সেই ঢাকা : মুনতাসীর মামুন

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

সেই ঢাকা তো নেই। থাকা সম্ভবও নয়। সেটি আমরা জানি। কিন্তু সেই ঢাকার আলাদা একটা রূপ ছিল, গন্ধ ছিল, মায়া ছিল। সেই ঢাকায় অনেক কিছু ছিল না, তারপরও সেই ঢাকা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম। গর্ব করতাম। সেই ঢাকায় বন্ধুত্ব ছিল, ভালোবাসা ছিল, ধর্ম ছিল। এই ঢাকায় অনেক কিছু আছে। কিন্তুঐ ভালোবাসা, ঐ মোহ নেই।

পৃথিবীর সব দেশের সব শহরেই বদলেছে। গত শতকের আশির দশকে লন্ডন যেমন দেখেছি, এখন তো তা নেই। কিন্তু লেস্টার স্কোয়ারের পুরনো বইয়ের দোকান, সোহোর বন্যভাব তো আর নেই। আরো ছোট ছোট অনেক আকর্ষণ হারিয়ে গেছে। কিন্তু অনেক কিছু আবার শতবছর ধরে রয়ে গেছে, রেখে দেয়া হয়েছে। সেগুলোর টানেই সবাই যায়।

ঢাকার মতো চারপাশে নদীবেষ্টিত শহর পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে। আর ছিল অজস্র ক্যানাল। ঢাকার বৈশিষ্ট্যই ছিল তা। আমরা ক্যানালগুলো মাটিভর্তি করে দখল করেছি। নদীগুলো নর্দমা বানিয়েছি। এ কাজগুলো সরকার ও জনগণ মিলে একসঙ্গে করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে সেই অপূর্ব বোগেনভিলিয়া আজকের প্রজন্ম দেখেনি বা মেডিকেলের সামনে শিরিষ গাছের সারি। কতদিন বিকেলে গেছি সেই আলো করা বোগেনভিলিয়া দেখতে। এক লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে প্রথমেই সে একশ বছরের পুরনো বোগেনভিলিয়া কেটে ফেললেন। এক মুহ‚র্তে ইতিহাসের একটি পাতা নষ্ট হয়ে গেল।

গত চার দশক বড়কাটরা ছোটকাটরা সংরক্ষণ করার জন্য কতো আবেদন-নিবেদন করলাম, কেউ শুনল না। আজ সেগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। প্রতœতত্ত্ব দপ্তর যেখানে লালবাগ কেল্লার দেয়াল ভেঙে ফেলে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য তখন আর কী বলা যায়! মূর্খতার বিরুদ্ধে আর কতো লড়াই করা যায়?

আসলে আমরা আর সরকার মনে করি না প্রতœসম্পদ, নিসর্গ, নদী আমাদের সম্পদ বা ঐতিহ্য। তা সংরক্ষণযোগ্য। আমরা মনে করি জিডিপি বৃদ্ধিই শুধু দেশের সম্মান রক্ষা করে।

আজ ঢাকার নদীগুলো যদি নর্দমা না হতো, ঢাকার সেই বৃক্ষরাজি যদি মূর্খ শাসকদের হাতে কর্তিত না হতো, প্রতœসম্পদগুলো যদি সংরক্ষিত হতো, ঢাকা আজ সজীব ও বাসযোগ্য শহরে পরিণত হতো। আমরা এ শহরে পর্যটক আশা করি কেন? পাশ্চাত্যে এমন কী প্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে/শহরে এমন কী নেই যা দেখার জন্য মানুষ ঢাকায় আসবে। স্কাইস্ক্রাপার দেখতে হলে মানুষ সাংহাই বা বেইজিং যাবে বা দুবাই, প্রতœসম্পদ দেখতে হলে ভারত বা চীন। এ বিষয়গুলো আমরা ভেবে দেখি না।

আমি এ শহর নিয়ে কাজ করছি দীর্ঘদিন। কিন্তু দেখেছি এ শহরের ইতিহাস নিয়ে কাজ করা খুব দুরূহ। উপাদানের দারুণ অভাব। তবুও সেটা করছি। ঢাকাকে কে কিভাবে দেখেছেন সে বর্ণনা দিয়ে একটি পাণ্ডুলিপি নির্মাণের চেষ্টা করছি। শহর ঢাকা, অবয়ব, স্থাপত্য সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, জনস্বাস্থ্য, বিনোদন প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে কে কী বলে গেছেন তা দিয়ে একেকটি অধ্যায় সাজাচ্ছি। এবং ফলাফলটা দেখি খুব খারাপ না। ঐ সব উদ্ধৃতির মাধ্যমে সেই ঢাকার একটি চিত্র ফুটে উঠছে যা কৌত‚হলোদ্দীপক। আমি বর্তমান প্রবন্ধের জন্য দুটি ক্ষেত্র বেছে নিয়েছি- এক. ঢাকা অর্থাৎ ঢাকা শহর সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা, দুই. সংস্কৃতি। প্রথমে বিষয় সম্পর্কে উদ্ধৃতি/মতামত, তারপর সময় এবং সবশেষে লেখকের নাম দেয়া হয়েছে। যাদের লেখা থেকে উদ্ধৃত করেছি তাদের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিচ্ছি।

সেবাস্টিয়ান মানরিক

সপ্তদশ শতকের ত্রিশ দশকে, স্পেনীয় যাজক সেবাস্টিয়ান মানরিক এসেছিলেন ভারতবর্ষে। ১৬৩২ সালে সম্রাট শাহজাহানের সময় হুগলিতে পর্তুগিজ কুঠি দখলের বিবরণ আছে তার ভ্রমণকাহিনীতে। ১৬৪০ সালে এসেছিলেন ঢাকায়।

নিকোলাই মানুচ্চি

সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি, ইতালীয় ভ্রমণকারী নিকোলাই মানুচ্চি ভারতবর্ষে এসেছিলেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের [১৬৫৮-১৭০৭] শাসনের সময়টা ছিলেন এখানে। তার গ্রন্থ স্টোরিয়া দো মোগর চার খণ্ডে রচিত। ১৬৬৩ সালে এসেছিলেন ঢাকায়।

জা ব্যাপতিস্ত তাভেরনিয়ের

তাভেরনিয়ের সপ্তদশ শতকের একজন ফরাসি পর্যটক। ভারত পৌঁছান ১৬৪০ ও ১৬৬৬ সালে। পেশায় তাভেরনিয়ের ছিলেন একজন জহুরি। ঢাকায় এসেছিলেন ১৬৬৬ সালে।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত [১৮২৪-১৮৭৩]

বাংলা ভাষার অন্যতম লেখক। অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও চতুর্দশপদী কবিতা রচনার পথিকৃত। মেঘনাদবধ অন্যতম মহাকাব্য।

জেমস টেইলর

ঢাকার সিভিল সার্জন ছিলেন জেমস টেইলর। ঢাকায় থাকার সময়ই তিনি রচনা করেন ঢাকা সম্পর্কিত তার গ্রন্থ এ স্কেচ অব দি টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস অব ঢাকা। ১৮৪০ সালে তা প্রকাশিত হয় এবং এখনো ঢাকার প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে তা স্বীকৃত।

এফ বি ব্রাডলি বার্ট

বার্ট ছিলেন ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের সদস্য। ঢাকা নিয়ে তাঁর রচিত গ্রন্থ দি রোমান্স অব অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটাল প্রকাশিত হয় ১৯০৬ সালে।

হৃদয়নাথ মজুমদার

হৃদয়নাথের জন্ম মানিকগঞ্জে ১৮৫৭ সালে। ঢাকায় পড়াশোনা করে ঢাকায় আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছিলেন। ঢাকা বিষয়ক তার আত্মজীবনী রেমিনিমেন্সেস অব ঢাকা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৬ সালে।

সজল নয়না দেবী

সমাজসেবী, গৃহিণী। জন্ম আনুমানিক ১৮৭৫ সালে।

নবীন চন্দ্র সেন [১৮৪৭-১৯০৯]

জন্ম চট্টগ্রামে। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন ১৮৬৮ সালে। কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। পলাশীর যুদ্ধ [১৮৫৭] তাঁর বিখ্যাত আখ্যানকাব্য। তার আত্মজীবনী আমার জীবন, পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত, মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ২২০৯। বাংলাভাষায় এত বড় আত্মজীবনী আর কেউ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই।

আবদুল কাইউম

গবেষক, অধ্যাপক, ঢাকা বিষয়ক বেশ কয়েকটি গ্রন্থের লেখক।

দীনেশ চন্দ্র সেন [১৮৬৬-১৯৩৯]

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন দীনেশ চন্দ্র সেন। জন্ম বিক্রমপুরে। দীনেশ চন্দ্র পরবর্তীকালে অধ্যাপনা করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার অন্যতম কীর্তি বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (১৮৯৬) ও মৈমনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকা সংগ্রহ ও সম্পাদনা। তাঁর আত্মজীবনী ঘরের কথা ও যুগ সাহিত্য প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে।

ভুবনমোহন সেন

ঢাকার প্রখ্যাত ব্রাহ্ম কর্মী। ১৮৯৬ থেকে ১৯০৬ পর্যন্ত ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।

কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার [১৮৩৪-১৯০৭]

পূর্ববঙ্গের প্রখ্যাত কবি। ঢাকার প্রথম বাংলা সংবাদপত্র ঢাকা প্রকাশ-এর প্রথম সম্পাদক। বিখ্যাত গ্রন্থ সদ্ভাবশতক। তাঁর আত্মজীবনী রা সের ইতিবৃত্ত প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৬৮ সালে।

ঢাকা প্রকাশ [১৮৬১-১৯৫৯]

ঢাকা তথা পূর্ববঙ্গের প্রধান পত্রিকা যা টিকেছিল প্রায় ১০০ বছর। এত দীর্ঘ সময় পূর্ববঙ্গে আর কোনো পত্রিকা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত হয়নি। উনিশ শতকের শেষভাগের ঢাকা শহর ও পূর্ববঙ্গ সম্পর্কিত আকরগ্রন্থ বিশেষ। দেখুন, মুনতাসীর মামুন, উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ সাময়িক পত্র, ৩, ৪ ও ৬ খণ্ড।

শঙ্ক চৌধুরী

প্রথিতযশা ভারতীয় শিল্পী। জন্ম ঢাকায় ১৯১৩ সালে। তাঁর আত্মজীবনী স্মৃতি বিস্মৃতি প্রকাশিত হয়েছে ২০০২ সালে।

কামরুদ্দীন আহমদ [১৯১২-১৯৮০]

১৯৫০-এর দশকে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। ক‚টনীতিবিদ ও লেখক। তিনখণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আত্মজীবনী বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ (১৩৮২, ২ খণ্ড) ও বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মকাহিনী, ১৯৭৯।

পরিতোষ সেন

ভারতের অন্যতম চিত্রশিল্পী। শৈশব-কৈশোর কেটেছে ঢাকায়। তারপর মাদ্রাজ আর্ট কলেজ, প্যারিস। তারপর থিতু হন কলকাতায়। ঢাকায় অনবদ্য স্মৃতি রূপায়িত করেছেন জিন্দাবাহার-এ (১৯৯৬)। অমলেন্দু দে জিন্দাবাহার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তাঁর চিত্রশিল্পীত্বের সঙ্গে মিলিয়েছেন বাকশিল্পীত্ব।’

প্রতিভা বসু

১৯১৫ সালে বিক্রমপুরে জন্ম। ১৯৩০ সালের মধ্যেই রানু সোম নামে ঢাকায় গায়িকা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। বুদ্ধদেব বসুকে বিয়ে করে ঢাকা ত্যাগ করেন। সঙ্গীত ত্যাগ করে সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম লেখক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর আত্মজীবনী জীবনের জলছবি প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে ১৯৯৪ সালে।

আবুজাফর শামসুদ্দীন [১৯১১-১৯৮৯]

ঢাকার গাজীপুরে জন্ম। সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর রচিত ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান; পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। তার আত্মজীবনী আত্মস্মৃতি প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে ঢাকা থেকে।

জর্জ গ্রাহাম

১৮৬০ সালে জর্জ গ্রাহাম বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। ১৮৬৩ সালে এই পদে যোগ দিয়েছিলেন। এই সিভিলিয়ান ছদ্মনামে তার চাকরি জীবনের বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করেছেন লাইফ ইন দি মফস্বিল গ্রন্থে। ১৮৭৮ সালে লন্ডন থেকে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।

নর্থ ফিল্ড

তিনি ছিলেন ব্যাপটিস্ট মিশনের সঙ্গে যুক্ত। গত শতকের ত্রিশের দশকে ঢাকায় ছিলেন।

আনোয়ার হোসেন [১৯৩৮-

জন্ম ঢাকায়। বর্তমানে বাংলাদেশের একজন সফল ব্যবসায়ী। আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত ছিলেন সংসদ সদস্য। ২০০৮ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় তার আত্মজীবনী আমার সাত দশক।

শামসুর রাহমান

বাংলা ভাষার অন্যতম কবি। জন্ম ঢাকায়। বাংলাদেশের প্রতিটি গণআন্দোলন উপলক্ষে রচিত তার পঙ্ক্তিমালাসমূহ এখনো আদৃত। সাংবাদিকতা করেছেন আজীবন। সর্বশেষ দৈনিক বাংলা/ বিচিত্রার সম্পাদক ছিলেন। কিশোরদের জন্য রচিত তার স্মৃতিকথা স্মৃতির শহর ঢাকা।

কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত

কিরণশঙ্করের [১৯১৮-১৯৯৮] জন্ম ঢাকাতেই। প্রথম জীবনে কিছুদিন ব্যবসা করেছেন। ঢাকার কমিউনিস্ট প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫০ সালের দিকে পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। বেশ কটি গ্রন্থের রচয়িতা।

রিজিয়া রহমান [১৯৪৭-]

রিজিয়া রহমানের জন্ম কলকাতায়। অর্থনীতির ছাত্র রিজিয়া রহমানের প্রথম গ্রন্থ, উপন্যাস উত্তরপুরুষ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সাল থেকে। তারপর তার আরো উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন।

হাসান হাফিজুর রহমান [১৯৩২-১৯৮৩]

১৯৫০-এর দশকে বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম কর্মী। মূলত কবি হিসেবে পরিচিত হলেও লিখেছেন গল্প ও প্রবন্ধ। একুশে ফেব্রুয়ারি সংক্রান্ত প্রথম গ্রন্থ তাঁর সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৫৩)। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত দলিলপত্র তাঁর সম্পাদনায় ১৬ খণ্ডে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র’ (১৯৮২) প্রকাশিত হয়।

দ্বীজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় [১৯৩৩-১৯৭৯]

গত শতকের ৬০-এর দশকের অন্যতম লেখক। ভারত প্রগতি লেখক সংঘের অন্যতম সম্পাদক। সম্পাদনা করেছেন বিখ্যাত সাহিত্যপত্র পরিচয়। চর্যাপদের হরিণী তার বিখ্যাত উপন্যাস।

সুফিয়া কামাল [১৯১১-১৯৯৯]

শুধু কবি বললেই সুফিয়া কামালের পরিচয় শেষ হয়ে যায় না। বাংলাদেশে নারী অধিকার, গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম সাঁঝের মায়া (১৯৩৮)।

আব্দুস সাত্তার

জন্ম ১৯২৭। মূলত কবি। কিন্তু নৃতাত্তি¡ক বিষয়ক রচনার জন্যও খ্যাতি অর্জন করেছেন।

হুমায়ুন আজাদ [১৯৪৭-২০০৪]

কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক। মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ বিরোধী লেখার জন্য ২০০৪ সালে আততায়ী কর্তৃক আক্রান্ত হন। সেই আঘাতের জেরেই পরে মৃত্যুবরণ করেন।

সুকুমার রায়

সঙ্গীতজ্ঞ। ঢাকায় জন্ম। বেতারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অনেক দিন।

আসলাম সানী

ছড়াকার।

অধ্যায় ১ : ঢাকা

বাংলার প্রধান শহর ঢাকা। বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত শহরটির আয়তন দেড় লিগের মতো। একদিকে মনেশ্বর, অন্যদিকে নারিন্দা, আরেকদিকে ফুলবাড়িয়া, এসব শহরতলিতে বসবাস করে খ্রিস্টানরা।

১৬৪০

সেবাস্টিয়ান মানরিক

ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পদ তুলনাহীন। ক্ষত্রি [মহাজন]দের বাড়িতে যে পরিমাণ টাকা থাকে তা গুনে শেষ করা যায় না দেখে ওজন করা হয়। এর লোকসংখ্যা দুলাখ, আর কতো জায়গা থেকে যে পর্যটক আসে। এর অসংখ্য বাজারে পাওয়া যায় না এমন জিনিস নেই। আর জিনিসের দাম? প্রায় এক রুপোর রিয়েল [চার আনা] দিয়ে কেনা যায় ২০টি কবুতর অথবা বড় আকারের একটি বন্য কবুতর। পানের থেকে প্রতিদিন শুল্ক পাওয়া যায় চার হাজার রুপি।

১৬৪০

সেবাস্টিয়ান মানরিক

বাংলার মেট্রোপলিটন ঢাকা। খুব বড় না হলেও এর অধিবাসী অনেক। অধিকাংশ বাড়ি খড়ের। ওলন্দাজ ও ইংরেজদের দু-একটি কুঠি আছে।

১৬৬৩

নিকোলাই মানুচ্চি

বর্ষার নদী তীরে অট্টালিকা শোভিত ঢাকা নগরীকে ভেনিসের মতো জলোত্থিত নগরী বলে মনে হতো।… অধিকাংশ দেশীয় শহরগুলির মতো এ শহরটিতে ইষ্টক নির্মিত দালানকোঠার পাশাপাশি কুঁড়েঘর, সংকীর্ণ আঁকাবাঁকা রাস্তা ও গলিপথ নিয়ে অনিয়মিতভাবে গড়ে উঠেছে, … শহরের আর্মেনীয় ও গ্রিস বসতি এলাকা বেশ কয়েকটি বড় বড় ইটের তৈরি ঘরবাড়ি আছে কিন্তু এর অধিকাংশ যাচ্ছে ধ্বংস হয়ে।… জমির দাম সবচেয়ে বেশি শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে।

১৮৩৮

জেমস টেইলর

ঢাকা দেখিয়া কিছুমাত্র সুখী হইতে পারি নাই, দেখিবার বড় কিছুই ছিল না। রাস্তাগুলি অতিশয় সঙ্কীর্ণ এবং এত স্যাঁতসেঁতে ও দুর্গন্ধময় যে, দুটি দিন মাত্র থাকিতে আমার কষ্টবোধ হইয়াছিল। শ্রীমতী বুড়িগঙ্গা দেবীকে দেখিয়া আমার হাসি পাইয়াছিল। পূর্ববঙ্গবাসী গামলায় করিয়া পার হয় বলিয়া দীনবন্ধু যে বিদ্রƒপ করেছিলেন, তাহার অর্থ পূর্বে বুঝিতে পারি নাই। তখন বসন্তকাল, শ্রীমতীর কলেবর এত সঙ্কীর্ণ যে, তখন তাহাকে অতিক্রম করিবার জন্য গামলারও প্রয়োজন ছিল না।

১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ

নবীনচন্দ্র সেন

ঢাকা পূর্ব রাজধানীর স্মৃতি হৃদয়ে ধারণ করিয়া সর্বত্র সম্মানিতা এবং ভদ্রস্থান । এত শিক্ষিত ও সুসম্পন্ন লোক পূর্ববঙ্গের অন্য কোনো নগরে নাই।

১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ

নবীনচন্দ্র সেন

মমালয় সন্নিহিত

বুড়িগঙ্গা প্রবাহিত

বান্দাঘাট শোভিত যাহাতে

সেখানে বসিয়া গিয়া

জুড়ায়া সন্তপ্ত হিয়া

সলিল শিকরসিক্ত রাতে।

১৮৬০-এর দশক

কৃষ্ণচন্দ্র মুজমদার

নাহি পাই নাম তব বেদে কি পুরাণে,

কিন্তু বঙ্গ-অলংকার তুমি যে তা জানি

পূর্ববঙ্গে। শোভ তুমি এ সুন্দর স্থানে

ফুলেবৃন্তে ফুলযথা, রাজাসনে রাণী।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

ঢাকা হচ্ছে সবচেয়ে মামলাবাজ এলাকা। দিনে কমপক্ষে দশটা মামলা দায়ের করা হয় আমার এজলাসে।

১৮৬৫-৬৬

জর্জ গ্রাহাম

ঢাকায় এতদিন ছিলাম, কিন্তু গরিব ভিখিরি একদিনও দেখিনি।

১৮৮০

সজল নয়না দেবী

বহু উত্থান-পতন ও ভাগ্য বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়েছে এই নগরীটিকে। আজ আবার এক রূপান্তরের হতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ রূপান্তর যেনো একটি পুরনো জীর্ণ জামায় নয়া কাপড়ের তালি। অসংখ্য মসজিদ, ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদসমূহ, শ্যাওলাধরা দেয়াল ও প্রাচীর, বিধ্বস্ত প্রায় গম্বুজ, আঁকাবাঁকা পথ ও অলিগলি, অন্ধকার দরবার, আদালত ও ঘিঞ্জি বস্তি নিয়ে সেই পুরান ঢাকা আজো বেঁচে আছে দুর্ভেদ্য রহস্যের বর্মে আবৃত হয়ে।

১৯০৬

এফ বি ব্রাডলে বার্ট

খাজা, কুট্টি, শাঁখা

তিনে মিলে ঢাকা

কামরুদ্দীন আহমদ

এই মহতী শহরের নোংরা গলির বাহিরে

পরিপূর্ণ কৃষ্ণ কেশের অগণিত মানুষজন,

জোর হাতে তারা প্রার্থনা মাগে ঈশ্বরে,

কিংবা রোগী দেখছে ধীরে অতিক্রমী জীবন।

সেখানে তারা এক পয়সার মাটির থালা ধরে,

নোংরা ফোঁকরে খাচ্ছে খাদ্য-খাবার

ন্যাংটো শিশু জীর্ণ কাঠের পরে

খেলছে, আর একটি নারী বাড়ির প্রতি বিকার।

১৯৩০

যাজক নর্থফিল্ড। অনুবাদ রবিউল হুসাইন

বায়ান্নাবাজার তিপ্পান্ন গলির পুরান ঢাকা শহরে ঘোড়ার গাড়ি, মলের গাড়ি, রাস্তায় পানি দেবার গরুর গাড়ি, দসব মিলে জমজমাট।

১৯২০-৩০

কামরুদ্দীন আহমদ

ঢাকা সব সময়েই দুটি ব্যাপারে খুব উত্তাল। এক সঙ্গীত, আর রাজনীতি।

১৯২০-৩০

প্রতিভা বসু

এ শহর ট্যুরিস্টের কাছে পাতে শীর্ণ হাত এখন তখন এ শহরে বালিকারা জামা পরে, নগ্ন, হাঁটে, খোঁড়ায় ভাষণ।

১৯৮০-এর দশক

শামসুর রাহমান

আজো আমাদের পড়শি আছে,

হাঁক দিলে লোক জমা হয়,

অ্যাপার্টমেন্ট হাউজের কঠোর বিচ্ছিন্নতায়

পড়িনি ছিটকে দূরে দূরে

শোকে দুঃখে সুখে এখনো দশজন ঘরে আসে,

পুত্র, কন্যা থাকে পরিবারেরই পক্ষপুটে,

এই তো মানবিকতা, পুরো শহর চাই না আমি তাই।

ঢাকা তুমি অর্ধেক গ্রাম হয়ে টিকে থাকো,

থাকো চিরকাল।

ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬

হাসান হাফিজুর রহমান

আমি ঢাকার ঢাকা আমার

বাপ-দাদা আর চাচা-মামার,

ঢাকা মহৎ ঢাকা মহৎ

অলিগলি হাজারটা পথ,

ঢাকার স্মৃতি ঢাকার প্রীতি

সুখ-দুঃখ জীবনগীতি,

ঢাকা বিশাল জানে ত্রিকাল

সকাল-রাত্রি দুপুর বিকাল,

ঢাকার আমি আমার ঢাকা

জন্ম মৃত্যু বেঁচে থাকা।

আসলাম সানী

ঢাকা মানেই স্মৃতির শহর

বুড়িগঙ্গার ধার

সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের

ঢাকা যে অপার

সুখে দুখে দ্রোহে প্রেমে

ঢাকা যে আমার

আসলাম সানী

ঢাকার পুরনো ইতিহাস গৌরবময়। শত উত্থান-পতনেও ঢাকা পরিত্যক্ত হয়নি বা হারিয়ে যায়নি বাংলার অন্যান্য শহরের মতো। ঢাকা পৃথিবীর একমাত্র শহর যা চারবার রাজধানীর [১৬১০, ১৯০৫, ১৯৪৭ ও ১৯৭১] মর্যাদা অর্জন করেছিল। অষ্টদশ শতকে পৃথিবীর সেরা শহরগুলোর মধ্যে একটি ছিল ঢাকা এবং শহরের ক্রমসংখ্যায় এর স্থান ছিল দ্বাদশতম।

মুসতাসীর মামুন

স্থায়ীভাবে ঢাকায় বাস করতে আসবার আগে যতবার এসেছি ঢাকায়, প্রাচীন নগরটি বুঝি অভিজাত সুকণ্ঠী তায়েফের অনির্বচনীয় গজলের মতো আবিষ্ট করেছে আমার উপলব্ধির আবেগকে। ঢাকা ক্রমে ক্রমেই হয়ে উঠেছে ঢাকা, প্রাচ্যের রহস্যময় নগরী, ঐতিহ্যে, ইতিহাসে, জীবনধারার প্রবাহমানতার বৈশিষ্ট্যে অনন্যা।

রিজিয়া রহমান

ঢাকার রূপে দৃর্ষ্টি এমন বিমোহিত যে পলক পড়ে না হৃদয় মনকে আকর্ষণ করে আচ্ছন্ন করে রাখে। পূর্বাঞ্চলের প্রাণ এই ফুলবাগান ঢাকা।

খালিদ বাঙালি

(তোমার) সকল গৌরব সতত চিত্রহারিণী,

মোগল যুগের তুমি এক প্রাণবন্ত চিত্র।

তোমার রূপ অলঙ্কার অনন্য,

(এবং) এশিয়ার সংস্কৃতি ছড়িয়ে আছে তোমার অবয়বে

হে পুষ্পনগরী ঢাকা, প্রাচ্যের তুমি যে হৃদয়।

খালিদ বাঙালি

তবু ঢাকার বুকে

রইব মোরা হাসি কান্না কষ্টে দুঃখে সুখে

পাখি ডাকা, বনের ছায়ায় নদীর কলতান

দুঃখ বিষাদ ভুলিয়ে দিয়ে জুড়িয়ে দেয় প্রাণ

ঢাকা আমার ঢাকা!

যেথাই যাই, যত দূরেই এই ছবিটা রইবে বুকে আঁকা।

সুফিয়া কামাল

পাল্টেনি ঢাকার নাম, এ নাম এখনো টিকে আছে,

তবে, হ্যাঁ, পড়েছে ঢাকা সততার ধারকবাহক,

ফুলে, ফেঁপে কলাগাছ ক্ষমতার ঠক-প্রতারক

সততা ঢেকেছে ওরা ধোঁপবাজি মিথ্যার লেবাসে।

আব্দুস সাত্তার

এ শহরে প্রত্যহ লড়াই করে বহুরূপী নেকড়ের সাথে।

শামসুর রাহমান

আমি তার মধ্যে আত্মগোপন করি বা প্রকাশমান হই,

সে আমার একান্ত আশ্রয়, আমার দৈনন্দিন সুখ-দুঃখের সঙ্গিনী

আমার আশা ও আকাক্সক্ষার উত্তাপ, আমার আনন্দময় সত্তার বিকাশ

আমার নিঃসঙ্গতার বিষণœতা সে তার মধ্যে ঢেকে রাখে

আমার সকল অনুভূতি বিছিয়ে রেখেছি তার আঁচলে

সে আমার শহর ঢাকা, আমার ভালোবাসার শহর।

মাহবুব তালুকদার

ঢাকা তো ডুবে খাচ্ছে শব্দের কোলাহলে। এই শব্দের কোলাহলে দিনরাতের কোনো ফারাক নেই।

মুনতাসীর মামুন

ঢাকা হচ্ছে গরিবের শহর অথচ ঢাকার কর্তৃত্ব কখনো গরিবের হাতে থাকেনি। ঢাকা গরিবের শ্রমে বিকশিত, কিন্তু শাহরিক, নাগরিক সব রকমের সুযোগ-সুবিধা থেকে গরিবরা বঞ্চিত। এ অবস্থা যেমন সপ্তদশ শতকে ছিল, এখন একুশ শতকেও আছে। ভবিষ্যতেও সে অবস্থা বদলাবে কিনা সন্দেহ। এলিটদের সঙ্গে গরিবের এই টানাপড়েন বা রণজিৎ গুহের ভাষায় উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের দ্ব›দ্ব, এ নিয়েই ঢাকা শহর। বরং উচ্চবর্গের লোভ ও দখল মানসিকতা, ঢাকায় যা কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল তা নিশ্চিহ্ন করছে। আজকের ঢাকা, তার পরিকল্পনা, স্থাপত্য সবকিছুই এর প্রমাণ।

মুনতাসীর মামুন

মধ্যবিত্ত দেশ চালায় সব সময়। বলে সব সময় প্রশাসনকে নিতে হবে জনগণের কাছে। কিন্তু কখনো প্রশাসন পৌঁছেছে জনগণের দোরগোড়ায় এমনটি শোনা যায়নি বা জনগণও যে এগিয়ে এসেছে তাও নয়। কারণ, স্রেফ ভয়। মধ্যবিত্ত প্রশাসক সব সময়ই নিজেকে অস্পষ্ট, রহস্যময় ও দুর্বোধ্য রাখতে ভালোবাসে এবং সে জন্যই সবার আগে দেয়াল তুলে দেয় চারপাশে। ঢাকার সচিবালয় এর উদাহরণ। তাই প্রশাসন কি ভাবে কেউ তা জানে না। সবকিছুই দেয়াল আড়াল করে রাখে।

মধ্যবিত্তই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক, তাই তারাও বলে, শিল্পসাহিত্য নিয়ে যেতে হবে জনগণের কাছে কিন্তু কীভাবে, তা তারা জানায় না স্পষ্ট করে। কারণ, মনের গহিনে সে তা চায় না। জনগণের কাছে শিল্প-সাহিত্য চলে গেলে তার প্রভুত্ব থাকে কোথায়? অতএব উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘিরে দাও বাংলা একাডেমি বা বাংলা ভাষাকে, দেয়াল দিয়ে ঘিরে দাও শিল্পকলা একাডেমিকে।

মুনতাসীর মামুন

মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত বা শাসকরা এভাবে দেয়াল তুলেছে ঢাকা শহরে। দেয়াল নেই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের চারদিকে সেটি হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ প্রতিষ্ঠানটি আক্ষরিক অর্থে নিম্নবিত্ত সমাজের। চরিত্র গণতান্ত্রিক। সে কারণে, এখানে আসতে যেতে কারো বাধা নেই। চারদিকে সবুজের সমারোহ, বৃক্ষরাজিতে পরিপূর্ণ। পাবলিক জিনিসটা মধ্যবিত্ত খুব একটা পছন্দ করে না। কারণ, পাবলিককে সে মনে মনে ভয় পায়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একান্তভাবেই পাবলিকের তাই সে দখলদারিত্বের ভয় করে না, দেয়াল তোলার প্রয়োজন নেই। নিজ গুণেই অর্জন করেছে সে স্বাধীনতা আর সে স্বাধীনতাকে ভয় পায় শাসকরা। তাই যেই শাসকই আসুক না কেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়াল তুলতে চায়। আক্ষরিক অর্থে কখনো কখনো তা প্রতীকী অর্থে ছাত্র শিক্ষকদের মাঝে।

মুনতাসীর মামুন

ঢাকার কোনো স্থাপত্যিক চরিত্র নেই। একটি সুস্থ শহরে স্থাপত্যিক চরিত্র নেই তা মেনে নেয়া কষ্টকর। এ ক্ষেত্রে সামাজিক অর্থনৈতিক প্রভাবটি লক্ষণীয়। যখন ধানমণ্ডি গড়ে ওঠে তখন এর বাসিন্দারা ছিলেন প্রথম বা দ্বিতীয় জেনারেশনের শিক্ষিত পেশাদারি। গ্রামের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল দৃঢ়। গ্রামীণ খোলামেলা ভাব, নিসর্গ তাদের মনে তখনো গেঁথে ছিল, যৌথ পরিবারের ধারণাও। ধানমণ্ডি বা গুলশানের বাড়িগুলো এক বিঘা জমির ওপর। ছিল একতলা বা দোতলা বৈশিষ্ট্যহীন বাড়ি। কারণ, তখনো স্থাপত্য পেশাবিদরা প্রায় ছিলেন না। বাড়ির চারদিকে আম, নারকেল, পেয়ায়া গাছ ছিলই। ছিল গরু পালার জায়গাও। বাড়ি এমনভাবে করা হয়েছিল যাতে ছেলেমেয়ে নাতি-নাতনিসহ থাকা যায়।

স্বৈরশাসনে গুলশান বারিধারার বিকাশ হয়। কালো টাকার মানুষরা বিদেশ যাওয়া শুরু করেন। অনেকে বিদেশে কাজ করে টাকা করেন। বাড়ি ছিল তাদের কাছে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। বিদেশে গিয়ে কোনো বাড়ি ভালো লেগেছে বা বই দেখে, তার আদলেই বাড়ি করতে বলেছেন। বিলাসী সব বাড়ি। মনে হচ্ছে দেয়াল উপচে টাকা পড়ছে। প্রায় ক্ষেত্রে দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য ভূগোল অনুপস্থিত।

মুনতাসীর মামুন

ঢাকার পক্ষে কখনো পরিকল্পিত নগর হওয়া সম্ভব নয়। যে শহরকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে আছে সেনাছাউনি। সে শহরের অবকাঠামোগত পরিবৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। এ ছাড়া এসব ছাউনির অনাকাক্সিক্ষত হস্তক্ষেপও শহর পরিবৃদ্ধি, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও পরিচালনায় অন্তরায়। এক কথায় বলা যেতে পারে এ সমস্ত কিছু ঢাকাকে করে তুলেছে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম শহর।

মুনতাসীর মামুন

তুমি ভাবছো ঢাকার পথে পথে নাচছে তোমার ভবিষ্যৎ

তুমি ভাবছো ঢাকার আকাশে উড়ছে তোমার স্বপ্ন

তুমি ভাবছো ঢাকার মিনারে মিনারে বাজছে তোমার জীবন…

তুমি জানো না ঢাকা এখন নেকড়ের থেকেও হিংস্র

তুমি জানো না ঢাকা এখন কর্কট রোগের থেকেও অচিকিৎস্য।

হুমায়ুন আজাদ

যে শহরে অধিকাংশ দরিদ্র সে শহরে অন্তিমে সংঘর্ষ অনিবার্য। যারা ঢাকা দখল করে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ নিশ্চিত বলে মনে করছেন, সে বিনিয়োগ নিশ্চিত নাও থাকতে পারে। কারণ শহরটি ক্রমেই অচল হয়ে পড়ছে। একটি শহরকে শহর বলা যায় তখনই যখন এর সব বাসিন্দা কমবেশি পৌর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিতরিত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। এ শহরে, শুধু সেই ৬০ ভাগই নন, ৮০ ভাগই সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তারপর নেই কোনো সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ বা বিনোদন, যা সবার জন্য উন্মুক্ত, ৬০ ভাগের বেঁচেবর্তে থাকাটাই অনিশ্চিত। তাই এ শহরে সব সময় এক ধরনের দ্ব›দ্ব, ক্রোধ বা সংঘাত বিরাজ করবে। মুঘল আমলের বাগানের শহর এখন আন্দোলন আর রিকশার শহর। এই দুই প্রতীকই বলে দেয় শহরের হাল। বাগানের শহর থাকার সময় হয়তো শহরটি ছিল দৃষ্টিনন্দন কিন্তু মানুষ ছিল দরিদ্র। আজ সেই শহরের একই অবস্থা, সংখ্যাগরিষ্ঠ হতদরিদ্র এবং শহরটিও আর দৃষ্টিনন্দন নয়। তাই ভাবি ৪০০ বছরের মৌলিক কী পরিবর্তন হলো আমাদের?

মুনতাসীর মামুন

অধ্যায় ২ : সংস্কৃতি

“মুসলমানের মহররম পর্ব। সর্ব্বত্রে প্রচার আছে মুরশিদাবাদে এবং ঢাকায় আশুরায় মহাসমারোহ হয়, অতএব আমি উক্ত পর্বে এখানে যাহা ২ দেখিয়াছি সংক্ষেপে লিলি বিদিত হইবেন, হোসেন দেওয়ালাখ্যা চতুর্দিক প্রাচীরবদ্ধ এক মনোহর আলয় আছে, উক্ত বাঢী নবাবের বাঢীর দূরবর্ত্তী আমি কতিপয় বন্ধুর সহিত উক্ত মসজিদে বৈকালে দেখিলাম বেগম বাজার হইতে হোসেনী দালান পর্যন্ত রাজমার্গে দুই পার্শ্বে অসংখ্য দীন-দরিদ্র অন্ধ পঙ্গু দুঃখী লোকেরা সম্মুখে বস্ত্র বিস্তার করিয়া বসিয়া রহিয়াছে, তাবৎ মুসলমানেরা মসজিদ হইতে প্রত্যাগমনকালে চাউল, কড়ি, পয়সা যাহার যাহছেনচ্ছা বাঙ্গালিদিগের সম্মুখস্থ বস্ত্রচয়ে মেঠাই ইত্যাদির দোকান বসিয়া গিয়াছে এবং তন্মধ্যস্থিত সরোবরের দক্ষিণ দিগে ভদ্রলোকের বসিবার জন্য ধাপার কুতঘরের ন্যায় তক্তা দ্বারা পাঠাতন করা উচ্চ ঘর সুচারু আসনাদিতে সজ্জীভূত দেখিলাম। আমরা পূর্ব্বশ্রæত ছিলাম পাদুকা লইয়া হোসেনী দালানে যাইতে নিষেধ কিন্তু আমরা পাদুকা সহিত ঐ মসজিদে প্রবিষ্ট হওয়াতেও কেহ কিছু বলিবেন না। গৃহ মধ্যে দখিলাম বহুমূল্যের এক সিংহাসন স্থাপিত রহিয়াছে এবং তাহার নিকট স্বর্ণ বিনির্ম্মিত মহম্মদীয় ধর্মানুসারে দ্রব্যাদি রহিয়াছে, তাতে ভাষায় কোরানের কয়েক পদ দেখা আছে। ঐ সিংহাসনের নিকট সকলে সরায় করিয়া সিন্নি দিতেছেন। হোসেনী দেওয়ালের পূর্বদিগে নবাব নুসরত জঙ্গ বাহাদুরের কবর। লোকে ঐ কবরের নিকটেও সিন্নি দিতেছে। রাজনীযোগে ঐ ধামে বহুমূল্যে কবর। লোকে ঐ কবরের নিকটেও মরচি আদিদ গীত করে, হোসেনী দেওয়ালে মহররমের কয়েক দিবস এ রূপ নানা কাণ্ড দেখা যায় এবং তোপগস্তের দিবস বহুসংখ্যক পতাকা, হাতি ঘোড়া প্রভৃতি লইয়া মান্য ২ মুঘলেরা চকের চতুর্দিকে বেড়াইয়া পুন উক্ত-মসিজদে গমন করেন, শেষ দিবস পিলখানার দিনের সকল কারবোলায় [আজিমপুরে?] যান এবং তথ্যা উপলক্ষে অতিশয় জনতা হয়। এবং উক্ত নসরত জঙ্গের গোরের কথা যে উল্লেখ করিলাম তাহার নিকট অনেক লোকে অনেক মানত করে অর্থাৎ যদি কাহার কাঁঠাল বৃক্ষ ফলবান না হয় সে আসিয়া তথায় বলে, নবাব সাহেব আমার গাছে কাঁঠাল হইলে প্রথম ফলটি আপনাকে দিব।”

১৮৫০

সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়, কলকাতা

লখনৌ শহর বিখ্যাত ছিল কণ্ঠ সঙ্গীতের জন্য। আর তবলা ও সেতার বাদনের জন্য ঢাকা ছিল বিখ্যাত। উনিশ শতকের মধ্যভাগে ঢাকার সেতার বাদকরা এক নিজস্ব ঘরানার সৃষ্টি করেছিলেন। ঢাকার তবলা ও সেতার বাদনের অদ্ভুত স্টাইল ভারতে আর কোথাও দেখা যায় না।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ

হৃদয়নাথ মজুমদার

যাত্রার জন্যও বিখ্যাত ছিল ঢাকা। নবাবপুর একরামপুর এবং সূত্রাপুরের সচ্ছল লোকেরা ছিলেন কীর্তনের ভক্ত। নবাবপুরের যাত্রা অনেক দিন থেকেই ছিল বিখ্যাত। সীতার বনবাস ঢাকার প্রথম যাত্রা। শেষ অ্যামেচার যাত্রা কোকিল সংবাদ।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ

হৃদয়নাথ মজুমদার

সঙ্গীতের পুরনো পীঠস্থান হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ঢাকায় ছিলেন বেশ কিছু বাঈজি যারা কলকাতায় বাঈজিদের থেকেও ছিলেন দক্ষ। পূর্ববঙ্গে বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে ঢাকার বাঈজিদের নিয়ে যাওয়া হতো। ঢাকার বিখ্যাত বাঈজিদের মধ্যে ছিলেন আমীরজান, অটল, গুনু, রাজলক্ষী, ইমানী, কালী প্রমুখ।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ

হৃদয়নাথ মজুমদার

ঢাকার বৈষ্ণব ধর্মের বিশেষ প্রাধান্য ছিল। কার্তিক মাসে নিয়ম সেবার সময় ভগবত পাঠ, কীর্তন প্রভৃতি বাড়ি বাড়ি হত, রাস্তায় যখন কীর্তনের দল চলে যেত, তখন দুপাশের বাড়ি থেকে খই, বাতাসা প্রভৃতি ছড়ানো হত। কীর্তনের পর সকলে সেই পথের ধুলায় গড়াগড়ি দিত।

১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ

সজল নয়না দেবী

কেতাবপট্টির চরিত্র ছিল আলাদা। পুঁথি ও ধর্মীয় পুস্তক বিক্রয়ের কেন্দ্র ছিল কেতাবপট্টি। অধ্যাপক আবদুল কাইউম লিখেছেন, “লক্ষণীয় যে, চকবাজারের কেতাবপট্টি শুধু চকবাজারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আশেপাশের মোগলটুলি বড় কাটরা, ছোট কাটরা, চম্পাতলি, ইমামগঞ্জ প্রভৃতি স্থানেও বিস্তৃত ছিল।” পুঁথিকারদের মধ্যে হায়দার জান ও মুন্সি আলিমুদ্দিনের দোকান ছিল চকবাজারে, ‘গোলজার’ পুঁথিতে মুন্সী হায়দার জান নিজের দোকানের পরিচয় দিয়েছিলেন-

“এই কেতাবের যার দরকার হইবে।

নিজ দোকানে মেরা আসিলে পাইবে।

মিয়া রবিউল্লাহ বটে ভগিনী জামাই।

দোকানে থাকেন সেই পাবে তার ঠাঁই

চওকের পশ্চিমধারে কেতাব পট্টিতে।

ঠিকানা বলিয়া ছিনু সবার খেদমতে।”

১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ

আবদুল কাইউম

ঢাকা মূলত একটি বৈষ্ণব শহর। শহরের হিন্দু মহল্লার প্রায় প্রতিটি সচ্ছল ঘরে ছিল রাধাকৃষ্ণের মূর্তি। শহরের আদি বাসিন্দারা হলেন শাঁখারী ও বসাকরা। তারা মনেপ্রাণে ছিলেন বৈষ্ণব, বিশেষ করে শাঁখারীবাজার বিকেল থেকে মাঝরাত পর্যন্ত মুখরিত থাকতো খোল করতালের শব্দে। কালী ও দুর্গারও ভক্ত ছিলেন অনেকে। এ অদ্ভুত অবস্থা বোধ হয় বিদ্যমান ছিল একমাত্র ঢাকা শহরেই।

এ পরিপ্রেক্ষিতে হোলি ও ঝুলন হয়ে উঠেছিলো ঢাকায় বড় ধরনের উৎসব।

হোলি ছিল এমন একটি উৎসব যাতে হিন্দু-মুসলমান সমবেতভাবে সমান উৎসাহে যোগ দিতেন। প্রতি বছর দোলযাত্রার সময় রচিত হতো হোলির গান, তবে বাংলায় নয়, উর্দুতে। এক বছর ভিখন ঠাকুরের বাজারে হোলির আসর বসলে পরের বছর তা বসতো উর্দু বাজারে লালবাবুর বাড়ির সামনের ময়দানে। আসরটি হত অনেকটা কবি গানের মতো। দল থাকতো দুটি-একটি রাজা বাবুর অপরটি উর্দু বাজারের বাবুর। আসরের মহড়া শুরু হতো হোলির দুসপ্তাহ আগে থেকে। আসরের প্রশ্ন উত্তর সবই হতো উর্দুতে। আসলে ঢাকার হাট বাজারের ভাষা ছিল ভাঙা উর্দু ও বাংলার মিশ্রণ।

১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ

হৃদয়নাথ মজুমদার

‘আমরা ফাগ লইয়া যে কত লোকের চক্ষে মারিয়াছি তাহার অবধি নাই। একবার পুলিশের কতকগুলি লোকের উপর ফাগ লইয়া অত্যাচার করাতে তাহারা আমাদের ভয় দেখাইয়াছিল। তাহাতে আমাদের লোকের হাতে তাহারা ভয়ানক মার খাইয়াছিল, কিন্তু নালিশ করিতে সাহস পায় নাই … সেখানে দোলের ফাগ খাইয়া একটা রীতি ছিল এই রীতির বিরুদ্ধে কেহ কিছু করিতে চাহিত না এবং এতদ সম্বন্ধে বিপক্ষতা করিলে সমাজে নিন্দিত হইতে হইত। দোলের সময় মনে পড়ে আমরা বাহির খণ্ডের সুবৃহৎ হল ঘরটার ২০/৩০টি ছেলে সকালে শুইয়া আছি, চাকরেরা নেকড়া ও জলের ঘটি লইয়া প্রত্যেকের চক্ষু খুলিয়া দিতেছে। কারণ পূর্বদিন ও পূর্বরাত্রে এত ফাগ আমাদের চোখে পড়িত যে, পরদিন চোখের দুটি পাতা একেবারে আটকাইয়া যাইত। ভৃত্যদের সাহায্যে চক্ষু না খুলিলে চোখ বুজিয়া থাকিত।’

১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ

দীনেশচন্দ্র সেন

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চৌকীগুলির [জন্মাষ্টমীর মিছিল] উপরিস্থিত অপদেবতারা অসভ্যতার এক একটি প্রতিরূপ। উহাদিগের বেশভূষার মহিমা দর্শন করিলে বোধ হয় ইহাদিগের অন্তঃকরণে লজ্জার লেশমাত্র নাই; আর তাহাদের গান? ঐ সকল অপদেবতাগুলি ঢোল বাজাইয়া নাচিয়া নাচিয়া ঋষভগঞ্জিত সুললিত তারস্বরে দর্শক ও শ্রোতাগণের শ্রবণে যে অপূর্ব সঙ্গীতসুধা বর্ষণ করে, তাহার মহিমা বর্ণনা করিতে নরকস্থ প্রেতযোনির বমি আইসে। বাংলা ভাষায় যত অশ্লীল শব্দ আছে, মনুষ্যের মনে যত ঘৃণিত ভাবের উদয় হইতে পারে, ঐ সকল সঙ্গীত তাহার প্রায় কিছুর অভাব থাকে না।… জন্মাষ্টমীর মিছিলের চৌকির অপদেবতার গানে যে সকল অশ্লীল ভাব ব্যক্ত করে, অভিনয়ের দ্বারা তাহা দর্শক এবং শ্রোতাগণকে ভালো করিয়া বুঝাইয়া দিতে ত্রুটি করে না।

১৮৬১

ঢাকা প্রকাশ, ঢাকা

বিজ্ঞাপন

আমাদিগের এই বাঙ্গালা যন্ত্রের পুস্তকাদি মুদ্রাঙ্কণের পূর্ব নিয়ম পরিবর্তন করিয়া নিম্নলিখিত নূতন নিয়ম নির্ধারিত করা হইল।

পাইকার প্রত্যেক ফর্মার মূল্য ৬ টাকা

ইংলিশের প্রত্যেক ফর্মার মূল্য ৫ টাকা

এতদপেক্ষা অল্পমূল্যে পুস্তক মুদ্রাঙ্কন করিয়া দেওয়া আমাদিগকে সাধ্যাতীত।

১৮৬৩

ঢাকা প্রকাশ, ঢাকা

আমাদের দেশে [কলকাতা] নাটক অভিনয়ের নিমন্ত্রণ প্রায় বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে হয়। যাহার ইচ্ছা সে উহা দর্শন করিতে যাইতে পারে। ঢাকার অভিনয়ে সেটি চাইবে না। অভিনয় কর্তারা উহার নিমিত্ত টিকেট বিক্রি করিবেন। টিকেট চারি, দুই এবং এক টাকা মূল্য লাগিবে।

১৮৭২

অমৃতবাজার পত্রিকা, কলকাতা

ঢাকার মেয়েদের আবরু খুব বেশি ছিল। তখন মোটর, বাস ইত্যাদি হয়নি। যারা খুব বড়লোক তাদের বাড়িতে হাতি থাকত, হাতির উপর হাওদা দিয়ে সকলে চড়ত। সাধারণ লোক ঘোড়া-গাড়ি ভাড়া করেই যাওয়া আসা করত, মেয়েরা যখন কোথাও যাবে বাড়ির ভিতর থেকে গাড়ি পর্যন্ত দুদিকে দু-খানা কাপড় কিম্বা চাদর দিয়ে আড়াল করে রাখত যাতে বাহিরের লোক না দেখে ফেলে। গরিব মুসলমানের মেয়েরা বোরখা পরে রাস্তায় বেরুত। ব্রাহ্ম সমাজের ভিতরও মেয়েরা চিকের আড়ালে থাকতেন।

১৮৮০-এর দশক

সজল নয়না দেবী

পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি নামে ঢাকাতে একটি নাট্যশালা আছে। যে সময়ে ঢাকার ধনী ও সম্ভ্রান্তগণ রামাভিষেক নাটকের প্রথম অভিনয় করিতে প্রবৃত্ত হন, তখন বহুতর টাকার সংগ্রহে ইহা সুনিশ্চিত হইয়াছিল। যাহাতে এই নাট্যশালায় বিশুদ্ধ ও পবিত্র আমোদ হইতে পারে; তাহাই উহার লক্ষ্য ছিল। পরে অনেক রাজনৈতিক সভা ও বৈজ্ঞানিক কার্য ইহাতে সুসম্পন্ন হইয়াছে। এমনকি হিন্দু ধর্মরক্ষিণী প্রভৃতি সভাও ইহাতে অধিবিষ্ট হইয়া সময়ে ২ কার্য করিতেছে। ঢাকার পণ্ডিত বহুলা সারস্বত সভারও অধিবেশন কার্য এই গৃহে সম্পাদিত হয়। কিন্তু কাল মাহাত্ম্যে সেই পবিত্র দেব মন্দিরে নবীনৃত্যমান বারবিলাগীগণ, পাদবিন্যাসে দর্শকগণকে চরিতার্থ করিতেছে। এই গৃহের সৃষ্টি সঙ্কল্পে এই পাপানুষ্ঠান সংকল্পিত হয় নাই। বিশেষত ইহা ঢাকার পূর্ব বাংলা ব্রাহ্ম সমাজের সংলগ্ন ভূমি। ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের ও রঙ্গ গৃহের কর্তৃপক্ষও প্রায় এক; এমন অবস্থায় কর্তৃপক্ষের উচিত হয় নাই যে, বেশ্যাদিগকে এই ঘরে অধিকার দেন। প্রায় দুই বৎসর গত হইতে চলিল ন্যাশনাল থিয়েটার যখন অভিনেত্রী বারবনিতাগণসহ, ঢাকার উপনীত হইয়া এই নাট্যগৃহে অভিনয় করিতে ইচ্ছা করে তখন সভাতে বহুতর আপত্তি সত্ত্বেও তৎকালীন কর্তৃপক্ষগণ তাহাদিগকে অভিনয় করিতে আজ্ঞা প্রদান করিয়াছিলেন। তদনুসারে প্রায় মাসান্ত ব্যাপিয়া সেই সদানুষ্ঠান (!) হইয়া যায়। সংপ্রতি পুনরায় কতকগুলি মুসলমান বেশ্যা (বাঈজি) এই নাট্যগৃহে অভিনয় করিয়া উপার্জন করিতে আরম্ভ করিয়াছে। আমরা এই সকল দেখিয়া ও শুনিয়া অবাক হইয়াছি।

১৮৮০

ঢাকা প্রকাশ

‘নূতন অক্ষর’

স¤প্রতি ঢাকা প্রকাশ কার্যালয়ে যে নূতন স্মল অক্ষর আসিয়া পৌঁছিয়াছে, ইহা শিক্ষিত ব্যক্তি দ্বারা বিশেষ সাবধানতার সহিত প্রস্তুত হইয়াছে। এরূপ সুন্দর অক্ষর ঢাকায় অদ্যাপি প্রচলন হয় নাই। ইহার সৌন্দর্য দেখিয়া কোনো কবি বলিয়াছেন-

আসিয়াছে নূতন অক্ষর,

সে অক্ষর সুন্দর শেখর,

যত প্রেস আছে ঢাকা, সকল ফেলিবে ঢাকা,

ঢাকা প্রকাশেতে করি ভর।

আমরা এই অক্ষর ভাল ভাল পুস্তক ছাড়া অন্য কাজে খাটাইতে ইচ্ছা করি না।

শ্রী গুরুগঙ্গা আইচ চৌধুরী।

১৮৮৩

ঢাকা প্রকাশ

সঙ্গীত বিদ্যালয়। ঢাকা শহরের এটাই ছিল বোধ হয় প্রথম সঙ্গীত বিদ্যালয়। এ প্রসঙ্গে ১২২৯ সালের (১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ) ১ ভাদ্রের ঢাকা গেজেট থেকে একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি।

‘ঢাকাবাসী সঙ্গীত বিদ্যোৎসাহী মহোদয়গণ শুনিয়া সুখী হইবেন যে, আমাদের বন্ধু সঙ্গীতানুরাগী শ্রীযুক্ত বাবু চন্দ্রনাথ রায় মহাশয়ের প্রযতেœ ঢাকা জগন্নাথ কলেজগৃহে একটি বিশেষ সঙ্গীত বিদ্যালয় সংস্থাপিত হইয়াছে। ইহা দ্বারা ঢাকা নগরীর একটি বিশেষ অভাব দূরীকৃত হইবার সম্ভাবনা। সঙ্গীত বিদ্যাভ্যাসাকাক্সক্ষীদের শিক্ষাকার্যের সুবন্দোবস্ত করা হইয়াছে।

‘ভরসা করি সঙ্গীতপ্রিয় মহোদয়গণ চন্দ্রনাথ বাবুর এই সদুদ্দেশ্য সুসিদ্ধ করিবার জন্য যথোচিত সাহায্য ও উৎসাহ প্রদান করিবেন।

বিদ্যালয় সংক্রান্ত কয়েকটি নিয়ম নিম্নে প্রকাশ করা গেল :

বিদ্যালয়ে চারটি বিভাগ অথবা শ্রেণি থাকিবে।

(ক) হারমোনিয়াম শ্রেণি

(খ) সঙ্গীত শ্রেণি

(গ) তবলার শ্রেণি

(ঘ) সেতারের শ্রেণি।

প্রতি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীগণ হইতে এক টাকা হারে মাসিক বেতন গ্রহণ করা হইবে। যদি কেহ দুই শ্রেণিতে শিক্ষা করিতে অভিলাস করেন, তবে তাহাকে উভয় শ্রেণির জন্য মাসে ১ টাকা বেতন দিতে হইবে। এক প্রকার তিন শ্রেণির জন্য ২ টাকা এবং চারি শ্রেণির জন্য ৩ টাকা বেতন গৃহীত হইবে। প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে সেই মাসের বেতন দিতে হইবে। সন্ধ্যা ৭টা হইতে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ের কার্য চলিবে। প্রতি সোম, বুধ, শুক্রবারে হারমোনিয়াম ও সেতারের এবং প্রতি মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং শনিবারে সঙ্গীত ও তবলা শ্রেণির শিক্ষাকার্য চলিবে। অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত কোনো স্কুলের অজ্ঞাতাকুলশীল কোনো ব্যক্তিকে গ্রহণ করা যাইবে না। বিদ্যালয়ের উন্নতি এবং শিক্ষার্থীগণের উৎসাহানুসারে ফ্লুট, ক্লারিওনেট, এস্রাজ প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের শিক্ষা যাবৎ আরম্ভ হইবে।

১৮৮৬

ঢাকা প্রকাশ

অত্রত্য ক্রাউন থিয়েটারে অদ্য রাত্রি হইতে এক অদ্ভুত দৃশ্য প্রদর্শিত হইবে। ব্রেডফোর্ড সিনেমাটোগ্রাফ কোম্পানি এরূপ সজীব চিত্র প্রদর্শন করিবেন যাহা দেখিয়া নিতান্ত বিস্ময় জন্মিবার সম্ভাবনা। গত বছর গ্রিক ও তুরস্কের যে ভীষণ যুদ্ধ হইয়াছে তাহা ও অন্যবিধ আশ্চর্য বিষয় যেন ঠিক কার্যক্ষেত্রে যাইয়া প্রত্যক্ষ করিতেছি বলিয়া নাকি বোধ হইবে। আমরা আগামীবার ইহার বিশেষ বিবরণ প্রকাশ করিব। আগামী বুধবার পর্যন্ত প্রত্যহ রাত্রি ৮ ঘটিকা হইতে এই ক্রীড়া প্রদর্শনের কথা হইয়াছে।

১৮৯৮

ঢাকা প্রকাশ

অভিনব অভাবনীয় ব্যাপার!

১২ মে, ২৯ শে বৈশাখ, সোমবার রাত্রি নয় ঘটিকার সময়!

এই খানে এই নতুন! এই খানে এই নতুন!! জগন্নাথ কলেজ গৃহে বায়স্কোপ।

জীবন্ত চিত্র! জীবন্ত চিত্রা জীবন্ত চিত্র!!!

পাশ্চাত্য জগতের শিক্ষিত হস্তে পরিচালিত।

প্রবেশ মূল্য :

প্রথম শ্রেণি : ১ টাকা

দ্বিতীয় শ্রেণি : ৮ আনা

তৃতীয় শ্রেণি : ৪ আনা

চতুর্থ শ্রেণি : ৩ আনা

১৮৯৮

ঢাকা প্রকাশ

এখানে কোনো সাহেব ফনোগ্রাফ যন্ত্র প্রদর্শনের জন্য আনিয়াছেন। আমরা গত বুধবার বৈকালিক ভ্রমণ (অস্পষ্ট) ডাকবাঙ্গালার প্রায় একশত হাত হইতে বাঈজীর গানের শব্দ পাইলাম। চারদিকে সাহেবের বাড়ি; সেখানে বাঈজীর গান একটু বিস্ময়জনক বোধ হওয়ায় ডাকবাঙ্গালোর দিকে চাহিয়া দেখিলাম ডাকবাঙ্গালার বারেন্দার ছাদে গুটিক এক সাহেব ও তাহাদের সামনে একটি দৃষ্টপূর্ব যন্ত্র। তাহা হইতেছে ঐ বাঈজীর গান বাহির হইতেছে বুঝিয়া উহা ফনোগ্রাফ মনে করিলাম।

১৮৯৯

ঢাকা প্রকাশ

ঢাকার বটতলার অঞ্চল বলতে কোনো অংশটাকে বুঝব? এটা ঠিক ঢাকায় ‘বটতলা’ নামে কোনো অঞ্চল ছিল না, তবে কেতাবপট্টি নামে একটি জায়গা ছিল যেখানে শুধু পুঁথি বিক্রি করা হতো। ঢাকার অধিকাংশ প্রেস ছিল বাবুবাজার থেকে বেগমবাজারের মধ্যে। পরবর্তীকালে বাংলাবাজারে স্থাপিত হয়েছিল কিছু মুদ্রণ যন্ত্র। বটতলার এলাকাটি এভাবে কল্পনা করে নিতে পারি-পাটুয়াটুলী থেকে সোজা বাবুবাজার; বাবুবাজার খাল পেরিয়ে মিটফোর্ডের সামনে দিয়ে, বেগমবাজারের রাস্তা ধরে চকবাজার। বাবুবাজারে ছিল কিছু মুদ্রণ যন্ত্র যেগুলোর মালিক হিন্দু সম্প্রদায়; সেখানে বই বিক্রিরও ব্যবস্থা ছিল। তারপর মিটফোর্ডের মোড়ে একটি বটগাছ, কিছুদিন আগে গাছটি কেটে ফেলা হয়েছে, পঞ্চাশ বছর আগেও যারা ঢাকা শহর দেখেছেন তারাও গাছটি দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। ধরে নিতে পারি উনিশ শতকের শেষার্ধেও হয়তো গাছটি ছিল। তারপর বেগমবাজারে কিছু মুদ্রণ যন্ত্র, চকের মসজিদ, তাকে ঘিরে গলি, সেখানেই কোতবপট্টি। চক মসজিদের নিচের অংশ, ফুটপাত ছিল ঢাকার বিখ্যাত কেতাবপট্টি। মসজিদের সামনে ও পাশে ছিল পিপুল গাছ। পুরনো বাসিন্দারা অন্তত তাই বলেন। কেতাবপর্ট্টির ভগ্নাবশেষ এখন দেখা যাবে চক মসজিদ কমপ্লেক্সের পিছে। বটতলার বই প্রকাশ ও বিক্রির পিছে এই ভূগোল- বাবুবাজার খাল, বুড়িগঙ্গা, সেইসব পিপুল বা বটগাছ, চকের মসজিদ- এসবেরও ভূমিকা ছিল।

১৯ শতকের শেষার্ধ

মুনতাসীর মামুন

ঢাকার মুদ্রণালয়গুলো শুধু মুদ্রণালয় ছিল না, ছিল একটি সামাজিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রও। অনুমান করে নিতে পারি বাংলাবাজার থেকে বেগমবাজার, বিশেষ করে ইসলামপুর থেকে বেগমবাজার পর্যন্ত মুদ্রণালয়গুলো সব সময় গমগম করতো লেখক, প্রকাশক, কর্মচারী ও খুচরা বিক্রেতা ও তাদের বন্ধু-বান্ধবে। অলস আড্ডা ও মতামত বিনিময়েরও কেন্দ্র ছিল তা। বিশেষ করে সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের কেন্দ্র ছিল এই মুদ্রণালয়গুলো। এর একটি কারণ, অনেক ক্ষেত্রে যেসব মুদ্রণালয় থেকে সংবাদ সাময়িকপত্র বা গ্রন্থ প্রকাশিত হতো তা বিক্রির বন্দোবস্তও সেখানে থাকতো। কারণ, তখন সবল ব্যবসায়িক ভিত্তিতে গ্রন্থ বিক্রির জন্য লাইব্রেরি বা পুস্তাকালায় গড়ে ওঠেনি। শুরু থেকেই চালু ছিল ও বন্দোবস্ত।

১৯ শতক

মুনতাসীর মামুন

ঢাকা বিখ্যাত ছিল সেতারের জন্য। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই বিশ শতকের গোড়ার দিকেও ঢাকায় দশ-বারোটি দোকান ছিল সেতার, এসরাজ ও বেহালার। সবচেয়ে নামকরা সেতার ও এসরাজ প্রস্তুতকারক ছিলেন শুকলাল মিস্ত্রি। তিনি অবশ্য ঢাকার লোক ছিলেন না; এসেছিলেন উত্তর ভারত থেকে কিন্তু পরে স্থায়ীভাবে থেকে গিয়েছিলেন ঢাকায়। শুকলাল মারা যাওয়ার পর তার তৈরি করা সেতার বিক্রি হতো চড়া দামে। শুকলালের ছেলে পুরুষোত্তমও নাম করেছিলেন এ সময়। বিশ শতকে যখন হৃদয়নাথ স্মৃতিকখা লিখেছেন তখন পুরুষোত্তমের ছেলে রামলাল বেঁচে ছিলেন। শুকলালের যারা সহকারী ছিলেন তারা প্রায় সবাই দোকান খুলেছিলেন। এদের মধ্যে বাবুরাম ও বদ্রিনাথের দোকান ছিল চকবাজারে আর বদন মিস্ত্রির দোকান ছিল কোতোয়ালির পাশে।

১৯১০-এর দশক

হৃদয়নাথ মজুমদার/মুনতাসীর মামুন

ঢাকার সাংস্কৃতিক জীবনে আর এক প্রধান অঙ্গ ছিল সরস্বতী পুজো। দুর্গা পুজো তখনো বারোয়ারি পুজো বা সবাই চাঁদা করে পুজো করার অনুষ্ঠান হয়ে ওঠেনি।

১৯১০-২০

শঙ্খ চৌধুরী

হিন্দুপাড়ায় প্রতি বছরই নাটক হত। খুব কম মুসলমান ছেলেরাই নাটকে অংশ নিত।

১৯২০-৩০

কামরুদ্দীন আহমদ

গান-বাজনায় পথটা ঢাকায় তিরিশ দশকেও বড়ো হেয় বলে গণ্য করা হতো। কিন্তু সেই সঙ্গে একদিকে স্বদেশী গানের রেয়াজ আর অন্যদিকে ছিল ব্রহ্মসঙ্গীতের প্রচলন। দেশাত্মবোধক নানা গানের প্রচলনের সঙ্গত কারণ ছিল। মুকুন্দ দাসের যাত্রা ঘুরেফিরে পাড়ায় পাড়ায় চলতো। দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকের গানগুলোও প্রচলিত হয়েছিল।

১৯৩০-এর দশক

সুকুমার রায়

ঝুলনের রাত্রিতে এদিকে ওদিকে বহু ঠাকুরবাড়িতে বসতো গানের আসর। নবাবপুর, বনগ্রাম, নারিন্দা, ফরাশগঞ্জ, তাঁতিবাজার সর্বত্র ঝুলনের গান। জাঁকিয়ে আসর জমে বহু রকমের গায়ক, বাঈজী, যন্ত্রী, কীর্তনীয়া প্রভৃতিদের নিয়ে।

১৯২০-৩০-এর দশক

সুকুমার রায়

সেকালে ঢাকায় দুটি ভালো সাধারণ পাঠাগার এবং লাইব্রেরি ছিল। তার একটি নর্থব্রুক হল বা লালকুঠির লাইব্রেরি। অন্যটিতে পাটুয়াটুলিতে রামমোহন লাইব্রেরি। নর্থব্রুক হল লাইব্রেরিতে প্রবেশ করার সাহস ছিল না। … রামমোহন লাইব্রেরি অপেক্ষাকৃত সহজগম্য এবং আপন মনে হতো।

১৯২০-৩০

আবু জাফর শামসুদ্দীন

শ্রাবণের একটি রৌদ্রচুম্বিত বিকেলবেলা। যেদিকেই তাকাই না কেন রাস্তা ঘাটে, ছাদে-কার্নিশে, বারান্দায়-রোয়াকে, দরজায়-জানালায়, গাছ-ল্যাম্পপোস্টে- সর্বত্রই কালো-কালো বিন্দু। এক কথায় কালো বিন্দুর এক মহাসমুদ্র। গোটা ঢাকা শহর এক অস্বাভাবিক উত্তেজনায় আর উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। আজ জন্মাষ্টমীর মিছিল বেরুবে। এমন জাঁকালো এমন বিশালাকার এবং অসাধারণ চমৎকারিত্বপূর্ণ একটি ঘটনা, এই উপমহাদেশে আর কোথাও কি দেখা যায়। যে জাদুকরি হাত জগদবিখ্যাত মসলিন কাপড়ের স্রষ্টা, এই মিছিল সে হাতেরই এক আশ্চর্য কারিগরির যোগফল যেন। দু-দিন ধরে এই বিন্যাসপূর্ণ, সাত-রঙ মিছিল, ক্রমাগত পরিবর্তনশীল, অতিকায় একটি নকশিকাঁথার মতো চোখের সামনে দিয়ে ভেসে যায়। ঠিক যেন একটি ক্যালিডোস্কাপের ভেতর দিয়ে দেখছি। অংশীদাররা হিন্দু হলেও আক্ষরিকভাবে এ মিছিল সর্বজনীন।

অপরাহ্নের সূর্য পশ্চিমের আকাশে হেলে পড়েছে। ধুলোর চিকের ভেতর দিয়ে দূরে, কালো পাহাড়ের মতো আবছা একটি পুঞ্জিত ছায়া দেখা যায়। তাই দেখে, কালো বিন্দুর সমুদ্রে উত্তেজনার মস্ত ঢেউ ওঠে। এই পাহাড়টি ভিড় ঠেলে কচ্ছপের চালে এগিয়ে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই আবছা মূর্তিটি জাঁকজমক পোশাকে সজ্জিত একটি বাস্তব হাতিতে রূপান্তরিত হয়। ‘আসছে, ঐ আসছে’;-সহস্র কণ্ঠের এই আওয়াজ বাবুবাজারের দিক থেকে, আকাশে উঠে, একটি শব্দতরঙ্গের মতো আমাদের দিকে ভেসে আসে। কী উন্মাদনা! কী ঠেলাঠেলি। যতদূর চোখ যায়, শুধু রঙ আর রঙ থাকে সাজানো। আক্ষরিকভাবে রঙের গাঙে যেন জোয়ার আসছে। হাতির পেছনেই কী অপরূপ এক দৃশ্য- গ্যালারির পর গ্যালারি। উচ্চতায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ ফুট। বহুযুক্ত গোরুর গাড়ির ওপর বসানো। এ গাড়িগুলোকে টানছে জোড়া জোড়া বলদ। এই গ্যালারির মাঝখানে একটি মঞ্চ। তার গর্ভগৃহে, খাঁটি সোনা কিংবা রুপোর চৌকি কিংবা সিংহাসন। সেখানে বৈষ্ণব দেবদেবীর মূর্তি। তার সামনে পৌরাণিক কাহিনীর মূকাভিনয় অথবা ভক্তিমূলক নাচ-গান চলে। কখনো বা নিছক খ্যামটা নাচ। কী অসাধারণ এক জমজমাট ব্যাপার। অনেকটা প্রতিমার চালার আকারে, দু-পাশ দিয়ে উঠছে কাঠ কিংবা বাঁশের কাঠামো। তাতে নানা নক্সার রাংতা আর শোলার অলংকরণ। এই কাঠামোর একের পর-এক, নিশ্চল পুতুলের মতো, নানাভাবের নানা জ্যান্ত মূর্তি, মেয়েদের পোশাকে, জরি, পুুঁতি এবং চুমকির কাজে এবং কারবাইডের আলোয় মালায় এবং পোশাকগুলো এমনই ঝলমল করে যে, চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

গ্যালারির সারি পার হবার পরই ঢেউয়ের পর ঢেউ-এর মতো, নৃত্যরত সঙ-এর দল আসে। তাদের মুখে কবিগান কীর্তন, বিদ্রƒপাত্মক সামাজিক ছড়া, জাতীয়তাবাদী গান। হাতে খঞ্জনি আর করতাল। বাদ্য এবং কণ্ঠসঙ্গীতের কী নিখুঁত ঐক্য। মনে হয় একটি মাত্র কণ্ঠ, একটি মাত্র বাদ্যের ধ্বনি। তারপরই রাজপুত বীরের বেশভূষায়, তলোয়ার উঁচিয়ে আসে অশ্বারোহীর দল। তাদের দুপাশে সারি সারি রঙে ঝলমল নিশান, অতিকায় মখমলের ছত্র, পাখা চামর, বর্শা, আরো কত কী। সঙ্গে আছে ঢাল-ঢোল-নাকারা-শিঙা, এমনকি ব্যান্ড পার্টিও। সামরিক সঙ্গীতের গমগমে শব্দচাঞ্চল্যে আকাশ-বাতাস ভরে ওঠে। যেন কয়েকশ পাখোয়াজ একই সঙ্গে একই বোলে বেজে উঠেছে। তারপর, আরো সঙ, আরো ঘোড়া, আরো গ্যালারি-এক অন্তহীন, সচল, সাড়ম্বর, অদৃশ্যপূর্ব প্রদর্শনী।

দুদিনব্যাপী মিছিলের পর জন্মাষ্টমী উৎসবের অত্যাশ্চর্য আকর্ষণ নবাবপুরের ‘বড়োচৌকি’। মিছিলের মতো এটিও আরেক অসাধারণ চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা।

সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের সৃজনীশক্তির কি কোনো ঠিক-ঠিকানা আছে। যেমনি নক্সার ভাব, তেমিন অলংকরণ, আর তেমনি অনুপাত-জ্ঞান। হিন্দু-মুসলমান নক্সার কি অপূর্ব সমন্বয়। আর রঙের তো রীতিমতো দাঙ্গা লেগেছে। আগাগোড়া রাংতা, রঙ্গীন কাগজ এবং কাপড় দিয়ে মোড়া। তার ওপর সোনা-রুপোর ছড়াছড়ি। নবাবপুরের সাবেকী ছাতা-পড়া বাড়িগুলো এবং রাতের কৃষ্ণবর্ণ আকাশের পটভূমিকায় চৌকিটি নানা রঙের আলোক ঝলকানিতে, এক পরীর রাজ্যের মতো ডগমগিয়ে উঠেছে। চৌকির মাঝামাঝি উচ্চতায় দ্বিগুণ পূর্ণাবয়ব পুতুল খেলার মাধ্যমে, মহাভারত রামায়ণ এবং অন্যান্য পালা রাতের পর রাত চলে। এসব পুতুলের গঠন-গাঠন, আঙ্গিক, রঙ, হাত-পা-মাথা ইত্যাদি নাড়াবার ভঙ্গি- এক কথায় তাবৎ নান্দনিক বিচার এবং সংযম দেখে, অজ্ঞাত, অশ্রæতকীর্তি শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধায়, আপনা-আপনিই মাথা নুয়ে পড়ে।

এই চৌকিতে আজ রাবণবধ পর্ব চলেছে। সে কী ভয়ানক দৃশ্য। যেমনি রাম-লক্ষণের হাত-পা এবং মুখের ক্ষিপ্ত গতি এবং মারাত্মক সব অস্ত্র নিক্ষেপ, তেমনি রাবণ তাঁর বিরাট খড়গ, দ্রুত চালিয়ে, চারপাশের খণ্ড খণ্ড করে ফেলে। তার হাতের চকচকে এই অস্ত্রটির থেকে ছটিকাক্ষুদ্র মেঘাচ্ছন্ন আকাশ বিদ্যুতের আলো-জিহ্বা লকলক করে। সেই আগুনে রামলক্ষণ পুড়ে ছাই হয়ে যায় আর কী। তাই দেখে আমার চোখের পলক থেমে যায়, বুক ধড়ফড় করে ওঠে। সব মিলে এক অদৃশ্যপূর্ব, অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। তাই তো, আজ এতকাল পরেও তার ছাপ আমার মনের, গতকালের ঘটনার মতোই উজ্জ্বল হয়ে আছে। এতটুকুও ¤øান হয়নি।

১৯৩০-এর দশক

পরিতোষ সেন

সংস্কৃতিচর্চা, খেলাধুলো, সঙ্গীতচিন্তা, নাটক ও সিনেমা- এমন কোনো দিক নেই যা ঢাকা শহরের জীবনচর্চার উৎস নয়। যে যে রকম সঙ্গ পেতে ইচ্ছুক সে সে রকম সঙ্গই পেয়ে যেতো। … সর্বত্রই একটি জমজমাট ভাব, আনন্দধারা, উৎসবের প্রকাশ। দলাদলি, মতবাদের সংঘর্ষ তখন পর্যন্ত ব্যাপকতা লাভ করেনি; সবাই তখন পর্যন্ত যেন একটি সম্মিলিত আয়োজন উদ্যোগে শরিক; সব মিলিয়েই যেন একটি সমগ্রতা যা বহু নদীর ফল্লুধারার মতো সমাজ জীবনে প্রবাহিত।

১৯৩০-৪০

কিরণশঙ্কর সেন গুপ্ত

ঢাকায় উৎসবের মধ্যে দুর্গাপূজা ও সরস্বতী পুজোর দিনগুলো দারুণ আনন্দের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হতো। অভিভাবকদের সঙ্গে ঘোড়ার গাড়িতে সারা শহরের দুর্গা প্রতিমা দেখতে যেতাম। … [আর ছিল] দোলযাত্রা ও ঝুলন পূর্ণিমার উৎসব। শহরে দুদিন দোল খেলা চলতো, প্রথম দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আবির মাখিয়ে দেয়া হতো পরিচিত বন্ধু ও পথচারীদের, পরের দিন রঙ খেলা চলতো দুপুর বারোটা পর্যন্ত। ঝুলনের সময় কোনো কোনো ধনী ব্যবসায়ীর বাড়িতে বাঈজীদের নিয়ে আসা হতো সারারাত গান শোনার জন্য এবং সমাগত ব্যক্তিদের কেউ কেউ মদ্যপানেও উৎসাহী হয়ে উঠতেন।

১৯৩০-৪০

কিরণশঙ্কর সেন গুপ্ত

মহররমের মিছিল সবচেয়ে ভালো লাগতো চকে। মাঝরাতের মিছিল। নানীর সঙ্গে যেতাম চকবাজারের একটা বাড়িতে রাত্তিরে মিছিল দেখবো বলে। নানী বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিতেন আর আমি মিছিলের জন্য অপেক্ষা করে ঝিমুতাম। কখন ঘুমপাড়ানী মাসিপিসি তাদের রূপালী সোনালী পাখা দুলিয়ে সবচেয়ে মিষ্টি এক সুরে গান গইতে গাইতে হাজির হতেন চকের সেই বাড়িটার আঁধার ভরা বারান্দায়, টের পেতাম না। … একটু পরেই চোখের সামনে ঝলমলে মিছিল। আলম বরদার, আশা বরদার, কালো কাপড়ে ঢাকা বিবি কা দোলা- একে একে সবকিছু চোখের সামনে। আর চোখ লুট করতে শুরু করে সিল্কের নিশান, লাঠির ঠোকাঠুকি, তলোয়ারের ঝলসানি, আগুনের চরকি। ফাঁকে ফাঁকে শোনা যায় ভেস্তাদের ‘এক নারা, দোনারা, বোলো বোলো ভেস্তা।’

চোখ জুড়িয়ে যেত লাঠি ঘোরানোর কায়দা দেখে, আগুনের চরকির খেলা দেখে। মনে হতো, যদি আমিও ফুরফুরে বাতাসে দুলে ওঠা ঐ সুন্দর সিল্কের রঙিন নিশান নিয়ে ভেস্তাদের সঙ্গে মিছিলে যোগ দিতে পারতাম। লোভে নতুন পয়সার মতো চকচকিয়ে উঠতো আমার চোখ দুটো। ঐ তো চলছে কাগজের কবর। আর চলেছে দুলদুল ঘোড়া। দেখি, ওর তীর বেঁধা গায়ে একটা চাদর, চাদরে নকল রক্তের ছোপ। আর দেখি সিল্কের রঙিন নিশানের ঝাঁক। ঝিলমিল ঝিলমিল, নীল, লাল, সবুজ, হলদে হরেক রকম। দেখি ভেস্তার দল। পরনে টিয়ের ডানার রঙের মতো সবুজ লুঙ্গি, সবুজ কুর্তা। খালি পা। হাতে রূপালী তারের কাঁকনের মতো কী যেন একটা। দূর থেকে মনে হয়, তারা জ্বলছে ওদের কব্জিতে। আর শুনি ভেস্তার দল বলছে; একনারা, দোনারা, বোলো বোলো ভেস্তা।

১৯৪০-এর দশক

শামসুর রাহমান

আমলিগোলায় রাস্তায় উপর চৈত্রসংক্রান্তির মেলা বসত। অনেক বড় ছিল সেই মেলা। মনে পড়ে চড়ক গাছ, দোলনা ও বিনোদনের অনেক রকম ব্যবস্থা থাকত মেলায়। লুঙ্গি, শাড়ি, গামছাসহ সাংসারিক সব জিনিস, যেমন দা, খুন্তি, চাকু, পেয়ালা-বাসন, তাওয়া, কড়াই, ফুঁকনি, হাতা, বাউলি ইত্যাদি বিক্রি হতো। আবার খই, পাতখিরসা বিক্রি করত কেউ কেউ। পাতখিরসা বিক্রি করা হতো কলাপাতায় করে। বাতাসা, নক্কল, মকরুম, ওখরা, মিছরির হাতি-ঘোড়াও বিক্রি করা হতো। আমার তো মনে হয় এসব জিনিস হাটবাজারে যত না বিক্রি হতো, তার চেয়ে কয়েকগুণ বের্শি বিক্রি হতো ওই মেলায়।

১৯৫০-এর দশক

আনোয়ার হোসেন

আরেকটি বড় মেলা ছিল মহররমের মেলা। ‘আগরবাগিচায়’, মানে আজিমপুর নতুন কবরস্থানে মহররম মাসে ১০ তারিখে এই মেলা হতো। চকবাজার আর হোসেনী দালনেও মেলা হতো। এসব মেলায় সাংসারিক জিনিসপত্র বেচাকেনা হতো, দোলনা আর চরকাও লাগানো হতো। আমরা শখ করে কাঠের বন্ধুক, গুলাই বাঁশ, লোহার পিস্তাল, বারুদের গুলি, ছোট ছোট ঢোলসহ আরো অনেক কিছু কিনতাম। বাচ্চাদের খেলনা, বিশেষ করে মাটির ছোট ছোট হাঁড়ি-পাতিলও বিক্রি হতো দেদার; তখন ওগুলোকে ‘ টোপাটাপি’ বলতাম আমরা।

১৯৫০-এর দশক

আনোয়ার হোসেন

কখনো কখনো শবেবরাতের দুতিন দিন আগে থেকে শুরু হতো হালুয়া-রুটি বানানের কাজ। কুমড়া, সুজি, লাউ, বুটের ডাল, গাজর, পেস্তাবাদাম-অনেক কিছুর হালুয়া বানাতেন মা। এসবের সঙ্গে থাকত বড় বড় তন্দুরের রুটি। একেকটা রুটি হতো ২ কেজি, ৩ কেজি, এমনকি কখনো কখনো ৫ কেজি পর্যন্ত। কেউ কেউ আবার চাল গুঁড়ো করে আটার মতো বানিয়ে ওটা দিয়ে সেঁকা রুটিও বানাত। এ কাজে পোলাও-এর চালও ব্যবহার করত অনেকে।

মনে আছে, আমলীগোলার বাড়ির উঠান, প্রতিটা ঘর, এমনকি কখনো কখনো বাইরের রাস্তাটাও ভালো মতো ধুয়ে ফেলতাম শবেবরাতের সকালে, যাতে কোথাও কোনো ময়লা না থাকে। মহল্লার কেউ কেউ পুরো বাড়ি চুনকাম করে ফেলত, আমরাও করতাম দুতিন বছর পর পর। তারপর রাতে মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালিয়ে পুরো বাড়ি সাজাতাম। প্রদীপে ব্যবহার করতাম সরিষার তেল, তাতে বিশেষ কায়দায় বসিয়ে দিতাম কাপড়ের সলতে। ওটা জ্বালালে খুব আলো হতো। এখন যেমন বাড়িতে বাড়িতে বিদ্যুতের সংযোগ আছে, সে রকম ছিল না ওই সময়ে; যেসব বাড়িতে ছিল তারাও ‘আলোকসজ্জা’ বলতে যা বোঝায় সেটা করতে পারত না। শুধু বাড়িই নয়, মহল্লার মসজিদগুলোও সাজাতাম আমরা- নির্দিষ্ট আকৃতিতে কাটা লাল-সবুজ কাগজ দিয়ে, আর প্রদীপ তো থাকতই। মসজিদে যদি কার্পেট, পাটি বা হোগলা থাকত তাহলে সেগুলো ধুয়েমুছে পরিষ্কার করা হতো। তারপর সেগুলোর উপর বিছান হতো সাদা কাপড়, যাতে একটি পবিত্র পবিত্র ভাব চলে আসে। এই কাপড়ের উপর জায়গায় জায়গায় লাগানো হতো আতর। সুগন্ধে ভরে যেত পুরো মসজিদ।

১৯৫০-এর দশক

আনোয়ার হোসেন

ঈদে মিলাদুন্নবী এলে সারারাত মসজিদে কাটিয়ে দিতাম আমরা। সকালবেলায় ছোট ছোট মিছিল বের করতাম। শবেবরাতের মতোই দীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করতাম মহল্লার মসজিদগুলো। কখনো কখনো ঈদে মিলাদুন্নবী বা শবেবরাতের সময় যেতাম দায়রা শরিফে। ওখানে কুরআনের তাফসির হতো মিলাদ হতো। এসব অনুষ্ঠানকে আমরা বলতাম ‘জলসা’। বড় হুজুর যিনি ছিলেন তিনি বয়ান শেষে বের হওয়ার সময় মুসাহাফা করতেন সবার সঙ্গে। জলসা শেষে খাওয়ানো হতো সাদা পোলাও আর আলু দিয়ে রান্না করা গরুর মাংসের ঝাল তরকারি।

১৯৫০-এর দশক

আনোয়ার হোসেন

কোনো পরিবারের নতুন সন্তান প্রথমবার রোজা রাখলে ওকে দিয়ে মহল্লার মসজিদে ইফতার পাঠানোর রেওয়াজ ছিল। এ ছাড়া মহল্লায় প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকে বড় বোলে মুড়ি, সব রকম ভাজাভুনা, জিলাপি, খেজুর, সাজিয়ে খানপোষ দিয়ে ঢেকে প্রতিদিন পাঠান হতো মসজিদে, ইমাম সাহেব আর মুসল্লিদের জন্য। যারা প্রতিদিন পাঠাতে পারত না তারা অন্তত শুক্রবার পাঠানোর চেষ্টা করত।

১৯৫০-এর দশক

আনোয়ার হোসেন

মুঘল আমল থেকেই কাসিদা গেয়ে সেহেরি খাওয়ার জন্য ডেকে ওঠানোর প্রচলন ছিল ঢাকায়, খাজা আহসানউল্লাহর সময়ে সেটা আরো উৎকর্ষ লাভ করে; আর আমাদের সময়ে তো আমি নিজেই বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে কাসিদা গাইতাম, ঘুম থেকে তুলতাম মহল্লাবাসীদের, তাগিদ দিতাম সেহরি খাওয়ার। রাতে ঘণ্টা চারেক ঘুমিয়ে সুবেহ সাদিকের দুঘণ্টা বাকি থাকতেই উঠে বেরিয়ে পড়তাম কাসিদা গাওয়ার জন্য। কাজটা করতাম রাত দুটো থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত। ১০/১৫ জনের দল থাকত আমাদের, হাতে হ্যাজাক বাতি নিয়ে বের হতাম আমরা।

১৯৫০-এর দশক

আনোয়ার হোসেন

অলৌকিকত্ব থেকে ফিরে আসি লৌকিকতায়। ঈদের চাঁদ দেখামাত্র খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠতাম আমরা ছোটরা। যাদের বয়স আমাদের চেয়েও কম ছিল তারা মজার একটা ছড়া আবৃত্তি করত তখন-

চান সালাম চান সালাম

চান কা আন্দার চিজ হ্যায়

আও বাবু হাত মিলাতে

কাল বাবু ঈদ হ্যায়।

বড়রা একজন আরেকজনকে সালাম জানাতেন, তারপর সমবেত হয়ে মোনাজাত করতেন। আমরা ছোটরা তখন দলবেঁধে যেতাম মুরব্বিদের কাছে, কদমবুসি করার জন্য। দূরে, একটু পর পর বাজাতে থাকত সাইরেন; ওই আওয়াজ শুনে আরো বাড়ত আমাদের আনন্দ। উনিশ শতকের শেষদিকে এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে নবাববাড়ি থেকে তোপধ্বনি করে চাঁদ ওঠার খবর জানিয়ে দেয়া হতো ঢাকাবাসীদের। ‘চানরাতে’ আতশবাজি জ্বালিয়ে আনন্দ করত অল্পবয়সী ছেলেমেয়রা।

ওই রাতে বলতে গেলে মেহেদি-উৎসব চলত পুরো মহল্লায়, বলা যায় পুরো শহরে। চাঁদ বা তারার আকৃতিতে হাতে মেহেদি লাগিয়ে নিতাম আমারও। সেমাই রান্না করার ধুম পড়ে যেত মহল্লার প্রতিটি বাড়িতে। মেশিনে তৈরি করা সেমাই পাওয়া যেত না বাজারে তখন, বাড়িতে বসে হাতেই সেমাই বানাতেন বাড়ির মা-বোনরা। এসব সেমাই ঈদের দিন সকালে গরম পানিতে ধুয়ে ঘন দুধ দিয়ে রান্না করা হতো। তারপর সেগুলো ছোট ছোট পিরিচে ঢেলে দেয়া হতো। প্রতিটা পিরিচের সেমাই-এর উপর কিশমিশ বা পেস্তাবাদাম ছড়িয়ে দেয়া হতো যাতে সৌন্দর্য আর স্বাদ দুটোই বাড়ে।

১৯৫০-এর দশক

আনোয়ার হোসেন

আজিমপুর, চকবাজার, নয়াবাজার, জিঞ্জিরা, রমনা, আসলামপুর, আরমানীটোলা, ধুপখোলা মাঠ, পল্টন ময়দানসহ ঢাকার আরো কয়েকটি জায়গায় মেলা বসত ঈদের দিন; চলত টানা প্রায় ১০ দিন। …

এক সময় ঢাকায় ঈদের সবচেয়ে বড় মেলা বসত চকবাজারে। ওই মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল চরকি বা নাগরদোলা। কখনো কখনো সার্কাসের ছোটখাটো দু-একটা দলও হাজির হয়ে যেত। আবার কোনো কোনো বছর অচেনা জাদুকরদের দেখতাম বিভিন্ন কারসাজি দেখিয়ে দেখিয়ে মুগ্ধ করেছেন দর্শকদের।

১৯৫০-এর দশক

আনোয়ার হোসেন

আমরা ছোটরা সেদিন মাততাম ‘ঈদ আনন্দ মিছিল’ নিয়ে। কেউ বাহাদুর সেজে কাশ্মির দখল করার সংকল্প নিয়ে ‘ইয়া কাশ্মির হামারা হ্যায়’ গাইতে গাইতে অংশ নিত মিছিলে, আবার কেউ লোক হাসানোর জন্য সাজত সং, কেউ পরী, ভূত, পুলিশ বা ডাকাত। তবে যে যা-ই সাজুক না কেন, মূলত রাজতৈক ও সামাজিক সমস্যাগুলোই তুলে ধরা হতো এই ঈদ মিছিলের মাধ্যমে। কমপক্ষে একশটা দলে বিভক্ত হয়ে হাজার হাজার লোক অংশ নিত স্বতঃস্ফ‚র্ত এই মিছিলে। কখনো কখনো এক-দেড় মাইল লম্বা হতো মিছিল। কেউ কেউ আবার চড়ে আসত ঘোড়া, উট বা হাতির পিঠে। কখনো আবার বেশ কয়েকটা হাতি সুন্দর করে সাজিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। এমনকি বর্মি জমিদার বাড়ি বা নেত্রকোনার জমিদার বাড়ি থেকেও হাতি নিয়ে আসা হতো কোনো কোনো বছর। রেসের ঘোড়া সাজিয়ে নিয়ে আসা হতো কখনো, মিছিল চলাকালীন সময়ে ঘোড়াগুলো বাদ্যের তালে তালে ছন্দে এগিয়ে যেত আর বিভিন্ন ভঙ্গিতে নাচ দেখিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করত। কোনো বছর মোমিন মোটর কোম্পানির বাসগুলোকে ময়ূর, নৌকা বা জাহাজের মতো করে সাজিয়ে নিয়ে আসা হতো, মন্থর গতিতে চলতে চলতে দর্শকদের প্রচুর আনন্দ দিত ওরা। বড় বড় ড্রাম নিয়ে বাদকেরা থাকত মিছিলে। প্রদর্শন করা হতো ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন দিক, যেমন কেউ নামাজ পড়ছে, কেউ মোনাজাত করছে ঈদের চাঁদ দেখে, ‘মদখোরের শাস্তি’ লেখা মঞ্চে জুতার মালা পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কাউকে। জনসচেতনতার জন্য আগুন নেভানোর কলাকৌশল দেখাত এককালের দমকল বাহিনী এ. আ. পি। আবার ব্যায়ামবীর ও কুস্তিগিররা যার যার নৈপুণ্য দেখিয়ে পুলক জাগাতেন দর্শকদের মনে।

১৯৫০-এর দশক

আনোয়ার হোসেন

বাড়ির বউ বিশেষ করে প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর পাঁচ মাসের সময় ‘পাঁচফল’ নামের একটি অনুষ্ঠান হতো, আর অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটাকে নতুন কাপড় পরিয়ে ফুলের মালা দিয়ে সাজিয়ে উপযুক্ত জায়গায় বাসানো হতো। তারপর সামনে নিয়ে আসা হতো বড় একটা থালা। সেই থালায় থাকত পাঁচ রকম ফল, পাঁচ রকম মিষ্টি, পাঁচ রকম পিঠা আর পাঁচ রকম ফুল। সেখান থেকে যতটুকু খুশি খেত মেয়েটা। উপহার হিসেবে ওকে নতুন কাপড় দিত আমন্ত্রিত অতিথিরা।

প্রায় একই রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো মেয়েদের গর্ভধারণের সাত মাসের সময় যার নাম ছিল ‘সাতোশা’। তখন ফল, মিষ্টি, পিঠা আর ফুলের সংখ্যা পাঁচের বদলে হতো সাত। সিদ্ধ চালের গুঁড়ো দিয়ে বানানো হতো দুটো পুতুল- একটা ছেলেশিশুর, আরেকটা মেয়েশিশুর। পুতুল দুটোতে কাজল দিয়ে চোখ-কান-চুল আর আলতা দিয়ে ঠোঁট, চুড়ি, জামার ডিজাইন এঁকে দেয়া হতো। স্বামী-স্ত্রীকে কোথাও এক সঙ্গে বসিয়ে একটা থালায় ফল, মিষ্টি, পিঠা সাজিয়ে মাঝখানে পুতুল দুটো বসিয়ে থালাটি নিয়ে আসা হতো সামনে। তারপর বলা হতো চোখ বন্ধ করে যে কোনো একটা পুতুল স্পর্শ করতে। স্বামী-স্ত্রীর হাত যদি একত্রিতভাবে কোনো একটা পুতুলের ওপর পড়ত, তাহলে সবাই ধরে নিত ওই লিঙ্গের বাচ্চা হবে ওই দম্পতির। অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটাকে চুড়ি আর নতুন কাপড় উপহার দিত আমন্ত্রিত অতিথিরা।

গর্ভধারণের নমাসের সময়ও ‘নওয়াসা’ নামের একই রকম একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।

১৯৫০-এর দশক

আনোয়ার হোসেন

ছোটবেলায় দেখতাম পানিতে ‘দাগ’ দেয়া হতো। তখন খুব কম লোকেই পানি ফুটিয়ে খেত; প্রায় প্রতিটি পরিবারেই লোহার শিক দিয়ে রাখা হতো চুলার ভিতরে, ওটা টকটকে লাল হয়ে গেলে একপ্রান্তে মোটা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে নামিয়ে এনে কলসে রাখা পানিতে ডুবিয়ে ‘ছ্যাঁকা’ দেয়া হতো। এ পদ্ধতির নাম ছিল পানিতে দাগ দেয়া। বিশেষ করে হাম-বসন্তের প্রাদুর্ভাব হলে কাজটা করা হতো, কারণ তখন অনেকের ধারণা ছিল ‘দাগ’ দিলে সব জীবাণু মরে যাবে! মজার কথা হচ্ছে, পানিতে ছ্যাঁকা দেয়ার সময় ‘হিসহিস’ জাতীয় আওয়াজ হতো, শুনে খুব মজা লাগত আমার; তাই মাকে বারবার বলতাম, ‘মা’, আবার দাও না।’

ধনী বা গরিব, যে কোনো দম্পতির বাচ্চা হওয়ার পর ষষ্ঠ রাতটাকে বিবেচনা করা হতো ‘কালরাত’ হিসেবে। এ রাতকে ‘হাটুইরা রাত’ও বলা হতো। অনেকেই মনে করত, এ রাতে বড় বিপদ হতে পারে নবজাতকের। তাই বাচ্চার দাদী, নানী, ফুফু, খালারা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসে থাকত সারারাত। দোয়া-দরুদ পড়ত ওরা, কুরআন তেলাওয়াত করত, হামদ-নাত আর নিজেদের লেখা গান গাইত। এই রাতে বাচ্চার বিছানায় বালিশের কাছে বইপত্র, চাল-পয়সা- সোনারূপা রাখা হতো এই বিশ্বাস নিয়ে যে, সন্তান একদিন বিদ্বান ও সম্পদশালী হবে।

১৯৫০-এর দশক

আনোয়ার হোসেন

বিশ শতকের বিশ থেকে চল্লিশ দশকে ওস্তাদের শিষ্যদের বাসায় আসর বসত। তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল সমরেশ রায়ের বাসায় প্রতি মঙ্গল, শনিবার আসর বসত। আর মালিটোলায় এ রকম কয়েকটি আসর বসত। বিশেষ করে সরস্বতী পুজোর সময় জনসন মেডিকেলে আসর বসত, ‘ঢাকার সঙ্গীতপ্রেমিক ছাত্রসমাজ এখানে ভেঙ্গে পড়ত।’ শুভড্ডায় পূর্বোল্লিখিত বনোয়ারী লাল বসুর বাসায় মাঝে মাঝে ওস্তাদদের আসর বসত।

কেশব বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন গত শতকের মধ্য ত্রিশ থেকে মধ্য চল্লিশ পর্যন্ত ঢাকার সাংস্কৃতিক গুরু।

১৯৩৬-৩৭ সালে ঢাকায় গানের জোয়ার এসে গেলে খেয়াল ও ঠুমরির চর্চা চলেছে, নানা গায়ক-বাদকের আনাগোনা বাড়ছে। তখন সূত্রাপুর ছাড়িয়ে কেশব বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠকখানা নতুন গানবাজনা শোনাবার বিশেষ কেন্দ্র। অন্যদিকে ফরাশগঞ্জের রূপবাবু রঘুবাবুর বাড়ির জমিদারি আমলের পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু নানা ঘরে গানের আসর জমে। যোগেশ দাশ তাঁর জলসাঘরে মাঝে মাঝে আসর জমিয়ে তোলেন। উল্টোদিকের বাড়িতে ওস্তাদ হেকিম সাহেবের ছাত্র রাধাগোবিন্দ ঘোষের আসর জমে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অধ্যাপকের বাসায় বসত গানের আসর। উপাচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার জগন্নাথ হলে সঙ্গীত শিক্ষার বন্দোবস্ত করেছিলেন। কার্জন হলে নিয়মিত আসর হতো। এস এম হল ও ঢাকা হলেও আসর হতো। আলাউদ্দিন খাঁ এস এম হলে বাজিয়েছেন। বিজ্ঞানী সত্যেন বসু সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তাঁর বাসায় নিয়মিত বসত আসর। ডা. এস এন রায়ের বাসায়ও মাঝে মাঝে আসর হতো।

১৯২০-৪০

সুকুমার রায়

স্বীকার করছি ঢাকায় প্রাণের ঢাকনি খুলে গেছে। এ আর এক নগর, আর এক দেশ, আর এক ঘর। স্বীকার করছি ঢাকায় গিয়েছিলাম মস্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে। ফিরেছি উত্তর আর শ্রদ্ধাভরা মন নিয়ে।

১৯৫৪

দ্বীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj