ইরা ভাবী : শাহাবুদ্দীন নাগরী

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

টেলিফোনটা রেখে দেয়ার পর আমি কতোক্ষণ থম্ মেরে বসেছিলাম মনে করতে পারি না। আমার সম্বিৎ ফেরে রুমমেটের ডাকে। মশারির ভেতর থেকে মুখটা বের করে জিজ্ঞেস করলো,

‘কী হইছে দোস্ত? অমন পাথর হয়া বইসা আছো যে?’

আমি ত্রস্তে সামলে নেই নিজেকে, কিন্তু মনে হয় ব্যর্থ হই।

‘কই কিছু না তো!’

‘তোমার মুখ কইতাছে সামথিং রং। আমার থাইকা লুকাইতাছো?’

আসলে রোমানকে এ বিষয়ে কখনো কিছু বলিনি। শেয়ারও করিনি কিছু। এখন নতুন করে তাকে বলা মানে বইয়ের ভূমিকা থেকে শুরু করা।

রোমান পুরান ঢাকার ছেলে, বাবার দোকান-বাণিজ্য আছে, বাসাবাড়িও আছে নিজেদের। তবুও হলে এসে উঠেছে গত চার মাস হয়। রাজনীতি-ফিতি করে, স্লোগান দেয়, রাতের অন্ধকারে চিকা মারে। ইতিহাসের ছাত্র, গ্র্যাজুয়েশনের শেষ সেমিস্টার চলছে তার। আমি মাস্টার্সের ছাত্র, তবুও দোস্ত ডাকে। আমি ওকে এড়িয়ে যাই। গামছাটা কাঁধে নিয়ে রাথরুমের জন্য বের হই।

কিন্তু আমার পা চলে না। আমি রেলিং ধরে দাঁড়াই। চারতলার এই বারান্দা থেকে কাঁটাবনের রাস্তাটা দেখা যায়। আমি রাস্তাটার দিকে তাকাই। বুকের ভেতরটা আমার ফাঁকা ফাঁকা মনে হয়। মনে হয়, কিছু যেন আমি হারিয়ে ফেলেছি, কিছু যেন আমার নেই। অন্ধকার ছিঁড়ে ফর্সা হচ্ছে চারদিক, আর আমার বুকের ভেতরের ফাঁকা জায়গায় যেন জমা হচ্ছে চাপ চাপ অন্ধকার। মানুষের এতো কষ্ট থাকে কেন? প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে থাকে মনের ভেতর। মাথা বন্বন্ করে ঘোরে। আমার মনে হয় আমি রেলিং ধরেও আর দাঁড়াতে পারছি না। বসে পড়ি বারান্দায়।

নরসিংদীর বাসে যখন উঠি তখন সকাল আটটা। এক ঘণ্টার পথ, যদি রাস্তায় কোনো জ্যাম না লাগে। আমি ন’টা নাগাদ পৌঁছে যেতে পারবো। হল থেকে বেরিয়েছিলাম সকাল সাতটায়। একটা রিকশা নিয়ে গুলিস্তান এসে যাত্রাবাড়ীর বাস ধরি। সকালে লোকাল বাসগুলোতে বেশ ভিড় হয়, অনেকে ঢাকা থেকে নরসিংদী গিয়ে অফিস-কারখানা করে। আমার ভাগ্য ভালো একটা বাসের জানালার পাশে সিট পেয়ে যাই। সকালে খেতে ইচ্ছে করছিল না, এসব মুহূর্তে ক্ষুধাও মনে হয় পালিয়ে যায়। আমি শুধু এক গøাস পানি খেয়ে বেরিয়েছিলাম।

রোমান জিজ্ঞেস করেছিল,

‘কোথায় যাইতাছো দোস্ত?’

‘বাড়ি।’

‘বাড়ি? মানে নরসিংদী?’

আমি শুধু হ্যাঁ বলে ঝাড়া হাত-পায়ে বেরিয়ে গেছি।

বাসটা চলতে শুরু করলে সকালের ঠাণ্ডা বাতাস মুখে এসে ঝাপটা মারে। মনে হয় খুলে দিতে চায় স্মৃতির জানালাগুলোকে। একসময় খুলেও যায় সেটা। আমার পাশের সিটের ভদ্রলোক বেশ ধোপ-দুরস্ত ফিটফাট মানুষ, চুলে ক্রিম মেখে সেট করেছেন চুল। বাতাসে তার সমস্যা হচ্ছিল বোধহয়। কন্ডাকটরকে ডেকে জানালাটা বন্ধ করার কথা বলছিলেন। আমার চেহারায় কী ছিল জানি না, কন্ডাকটর পিছিয়ে গিয়ে বলেছিল,

‘স্যার, বাতাস খাইতে খাইতে না গেলে তো সিদ্ধ ডিম হইয়া যাইবেন। থাউক স্যার, খোলাই থাউক।’

ভদ্রলোক আমাকে অনুরোধ করতে সাহস করেননি।

আমি আমার চোখজোড়া জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে দেই। যদিও আমি তখন কিছুই দেখছিলাম না, দেখছিল আমার মন। মন যখন কোনোকিছু দেখে চোখ তখন অন্ধ হয়ে যায়।

সামাদ ভাই নরসিংদীর একটা ব্যাংকের সেকেন্ড অফিসার হিসেবে চাকরি করতেন। আমার একটু দূর সম্পর্কের মামাতো ভাই, আমার চেয়ে ছ’সাত বছরের বড়। তাদের পৈতৃক নিবাস ভৈরবে, বাবা-মা ওখানেই থাকতেন। চাকরি সূত্রে নরসিংদী এসে একটা ব্যাচেলর বাসা ভাড়া নেন, আমাদের বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটারের মধ্যে। মাঝে মাঝে আসতেন আমাদের বাড়িতে, আব্বার সাথে গল্প করতেন। আমি ঢাকায় থাকতাম বলে আমার সঙ্গে দেখা হতো কম। কখনো ছুটি-ছাটায় বাড়ি গেলে আমার সাথে দেখা হতো, বলতেন,

‘বাসায় চলে এসো, দু’জনে দাবা খেলবো।’

আমি মাঝে মাঝে চলে যেতাম, দাবা খেলতাম। কাজের বুয়ার রান্না করা ভাত-তরকারি খেয়ে কোনো কোনোদিন বাসায় ফিরতাম। আম্মা মাঝে মাঝে না করতো আমাকে।

‘যাবে যাও, তবে মাঝে মাঝে, রেগুলার যাবার দরকার নেই।’

আম্মা কেন আমাকে না করতো সেটা অবশ্য কখনো খুলে বলেনি। আমিও জানতে চাইনি। আম্মা হয়তো ভাবতো, আমি ভার্সিটিতে পড়ি, ঢাকায় থাকি, আমি অনেক কিছু বুঝি, আমাকে সবকিছু খুলে বলার দরকার নেই।

বছর দুয়েক আগে দুম করে বিয়ে করে ফেললেন সামাদ ভাই। অনেক মেয়ে দেখা হচ্ছিল পারিবারিকভাবে, কিন্তু ছবি পাঠালেই সামাদ ভাই ‘পছন্দ হয়নি’ বলে না করে দিতেন। বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে বলে মামা-মামিও খুব চিন্তিত ছিলেন। তখন আমার গ্র্যাজুয়েশনের আট সেমিস্টার চলছিল, নিয়মিত লাইব্রেরি ওয়ার্ক করা, এসাইনমেন্ট জমা দেয়া, রিসার্চ পেপার তৈরি করা নিয়ে ব্যস্ত সময় যাচ্ছিল, আম্মা ফোন করে জানালো যে সামাদ ভাই বিয়ে করেছে। কুমিল্লায় বিয়ে হয়েছে, নরসিংদীতে একটা কমিউনিটি সেন্টারে বৌ-ভাতের আয়োজন করেছিল অফিসের কলিগদের জন্য। সব ঘটনা ঘটে গেছে মাত্র সাত দিনের মধ্যে। মামা-মামি ছেলের পছন্দ হয়েছে শুনে এক সেকেন্ড দেরি করেনি। মেয়ের বাড়ি কুমিল্লায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ করেছে। মেয়েটা দেখতে ভালোই- ওটা আমার আম্মার কথা। আব্বা-আম্মা বৌ-ভাতে গিয়েছিল, সামাদ ভাই পরে একদিন ভাবীকে নিয়ে আমাদের বাসা ঘুরেও গিয়েছিল।

আমি যখন বাড়ি যাই বৌ তখন দু’মাসের পুরনো হয়ে গেছে। আমি ভার্সিটিতে পড়ি, হলে-হোস্টেলে থাকা মানুষ, আইন-কানুন নিয়ম-নীতি, রীতি-ফিতি ওসব আমার মানতেই হবে এমন কোনো কথা নেই, পরদিন সন্ধ্যেবেলা সামাদ ভাইয়ের বাসার কলিং বেল বাজিয়ে দিলাম। ব্যাংক থেকে নতুন বৌয়ের টানে নিশ্চয়ই সামাদ ভাই এখন তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরে, অতএব বাসাতেই আছে।

কিন্তু দরজা খুললেন দু’মাসের পুরনো হয়ে যাওয়া বৌ। আমি একরকম পাশে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ‘সামাদ ভাই, কোথায় আপনি’ বলে বাসার ভেতরে ঢুকে পড়লাম। মহিলা তো অস্থির হয়ে গেলেন এরকম একটা জোয়ান ছেলে পরিচয় না দিয়ে বাসায় ঢুকে পড়েছে বলে। ড্রয়িং রুমে সোফায় বসতেই দেখি মহিলা দরজার খিল তুলে হন্তদন্ত হয়ে ভেতর ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন, আমি কোনোভাবেই যেন বেডরুমে ঢুকতে না পারি।

মহিলা একটু ক্রোধের সাথেই বললেন,

‘কে আপনি? আপনাকে কোনোদিন দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না?’

হলের সাংস্কৃতিক সপ্তাহে কিছু নাটক করেছিলাম একসময়। খুব ভালো অভিনয় না পারলেও চালিয়ে নিতে পারি। মনে করলাম এখানেও চালিয়ে নেবো। আমাদের ক্যাম্পাসের অতি পরিচিত সেই নাট্যাংশ আওড়ালাম-

‘হু-হু-হু-হু-হা-হা-হা, কোথায় পালাবে চুন্দরী, তুমি আজ বন্দি, তবে লোহার চিকলে নয়, মনের চিকলে।’ ভিলেনের মতো করে অট্টহাসি দিলাম আরেকবার।

সামাদ ভাইয়ের পরিণীতা ঘাবড়েই গেলেন মনে হয়। আমার দিকে চোখ, অথচ বাঁ হাতে ধরে রাখা মোবাইল ফোনটায় আড়চোখে তাকিয়ে টেপাটেপি করছেন। নিশ্চয়ই নম্বর খুঁজছেন সামাদ ভাইয়ের। কন্টাক্ট পেয়ে গেলেই সবুজ বোতামে চাপ দেবেন।

কিন্তু তার আর দরকার হলো না। কলিং বেল বাজলো।

আমি বললাম,

‘দাঁড়িয়ে থাকুন চুন্দরী, আমিই দরজা খুলে দিচ্ছি।’

দরজা খুলতেই সামাদ ভাই বললেন,

‘আরে রায়হান, তুমি কখন এলে? তোমার ভাবীর সঙ্গে নিশ্চয়ই পরিচয় হয়েছে?’

কিন্তু ড্রয়িং রুমে ঢুকে বৌকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলেন সামাদ ভাই।

‘তুমি নিশ্চয়ই ওকে চিনতে পারোনি? ও রায়হান, আমিনা ফুপুর একমাত্র ছেলে। ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ে সেটা তো ফুপুর কাছেই শুনেছো।’

এতক্ষণে যেন মহিলা দম নিলেন, আটকে ছিল গলার কাছে। আমি ডাইনিং টেবিলের বোতল থেকে গøাসে পানি ঢেলে এগিয়ে ধরলাম মুখের কাছে। বললাম,

‘খান, আতঙ্কে জিহ্বা শুকিয়ে গেছে, তাই কথা বেরুচ্ছে না।’

আমার হাত থেকে গøাসটা নিয়ে পানি খেলেন নিজেই। সামাদ ভাই আমাকে বললেন,

‘ইনি তোমার ভাবী, ইরা, আজ থেকে ইরা ভাবী।’

‘আসসালামো আলাইকুম ইরা ভাবী, সরি ফর এভরিথিং।’

রাজা-বাদশাহদের সামনে প্রজারা যেমন ঝুঁকে পড়ে সালাম দিতো (অবশ্য সবই সিনেমায় দেখা) সেভাবে সালামের ভঙ্গিটা করলাম।

‘রায়হান তুমি বসো, আমি কাপড়-চোপড় পাল্টাই।’

সামাদ ভাই ঢুকে গেলেন বেডরুমে। পেছন পেছন ঢুকলেন ইরা ভাবীও। ভেতর ঘরের কথাবার্তা কিছুটা উড়ে এলো কানে, আমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র, রাতে আমাকে না খেয়ে বাড়িতে যেতে দেয়া হবে না।

আম্মাকে ফোনে জানিয়ে দিলাম যে ইরা ভাবীর রান্না খেয়ে আসছি।

আসলেই ইরা ভাবী অসম্ভব সুন্দরী। খুব ফর্সা নন, কিন্তু ফর্সা না হলেও কিছু মুখ থাকে, বড় মায়াময়ী, হৃদয়কাড়া, ইরা ভাবী অনেকটা সেরকম। জানালেন, লেখাপড়া যেহেতু করেছেন, স্থানীয় একটা কিন্ডারগার্টেনে আপাতত শিক্ষকতায় ঢুকবেন। বিসিএস পরীক্ষার সময় এলে পরীক্ষা দেবেন। আবেদন করেছেন। কার্ড পেয়েছেন প্রিলিমিনারির। ইরা ভাবীর বাবা কুমিল্লা জেলা প্রশাসন অফিসে চাকরি করতেন, গত বছর রিটায়ার্ড করেছেন, তিনি জানেন এবং দেখেছেন একজন জেলা প্রশাসক বা সহকারী কমিশনার কতো সম্মানিত সবার কাছে। তার ইচ্ছে তার মেয়েও সে ধরনের চাকরির চেষ্টা করবে। বিয়ের সময় নাকি জামাইয়ের কাছ থেকেও তিনি অনুমতি নিয়ে রেখেছেন, মেয়ে সুযোগ পেলে তেমন চাকরি যেন করতে দেয়া হয়।

‘তোমার ভাবী তো ডিসি হবে।’

খেতে খেতে সামাদ ভাইয়ের খোলাখুলি মন্তব্য। এটা কি তিনি পজিটিভলি নাকি নেগেটিভলি বলেছিলেন তখন বুঝতে পারিনি।

‘হবেই তো। আমরাও সেটা চাই।’

‘বিসিএস পরীক্ষা দেবে সামনে। প্রিলিমিনারির জন্য কার্ড পেয়েছে।’

‘দেবেই তো।’

আমার স্পষ্ট জবাব শুনে সামাদ ভাই হাসতে হাসতে বললেন,

‘শোনো রায়হান, বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পাওয়া এতো সহজ নয়। আমি তিন তিনবার পরীক্ষা দিয়েছিলাম, দু’বার রিটেন পর্যন্ত গেছি, একবার ভাইবা পর্যন্ত। সব এখন টাকাকড়ির খেলা, নতুবা পলিটিক্যাল প্রেশার।’

‘আপনি পারেননি, তাই বলে ভাবী পারবেন না, সেটা কোনো ফর্মুলা নয়। লেট হার এ্যাপিয়ার, মাস্টার্স শেষ হলে আমিও তো দেবো।’

প্রথমদিনই আমি কথার ফাঁকে ফাঁকে খেয়াল করছিলাম আমার কথাগুলো ইরা ভাবী তার চোখ দিয়ে সমর্থন করছিলেন।

তারপর আরো নানান কথাবার্তা, হানিমুনে ভারত যাবে নাকি থাইল্যান্ড যাবে, কবুল বলতে কে দেরি করেছিল, বরের গেট ধরে ছেলেমেয়েরা কতো টাকা পেয়েছিল, বিয়েতে ভাবীর বাবা কাচ্চি বিরিয়ানি দিয়েছিল, নাকি প্লেন পোলাউ ইত্যাদি নানা গল্প করে আমি বাসায় ফিরছিলাম রাত এগারোটায়।

ইরা ভাবীকে আমার খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। সেবার দশ দিনের ছুটিতে চারবার গিয়েছিলাম তাদের বাসায়। অন্য সময় ছুটিতে বাড়ি গেলে আমি সারাদিন বাসায় শুয়ে শুয়ে হিন্দি ছবি দেখতাম, না হয় বিকেলে ঘণ্টাখানেক রব ভাইয়ের চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরে আসতাম। আমার কলেজ জীবনের বন্ধু আলতামাস আমাকে সঙ্গ দিতো। গামছার ব্যবসায় ওদের। কর্মচারীদের হাতে দোকান ছেড়ে দিয়ে আমার সঙ্গে চায়ের দোকানে আড্ডা দিতো। রব ভাইয়ের খাঁটি গরুর দুধের চা ছিল আমাদের অত্যন্ত প্রিয়।

সেবার এসে মাত্র একদিন বসেছিলাম আলতামাসের সঙ্গে।

হলে চলে এলেও মাঝে মাঝেই কথা হতো ইরা ভাবীর সঙ্গে টেলিফোনে।

‘কবে আসবা বাড়িতে?’

‘ঠিক নেই ভাবী। ছুটি হলেই চলে আসবো।’

‘বিসিএস-পরীক্ষার প্রস্তুতি আমি নিতে শুরু করেছি, তুমি এলে তোমার সঙ্গে কনসাল্ট করবো।’

ভাবী যে বিসিএসের জন্য বেশ সিরিয়াস এটা তার কথা শুনেই বুঝতে পারতাম।

বাসটা কাঁচপুরের ব্রিজের ওপর ওঠে।

কিছু লোকজন হুড়োহুড়ি করে বাসে উঠে যায়। বসার জায়গা নেই। হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।

ইরা ভাবী একদিন এই ব্রিজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে গল্প করেছিল অনেকটা সময় ধরে। হঠাৎ করেই তখন বলেছিল,

‘একদিন আমি ঠিকই এই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মরবো।’

আমি জানতে চেয়েছিলাম,

‘সাঁতার জানো না?’

‘না, কেউ কখনো শেখায়নি, আমারও শেখা হয়নি। তাইতো পানিকে আমি খুব ভয় পাই।’

‘আমিও ঝাঁপ দেবো উদ্ধারের জন্য।’

‘তখন কি তোমরা থাকবে কেউ?’

ভাবী ফান করে বলেছিল ভেবেছিলাম তখন। ততদিনে আমি ইরা ভাবীকে ‘তুমি’ সম্বোধনে ডাকতে শুরু করেছি তারই নির্দেশে।

ভাবী বলেছিল,

‘কাছের মানুষদের আপনি ডাকতে নেই। বলতে হয় তুমি।’

কথাটার মধ্যে কি আমি অন্য কিছু খুঁজে পেয়েছিলাম? অন্য কোনো সৌরভ? আমি তার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলাম। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ভাবী বলেছিল,

‘আমি কি তোমার কাছের মানুষ নই রায়হান?’

‘কাছের মানুষ’ কথাটির ভেতর লুকিয়ে ছিল দশ লক্ষ গোলাপের মুগ্ধতা। ভার্সিটি পড়ুয়া এক তরুণের কাছে এসব কথা যে নিছক কথার মতো শোনায় না, অনেক অজস্র পরিভাষা আর অনুবাদে চারপাশ কাঁপিয়ে তোলে, শরীরের ভেতর কে যেন ঘণ্টি বাজায়, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ভর করে হাজার ওয়াটের শক্তি তা ভাবীকে বোঝাবে কে? ভাবী কি আমার মনের তলদেশ ছুঁয়ে দেখেছে?

আমি নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানগুলো থেকে বিসিএসের প্রস্তুতিমূলক গাইড এবং সাধারণ জ্ঞানের বইগুলো নিয়ে যেতাম ভাবীর জন্য। তাই দেখে সামাদ ভাই বলতেন,

‘তুমি তো দেখছি তোমার ভাবীকে ডিসি বানিয়েই ছাড়বে।’

আমি বলতাম,

‘ভাবী ডিসি হবেন না এসপি হবেন সেটা আল্লাহই জানেন। প্রস্তুতিটা তো ভালো হওয়া চাই, নাকি?’

সামাদ ভাই কিছু বলতেন না আর। বেডরুমে গিয়ে টিভি দেখতেন। আমি আর ইরা ভাবী ড্রয়িং রুমে বসে বইপত্র আর গাইড ঘেঁটে কনসাল্ট করতাম। পুরনো প্রিলিমিনারি প্রশ্নপত্রগুলো সলভ্ড করাতাম ভাবীকে দিয়ে। প্রতিদিনের এমনধারা জীবনচক্রে আমি ভাবীর বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে শুরু করি।

কোনো কোনোদিন দুপুরে ভাবী আমার জন্য এটা-সেটা রান্না করতেন।

আমি বলতাম,

‘আগে পড়েন, তারপর রান্না। বিসিএসে টিকে গেলে তারপর কাচ্চি বিরিয়ানি রান্না করে খাওয়াবেন।’

আমি জানতাম ভাবী কাচ্চি বিরিয়ানি রাঁধতে পারেন না। তাই ওটাই থাকতো আমার দাবি।

ইরা ভাবী প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় টিকে যান। লিখিত পরীক্ষার জন্য তার প্রস্তুতি শুরু হয়। আমি ভার্সিটির সিনিয়র ভাইদের কাছ থেকে কিছু নোট সংগ্রহ করি, কয়েকজন স্যারের সঙ্গে আমার বন্ধুর মতো সম্পর্ক ছিল, তাদের কাছ থেকে সাজেশন নিয়ে আমি ভাবীকে দিয়ে আসি।

তখনই একদিন জানতে পারি সামাদ ভাই ইরা ভাবীর গায়ে হাত তুলেছে।

ভাবী বলতেই চাচ্ছিল না। আমাকে দেখেই তার সে কি কান্না।

‘কী হয়েছে আমাকে বলবে তো?’

সামাদ ভাই তখন ব্যাংকে। আমি নরসিংদী বাসস্ট্যান্ডে নেমে সোজা গিয়েছিলাম ভাবীর ওখানে।

‘প্লিজ ভাবী, আমাকে বলো।’

‘না-না রায়হান, এটা বলা যায় না।’

‘আমাকে বলতেই হবে কী হয়েছে, প্লিজ।’

নাছোড়বান্দার মতো আমি চেপে ধরি ভাবীকে।

‘আমি না তোমার কাছের মানুষ? তুমিই তো বলেছিলে।’

এই কথাটায় বরফ গলে। ভাবী ব্লুাউজের বোতাম খুলে পিঠটা আমাকে দেখায়। পিঠে দুটো লম্বা লম্বা কালসিটে দাগ।

‘কী হয়েছিল?’

‘সকালে উঠে কয়েকটা ম্যাথ সল্ভ করছিলাম। নাশতা টেবিলে দিতে একটু দেরি হয়েছিল। ব্যস, কথা নেই বার্তা নেই দরজার পাশ থেকে বেতটা তুলে নিয়ে পিঠের ওপর সপাং সপাং করে চালিয়ে দিলো। বলো, এটা মানুষ করে? তুমি ডিসি হও এসপি হও বেতের মার তোমাকে খেতেই হবে- গজগজ করে বলতে বলতে নাশতা না খেয়েই চলে গেলো।’

আমি সরিষার তেলে রসুন পুড়িয়ে ভাবীর পিঠে মালিশ করে দিয়েছিলাম। সোফায় বুকটা ঠেস দিয়ে বসেছিল সে। মুখের তুলনায় ভাবীর পিঠটা ছিল অনেক ফর্সা, বেতের দাগগুলো তাই লালরক্ত জমাট বেঁধে কালো রূপ নিয়েছিল।

‘তোমার হাতটা সারাপিঠে বুলিয়ে দাও তো রায়হান।’

‘ও-তো দেবে সামাদ ভাই, আমি কেন?’

‘না রায়হান, আমি বুঝে গেছি, ওর থেকে এটা আমি আর কোনোদিনও পাবো না। একবার যখন ও হাত তুলেছে, তখন এটা আর বন্ধ হবে না।’

ব্রা’র হুক খুলে সারা পিঠে আমি তেল মালিশ করে দিয়েছিলাম। কোনো নারীর ব্রা’র হুক খুলে ফেলার মধ্যে অবশ্যই অধিকারের একটা গন্ধ আছে। ইরা ভাবী কি আমাকে সেই অধিকার দিয়ে দিয়েছিল? আমি কি ভাবীর অতো আপন হয়ে উঠেছিলাম? কিন্তু আমি সম্পর্কে বা বয়সে যেমনই হই না কেন, আমি তো একটা রক্তমাংসের পুরুষ, যার একটা অগ্নিগর্ভ জ্বালামুখ আছে, সেই জ্বালামুখের উষ্ণধারা ধারণ করার নৈতিক অধিকার কি ভাবীর আছে? আমি জানতাম এটা হয় না। তবুও ভাবীর জেদের কাছে আমি আস্তে আস্তে হেরে যেতে শুরু করেছিলাম।

ভাবী বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় টিকে যায়। মৌখিক পরীক্ষাও খুব ভালো হয় তার। ইন্টারনেটে ফলাফল দেখেই ফোন করেছিলাম ভাবীকে।

‘ইয়েস ভাবী, ইউ আর সিলেক্টেড ফর এডমিন ক্যাডার।’

‘কবে আসবে বাড়িতে?’

‘এই তো এলাম বলে। ডিসি’র বাসায় কাচ্চি বিরিয়ানি খেতে আসবো।’

সামাদ ভাই ইরা ভাবীর এইসব ফলাফলে মোটেও সন্তুষ্ট হননি। তার তখন একটাই কথা, মেয়েদের চাকরি করার দরকার নেই। ওরা ঘরের কাজ করবে। এর মধ্যে গায়ে হাত তোলাতুলির ব্যাপারটা আরো বহুবার ঘটেছে। ভাবী আমাকে সাক্ষী রেখেছিল। আর একটা বিষয় আমি লক্ষ করছিলাম, সামাদ ভাইয়ের সঙ্গে ভাবীর সম্পর্কটায় যখনই আঘাত পড়ে ভাবী বড় বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে আমার ওপর।

দুঃখ করে বলতো,

‘আমার বান্ধবীরা সব চট্টগ্রামে আর কুমিল্লায়। কার সঙ্গে শেয়ার করবো এসব? জানোই তো আনন্দ শেয়ার করলে দ্বিগুণ হয়ে যায়, আর দুঃখ শেয়ার করলে অর্ধেক হয়ে যায়?’

ভাবীর অকাট্য যুক্তি।

একদিন ইরা ভাবী এমন কিছু কথা বলেছিল শুনে আমি তো রীতিমতো ঘাবড়েই গিয়েছিলাম।

‘তোমার ভাই কি তোমাকে ফোন-টোন করেছিল?’

‘না তো ভাবী। কেন?’

‘কেন আবার, ও তো তোমাকে-আমাকে নিয়ে সন্দেহ করে বসেছে।’

‘মানে?’

‘সেদিন বললো, ওর সঙ্গে তোমার এতো কিসের মাখামাখি? ও একটা ইয়াং আনম্যারেড ছেলে, সব বিষয়ে ওকে টেনে আনো কেন?’

‘কেন, তুমি কী বলেছিলে?’

‘কথায় কথায় কথা উঠেছিল, আমি বলেছিলাম, আমার বিসিএসে টিকে যাবার পেছনে পুরো কৃতিত্ব রায়হানের। ও সাহায্য না করলে আমি টিকতেই পারতাম না। কথাটা বলাও শেষ হয়নি, আর অমনি খ্যাক খ্যাক করে খেঁকিয়ে উঠলো। বললো তোমরা পড়াশুনার নামে কী করেছো, তোমরাই জানো।’

বাস ভুলতায় এসে থামে।

এক ফেরিওয়ালাকে দেখে মনে পড়লো ইরা ভাবীকে নিয়ে একদিন আমি ঢাকায় যাচ্ছিলাম। বাস ভুলতায় এসে থামতেই বলেছিল,

‘রায়হান, ঐ যে দেখো ফেরিওয়ালা, আমড়া বিক্রি করছে। আমি আমড়া খাবো।’

আমি ভাবীকে আমড়া কিনে দিয়েছিলাম।

টক আমড়ায় ভাবী খুব মজা পাচ্ছিল বোধহয়। বাস কাঁচপুর আসতেই বলেছিল,

‘চলো, বাস থেকে নেমে যাই, ব্রিজটা হেঁটে হেঁটে পার হই।’

আমি না করিনি। দু’জনে নেমে গিয়েছিলাম রূপগঞ্জ প্রান্তে। তারপর রোদ মাথায় করে গল্প করতে করতে ব্রিজের ফুটপাত ধরে পার হয়েছিলাম ব্রিজটা। ব্রিজের মাঝামাঝি এসে রেলিং ধরে বলেছিল- ‘একদিন ঠিকই আমি এই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মরবো।’

ইরা ভাবীর মধ্যে শিশুসুলভ এক ধরনের চপলতা ছিল। চোখের চাহনিতে কোনো জঞ্জাল ছিল না। হাসিটাকে মেকি মনে হয়নি কোনোদিন। যা বলতো, খুব বিশ্বাস নিয়ে বলতো, আস্থার সঙ্গে বলতো, মাঝে মাঝে ভবিষ্যতের কথা এমনভাবে বলতো, মনে হতো জ্যোতিষি। দু’একবার সেসব কথা ফলেও যেতো, তখন হাসতে হাসতে বলতো,

‘আমি যে ভবিষ্যৎ বলতে পারি, সেটা মানলে তো?’

একদিন বলেছিল, তারপর আরো অনেকবার,

‘দেখবে তোমার ভাই আমাকে চাকরি করতে দেবে না।’

এডমিন ক্যাডারের জন্য ইরা ভাবী পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়ে গেলে সেদিন আবার বলেছিল,

‘দেখবে, ও আমাকে চাকরি করতে দেবে না। আমি জেদ করলেও আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেবে।’

‘তাহলে কী করবে তুমি?’

‘আমার বাবার শতভাগ ইচ্ছে আমি চাকরিটা করি। আমার ইচ্ছে তো আছেই। আমার হয়তো আর সংসার করা হবে না।’

সংসার আর চাকরির বিষয়টা আমার মাথার ভেতর চক্কর দিচ্ছিল। দু’টোই কঠিন সিদ্ধান্ত।

তারপর হঠাৎ কঠিন মুখটা হাসিতে মাখিয়ে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল,

‘এই ছেলে, আমাকে বিয়ে করবে?’

আমি প্রশ্নের আগামাথা পরিবেশ-পরিস্থিতি, সমাজ-জীবন-সংস্কার এইসব না ভেবেই বলেছিলাম,

‘করবো।’

‘করবো?’ ভাবী যেন অবাক হয়েছিল আমার উত্তর শুনে।

‘আমি কিন্তু তোমার চেয়ে বয়সে বড়, এটা জানো?’

‘জানি।’

‘তোমার আব্বা-আম্মা আত্মীয়-স্বজন যদি রাজি না হয়?’

‘তবুও করবো। সামাদ ভাই তোমাকে ছেড়ে দিলে আমিই তোমাকে বিয়ে করবো ইরা ভাবী।’

আমার গাল দু’টো হাতের তালুতে ঘষে দিয়ে কপালে চুক্ করে একটা চুমু দিয়ে বলেছিল,

‘তুমি কি জানো তোমার ভাইয়ের সঙ্গে আমার গত ছ’মাস কোনো সেক্স হয় না?’

মাথাটা নিচু করে আমি বলেছিলাম,

‘এটা কি আমার জানবার কথা? তুমি না বললে আমি জানবো কী করে?’

‘কচি খোকা, মুখ নিচু করো কেন? চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারো না? চেহারা কখনো কাপুরুষের মতো করবে না। তোমার ভাই তো একটা কাপুরুষ, আমার চাকরি নিয়ে কথা বলার সময় চোখ নিচের দিকে করে রাখে, আমার চোখের দিকে তাকাতে ওর সাহসে কুলোয় না।’

মাসখানেক আগে ব্যাংকের কী একটা লোন নিয়ে সামাদ ভাইয়ের সমস্যা হয়েছিল। হেড অফিস তলব করেছিল সে কারণে। চার-পাঁচদিন ঢাকাতেই ছিল, নরসিংদী আসেনি। ইরা ভাবী ফোন করেছিল আমাকে। কয়েকটা এসাইনমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম আমি।

‘চলে আসো নরসিংদী।’

‘কেন?’

‘আমাকে পাহারা দিতে হবে।’

‘মানে?’

‘মানে তোমার ভাই ঢাকায়, কাজে আটকে গেছে, চার-পাঁচদিন নাকি আসতে পারবে না। আমি একলা থাকবো কিভাবে?’

‘রাতে তোমার বাসায় থাকতে হবে?’

‘হ্যাঁ, নইলে পাহারা হবে কিভাবে?’

‘ভাইকে বলেছো?’

‘বললে মনে করো ও অনুমতি দেবে?’

বিকেলের বাসে উঠে আমি সন্ধ্যায় পৌঁছে গিয়েছিলাম নরসিংদী।

রাতে খাবার পর দুজনে রাজ্যের গল্পে মশগুল হয়েছিলাম।

‘আচ্ছা, তোমার পোস্টিং যদি পঞ্চগড় বা খাগড়াছড়ি হয় তবে কী করবে?’

‘কেন ওখানে মানুষ চাকরি করে না? চলে যাবো।’

‘একলা থাকতে পারবে? ভয় করবে না?’

‘ভয় তো করবেই, তখন তোমাকে নিয়ে যাবো পাহারা দেবার জন্য।’

‘আমি কি আর সারাবছর তোমার সাথে থাকতে পারবো, আমার মাস্টার্স ফাইনাল আছে না?’

‘পরীক্ষা শেষ হলে যাবে। ততোদিন একটা আয়া রেখে দেবো।’

‘আচ্ছা, তুমি তো একদিন সচিব হবে, নাকি?’

‘হবো।’

‘তখন আমাকে চিনতে পারবে?’

‘না চেনার কী আছে? তুমি কি ফেসিয়াল সার্জারি করবে নাকি?’

কথা চলে গিয়েছিল অন্যদিকে।

‘তুমি বাচ্চা-কাচ্চা নিচ্ছো না কেন? বিয়ের দু’বছর তো হয়ে গেলো।’

‘তোমার ভাই পারে না।’

‘পারে না মানে?’

‘তার সমস্যা আছে। আমি আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে চট্টগ্রামে কথা বলেছিলাম।’

‘সমস্যা তোমারও তো থাকতে পারে।’

‘আমি কুমিল্লায় টেস্ট করিয়েছি। আমার সমস্যা নাই। সমস্যা তোমার ভাইয়ের।’

‘ভাইকে বলেছিলে ডাক্তার দেখানোর কথা?’

‘একবার বলে থাপ্পড় খেয়েছিলাম। তাই আর বলি না।’

ভাবী একসময় উঠে গিয়েছিল বেডরুমে। আলমারি খোলার শব্দ পেয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে একটা কাগজে মোড়ানো স্কচ টেপ দিয়ে আটকানো ডায়েরি দিয়েছিল আমার হাতে। তারপর বলেছিল,

‘দেখো রায়হান, এটা আমার একটা ডায়েরি। গত দু’বছরের উল্লেখযোগ্য দিনগুলোর নোট রেখেছি এতে। তুমি এটা কখনো খুলবে না এবং পড়বে না। যদি কখনও আমি হারিয়ে যাই সেদিন তোমার অনুমতি রইলো পড়ার। নট বিফোর দ্যাট।’

হাসছিল ইরা ভাবী। আমি প্রশ্ন করেছিলাম,

‘তুমি হারিয়ে যাবে কেন?’

‘হারিয়ে যাওয়া মানে মরে যাওয়া।’

‘এই বয়সে তুমি মরে যাবে কেন?’

‘মৃত্যুর জন্য কি বয়স লাগে?’

খুবই হেঁয়ালিপূর্ণ ছিল কথাগুলো। আমি রাগ করেছিলাম ভীষণ। তাই দেখে ভাবী বলেছিল,

‘তুমিও তো মরে যেতে পারো, তাই না?’

‘না ঠিক আছে তোমার কথা। কিন্তু তুমি ওভাবে বললে কেন?’

আমিও বোধহয় অবুঝের মতো কথা বলছিলাম।

ডায়েরিটা এনে আমি হলে আমার স্যুটকেসে রেখে দিয়েছিলাম, পরে আবার বেশি যতেœ রাখবো বলে নরসিংদীতে নিয়ে বাড়িতে রেখে আসি আমার ফাইল ক্যাবিনেটে।

আম্মা কি কিছু সন্দেহ করেছিল?

‘তোমার দেখি আইজকাইল পড়াশুনায় খুব একটা মন নাই। হুটহাট বাড়ি চলে আসো। ভার্সিটি কি বন্ধ?’

‘না আম্মা, ক্লাস চলছে।’

‘তো ক্লাস বাদ দিয়ে বাড়িতে এসে বসে থাকো কেন?’

‘আম্মা, কোনো অসুবিধা?’

‘না, অসুবিধা আর কি। একদিন তোমার সামাদ ভাই এসে কী সব বলছিল, আমার ভালো লাগেনি।’

‘লোকটা ভালো নয় আম্মা, ভাবীর গায়ে নাকি হাত-টাত তুলে। আপনি শুনেছেন কিছু?’

আমি ‘নাকি’ ব্যবহার করে বিষয়টার মধ্যে একটা অস্পষ্টতা ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম যাতে আম্মা আমাকে সন্দেহ করতে না পারেন। আম্মা একটু বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন যেন একটি অসম্ভব কথা তিনি আমার মুখ থেকে শুনতে পেলেন।

‘হাত তুলেছে নাকি? তোমাকে কে বললো?’

কিভাবে আম্মার কাছ থেকে বিষয়টা লুকোবো ঠাহর করতে পারছিলাম না। হঠাৎ করে হাত তোলার কথাটা বলে দেয়া আসলে ঠিক হয়নি। আমি কথাটা অন্যদিকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিলাম।

‘সামাদ ভাই নাকি ভাবীকে চাকরি করতে দেবেন না। আপনাকে বলেছেন কিছু?’

‘তুমি এতো কথা জানো কিভাবে?’

‘ঐ যে সেবার এলাম, ভাবীর চাকরি হয়েছে শুনে মিষ্টি খেতে গিয়েছিলাম, তখনই ভাবী বলেছিলেন।’

‘চাকরি করবে এতে দোষ কিসের? এমন চাকরি ক’জন পায়? সামাদটা এখনও গ্রাম্য থেকে গেলো।’

‘আম্মা, আপনি মনে হয় ঠিক বললেন না। চাকরি করতে দেয়া না দেয়ার সঙ্গে গ্রাম্যতার কিছু নেই। গ্রামের সব বাবারাই এখন মেয়েকে চাকরি করতে দিচ্ছে। এটা আসলে মানসিকতার ব্যাপার। লোকটার মনটা খুব ছোট।’

‘বউ বড় চাকরি করবে এটাতে মনে হয় তার প্রেস্টিজে লাগছে?’

আম্মার এই মূল্যবান কথাটা আমি ইরা ভাবীকে বলেছিলাম।

আরো বলেছিলাম,

‘ভাবী, যাও না একদিন আম্মার কাছে। আম্মাকে বলো। আম্মা হয়তো তোমার বদ স্বামীটাকে একটু সাইজ করে দিতে পারবে।’

ইরা ভাবী যায়নি।

কিন্তু ও যেভাবে গেলো সেটাও তো আমি-আমরা কেউ চাইনি। ইরা ভাবীদের বাসার কাছে যখন পৌঁছলাম তখন সকাল সাড়ে ন’টা। বেশ কিছু লোক বাইরে দাঁড়িয়ে, যেন তামাশা দেখছে। পুলিশও চোখে পড়লো।

আলতামাস বললো,

‘পুলিশ সব মাপজোক করতেছে, আলামত নিতেছে। ভিত্রে যাওয়ার দরকার নাই, খাড়ায়া থাক।’

শুনলাম আব্বা-আম্মাও এসেছেন, ভেতরে আছেন। কুমিল্লা-ভৈরব থেকে আত্মীয়-স্বজনরা এসেছেন। সামাদ ভাই পাথরের মতো বসে আছেন একটা চেয়ারে।

পুলিশের একটা গাড়ি আসলো, লাশ নিয়ে যাবে মর্গে, ময়নাতদন্ত হবে। পুলিশকে খুব উৎসাহী মনে হলো।

আলতামাস আবার বললো,

‘এইসব কেস পাইলে, বুঝলা দোস্ত, পুলিশ খুব খুশি হয়।’

এতো কষ্টের ভেতরও হাসি পেলো আমার।

কেউ একজন ভেতর থেকে খবর দিলো লাশের পাশে একটা সুইসাইড নোটও পাওয়া গেছে।

‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। ময়নাতদন্তের প্রয়োজন নেই, থানায় মামলার প্রয়োজন নেই, কাউকে জিজ্ঞাসাবাদেরও প্রয়োজন মনে করি না। লাশটি কুমিল্লা পাঠিয়ে দেবেন দাফনের জন্য।’

সুইসাইড করেছে ইরা ভাবী। আজ সকালে তার চাকরিতে যোগদান করতে যাবার কথা ছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। রাতে এ নিয়ে সামাদ ভাইয়ের সাথে তার বেশ কথা কাটাকাটি হয়, সামাদ ভাই হুমকি দিয়েছিল এই বলে যে, যদি সে সকালে ঘর থেকে বের হয় তবে সে যেন এই বাসায় ফিরে না আসে।

ইরা ভাবী আর ফিরে না আসার সব প্রস্তুতি নিয়েছিল, ব্যাগ এবং ট্রলি স্যুটকেসটা গুছিয়ে রেখেছিল। এই বাসা থেকে তার সব চিহ্ন সে ঢুকিয়ে নিয়েছিল ব্যাগে, তার প্রিয় কলমটাও তুলে নিতে ভুল করেনি। স্বামীর সঙ্গে এক বিছানায় শোয়ার ইচ্ছে হয়নি তার। ড্রয়িংরুমেই সে শুয়েছিল ছোট সিঙ্গেল বেডের খাটটায়। কিন্তু কখন যে সে একটা একটা করে পঞ্চাশটা ঘুমের বড়ি খেয়েছিল, কেউ জানে না। খুব ভোরে তার নিথর ঠাণ্ডা দেহ পড়েছিল বিছানায়। হাত দিয়েই সেটা টের পান সামাদ ভাই।

আব্বাকে প্রথমে ফোন করেন।

আম্মার কানে যায় কথাটা।

আম্মা ফোন করেন আমাকে-

‘তোমার ইরা ভাবী সুইসাইড করেছে। বাড়িতে আসো।’

সুইসাইড নোট থাকার পরও পুলিশ সামাদ ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যায়। বাড়িটা সিল করে দেয় তদন্তের প্রয়োজনে। দু’জন পুলিশ পাহারায় রেখে যায়।

ইরা ভাবীর সুইসাইড নোট নিয়ে আব্বা কথা বলেন ডিসি-এসপি’র সাথে। নোটটিকে সম্মান করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ পাঠিয়ে দেয়া হয় কুমিল্লায়, মামলা করা হলো না, সামাদ ভাই বাসায় ফিরে গেলেন, সিজ করা বাসা খুলে দিলো পুলিশ।

আমার জন্য একটা চিঠি থাকার কথা ছিল এই বাসায়। ইরা ভাবী একদিন একটা জায়গা দেখিয়ে বলেছিল,

‘আমি যেদিন এ বাসা থেকে চলে যাবো, তুমি তো আসবে তোমার ভাইয়ের বাসায়, খুঁজে দেখো একটা চিঠি পাবে। তোমাকেই লেখা।’

পুলিশ জানলো না, পৃথিবীর কেউ জানলো না, শুধু আমি জানলাম ইরা ভাবীর সুইসাইড কেস। কয়েকদিন পর সামাদ ভাইয়ের বাসায় যাই। সবার অগোচরে সেই জায়গাটায় আমি পেয়ে যাই তার চিঠি, আঁকাবাঁকা অক্ষরগুলো, বোঝাই যায় মন খুব অস্থির ছিল। কিন্তু লিখেছে সবকিছু। পৃথিবীর একজনকে সে জানিয়ে গেছে তার শেষ কথাগুলোকে। ডায়েরিটা পড়া হয়নি, ভয় করছে পড়তে।

ইরা ভাবীর জন্য কষ্ট, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় আমার চোখ বেয়ে নামতে থাকে অঝোর কান্না। বহুদিন এমন কান্না আমি কাঁদিনি। হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj