সোহেলার ভালোবাসা : দীপিকা ঘোষ

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

আজ সকাল থেকে স্তরে স্তরে নানা রঙের মেঘ জমে অবশেষে বিকেল থেকে শুরু হয়েছিল বৃষ্টিটা। সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে শেষ হেমন্তের উদ্দাম বাতাস এলোমেলোভাবে থেকে থেকে ছড়িয়ে পড়ছিল বর্ষাকালের জোয়ার তোলা দুর্দান্ত নদীর মতো। দুরন্ত আবেগে বারবার চারপাশের বাড়িঘর, গাছপালা, বনজঙ্গল, মাটি, মানুষ, সবই সে ছুঁয়ে যাচ্ছিল হুটোপুটি করে। সেই সঙ্গেই ছুঁয়ে যাচ্ছিল বাইরের বারান্দায় নিঃশব্দে বসে থাকা সোহেলার খসে পড়া শাড়ির আঁচল। বিস্রস্তভাবে ছড়িয়ে থাকা এলো চুল। আর তার দিকভ্রান্ত জীবনটাকেও। বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া শাড়ি পরার অভ্যাস নেই তার। আজ সে শোকের তরঙ্গে ভেসেও শাড়ি পরতে ভোলেনি। কারণ আজ তার বিবাহবার্ষিকী। এই দিনে ভালোবেসে দুই বছর আগে তাপস আর সে বিয়ে করেছিল। এই বিয়ে অবশ্য সমাজের বিধিবিধান মানা হিতাকাক্সক্ষীদের আশীর্বাদপুষ্টির দ্বারা সমৃদ্ধ হতে পারেনি। কারণ সোহেলার জীবনে সহসা ভালোবাসার মাতাল বাতাস লেগে, তাকে পরিচিত জীবন থেকে দিকভ্রান্ত করেছিল।

এই দিকভ্রান্তি তার নিয়তির কারণে। চলন্ত পথের মাঝখানে সেই-ই হঠাৎ জীবনের নিশানা বদলে দিয়েছে বলে তার বিশ্বাস। নিজের বাড়ির চিল্তে বারান্দায় নির্জন মুহূর্তের নিঃসঙ্গ ভাবনায়, কদিন আগের সদ্য পেরুনো শোকার্ত অতীত নিয়ে সন্ধ্যেবেলা আপাদমস্তক বসে বসে ভাবছিল সে। সেই ভাবনা অকথিত আলোড়নে উত্তাল করে দিচ্ছিল তার দেহ মন। কারণ অশ্রæর বেদনার চেয়েও আরো কোনো গাঢ়তর বেদনার ধার, তার হৃৎপিণ্ডের শরীর থেকে রক্ত ঝরাচ্ছিল তখন। সোহেলা বসে বসে কাঁদছিল তাই। সূর্যহীন শেষ হেমন্তে সন্ধ্যারাতের ছায়া চারপাশ ঘিরে খুব তাড়াতাড়িই ঘন হয়ে উঠছিল আজ। সন্ধ্যা না নামতেই ঘনিয়ে উঠছিল রাত। নানা কথা ভাবতে ভাবতে সহসা ঘরের ভেতর থেকে এক ব্যাকুল কণ্ঠের আহ্বান কানে আসতেই সচকিত হয়ে উঠে বসলো সে। স্পষ্ট শুনতে পেল- একা একা বাইরে বসে এমন বাদল সন্ধ্যায় কী করছো সোহেলা? ঘরে এসো! ঘরে এসো তাড়াতাড়ি!

সেই আহ্বানে দ্রুত পায়ে ঘরে এলো সোহেলা। তাপস ডাকছিল ভেতর থেকে। সন্ধ্যার অন্ধকারে একা কখনো বারান্দার দোলনায় তাকে বসে থাকতে দেখলেই বারবার সে আহ্বান জানায় তাকে। কেননা জীবনে নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণায় বহুকাল কুঁকড়ে থাকায়, একাকীত্বের অসহনীয়তাকে বড় ভয় করে তাপস। বিয়ের পরে সোহেলার সাহচর্য, ভালোবাসার নিবিড় ছোঁয়া ব্যাকুলভাবে সর্বদাই তাই খুঁজে বেড়ায় সে। অবশ্য এমন ব্যাকুলতার আরো এক বাস্তব কারণও রয়ে গেছে তাপসের। নিজের রোগাক্রান্ত দেহের ভাবনা বড় অসহায় করে তোলে তাকে। স্ত্রীর উপস্থিতি তাকে শক্তি জোগায়। সান্ত¡নার প্রলেপ লাগায় মনে। ঘরে এসে অশ্রæসিক্ত ফিসফিসে গলায় সোহেলা কোমলভাবে জিজ্ঞেস করলো -এত অন্ধকার হয়ে গেছে, ঘরে এখনো আলো জ্বালোনি কেন তাপস? আমি যে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারি না সোহেলা! কী করে আলো জ্বালি বলো তো? তাপসের পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠস্বর ক্ষীণ থেকে বড় বেশি ক্ষীণতর শোনায় তার কানে।

সোহেলা চমকে ওঠে দ্রুত হাতে অন্ধকারে সুইচ টিপটেই আলোকিত ঘরে কদিন আগের কঠিন বাস্তব ঝাঁপিয়ে পড়লো তার চোখের সামনে। যার আহ্বান শুনে দ্রুত পায়ে অন্যমনে সে ঘরে এসেছিল, তার উপস্থিতি সেখানে ছিল না। তাপস নেই। তার অস্তিত্ব তবুও বারবার বাস্তবতা পেতে চায় সোহেলার উদভ্রান্ত চিত্তচাঞ্চল্যে। তার কামনার কণায় কণায়। সবকিছু জেনেবুঝেও শূন্য বিছানায় নজর ফেলে বাইরের বৃষ্টিভেজা হেমন্তের বাতাসের মতো সহসা সে কেঁদে উঠলো হুহু করে। রোগক্লান্ত দেহ নিয়ে বিছানার যে প্রান্তে রোজ শুয়ে থাকতো মানুষটা, সেখানে আলতো হাতে কয়েকবার নরম পরশ বুলিয়ে অশ্রæবিকৃত ভাঙা গলায় আবারো সে কথা বললো- এমন অসময়ে আমায় ছেড়ে, পৃথিবীর সবকিছু ছেড়ে কেন তুমি চলে গেলে তাপস? কেন গেলে বলো? আমায় যে বলেছিলে, আমার অন্যরকম ভালোবাসা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়েছে তোমাকে, সে কথা কি মিথ্যে ছিল?

জনমানবহীন শূন্য ঘরে তার সেই কান্নাজড়িত কথাগুলো প্রেতের নিঃশ্বাসের মতো যন্ত্রণার দীর্ঘশ্বাসে ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। দৃষ্টির পলক ছুঁয়ে তারপরও আরো একবার খুঁজে বেড়ালো তাকে, যার পার্থিব অস্তিত্ব কদিন আগেই বিলীন হয়েছে মৃত্যুর স্পর্শ পেয়ে। তাপসের বিদায়পর্ব অনাকাক্সিক্ষত হলেও অপ্রত্যাশিত ছিল না কারও কাছেই। মৃত্যুদূত বছরখানিক আগে থেকেই তার জীবনদুয়ার রুদ্ধ করে সমন হাতে দাঁড়িয়েছিল বিশ্বস্ত প্রহরীর মতো। কিডনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার অলিভ তাকে সুস্থ করে তুলতে সব প্রচেষ্টাই চালিয়েছিলেন। কিন্তু সব চেষ্টাই অসফল হয়েছিল পরিহাসভরে। দ্বিধা থাকলেও অলিভকে স্পষ্ট ভাষায় জানাতে হয়েছিল- সোহেলা, তোমার স্বামীর জন্য যথাসাধ্য ট্রিটমেন্টটাই কেবল আমরা দিতে পারি! কিন্তু আয়ু দান করতে পারি না! সোহেলা উত্তরে অশ্রæ মুছে অসহায়ভাবে ফিসফিস করেছিল চাপা গলায়- আমি নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করছি ডাক্তার! সোহেলাকে সান্ত¡না দিতে চেয়েছিলেন ডাক্তার। তার কণ্ঠস্বর চুইয়ে নিংড়ে পড়েছিল সহানুভূতির স্নেহরস। অলিভ কোমল অনুভবে বলেছিলেন- একে দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কী-ই বা বলি বলো? ওর দুটো কিডনিরই ফিলটারিং ইউনিটগুলো সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে! অথচ তাদের সঙ্গে ম্যাচ করে এমন কিডনি সংগ্রহ করা আজও আমাদের পক্ষে সম্ভবপর হলো না! গত মাসে যে দুটো পাওয়া গিয়েছিল, তাদের একটাও ম্যাচ করেনি তাপসের জন্য! আপনার কথাই আমি ঠিক বলে মানি ডক্টর অলিভ! আমি একে দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু মনে করতে পারি না! তাছাড়া আরো একটা আশ্চর্য ব্যাপার দেখো সোহেলা, অলিভ ফের বলতে শুরু করেছিলেন। তাকে তিনি নিজের কন্যার মতো স্নেহসুলভ দৃষ্টিতে দেখেন। অলিভ বলেছিলেন- তাপসের অবস্থার অবনতি যে এত দ্রুততায় ঘটে যাবে, সেটা এতদিনের অভিজ্ঞতায় আমি ভাবতেই পারিনি! এ ধরনের কেস ভেরি রেয়ার! দশ হাজারের মধ্যে একটা ক্ষেত্রেই কেবল ঘটা সম্ভব!

তাপসের অবস্থার দ্রুত অবনতি ভালোবাসার প্রলেপ দিয়ে ঠেকাতে পারেনি সোহেলা। যদিও তাকে পেয়ে সংক্ষিপ্ত জীবনের মধ্যেই আশ্চর্য প্রশান্তির সুখপরশ অনুভব করেছিল তাপস। রোগ যন্ত্রণার আবিলতা ছাপিয়ে কখনো কখনো সেই সুখের পরশ মেঘভাঙা অবাক রোদ্দুরের মতো ফুটে উঠতো তার শীর্ণ মুখের সীমানায়। সেই দৃশ্য কখনো নজরে এলেই দ্রুত কাছে এসে জিজ্ঞেস করতো সোহেলা- এখন কি একটু ভালো লাগছে তাপস? কিছু বলবে আমায়?

উত্তরে ক্ষীণ বাহু তুলে স্ত্রীর দিকে হাত প্রসারিত করতে করতে তাপস পাণ্ডুর মুখে হাসতো এক ঝলক। বলতো- তোমাকে বড় ভালো দেখাচ্ছে সোহেলা! ঠিক যেন বৃষ্টিভেজা কদম ফুল! কিন্তু তুমি গন্ধহীন নও! তোমার অন্তরের সুবাসে আমি অন্য ভালোবাসার গন্ধ পাই! তখন আমার মায়ের কথা মনে পড়ে! যে মা পৃথিবীর সবকিছু ছেড়ে অন্যপারে চলে গেছেন, আমার বারো বছর বয়সে! তাছাড়া ছেলেবেলার কদমফুলও আর কখনো দেখা হয়নি জীবনে! সোহেলা অশ্রæ সংযত করে স্বামীর শীর্ণ কপালে হাত রেখে নরম হাসির রেশমি ছড়িয়ে বলতো- এখন কদমফুলের সময় থাকলে দেশ থেকে তোমায় আনিয়ে দিতাম! যেমন করে হোক আনিয়ে দিতাম! আচ্ছা, এছাড়া তোমার আর কী কী ভালো লাগে বলো আমায়!

দুর্বল হাতে স্ত্রীর পরিপুষ্ট হাত ধরে রেখে তাপস শান্ত গলায় উচ্চারণ করতো- তোমার মধ্যেই সব ভালোলাগার জিনিস আমি খুঁজে পাই সোহেলা! আমার সব ভালোবাসার জিনিসগুলোর গন্ধ পাই! তাই যখন তুমি কাজে চলে যাও, তখনো তোমার উপস্থিতি আমি অনুভব করি!

তাপসের সঙ্গে তার সংসার নিতান্ত ক্ষণকালের। মাত্রই দুই বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। তাদের দাম্পত্য জীবন ঘিরে ভালোবাসার শুদ্ধ সত্তা অনুভূতির সুপরশ যেমনই পাক, নিন্দুকেরা অবশ্য তাই নিয়ে সমালোচনার বিষবাষ্প ওড়াতে ছাড়েনি কখনো। সমাজবিধি মতে তাদের বিষবাষ্প ওড়ানোর সঙ্গত কারণও ছিল যথেষ্ট। বিশেষত বিয়ের পূর্বেই নিজের সংসার ছেড়ে যেদিন তাপসের কাছে বসবাসের জন্য চলে এসেছিল সোহেলা, সেদিন শুধু পরিচিত বন্ধুবান্ধব নয়, আত্মীয় পরিজনরাও পরিত্যাগ করেছিল তাকে। তাপসের অকাল মৃত্যুর সংবাদে মানবিকতার দায়ভার নিয়ে বিশেষভাবে কেউ তাই শোকার্ত হতে পারেনি। বরং খবর শুনে পরিচিত এক প্রবীণা রাখঢাক না রেখেই ক্ষুব্ধভাবে বলে উঠেছিলেন- হবে না? অমন ভালোমানুষ স্বামী, সংসার, সন্তানদের ফেলে বুড়ো বয়সে ঘর ভেঙে বিয়ের আগে আরেক পুরুষের ঘর করতে গেলে পাপ কি আর ছেড়ে কথা বলবে? ছিঃ ছিঃ কী অনাচার কাণ্ড বলো! বলা নেই, কওয়া নেই, দুই সন্তানের জননী, একজনকে দেখে ভালো লাগলো বলেই ডিভোর্স দিয়ে সংসার ফেলে চলে যেতে হবে? কিন্তু কই, তুই গেলি বলে তোর স্বামী তো আর আরেকখানা বউ ঘরে আনেনি! সেটা কি সে পারতো না? এবার বোঝ, পাপের ফল কাকে বলে!

কারুর সঙ্গে না মিশেও এসব তিক্ত সমালোচনার ঝড় তুফানের সংবাদ বহুদূরে বসেও নিয়মিত পায় সোহেলা। সবই বোঝে সে কিন্তু কেবল বুঝতে পারে না, একজন অসহায় মানুষের জন্য জীবনের প্রতিষ্ঠিত আশ্রয় ছেড়ে বিধির বিচারে সত্যিই কোনো ক্ষমাহীন পাপ সে করেছে কিনা। যদিও এটা সে নিশ্চিত জানে, তার আজকের অবস্থা নিজেরই কৃতকর্মের প্রত্যক্ষ ফলাফল। নিয়তি যার দায়িত্ব নিয়ে যথাসময়ে বাস্তবায়ন করেছে। সোহেলা বোঝে, সবচেয়ে বেশি ক্ষমাহীন অপরাধ সে করেছে নিজের আত্মজ আর নির্ভরযোগ্য ভালোমানুষ বেচারা স্বামীর কাছে। তার যোগ্য শাস্তি প্রাপ্তিতে পরিচিত মানুষগুলোর এই বিরূপ সমালোচনা তাই যথেষ্ট নয়। অকালে তার ভালোবাসার মানুষটার জীবন কেড়ে নিয়ে বিধিহীন ভালোবাসায় বৈধব্যের অভিশাপ লেগেছে তাই। অথবা আরো অন্যকিছু। যার ব্যাখ্যা সবার জানার বাইরে বলে নিরন্তরই তা রহস্যময়।

তারপরেও সে জানে, আজ সন্তানদের মাতৃশ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত সে। তারা তাকে প্রবলভাবে ঘৃণা করতে শিখেছে। স্বামীর অন্তরেও অপ্রকাশ্য বীতশ্রদ্ধা আর অপরিমেয় বিরাগের খবর তার অজানা নয়। কারণ, স্থান, কাল, পাত্র ভেদে অপরাধীর বিচারের দণ্ড ভিন্নতর হয়। সোহেলা বয়সে নিতান্ত তরুণী নয়। যে বয়সে প্রতিষ্ঠিত সংসার পেছনে ফেলে বুকের জোয়ারে ভেসে অনায়াসে অনিশ্চিত জীবনেও আকর্ষণ অনুভব করা যায়, তার চল্লিশ বছর বয়সে সেই পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত ছিল না কখনো। সেই কারণেই চারপাশের তীব্র ধিক্কার সফেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো এমন উঁচু হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে উদ্ধত প্রতিবাদ নিয়ে। তার চরিত্রস্খলনে সুশিক্ষিত, মার্জিত স্বামী ভদ্রলোক আহত হয়েছিল ভীষণ। অবাক হয়েছিল খুব। তবুও অভিমানের ভারী পাথর সরিয়ে সে বোঝাতে চেয়েছিল স্ত্রীকে- সোহেলা, কারোর ভালোবাসার ওপর দাবি খাটানোর প্রবৃত্তি আমার নেই সেটা তুমি জানো! আমি তাই আমার জন্য বলছি না! কিন্তু আমাদের সন্তানদের কথা ভাবো! কোন অপরাধে আমায় ডিভোর্স দিয়ে তাদের তুমি বিধ্বস্ত করতে চাইছো? তোমার মতো শিক্ষিত অধ্যাপিকার কাছে আমার একটাই বক্তব্য, এই আচরণ তুমি পরিত্যাগ করো সোহেলা! আমায় বারবার এসব কথা বলে বিরক্ত করো না! এ কথা বলতে গিয়ে অকারণে সোহেলার কণ্ঠে বিরাগ ঝরেছিল সেদিন। সোহেলার দাম্পত্য জীবনে ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতির সংবাদ অন্তরঙ্গ দুই একজন সুহৃদজনের জানা থাকলেও তাকে কেউ ভাঙনের শর্ত বলে ভাবেনি কোনোদিন। এমনকি সে নিজেও তা মনে করেনি কখনো। কিন্তু তারপরেও আরেকজনের প্রতি ভালোবাসার প্রবল আকর্ষণ অন্ধ টানে যখন তাকে অবিবেচক করে তুললো, নিজের শিক্ষাবোধ, আভিজাত্য, সমাজ পরিকাঠামোর সব রকম যৌক্তিক বিশ্লেষণ, স্বামীপ্রেম, সন্তানস্নেহ সবই যেন গুরুত্বহীনভাবে তখন নিষ্প্রাণ হয়ে গেল তার কাছে।

তাপসের সঙ্গে তার পরিচয় ইউনির্ভাসিটির এক সেমিনারে এসে। তিনদিনের দেখাশোনার আলাপ পরিচয়ে এই সুদর্শন অধ্যাপকের প্রতি তার যে ভালোলাগার অনুভূতি অজান্তেই তৈরি হয়ে গেছে, বুঝেছিল সে। দুর্নিবার আবেগের অজানা স্রোত এরপরে সম্পূর্ণ প্লাবিত করেছিল তাকে। ফোন নাম্বারসহ ঠিকানা বিনিময় হয়েছিল দুজনের। দুপক্ষ থেকেই ভালোলাগার উচ্চকিত পরশ উভয়ের বাক্যবিনিময়ে সৌজন্যের সীমা থাকা সত্ত্বেও ঝরেছিল বারবার। কিন্তু কেন এমন হয়েছিল, কী করে এটা সম্ভব হয়েছিল, তার যথার্থ যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা বারবার নিজের কাছে প্রশ্ন করেও পায়নি সোহেলা। তারপর ধীরে ধীরে পারস্পরিক বাক্যালাপে, গাঢ় মেলামেশায় যখন মানুষটির জীবন সংক্রান্ত যন্ত্রণাকাতর গোপন কথাগুলো জেনেছিল সে, ভালোবাসার অতলান্তে আরো বেশি ডুবেছিল সোহেলা। জেনেছিল তার সাবেক স্ত্রী, যে কিনা নিজ উচ্চাকাক্সক্ষার দায় মেটাতে আরেকজনকে বিয়ে করে অসহায় মানুষটিকে ছেড়েছিল, তার হৃদয়হীনতার গুপ্ত কাহিনী। বিশেষত তার রোগাক্রান্ত দেহের অনিবার অসহায়ত্বের সব রকম আকুলতার সংবাদ তার নরম হৃৎপিণ্ড কেটে কেটে গভীর দাগে বসে যাচ্ছিল ক্রমাগতভাবে। মনের গভীরে ডুব দিয়ে পাকা জহুরীর মতো ভালোবাসার রতœমাণিক আবিষ্কার করতে গিয়ে সে অবাক বিস্ময়ে দেখেছিল, তার দুই সন্তানের জনককে চৌদ্দ বছরের বিবাহিত জীবনে সে যতখানি না ভালোবাসতে পেরেছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ভালোবাসা বিলিয়ে রীতিমতো আত্মসমর্পণ করে বসে আছে কঠিন রোগে রোগাক্রান্ত, একান্ত নিঃসঙ্গ, হঠাৎ দেখা অভিশপ্ত পুরুষটির কাছে। নিষ্ঠুর মৃত্যুর আহ্বানধ্বনি প্রতিদিন যার জীবন সীমানা জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়। সোহেলা আর পিছু ফিরে তাকায়নি এরপরে। এমনকি একযুগ ধরে মাতৃত্বের সুধা দিয়ে, অন্তরের মমতা ঢেলে যে দুই সন্তানকে সে প্রতিপালন করেছিল নিজের দেহের মতোই নিত্য সাহচর্য নিয়ে, তাদেরও অন্ধ আকর্ষণের তোড়ে ছুড়ে ফেলতে দ্বিধা করেনি।

তাপস চলে যাবার পর থেকেই ভালোবাসার শুদ্ধ সত্তা, আর্তনাদের বিরাট বিশাল ঢেউ তুলে কান্না হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে সোহেলার ভাঙা বুকের অভ্যন্তরে। যাবার আগে অনুশোচনার আগুনে উত্তপ্ত হতে হতে সে বলেছিল- তোমার জন্য কষ্ট হচ্ছে সোহেলা! বড় একা করে দিয়ে যাচ্ছি! কে জানে আমার সঙ্গে কখনো দেখা না হলে তোমার সুখের সংসারটা হয়তো ভেঙে যেতো না এভাবে! তোমায় পেয়ে আমি সুখ পেয়েছি সত্যি, কিন্তু যাদের জড়িয়ে তুমি স্ত্রী হয়েছিলে, মা হয়েছিলে তাদের কষ্টকেও তো অস্বীকার করার উপায় নেই! বড় বেশি স্বার্থপর হয়ে পড়েছিলাম তোমায় পাওয়ার জন্য! তাই একবারও তাদের ছেড়ে আসার জন্য তোমায় বাধা দিতে চাইনি! তার উসুলটাও সে জন্যই বড় বেশি করে দিতে হচ্ছে আজ!

সোহেলার বুকের উদ্দাম হাওয়া, ঝড়ের প্রচণ্ড বেগ নিয়ে তুফান তুললেও সে মথিত হয়ে কাঁদতে পারেনি এর উত্তরে। এই প্রশ্ন কি সে নিজেকেও করেনি বহুবার? কেন সে অন্ধ আবেগে সেদিন উল্কা হয়ে ছুটেছিল সবকিছু ছেড়ে? স্বামী, সন্তান, আত্মীয়, পরিজন, বন্ধুবান্ধব, মান সম্মান তুচ্ছ করেছিল শুধু কি লোভাতুর ভালোবাসারই টানে? তাহলে কেন সে ঘৃণা করতে পারে না এই ভালোবাসাকে? কেন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটির জন্য বুকের প্রেম আজও হাহাকার তোলে এমন আকুলতায়? কেন মনে হয়, এই অসহায় সঙ্গকাতর নিঃসঙ্গ মানুষটিকে ভালোবেসে কোনো অন্যায় সে করেনি? মৃত্যুর পূর্বে তাপসের চেতনা দায়দায়িত্বের সিঁড়ি ভেঙে তখন ওঠানামা করছিল বারবার। সে জানতে চেয়েছিল- আমি চলে যাবার পরে তুমি কী করবে সোহেলা? সোহেলা স্বামীর কপালে চুমু খেয়ে চোখের তপ্ত অশ্রæ মুছে নিতে নিতে মুখ নামিয়ে তাপসের কানের কাছে রুদ্ধ গলায় বলেছিল- আমাদের বিয়ের পরে তুমি বলেছিলে, কোনোদিন আমার কাছ ছাড়া তুমি হবে না! তাহলে আমাকে ছেড়ে চলে যাবার কথা কেন বলছো তাপস? আমার জীবনের সবখানে তুমি আছো, থাকবে! ওই দেখো! বলেই সামনের ফায়ারপ্লেসের দেয়ালে রাখা তাদের যুগল ছবিটার দিকে আঙুল তুলেছিল সে।

তাপসের বিগলিত অশ্রæ, তার কোটরাগত শুকনো চোখজোড়া প্লাবিত করেছিল উষ্ণ জলে। স্ত্রীর জবাব শুনে বড় নিশ্চিন্ত হয়েছিল সে। তারপর ধীরে ধীরে একসময় চিরকালের জন্য গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সোহেলা ভেতরে ভেতরে ধূলিমূর্তির মতো নিঃশব্দে তখন ভাঙছিল। কিন্তু যা ধরে রাখার নয়, তাকে ধরে রাখার জন্য সেই মুহূর্তে উতলা হয়ে ছুটোছুটি করে ডাক্তারকে কোনো সংবাদ সে জানাতে চায়নি। কেবল বিপুল ভালোবাসার শুদ্ধ সত্তা নিয়ে স্বামীর চিরবিদায়ের মুহূর্তগুলোকে প্রত্যক্ষ করেছিল গভীর শোকের যন্ত্রণা বয়ে। সন্ধ্যেবেলা বারান্দায় বসে তাপসের হঠাৎ আহ্বান শুনে সেই যে শূন্য ঘরে আলো জ্বেলে শুয়েছিল সোহেলা, তারপরে বিছানা ছেড়ে আর ওঠেনি। কাজ থেকে চৌদ্দদিনের ছুটি নিয়েছে বলে সকালে ওঠার ব্যতিব্যস্ততাও ছিল না। তারপরেও ভোর রাতের দিকে বিছানা ছেড়ে সে উঠে বসলো। দেয়ালঘড়িতে রাত চারটে বাজার শব্দ উঠলো একটু পরেই। বিছানা ছেড়ে নিচে নেমে আপন মনে অস্ফুটে কথা বললো সে- কবিয়ালের সেই কথাটা খুব মনে পড়ছে তাপস! প্রেমিকা মারা যেতে সে গান বেঁধেছিল- ‘জীবন এত ছোট কেনে’! বলতে বলতেই চোখের জল নিয়ে যুগল ছবিটার সামনে এসে দাঁড়ালো সোহেলা।

দুই বছর আগে বিয়ের পরে ঘরে ফিরে তোলা হয়েছিল ছবিটা। সেদিন বিয়েতে কেউ নিমন্ত্রিত হয়ে আসেনি তাদের বাড়িতে। কেউ বধূবরণও করেনি। তবুও সোহেলা ভালোবাসার রাজ্যে পদার্পণ করেছিল অবিসংবাদিত এক সম্রাজ্ঞীর মতো। ভালোবাসার বিপুল ঐশ্বর্যে দেহ মনে পরিপূর্ণ হয়ে। তাপস তাকে বিছানার ওপরে বসিয়ে দিতে দিতে বলেছিল- এবার বেশ করে সাজগোছ করে নাও, ভালো একখানা ছবি নিতে হবে! আর তুমি? হ্যাঁ, আমারও বরবেশের একখানা ছবি চাই! দুজনে পাশাপাশি বসে তুলবো! তারপর খুব বড় করে সুন্দর ফ্রেমে বাঁধিয়ে রেখে দেব! যাতে এই দেহটা যেদিন থাকবে না, সেদিনও তোমার সঙ্গে এভাবেই থেকে যেতে পারি! সদ্য বিয়ে করা স্বামীর মুখে এমন উক্তি শুনে আহত হয়েছিল শিক্ষিত অধ্যাপিকা। বলেছিল -এসব কথা এখন কেন তুলছো তাপস? ডক্টর অলিভ তো বললেন তোমার অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো! তাপস হেসেছিল সুখময় হাসি -বাঃ! আমি কি শিগগিরই চলে যাবার কথা বলেছি নাকি? সেদিনের সুখময় হাসি অন্তরের স্বস্তিতে আলো ফেলেছিল তাপসের মুখে। সোহেলাও যোগ দিয়েছিল তার হাসিতে। বলেছিল- সে তো নয়ই! তুমি আমার চেয়েও বেশিদিন বেঁচে থাকবে দেখে নিও! তাপস উত্তরে হাত চাপা দিয়েছিল নব পরিণীতার মুখে -প্লিজ! এই অভিশাপটা আমায় দিও না! যুগল ছবির মুখে নবদম্পতির সেই মুহূর্তের নিটোল প্রাণের সাড়া আজও তেমনি অটুট। অথচ সেখানে তাকিয়ে প্রাণের কোনো সাড়া এই মুহূর্তে উদ্বেল করছে না তাকে।

কেমন এক অবাক অস্থিরতা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো অসম্ভব নাড়াচ্ছে তার ভেতরটাকে। কিছুসময় পায়চারি করে অন্ধকারে বাইরের দোলনায় এসে বসলো সে। কাল বিকেলের চাপা বৃষ্টিটা এখন নেই। তার বদলে নেইবারহুডের বাড়িঘরের ফাঁক দিয়ে ভোররাতের চাঁদটাকে চোখে পড়ছে। শুক্লপক্ষ চলছে সম্ভবত! বিগত একটা মাস দীর্ঘশ্বাসের জেয়ারে ভেসে কোনোদিকেই চোখ রাখতে পারেনি সে। কারণ এই দিনগুলো তাপস তার কাছ থেকে ভালোবাসার সুদ হিসেবে ধার করে নিয়েছিল। তখন সোহেলাকে প্রায়শই শুনতে হতো- সোহেলা, প্লিজ আমায় ছেড়ে এভাবে বাইরে চলে যেয়ো না! আমি তো কোথাও যাইনি তাপস! এই দেখো, রান্নাঘরে তোমার জন্য খাবার আনতে গিয়েছিলাম! ডক্টর অলিভের সঙ্গে কথা হয়েছে আজ? হ্যাঁ। কী বললেন? তাপসের এই জিজ্ঞাসার জবাব এখন আর দিতে পারে না সে। কারণ আশান্বিত হওয়ার কোনো তথ্য তাদের সংলাপে আজকাল আর থাকে না। তাপস সবই জানে। তবুও জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়ার আর্তি শিক্ষিত অধ্যাপকের বেঁচে থাকার কামনায় ধ্বনিত হয় বিদায়কালীন বেলাশেষের দিনগুলোতে। অধ্যাপকের চোখের কোল বেয়ে অশ্রæ গড়ায় ফোঁটায় ফোঁটায়। অভিমান বুকের তলায় উদ্বেল হয়ে ওঠে ঝড়ের মতো। তার অভিঘাতও গড়িয়ে পড়ে গলার স্বরে- মৃত্যুকে এত অনাকাক্সিক্ষত কেন মনে হয় সোহেলা? সে কি তোমার ভালোবাসার লোভেই? বড় ইচ্ছে করে, তোমার ভালোবাসার শান্ত আশ্রয়ে আরো কয়েকটা দিন বেঁচে থাকি! দোলনায় বসে সোহেলার চোখে পড়ছে, চারপাশ থেকে অন্ধকার সরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। ফিকে হয়ে আসছে শুক্লপক্ষের রাতজাগা চাঁদ। তার চোখের পাতায় কদিন ধরেই ঘুমের চিহ্নমাত্র নেই। থাকার প্রশ্নই আসে না। জীবনের পাতায় পাতায় যত স্মৃতি, যত ঘটনার পদচারণা বহুকাল গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন ছিল, সোহেলার শূন্য জীবনে নিঃসঙ্গতার নির্জন পথে-পথে তারা সবাই জেগে উঠেছে একে একে। তাদের কেউ বা অশ্রæজলে ক্লান্ত। কোনোটি আবার সুখের পরশে মখমলি জ্যোৎস্নার মতো প্রশান্তির স্নিগ্ধতায় সুকোমল। কোনোটি আবার বেদনার বুনুনিতে স্তরে স্তরে রক্তাক্ত হয়ে ঠাসা।

বারান্দার বুক ঘেঁষে সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা নিবিড় পাইন গাছের ফাঁক থেকে রবিন পাখির ঘুম ভাঙানিয়া মিষ্টি সুরতরঙ্গ হঠাৎ ভেসে আসছে তার কানে। জীবন জাগরণের আনন্দ সংকেত তাতে বেজে উঠেছে সহসা। সেই সংকেতে ভোরের আলো ফুটছে। দৃশ্যহীন হয়ে যাচ্ছে স্তব্ধ রাতের সুন্দরী চাঁদ। সোহেলা দোলনা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো শান্ত মনে। জীবনপাত্র ভরে পান করলো নিরালা ভোরের স্নিগ্ধ রস। শ্লথগতিতে ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে এসে দুই বছর আগের তোলা যুগল ছবিটার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো। তাপসের কণ্ঠ থেকে কথা ভেসে আসছে তার কানে। শুনতে পাচ্ছে তার সুখময় হাসি। এখন আর ছবিটাকে কাল রাতের মতো প্রাণহীন, স্পর্শহীন মুখচ্ছবি বলে মনে হচ্ছে না। নিটোল প্রাণের জোয়ারে ভেসে, শিউলি ফুলের সতেজ ভালোবাসা নিয়ে তারা দুজন মানব-মানবী হয়ে তরঙ্গায়িত উদ্বেল প্রাণে খেলা করছে সেখানে। জীবনের স্রোত তাতে উথলে পড়ছে। গড়িয়ে পড়ছে ভালোবাসার বিগলিত আবেগ। দেখতে দেখতে অনুভবের গাঢ়তায় তাপসের শরীর ছুঁয়ে শিহরিত হতে হতে কথা বলছে সোহেলা। বলছে- তুমি ঠিকই বলেছিলে তাপস! তুমি আছো! তুমি থাকবে! একটু আগে যেমন করে শুক্লপক্ষের চাঁদ ডুবে গেল আকাশের হৃদয়ের মধ্যে, আকাশের শরীরের মধ্যে, তেমনি করে আমার হৃদয়ের মধ্যে, আমার শরীরের মধ্যে তুমি আছো! তুমি থাকবে! আজীবন ভালোবাসার এমন আস্বাদ পাবো বলেই হয়তো একদিন তোমার জন্য সব ছেড়েছিলাম! লোকে যাই বলুক, সে আমার লোভ ছিল না! কোনো পাপ ছিল না তাতে! হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj