তারাবাতি : মাসুদ আহমেদ

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

সারা দিন মাটির ভেতর থেকে একটা গনগনে তাপ বের হচ্ছিল। জ্যৈষ্ঠের দ্বিতীয় সপ্তাহের একটা বিকেল ফুরিয়ে আসছে। বাতাস ঠাণ্ডা না হলেও ছায়া ছায়া ভাব গাঢ় হতে হতে সন্ধ্যা নামছে। গোলাপি আভা পশ্চিম দিগন্তে। অফিস ছুটির পর বাসায় ফিরছি। এমন সময় ফারিহার নাম্বার ভেসে উঠলো মুঠোফোনের নীল স্ক্রিনে।

-‘চাচু আজ সন্ধ্যায় কি করছো?’

-মাগরিব নামাজ পড়ে কয়েকটা বাসায় যাব শবেবরাতের হালুয়া দিতে।

-তারপর?

-তারপর বাসায় ফিরে মসজিদে যাব। অন্যান্য বারের মতো। কেন আম্মু তোমার কোনো কাজ আছে?

-চাচু, চল না আজ একটা কাজ করি আমরা সবাই মিলে।

ফারিহা আমার ছোট ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে। মেডিকেল কালেজের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী।

বললাম,

-কি কাজ বল তো? কিন্তু আজ রাতে শবেবরাতের নামাজের বিষয়টা যে রয়েছে——–

-না চাচু, তোমার নামাজের কোনো অসুবিধা হবে না। বলছিলাম যে, চল না আজ রাতে দাদুর বাসায় যাই।

অনেক বছর আগে আব্বা একটা বাসা বানিয়েছিলেন, ওখানে আমরা কেউ থাকি না। ভাড়া দেয়া। আমি বললাম,

-তো এমন রাতে হঠাৎ ও বাসায় কেন? কার কাছে যাবে? ওখানের সবাইও তো আজ নামাজ আর হালুয়া রুটি বিলানো নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন।

-চাচু আমি, সৌম আর আম্মু ঠিক করেছি আজ ঐ বাসার চার তলার ছাদে বোমা ফোটাবো আর আতশবাজি করবো। থাকুক না ভাড়াটে। বাসা তো আমাদেরই। উনারা কি আর না করবেন?

ওর কাথাটায় স্মৃতি জাগানিয়া একটা শিহরণ গাড়ির মধ্যে আমার শরীর ও মনকে ছুঁয়ে গেল। মনে পড়ল ফারিহার জন্ম হয়েছিল এই বাসায়। বছর দশেক ওখানের একটা ফ্লোরেই ও বড় হয়েছে। আমিও তখন ওখানেই আর একটা ফ্লোরে ছিলাম। বাসাটার ছাদ চারজন ভাড়াটেই ব্যবহার করেন তবে চার তলার যিনি তার ফ্যামিলি বেশি করে থাকেন। কাপড় শুকোতে দেয়া, টবে কিছু গাছ লাগানো, ছোট বাচ্চা যারা আছে তাদের কিছুটা খেলাধুলায় ওটা ব্যবহার হয় বেশি। ভদ্রলোক সজ্জন। একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার। পানির বিল, ভাড়া, গ্যাস বা অন্য ছোটখাটো বিষয়ে কোনো প্রোবলেম হলে বছরে দু’তিনবার উনার সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়। আমি উনাকে গাড়িতে বসা অবস্থায়ই ফোনে বললাম আজ সন্ধ্যায় ফারিহা ও তার ভাই ছাদটা একটু ব্যবহার করবে। উনি মুহ‚র্তে রাজি হয়ে বললেন যেন তারা সে সময় উনার ফ্লোরেও যায়। আমি বা আমার স্ত্রী যে যাব তা আর উনাকে বললাম না। আজ নানা নফল নামাজের রাত। মানুষকে ডিসটার্ব করা ঠিক নয়। ফারিহাকে ব্যবস্থাটার কথা জানাতেই বলল, তাহলে জিনিসগুলো তুমি কিনে আনবে তো? আমি বুঝতে পারলাম ও কি বুঝিয়েছে। ওর বাবা ঢাকার বাইরে। জিনিসগুলো তো আমাকেই কিনতে হবে। রাস্তার একটা দোকান থেকে ওগুলো কিনলাম। তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরলাম।

সন্ধ্যা হবার ঘণ্টাখানেক পর আমরা আব্বার বাসায় চারতলার ছাদে এসে উঠলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে দেখতে পেলাম এমনি রাতের সেই চিরচেনা পরিবেশ। ফ্ল্যাটের দরজাগুলো খোলা। ট্রে হাতে অন্যান্য বাসার কাজের মেয়ে এবং ছোট ছেলেরা বাসায় বাসায় আসা-যাওয়া করছে। ভেতরে শোনা যাচ্ছে কুরআন তেলাওয়াতের মিষ্টি শব্দ। সিঁড়ির মুখে শুধু ইলেকট্রিক বাল্ব নয়, অন্য রকম আলো জ্বলছে। তা হচ্ছে মোমবাতি। শবেবরাতের পরিবেশ এমনই হয়ে থাকে। রাস্তায় টুপি মাথায়, পায়জামা-পাঞ্জাবি পরনে মানুষদের ভিড়।

শাবানের চাঁদের আজ দু’দিন। তাই ছাদে বিদিশার অন্ধকার। তবে সারা দিন আকাশে টনটনে পরিষ্কার থাকায় ওপরে সীমাহীন নীল আকাশে অনন্ত নক্ষত্র আর তারাদের মেলা দেখা যাচ্ছে। ধ্রæবতারা, নীল গ্রহ নেপচুন, টাইটান, ক্যারন, টেথিস, ফোবে পেগাসাস, সুপারনোভা, ফিনিকস আর ক্যাস্টর। সাতটি তারার ঐ তিমির আর লেডি ইন দ্যা চেয়ার যথারীতি গোনা গেল। জ্বলজ্বল করছে ওগুলো। সুপার কনসটিলেশন আর মিল্কি ওয়ের অপার রহস্য নিয়ে ভাবতে আমার বরাবরই ভালো লাগে। আজ গান গাইবার দিন নয়। তবুও ওপরের নক্ষত্রের আলো আর ছাদের অন্ধকার দেখে মনে হলো গেয়ে উঠি

‘আজি তারায় তারায় জলুক বাতি

আমার আঁধার সরিয়ে দাও।

অন্ধকারের দুয়ার খুলে আলোয় আমায় ভরিয়ে দাও’।

আমার এই মহাকাশ দর্শন বেশিক্ষণ সহ্য করবার জন্য এরা এখানে আসেনি। ফারিহা বলল,

-চাচু তোমার জিনিসগুলো কোথায়? পলিথিনের প্যাকেটটা ছাদের ওপর পানির ট্যাংকের নিচে পাইপের ফাঁকে রেখেছিলাম। বের করে দিলাম ওটা। একটা ম্যাচ বের করে ফারিহা আর সৌম মোমবাতিগুলো জ্বালানো শুরু করল। সাদা, সোনালি, নীল, লাল আর বেগুনি রঙের। ছাদের দু’দিকের প্রান্তে ফোঁটা ফোঁটা গরম মোম ফেলে সেগুলোকে সেট করে বসালো। রেলিংয়ের নিচে। তাই বাতাস লাগছে না ওগুলোর ভীরু শিখাতে। এরপর বের করলাম বোমা। এগুলো পুলিশ নিষিদ্ধ করে রাখে এই রাতের জন্য। কিন্তু তারপরও দোকানিরা তা রাখবে এবং বাচ্চারা তা ফোটাবেই। ওদের মা এবং চাচিও এতে অংশগ্রহণ করলো। দেখতে পেলাম পাশের ফ্ল্যাটগুলোর বারান্দা এবং ছাদে একই কাজ চলছে। এরপর বের করতে হলো অনুষ্ঠানের আসল আকর্ষণ। পাতলা নীল রং লোহার শলার মাথায় নিশাদল, ফসফরাস আর একটু বারুদ দিয়ে তৈরি এই দ্রব্যটি এমনি রাতে সব বয়সের মানুষের মন এবং দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে। আমাদের সবার হাতে এগুলোর একটি করে নিলাম। একজন আর একজনের টায় আগুন ধরিয়ে দিতে দিতে দু’তিন সেকেন্ড পর ফস্ ফস্ করে ওগুলো জ্বলে উঠলো। বিজ্ঞানের তত্ত্ব এবং গদ্য লাল, নীল, সবুজ, বেগুনি, কমলা, হলুদ এবং সাদার সপ্তবর্ণার আলো ও রঙে অর্ধবৃত্তাকারে ফুল হয়ে ফুটে উঠতে থাকলো।

ভালো করে শলার অর্ধেক জ্বলে গেলে আমরা আকাশে যতদূর পারা যায় ততদূর উঁচুতে ওগুলো ছুড়ে দিতে থাকলাম। বৃত্তাকারে আলো জ্বলছে। সেই সঙ্গে ফস্ফস্ আর ফরফর শব্দ। উজ্জ্বল রং আর আলোর ছটার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টাতে একটা ছন্দ, লয় এবং তালও আছে। অন্ধকার আকাশের বুক চিরে ওগুলো ওপরে উঠছে তারপর আবার ছাদে এসে পড়ে নিভে যাচ্ছে শেষ কয়েকটা আলোর বুদ্বুদ ফুটিয়ে। এভাবে এক সময় চল্লিশটা পোড়া শলা ছাদের এক কোণে জমা হলো। ‘এলিয়েনস’ জাতীয় টিভি সিরিয়ালগুলোতে মানুষের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মারা যাবার পর লোহার তৈরি মাথা আর হাত ভাঁজ করে এলিয়েনরা যেভাবে ধুলোয় পড়ে থাকে এই তারাবাতিগুলোর ধ্বংসাবশেষগুলো দেখে আমার কাছে সে রকম মনে হলো। মানুষ, প্রাণী, গাছ, লোহ, মৃত্যু বা অতীতের গহŸরে সবই তো এক সময় একাকার হয়ে যায়। সবই শেষে ভগ্নাবশেষ বা মরটাল রিমেইন্স। এই বাসায় আমি হয়েছি, তা শুনেছি। মনে নেই। ফারিহা আর ওর ভাই হয়েছে। আমাদের কাছে শুনেছে কিন্তু ওদেরও তা মনে নেই। এ যেন রেলের কামরায় বসে অনেক দূরের গ্রামের দৃশ্যপটের দ্রুতবেগে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া দেখা। এক প্রজন্মের আমি। আর এক প্রজন্মের ফারিহা ও সৌম আজ রাতে এই ছাদে কেন এসেছিলাম তা জানি। ওদের মুখে-চোখে আতশবাজি আর হাওয়াইয়ের আলোয় সেই অতীতকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টার আনন্দটুকু যে একেবারে দেখতে পেলাম না তা নয়। আমার মনেও আম্মার কাছে শোনা বোরাকের গল্প বলার শব্দ, চালের রুটি, বুটের ডাল, সুজির হালুয়া ও নেশেস্তার মিষ্টি এবং ঘির গন্ধের স্মৃতি এই মুহ‚র্তে ভেসে বেড়াতে থাকলো। আতশবাজির চাহিদা ফারিহার যা ছিল আমার বা ওদের মা চাচিরও তাই ছিল। এনেছিলামও প্রচুর। ছোটকালে এর অর্ধেক জিনিস পেলে বর্তে যেতাম। সেগুলোর ফোটানো মনমতো আনন্দের এবং জ্বালানোর গন্ধ এবং আলো যথেষ্ট হলো। চারদিকে তেমনি শিশুকাল থেকে দেখে আসা পবিত্র রজনীর আভাষ। সেই গন্ধ, শব্দ এবং আলো। তারপরও সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাসার দিকে ফিরতে ফিরতে আমার মনে হলো, আজ যেন ‘মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছিলাম। বাজালামও প্রাণ ভরে। কিন্তু বাঁশি আগের মতো আর বাজলো না। মনও তেমন করে সাজলো না। হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj