গিয়েছিল বা ক্ষমতাসীনরা ঢোকাতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে পারস্পরিক হৃদ্যতায় চিড় ধরতে শুরু করেছিল। তবু বাহ্যিক সম্পর্ক ও জোটীয় মৈত্রী অটুট আছে, এটা দেখার চেষ্টা করে যাচ্ছিল উভয় নেতৃত্বই। নানাবিধ অন্তরবিরোধ থাকা সত্ত্বেও তবে এই ফাটল যে বিস্তৃত হচ্ছিল, তার প্রদর্শনী মাঝেমধ্যেই অনুষ্ঠিত জোট সমাবেশে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের সংঘর্ষ ও হানাহানি তা বুঝিয়ে দিচ্ছিল। অনেকে বলছিলেন, বর্তমান মহাজোট সরকার যুদ্ধাপরাধ বিচারে উদ্যোগ গ্রহণ করার পর থেকে জামায়াত বেশ ক্ষুব্ধ হতে থাকে তবে জোটবদ্ধতা ছাড়তে রাজনীতির চাল ঠিকই চেলে যাচ্ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যখন ‘সত্যানুসন্ধান’ তদন্ত করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ফাঁসি যাবজ্জীবন, আমৃত্যু দণ্ড ইত্যাদি দিতে আরম্ভ করলেন তখন জামায়াত-বিএনপি কোনো প্রতিক্রিয়া বা দেখে উষ্মা প্রকাশ করেছে নিজেদের মধ্যে এবং অন্যদিকে শোনা যায় সরকারের কাছে যাওয়ার চেষ্টাও করেছে। পারেনি বলে আত্মদহনের গøানি কাটিয়ে ওঠার জন্য কাদের মোল্লা, গোলাম আযম, সাঈদী, কামারুজ্জামানদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত-বিএনপিকে ছাড়াই সারা দেশে ব্যাপক ভাঙচুর, খুন-খারাবি, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি ঘটাতে থাকল আর বিবৃতি দিয়ে ‘হরতাল’ ডেকেছিল। হলো কিনা সেদিকে তাকানোর কোনো ইচ্ছে নেই কারণ জানেই তো হবে না হরতাল, তবু ডাক দিতেই হবে। এই ‘হাস্যকর হরতাল’ ডেকে মানুষকে দুর্ভোগে ফেলতে পারেনি কারণ সাধারণ মানুষই যে এ হরতালকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অবশ্য ওদের ধারণা হরতাল সাকসেসফুল। মনে মনে হয়তো তৃপ্তি লাভ করে কিন্তু বোঝে কেন হচ্ছে না হরতাল। তবু ওরা হরতাল ডাকা বন্ধ করে না এবং বিএনপি যে সমর্থন দেয় না আর নিজ কর্মক্ষেত্রগুলো- অফিস-আদালত, কল-কারখানা চালু রাখে। দোকানপাটও খোলে সবার সঙ্গে। বাস, গাড়ি সবই চলে রাজপথে। স্কুটার-রিকশার বালাই নেই। ওরা অবশ্য যে কোনো হরতালে চালু থাকে। লোকে যে হরতাল গ্রাহ্য করে না, কজন ভীতু গাড়িওয়ালা ধনাঢ্য ব্যক্তি ছাড়া তা ডেকে কোনো লাভ নেই তবু জামায়াত তাদের রাজনীতির প্রক্রিয়া ঠিক রাখে এবং বিএনপিকে দেখাতে চায় ওরা ছাড়াও জামায়াত যে কোনো কর্মসূচি সফল করতে পারে।

জনগণের দাবি, জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই জামায়াতকে বারবার ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ বলে বিভিন্ন রায়ে অভিমত প্রকাশ করেছেন। সরকার চাইলেই এক্সিকিউটিভ নির্দোষ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু করছেন না একটি রিট পেনডিং থাকায় সব তাড়াতাড়ি সম্ভব চূড়ান্ত করে জামায়াত নিষিদ্ধ করা উচিত। তবে মহামান্য আদালতের ওপর এখন নাকি নির্ভর করছে। তাই বলি, যত তাড়াতাড়ি রায় হয়, ততই মঙ্গল। যে কোনো কারণেই এই বিলম্ব হওয়াতে জামায়াত এখনো যুদ্ধাপরাধীর রায় ঘোষণায় অনর্থক হরতাল-হাঙ্গামা, জ্বালাও-পোড়াও, বোমা হামলা-মানুষ হত্যা, হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর হিংসাত্মক হিংস্রতা দেখাতে সাহস পাচ্ছে। তবে আশার কথা, সরকারের সন্ত্রাসের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিগ্রহণে এখন আর ব্যাপক হাঙ্গামা হতে পারছে না। ক্রমশ এরা লুকিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে, না হয় নতুন গ্রুপ তৈরি করছে। আমাদের সংবিধানে ধর্মাশ্রয়ী সংগঠন বিশেষ করে রাজনৈতিক দল করা বিধান নেই তবু কেন জামায়াতরা এই ধর্মভিত্তিক দল থাকবে? এই ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠনকে বন্ধ করে এর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ সরকার নিয়ন্ত্রণাধীন নেয়া প্রয়োজন। এদের জঙ্গি-সন্ত্রাসী তৎপরতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসনে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা এসব প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ বা অর্থ থেকে করা উচিত। সেই সঙ্গে যেসব রাজনৈতিক দলে এরা অনুপ্রবেশ করতে পারে, তাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং পটভূমি গোপনে যাচাই করে সদস্যপদ দিতে হবে। না হলে জামায়াতী অনুপ্রবেশের আশঙ্কা থেকে যাবে। এখন কিন্তু ওরা এই কৌশলই গ্রহণ করেছে বলে মনে হচ্ছে।

অন্যদিকে নিজেদের জামায়াতবিরোধী বলে আখ্যা দিয়ে সংগঠিত করে এখন জামায়াতেরই ‘বি টিম’ হয়ে সন্ত্রাস, মিথ্যাচার, মাদ্রাসা পরিচালনা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক সংঘের মতো বক্তৃতা-বিবৃতি ও জমায়েত করার চেষ্টা করতে শুরু করেছে। ৫ মে ঢাকা সমাবেশের আহ্লাদে যা যা করেছে, তাকে কি অরাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড বলা যায়। বাচ্চাদের ভাঁওতা দিয়ে ঢাকা এনে যে অনাসৃষ্টি করেছিল তার কোনো তুলনা নেই। হেফাজতে ইসলাম নামে এমন সংগঠন ইসলাম ধর্মের রাখোয়ালার দায়িত্ব পেল কোত্থেকে? ধর্মনিরপেক্ষতার দেশে যে কোনো ধর্ম পালন করার অধিকার সবারই আছে কিন্তু এ ধরনের সংগঠন গড়ে তোলার কি কোনো বিধান আছে? তারা বলেছে, ঢাকার সভায় আড়াই হাজার লোক পুলিশ হত্যা করেছিল। বিএনপি-জামায়াতও শেয়ালের মতো হুক্কা হুয়া করেছিল তা তো মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, তদন্তে। সরকার পদক্ষেপ কেন নিচ্ছে না। মাঝে মাঝেই সে ধরনের বক্তব্য দিয়ে জনগণ উত্তেজিত করে মুক্তমনের লেখক, বক্তা, ব্লুগারদের হত্যা করে ও হেনস্তা করার কুমতলব আঁটে, তারপরও কেন এই নামে ধর্মভিত্তিক সংগঠন করার সুযোগ পাচ্ছে? ৫ মে ঢাকা হত্যা নিয়ে যে মিথ্যা উদ্ভট সংখ্যা দিয়ে মানুষকে ক্ষেপাতে চেষ্টা করেছিল, সঙ্গে মিথ্যা তা তো একাত্তরে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় গিয়ে বাড়ি বাড়ি খোঁজ করে যে রিপোর্ট তৈরি করেছে বিশাল আকারে এবং সবিস্তারে, তার ভিত্তিতে এদের বিরুদ্ধে তো মামলাও করা যায়। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা অনুযায়ী সরকার ও বিরোধীদলীয় যৌথ প্রশাসনিক ব্যবস্থাই তো গণতান্ত্রিক বিধান। আমরা সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলের যে আচরণ দেখছি, তাতে ক্ষমতায় না গেলেই অথবা যাবার জন্যই কি এ ধরনের হিংসাত্মক কার্যকলাপের আশ্রয় নিতে হবে? না হলে বিরোধী দল বলে প্রমাণ করা যাবে না? …বলুন তো খালেদা জিয়া, ৯২ দিন ধরে যে ‘অবরোধবাসিনী’ নাটকাভিনয় করলেন সাত সমুদ্দুর তের নদী পাড়ে জামায়াতী-বিএনপি সমাদরে লন্ডনে বসাবাসকারী পলাতক আসামি ও আপনার ‘সুপুত্র’ তারেক জিয়ার নির্দেশে বা পরিচালনায়, তাতে কি আপনাদের কোনো লাভ হয়েছে? জনগণ কি উপকৃত কিংবা উত্তপ্ত হয়েছেন? এই যে দায়িত্বশীলহীন নির্বাচন বর্জন এবং ওই রাজনীতির ভিত্তিতে ‘একক সিদ্ধান্তে’ দল চালিয়ে কি কোনো লাভ পেয়েছেন? লোক মেরেছেন, পুড়িয়ে হত্যা করেছেন কি নির্মমভাবে, তারপরও কোনো অর্জন পাননি কারণ জনগণ তো সমর্থন করেনি এমন হিংস্রতাকে। উপরন্তু আপনার দলে নির্বাচন ও এই অবরোধ আন্দোলন নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। তার ফলেই দেখছি লন্ডনে বসে তারেক জিয়াও খুব স্বস্তিবোধ করছেন না। তাই এবারে খালেদা জিয়া সৌদি বাদশাহের দাওয়াতে ওমরাহ করতে গেছেন। না হলে বাদশাহের আতিথেয়তায় হজ পালন করবেন বারবার বাদশাহ দেখি ওকেই দাওয়াত দেন এবং মেজবানিও করেন। অবশ্য এবারে পুত্র তারেক জিয়া এমন সময় ওমরাহ করতে যাবেন। কারণ কিন্তু সবাই ধরে ফেলেছেন, মা ও বেটা দূরে বসে লোক মারফত, ফোনের মাধ্যমে কিংবা অন্য সহজ মাধ্যমে কথাটা নিরাপদ কিংবা সমীচীন নয় মনে করে একত্রে ওমরাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বৈঠক হবে তিন চারদিন। দুয়ে সংলাপের মাধ্যমে বিএনপি নেতারা ‘নীতিনির্ধারকরা’ ছাড়াই যে সিদ্ধান্ত নেবেন পার্টি পুনর্গঠনে পুত্রের পরামর্শে ফিরে এসে খালেদা জিয়া সেগুলোই পার্টির ওপর চাপিয়ে দেবেন হয়তো। দেখা যাক, কি করেন। অবশ্য পার্টির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে অতি সম্প্রতি গভীর রাতে বৈঠক করে তাদের মতামত নিয়েছেন খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে সৌদি মেজবানিতে যে আরব পরামর্শ নিয়ে আসবেন, তার ভিত্তিতেই ভদ্রমহিলা দল পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করবেন মনে হচ্ছে।

বেচারী খালেদা জিয়া এতিমদের তহবিল তছরুপ করেছেন বলে মামলার সম্মুখীন হয়েছেন, পুত্র পালিয়ে তাই ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করছেন। দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ওই অনর্থক সাজানো নাটক অবরোধ এবং আন্দোলনের নামে পেট্রলবোমা, ককটেল- জামায়াতী সহযোগিতায় কেবল নিজেদের ক্যাডার, নেতা ও কর্মপদেও ভাড়ায় খাটিয়ে যে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন এবং মানুষ পুড়িয়ে বার্ন ইউনিটগুলো ভরিয়ে তুলেছেন, তার দায় তারা নিতে না চাইলেও তাদেরই অভিযুক্ত করা হবে কারণ সাধারণ মানুষও তো সাক্ষী এসব অপকর্মের। অবরোধবাসিনী খালেদা জিয়া নিজ বাসগৃহে ফিরে যাওয়ার পর ওই সহিংসতা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল নাকি? যে আন্দোলনের নেতাকর্মীরা রাজপথে নামেনি, ভাড়াটিয়া দিয়ে হত্যা করেছে, বাস, গাড়ি পুড়িয়েছে। আজ সে সব অপকর্ম ধরা পড়ে গেছে। তাই দলে তৃণমূলের চিৎকার শুনে ঘাবড়ে গেছেন সৌদি আরব পুত্রের সঙ্গে বৈঠক করতে এবং মেজবানের সঙ্গেও পরামর্শ করতে। এই হলো আমাদের ‘জনপ্রিয়’ বিরোধী দল যাদের পরিচয় ‘দেশনেত্রী’ খালেদা জিয়া এবং তার স্বামী জেনারেল জিয়ার উত্তরাধিকার। সেই সুবাদে পুত্রকে নির্ধারিত করেছেন পরবর্তী নেতৃত্বের আসনে। অথচ পুত্র পালিয়ে লন্ডনে। রমজানের জন্য ছুটি থাকে দলীয় আন্দোলন কর্মসূচির। তবে পারুক না পারুক জনগণকে আশ্বাস দেন খালেদা জিয়া এবং সভাসদগণ, রমজানের পর আন্দোলন জোরদার হবে। এবার কিন্তু এ ধরনের কোনো ঘোষণা শুনতে পাইনি। তাই বুঝি মা-বেটার মক্কাগমন এবং মদিনাতে বসে শলাপরামর্শ হবে, ঈদের পরে কেমন করে দল গোছাবেন আর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। দলে মুক্তিযোদ্ধা ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে বেশ ঠাণ্ডা লড়াই শুরু হয়েছে, সে জন্যও খালেদা উদ্বিগ্ন। সব সময় সিনিয়রদের টপকে জুনিয়র জিয়াকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব একবারেই বানিয়েছিলেন, এখন সে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বশংবদ নেতাকর্মীরা তাকেই পরবর্তী পার্টি প্রধান বলেই ভেবে আসছিলেন। তিনি তো লন্ডনে পালিয়ে। খালেদা জিয়ার যে কোনো মামলায় যদি সাজা হয়েই যায়, নির্বাচন করতে না পারেন আইন মোতাবেক, তাহলে কি হবে? খালেদা-তারেকের ধারণা পারিবারিক ক্ষমতায়ন তো বিঘ্নিত হবে। এ অবস্থা কাটাতে হলে তারেককে দেশে ফিরে মামলার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। সেটা করার সাহস নেই কারণ সে তো অপরাধী। ধরা পড়বেই। তাহলে কি হবে? এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বৈঠক হবে লাগাতার। তারপর খালেদার প্রত্যাবর্তনে বোঝা যাবে কি চাইছেন তিনি। দল সেটা মানবে কিনা।

হায়রে বিরোধী দল! জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে জনগণের নাম ব্যবহার করে আন্দোলন যে হয় না সেটা প্রমাণিত। সুতরাং আপনাদের ভাষায় যত গণবিরোধী বলেন না কেন, সরকার তার মেয়াদ পার করবেই।

বর্তমান মহাজোট সরকার আপনাদের ভাষায় যতই ‘স্বেচ্ছাচারী’ হোক না কেন, জনগণ তাদের কার্যক্রমের ফলাফল পাচ্ছেন। জনগণ সমালোচনা করতেও ছাড়ছে না কিন্তু সেই সঙ্গে দেশের অগ্রগতি উন্নয়নের যে প্রমাণ মিলছে, তাতে তারাও উৎফুল্ল। তাই বিরোধী দলকে ভাবতে হবে যে ট্রেন মিস করেছে তাকে ধরতে হলে জনগণের কাছে যেতে হবে। যাবেন কি করে? একমাত্র ভরসা জনগণ সব সময় এ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট। কিন্তু সামরিক বা স্বৈরাচারী শাসনের বাইরে, যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তারা কি খালেদা জিয়ার গণতন্ত্রহীনতা, সংখ্যালঘু বলে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে হত্যা, নিপীড়ন, ধর্ষণ, লুট- পাকিস্তানি স্টাইলের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম ভুলে গেছেন, মনে করছেন? না, জনগণ সবাই গণবিরোধী দমন-পীড়নের কথা মনে রাখেন। দেশবাসী জনগণ জানেন, জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত যুদ্ধাপরাধী শক্তি, তাদের সঙ্গেই খালেদা ও তার বিএনপি সুদীর্ঘকাল দোস্তির সঙ্গে সব কাজই করে যাচ্ছে। বিএনপি নিজেদের শাসনামলে জামায়াতী দুজন নেতাকে মন্ত্রী বানিয়েছিল যাদের দুজনারই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসির রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।… ওদের ও মিল-মোহাব্বত সম্ভব হয়েছিল কারণ বিএনপি নেত্রী নিজেও তাই। ফলে শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে পিটিয়ে খালেদা হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন শহীদ জননী যুদ্ধাপরাধীর বিচার দাবি করেছিলেন বলে। মনে আছে নিশ্চয়ই খালেদা জিয়ার। অস্বীকার করতে পারবেন না কারণ প্রকাশ্য রাজপথে হাইকোর্টের সামনেই তিনি পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছিলেন। অবশ্য আবার পুলিশকেও গালমন্দ করেছেন। তিনি এরপর যদি ক্ষমতায় যান, তাহলে তিনি এই পুলিশই ব্যবহার করবেন বিরোধী দল বা আন্দোলনকে শায়েস্তা করতে।

এসব যদি হতেই থাকে তাহলে বিরোধী দলের ভূমিকা কি যে কোনো সরকারে? 

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj