অদল বদল : ফরিদুর রেজা সাগর

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

এই নিয়ে ছয়বার স্কুল বদল করল অপু। কিন্তু কখনই আজকের মতো বুক ধুকপুক করেনি। বাবার বদলির চাকরি। সেই সুবাদে প্রায় প্রতি বছরই স্কুল বদল করতে হয় ওকে। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ছয় বছরে ছয়বার স্কুল বদল করতে হয়েছে।

কিন্তু আজকের মতো কখনো অপুর এই রকম বুক ধুকপুক করেনি। এগারোটার সময় স্কুল শুরু। সকাল আটটায় মা নাশতার টেবিলে মনে করিয়ে দিয়েছেন,

‘বইপত্র সব ঠিকমতো নিচ্ছিস তো?’

অপু জানে। মায়ের এটা কথার কথা। কিছু একটা বলতে হবে, তাই সকালবেলা বইয়ের কথা মনে করিয়ে দিলেন। নতুন স্কুল। নতুন ক্লাস। সুতরাং বইয়ের খুব একটা গুরুত্ব নেই।

অপু জানে মায়ের সঙ্গে যখন আবার নয়টার সময় দেখা হবে তখন মা বলবেন,

‘হোমওয়ার্ক করেছ তো?’

‘মা তুমি ভুলে যাচ্ছো যে, আমি একদম নতুন একটা স্কুলে যাচ্ছি। হোমওয়ার্ক পাব কোথায়? দেবেই বা কে?’

‘নিজের থেকে কিছু করে নিয়ে টিচারকে দেখাও। টিচার খুশি হবেন।’

মায়েদের এই ধরনের কথার জবাব দেওয়ার দরকার মনে করে না অপু। বাবার বদলির চাকরির কারণে অনেকগুলো সুবিধা যেমন পায় অপু আবার অসুবিধাও হয়।

নতুন জায়গা মানে নতুন বন্ধু। নতুন পরিবেশ। নতুন বাড়ি। এবারের বাড়িটা অবশ্য অপুর বেশি পছন্দ হয়েছে। এই বাড়িতে অপুর নিজের একটা আলাদা কামরা হয়েছে। গত বছর জন্মদিনে অপুর মামা অপুকে একটা ল্যাপটপ উপহার দিয়েছিলেন। মা আবার ল্যাপটপ রাখার জন্য ছোট্ট একটা টেবিল কিনে দেন। কিন্তু সেই টেবিলটা রাখার জায়গা ছিল না। নতুন বাড়িতে এসে অপুর ঘরে টেবিলটা বসেছে। টেবিলের ওপর ল্যাপটপ।

‘ল্যাপটপ তোমার নিজের?’

‘হ্যাঁ। আমার মামা দিয়েছে।’

‘আমি হলে মামাকে বলতাম রুপালি রংয়ের ল্যাপটপ দিতে।’

‘কেউ কোনো জিনিস দিলে তাকে কি নিজের পছন্দের কথা বলা যায়।’

‘তাই বলে কেউ এরকম কটকটে সবুজ রঙের ল্যাপটপ কাউকে দেয়।’

এই ধরনের অভিজ্ঞতা অপুর অনেক রয়েছে। নতুন পাড়ায় গেলে আশপাশের বাড়ি থেকে কেউ না কেউ এসে বন্ধু হতে চায়। কখনো কেউ বন্ধু হয়। কেউ হয় না।

যে ছেলেটা ল্যাপটপ নিয়ে এতো কথা বলেছে তার নাম কাজল। অপু যে স্কুলে পড়ে সে স্কুলে অপুর সাথেই পড়ে। তবে কাজল বলেছে এক ক্লাসে ওরা পড়লেও কাল যখন অপু স্কুলে যাবে তখন অপুর সেকশন হয়তো বদলাতে হবে। আগেও যে স্কুলে অপু পড়তো সে স্কুলে ক্লাস সিক্সে তিনটা সেকশন ছিল। নতুন এই স্কুলে দুইটা সেকশন। তবে কাজলের সেকশনে যদি অপু ভর্তি হতে না পারে তাতে অপুর কোনো দুঃখ নেই। কারণ ল্যাপটপটা নিয়ে কাজল যে রকম মন্তব্য করছে তা অপুর মোটেও ভালো লাগছে না। যদিও এতোক্ষণ পর কাজল বলল,

‘আমাদের ক্লাসে অবশ্য কারোরই নিজের ল্যাপটপ নেই। সুতরাং তোমার ল্যাপটপের রং যাই হোক না কেন তুমি একটা ল্যাপটপের মালিক এটাই বড় ব্যাপার।’

এই কথাটা বলার পর কাজলকে যতটা অপছন্দ হয়েছিল ততোটুকু হলো না অপুর। জিজ্ঞেস করল,

‘তোমাদের স্কুলে কি পড়াশোনার খুব কড়াকড়ি?’

‘আগে ছিল।’

‘মানে?’

‘আগে পড়াশোনার প্রচণ্ড কড়াকড়ি ছিল।’

‘কয়েক বছর আগে তোমাদের স্কুল থেকে একজন বুঝি এসএসসিতে ফার্স্ট হয়েছিল।’

‘সেটা হয়েছিল। তবে ফার্স্ট হওয়া মানে কিন্তু পড়াশোনা, স্কুল ভালো এটা নয়।’

কাজলের কথা শুনে অপুর চট করে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। তখন ওর বাবার পোস্টিং ছিল বগুড়াতে। সাধারণত এরকম জেলা শহরে ভর্তি হলে জেলা স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় অপু। কিন্তু বগুড়ায় ঘটল এর ব্যতিক্রম। বাবার এক বন্ধু জেলা স্কুলের বাইরে অন্য একটা স্কুলের হেডমাস্টার। তাই অপুকে সেই স্কুলে ভর্তি হতে হলো।

স্কুলটা জেলা স্কুলের মতো অত পুরনো না হলেও গত কয়েক বছরে এসএসসির রেজাল্ট ভালো হওয়ায় খুবই নাম করেছে।

বাবার বন্ধু। তারপর এসএসসির রেজাল্ট খুব ভালো। সুতরাং অপুর বাবার কোনো আপত্তিই থাকলো না এই স্কুলে ভর্তির ব্যাপারে।

ভর্তির পর ক্লাসে গিয়ে অপু খুশি। দুই একজন শিক্ষককে তো ওর দারুণ পছন্দ হয়ে গেল। বাংলা যিনি পড়ান তার ক্লাসে তো অপু মুগ্ধ। পৌরনীতি বিষয়টা ওর একেবারেই পছন্দ ছিল না। কিন্তু বিষয়টা যে কত সহজ সেটা পৌরনীতির আব্দুর রহমান স্যারের ক্লাস না করলে বোঝা যেত না।

সবকিছু ঠিকমতো চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করে জটিলতা বাধলো বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটা চিঠি নিয়ে। এর আগের স্কুলে থেকে টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতার অডিশন নেওয়ার একটা দল অপুদের স্কুলে এসেছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায় স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের বিতর্কেও যে অনুষ্ঠান হয় সেই অনুষ্ঠানটি সারা দেশের স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিশাল জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। সেই হিসাবে খুব প্রিয়।

অপু একবার বিতর্কের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য ঢাকায় গিয়েছিল। কিন্তু এবারের ব্যাপারটা পুরো উল্টো।

ঢাকার টেলিভিশন থেকে বিতর্ক অনুষ্ঠানের কর্মকর্তারা এসেছেন অডিশন নিতে। সেই অডিশনের ফলাফল অপু তখন পায়নি। কিন্তু এতোদিন পর অপু টেলিভিশনের প্যাডে একটা চিঠি পেয়েছে। অনুষ্ঠানের প্রযোজক বেলাল বেগ লিখেছেন,

বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিতর্ক অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ কর্মশালার জন্য সারা দেশের স্কুল থেকে বেশ কয়েকজনকে নির্বাচিত হয়েছে। এদের মধ্যে অপু একজন।

বিটিভি থেকে একজন প্রশিক্ষকও আসবেন। সারা দেশ থেকে বিভিন্ন স্কুলের ছেলেমেয়েদের প্রায় তিন সপ্তাহ ঢাকায় গিয়ে থাকতে হবে।

টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের জন্য তিন সপ্তাহ ঢাকায় থাকা ব্যাপারটা যেমন আনন্দের তেমনি ঝামেলারও। মা হলো একটা ঝামেলা। ঢাকায় গিয়ে তিনদিন থাকা, কি হবে না হবে, সাথে কে যাবে- এরকম অসংখ্য প্রশ্ন। তারপরও মাকে সামাল দেয়া হলো। বাবা কিছুটা রাজি।

পড়াশোনাও কিছুটা গুছিয়ে ফেলেছে অপু। বাবা তার বন্ধু স্কুলের হেডমাস্টার হেলাল খানকে জানিয়ে দিয়েছে। প্রায় চার সপ্তাহ ক্লাস করতে পারবে না অপু। স্কুলের হেডমাস্টার খুব আনন্দিত। অপু মানসিকভাবে তৈরি ঢাকা যাবার জন্যে। কিন্তু সে সময় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো একটা ঘটনা ঘটল। অপুর এই ঢাকা যাওয়া নিয়ে বাঁধ সেধে বসলেন অপুরই সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক বাংলার আব্দুর রহমান।

তিনি বলে বসলেন,

অপু যদি তিন সপ্তাহ ক্লাস না করে তবে তিনি তাকে বাংলা পরীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে কোনো সাহায্যই করতে পারবেন না।

অপুর বাবা ব্যাপারটা জানার পরে বন্ধু হেলাল খানের কাছে জানতে চাইলেন, ‘সাহায্য করতে না পারার মানে কী?’

‘মানে একটাই। বাংলা পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেবেন না আব্দুর রহমান স্যার।’

‘স্যার আপনি বুঝতে পারছেন বাংলাদেশের মাত্র কয়েকটা স্কুল থেকে আমরা কয়েকজন মাত্র ঢাকায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের এই কর্মশালায় সুযোগ পেয়েছে।’

‘টেলিভিশন তো স্কুল নয়। আর স্কুল বাদ দিয়ে কেউ টেলিভিশন করে এমন কথা শুনিনি।’

রহমান স্যারের কথা শুনে অপু বলে,

‘স্যার বিশ্বাস করুন, এই তিন সপ্তাহের পড়াশুনা পুরোটা আমি ঠিক কাভার করে নেব।‘

‘স্কুলে নিয়মিত আসতে হয়। সেটাই নিয়ম। কেউ অন্যকিছু করে পড়াশোনা করবে এটা হয় না।’

‘স্যার বিশ্বাস করুন…’

‘আমি তো বলেই দিয়েছি, আমি ছুটি দেব না।’

‘হেডস্যার যদি ছুটি দেয় তাহলে?’

‘সেটা তার দায়িত্ব।’

‘স্যার আপনি তো জানেন, আপনি ‘হ্যাঁ’ না বললে হেডসার ‘হ্যাঁ’ বলবেন না।’

‘তুমি কি আমাকে হ্যাঁ বলার জন্য চাপ দিচ্ছো?’

‘স্যার আমি আপনার ছাত্র। আমি কি আপনাকে চাপ দিতে পারি?’

‘তাহলে কথা না বাড়িয়ে ঠিকমতো ক্লাস করো। ভুলে যাও টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের কথা।’

আব্দুর রহমান স্যারের আপত্তির কারণে অপুর সেবার টেলিভিশনের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়নি। যদিও ঘটনাটার কিছুদিন পরে রহমান স্যার চাকরি ছেড়ে অন্য স্কুলে চলে গিয়েছেন। তার এই চলে যাওয়ার কারণে অপু আর তাকে জানাতে পারেনি, বাংলায় খুব ভালো ফলাফল সে করতে পারেনি। অর্থাৎ টেলিভিশনের কর্মশালায় গেলেও অপুর ফলাফল এর চেয়ে খুব খারাপ হতো না।

অপু ভেবেছিল, ব্যাপারটা কোনোদিনই রহমান স্যারকে জানানো হবে না। কিন্তু মানুষ ভাবে এক রকম আর হয় আরেক রকম।

‘কালকেই তোমার ল্যাপটপটা স্কুলে নিয়ে যাবে?’

‘না, না। ল্যাপটপ নিয়ে স্কুলে যাব কেন?’

কাজল কেন যে প্রশ্নটা করে বোঝা গেল না।

তারপরও অপু বলল,

‘ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ার কথা কেন বলছো তুমি?’

‘আমাদের একজন শিক্ষক রয়েছেন যিনি পড়াশোনার বাইরেও অনেক উৎসাহ দেন।’

‘সেটা কি রকম?’

‘মাঠের খেলাধুলা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, দেয়াল পত্রিকা- তাছাড়া আমাদের শহরে একটা এফএম রেডিও রয়েছে। সেখানেও অনুষ্ঠান করার ব্যাপারে আমাদের উৎসাহ দেন।’

‘এরকম শিক্ষক তো ভাগ্যের ব্যাপার।’

‘মাত্র কয়েকদিন আগে আমাদের স্কুলে যোগ দিয়েছেন। কাল আলাপ হলে বুঝতে পারবে- কী অসাধারণ শিক্ষক তিনি।’

কাজলের কথা শুনে কাজলের আব্দুর রহমান স্যারের কথা মনে পড়লো। দারুণ পড়াতেন তিনি। অথচ অপু টেলিভিশন অনুষ্ঠানের কর্মশালায় যাবে শুনে এমন ব্যবহার করলেন যাতে মনে হলো, টেলিভিশন তার খুবই অপ্রিয়। আর কাজলদের কী সৌভাগ্য ওরা এমন একজন শিক্ষক পেয়েছে যিনি শুধু পড়াশোনা করান না, একই সাথে ভাবেন, ছাত্রদের নানা রকম প্রতিভা সম্পর্কে।

কাজলকে ওদের সৌভাগ্যের কথা বলতেই কাজল বলল,

‘কাল আমাদের প্রথম ক্লাস নেবেন তোমার এই না দেখা পছন্দের স্যার।’

‘তাতে আমার কি লাভ?’

‘কেন?’

‘ক্লাস নেবে তোমার। আমি তো অন্য সেকশনে।’

‘আরে না। আমি তো ভুল বলেছিলাম। আমার মানে তোমার সেকশনেই ক্লাস নেবেন।’

‘একটু সকাল সকাল স্কুল গিয়ে ভর্তিও কাজগুলো সেরে ফেলো। না হলে ফার্স্ট পিরিয়ড মিস করবে।’

আগে স্কুলে ভর্তির সময় বাবা সাথে যেতেন। কিন্তু ছয়বার ভর্তির কারণে এখন আর বাবা সাথে যান না। আমি নিজেই এক্সপার্ট হয়ে গেছি। সুতরাং সকাল সকাল স্কুলে গিয়ে আগের স্কুলের কাগজ দেখিয়ে ভর্তির কাজ সেরে ফেলল অপু। কাজলের কথামতো সত্যি সত্যি আমি ভর্তি হলাম ‘বি’ সেকশনে।

ক্লাসরুমটা স্কুলের অফিস ঘর থেকে একটু দূরে। দারোয়ানই সেটা দেখিয়ে দিলো। এগারোটায় ক্লাস শুরু। খুব একটা সময় নেই। ক্লাসের দিকে এগোয় অপু।

কিন্তু অপুর আগে আগে ক্লাসের দিকে যে দুইজন যাচ্ছে দুজনই অপুর চেনা। একজনকে সে দেখেছে টেলিভিশনে। আবৃত্তি করেন অভিনেতা জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। আরেকজন অনেক পরিচিত। এটুটু ভাবতেই অপুর কাঁধে কাজলের হাত। বলল,

‘কি, কেমন স্কুল আমাদের? আর ঐ যে তোমার ক্লাস টিচার- আমার প্রিয় শিক্ষককে দেখেছ? সাথে কে দেখেছ?’

‘জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়।’

‘বলেছিলাম না, স্যারের ক্লাস নেওয়ার স্টাইলটা আলাদা। আজ হয়তো আবৃত্তির ক্লাস। সে জন্যে সাথে করে এনেছেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়কে। কবিতা পড়ার সাথে সাথে আবৃত্তিও সরাসরি দেখানো হবে। একবারে টেলিভিশনের মতো।’

কাজলের মুখে অপু টেলিভিশন শব্দটা শুনে চমকে ওঠে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারল না জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের সাথে অপুর নতুন ক্লাসে যে স্যার প্রবেশ করছেন তিনি অপুর পূর্ব পরিচিত। যিনি কয়েক বছর আগে অপুকে স্কুল ছেড়ে টেলিভিশনের কর্মশালায় যেতে দেননি। হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj