প্রেমার চিঠি : হারুন হাবীব

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

প্রিয় পিকু, অনেক বছর পর তোকে লিখতে বসেছি। একবার ভেবে দেখ, কত বছর! তোর ঠিকানাটা হঠাৎই আবিষ্কার করে ফেললাম। বলতে পারিস প্রায় স্বপ্নে পাবার মতো। এমন অজ এক পাড়াগাঁয়ে থাকি যে তোদের ঢাকা নগরীর অনেক খবরই আজকাল আমার রাখা হয় না। রাখিও না। প্রয়োজনও পড়ে না। মানুষের জীবনে এমন সময় আসে যখন এক সময়ের ভীষণ দরকারগুলোও অপ্রয়োজনীয় ঝরাপাতা হয়ে যায়। গা ছমছম করে ওঠে, মাড়াতে কষ্ট হয়, কিন্তু উপায় থাকে না। যখন মনে হয় থেমে গেলে কি চলে, আরো তো পথ চলতে হবে, তখন ভাবি, এ রকম ঝরাপাতার স্ত‚পে আগুন লাগলে তো পুড়েই মারা যাবো। কাজেই দূরে সরিয়ে দিতে না পারলেই বিপদ। জীবনের এই পলায়নপরতা আমার জন্য কষ্টদায়ক, কিন্তু অস্বীকার কি করতে পারি, বল?

জেনে অবাক হবি পিকু, কত বছর পর তোকে আজ এই চিঠি লিখছি! টেলিফোন এখন প্রায় ঘরে ঘরে। মোবাইল ফোনে দেশ সয়লাব। কাজের কথা তাই অতি সহজেই বলা যায়, চিঠি লেখার দরকার হয় না। কিন্তু যে কথা ‘কাজের’ নয় তা কি করে জানাবো রে? ফোনে না চিঠিতে? ইন্টারনেটের এই যুগে সাদা কাগজের ওপর কালির আঁচড়ে মনের ভাষা লিখতে যাওয়ার বিড়ম্বনা সইবে কেন আধুনিক যুগের বুদ্ধিমান মানুষ?

আমার কি মনে হয় জানিস, চিঠি যেভাবে, যে যৌগ্যতায় মনকে প্রকাশ করে- তার কোনোই তুলনা নেই! আমাদের বর্ণমালা, এক একটি অক্ষর, এক একটি কলমের আঁচড় এতো নিখুঁতভাবে আবেগ, ভালোবাসা, ক্রোধ, দুঃখ, না বলা কথা, জোড়া লাগা ও বিচ্ছেদ মেলে ধরতে পারে, আর কিসে পারে বল? অথচ দেখবি এখন আর চিঠিই লেখা হয় না! মানুষ কতোটা নির্বোধ বল! টেলিভিশনের পর্দায় এভারেস্ট দেখে লোকজনে ভাবে, কি আর এমন! এমন কি আর পাবার আছে!

পিকু, তোর মনে আছে, আমাদের ডিপার্টমেন্টে ‘হাবাগোবা’ মতো একটা ছেলে ছিল। আমাদের সিনিয়র কিন্তু ক্লাস ফ্রেন্ডের মতোই। ভীষণ শান্তশিষ্ট। পড়ালেখাতেও ভালো। ছেলেটা আমাদের দুজনের দিকে কেমন ড্যাবড্যাব করে তাকাতো! আমরা একসাথে হাঁটলে, বসে থাকলে, গল্প করলে ওর চোখ পড়তোই। আমরা ফিরে তাকাতেই আবার ত্বরিত মুখ ঘুরিয়ে নিতো! মনে পড়ে, প্রথম প্রথম আমরা দুজনেই বেশ রেগে যেতাম। নিজেরা বলাবলি করতাম- এ কেমন ছেলেরে! অবশ্য ধীরে রাগ কমেছে। ওর চাউনিকে নিষ্পাপ প্রয়োজন মনে হয়েছে। তোর মনে আছে, শেষ পর্যন্ত একদিন আমি-তুই মিলে ঠিক করলাম ক্লাস ছুটির পর ওর মুখোমুখি হবো। কিন্তু লাভ হয়নি। মুখচোরা ছেলেটা আমাদের হাবভাব দেখেই পালিয়েছে।

অনেক আগের কথা রে পিকু। মনে পড়ে, ছেলেটাকে নিয়ে আমরা বিস্তর কথাবার্তা বলতাম। তুই ও আমি বটতলা না হয় মধুুদা’র ক্যান্টিনে গিয়ে বসতাম। আমি বলতাম, আমাকে নয়- তোকেই দেখে পিকু। আর তুই বলতি, নারে প্রেমা, তোকেই।

বটতলায় একদিন আমরা বসে আছি। কলা ভবনের বারান্দাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তুই হঠাৎ চিৎকার করে উঠলি- দেখ দেখ তোকে দেখছে! আমাকে দিকে এক্কেবারে না।

তোর ডাকে আমি চোখ ফেরালাম। কিন্তু কি দেখলাম? না, আমাকে না, দেখছে তোকেই। কিন্তু তুই আমাকে কিছুতেই বিশ্বাস করলিনে।

সেদিন আবারো আমরা চেষ্টা করলাম ছেলেটার মুখোমুখি হতে। ক্লাস শেষ হতেই তাড়াতাড়ি উঠে গেলাম। কিন্তু সেবারেও বোধকরি পালালো। তোর মনে পড়ে, তারপর আমরা দুজনে অনেকক্ষণ ধরে হাসলাম। কি যেন নাম রে ওর? (তোরই তো বেশি মনে থাকার কথা! বুঝলি, কেন টিপ্পনিটা কাটছি?)

সেই ‘ছেলেটার’ (!) কাছেই ক’দিন আগে তোর ঠিকানাটা পেয়ে গেলাম! বুঝলি, ও এখন সমাজকল্যাণ বিভাগের বড় কর্মকর্তা। আমাদের গ্রামে (মনে পড়ে, যে গ্রামটায় তোকে নিয়ে এসেছিলাম?) একটা ছোট সংগঠন করি আামি। গরিব গ্রামবাসী মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করার একটা অতিসাধারণ চেষ্টা বলতে পারিস। এমন বড় কিছ বা গুরুত্ব¡পূর্ণ সংগঠন নয়। নিজের চেষ্টায়, নিজের সাধ্যে কিছু করা আর কি! অজপাড়াগাঁ তো, রেললাইনও এখান থকে মাইল আটেক দূরে। বেশ কয়েক বছরে সংগঠনটার কিছু পরিচিতিও জুটেছে। সে কারণে মাঝেমধ্যে সরকারি-বেসরকারি লোকজন আসেন। আমাদের কাজকর্ম দেখেন, কথাবার্তা বলেন, সাহায্য-সহযোগিতার আশ্বাস দেন। প্রশংসাও করেন, বলেন, মহৎ উদ্যোগ, ভালো কাজ করছেন- ইত্যাদি। কিন্তু আমি তো জানি, এ তেমন আর কি। তবে, তোকে বলতে দ্বিধা নেই, যেহেতু ক্ষুদ্র মানেই তুচ্ছ নয়, সেহেতু উদ্যোগটি শান্তি দেয়।

বলাই বাহুল্য, উদ্যোগটি সরজমিন তদারকি করতেই ভদ্রলোক এসেছিলেন আমাদের গ্রামে। জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের কিছু অফিসারও সাথে ছিল ওর। খবরটা আগেই জানা ছিল আমাদের। কাজেই খাতির-যতেœর অভাব হয়নি। আর যাই হোক একেবারে ঢাকা থেকে এই অজ পাড়াগাঁয়ে কিনা!

আমাদের সংগঠনের মেয়েরা হাতে তৈরি খাবার পরিবেশন করলো। খেতে খেতে লোকটা বার কয়েক আমার চোখের দিকে তাকাবার চেষ্টা করলো। বিশ্বাস কর, আমি তাকাতেই সে চোখ ঘুরিয়ে নিল। আমার তখন পুরনো একটা সন্দেহ জেগে উঠলো। মনে পড়লো, এ রকম তো করতো একজনই, তোর আর আমার বয়স যখন বিশ-একুশ।

তিন-চার ঘণ্টা ছিলেন অফিসার সাহেব। ঘণ্টায় ঘণ্টায় সন্দেহ বাড়তে থাকলো আমার। বিশ্বাস কর- একবার ঠিক চিনে ফেললাম। কিন্তু সে-ই কি আগে চিনে ফেলেছিল আমাকে! কিভাবে? কোনটা সত্য বুঝতে পারিনি। বোঝার চেষ্টাও করিনি। আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে-ই আগে প্রশ্ন করলো,-আপনি কি প্রেমা? এইট্টিওয়ানের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন?

-হ্যাঁ। ছিলাম।

-আপনি কি…?

লোকটা থামলো, আর বাড়ালো না। ঠিক আগের মতোই চোখ ঘুরিয়ে নিল। খানিক বাদে বললো,- ভালো আছেন?

-এই তো, চলছে। ছোট্ট উত্তর দিলাম।

নিজেকে নিজেই তো চিনতে পারিনে এখন, ওজন যা বেড়েছে! বুড়িয়ে যাওয়া যাকে বলে! দেখেও তুইও চিনতে পারবিনে। তুই কেমন রে? আগের মতোই পাতলা আছিস? চটপটে? নাকি আমার মতো?

তোর মতো সুন্দর কখনই ছিলাম না আমি, (টিপ্পনি নয়, রাগ করিসনে ভাই) সে-তো জানিসই। কিন্তু শ্রষ্টা মানুষের মুখে এমন কিছু চিহ্ন এঁকে দেন- যা কোনো বয়সেই পুরনো নাম, পুরনো মানুষকে আড়াল হতে দেয় না। তা না হলে আমারই বা সন্দেহ হতে যাবে কেন? মনে হচ্ছিল নিশ্চয়ই ভদ্রলোককে দেখেছি, নিশ্চয়ই ওকে চিনি। চিনবো না আবার! কি কাণ্ডটাই না দুজনে করতাম! মনে পড়ে তোর?

অবাক হচ্ছিস? হবারই কথা। ও রকম একটা যাচ্ছেতাই ‘গবেট’ (কথাটা কিন্তু তোর, আমার নয়, মনে পড়ে? ) শেষ পর্যন্ত ‘লাইফে’ এমন ‘সাইন’ করবে- ভাবতেও পারিনি। অবশ্য কাকে ‘সাইন’ আর ‘সাকসেস’ বলবো? ধুত্তরি, এসব নিয়ে আমি আর ভাবতে চাইনে।

রাগ করিস নে পিকু, আমার কিন্তু ধারণা, তুই ‘ট্রেন মিস’ করেছিস। আমার কথাটা তুই মানতেই পারতি। ওকে নিয়ে অনেক কথাই তো বলেছিলি। এক সময় ঠিক করলি বিয়েও করবি। আর আমি? থাক, আমারটা থাক।

ভাবতে পারিস, ওই ছেলেটাই এখন ডাকসাইটে অফিসার, যাকে ওর আশপাশের লোকজন ‘স্যার’ বলে ডাকে! আমার অবশ্য ‘স্যার-টার’ বলা সয় না। স্বাধীনভাবে কাজ করি। সাধ্যমতো মানুষের উপকার করার চেষ্টা করি। সবসময় যে পারি তাও না। অন্তত অপকার তো হয় না। এটুকুনই কি কম?

যা হোক, তুই নিশ্চয়ই ভাবছিস জীবনটাকে যেভাবে দেখতে চেয়েছিলাম সেভাবে পাইনি বলে আজ নিজের কাছেও আমি বিচ্ছিন্ন, পরাজিত। তা নয়রে পিকু। শুনেছি, বাবা-মার নির্দেশে বা পরিস্থিতির চাপে তুই শেষ পর্যন্ত অপছন্দের ‘বড়লোক’ ছেলেটাকেই বিয়ে করেছিস। তুই এখন বড় ব্যবসায়ীর স্ত্রী। এ রকম ঘটনা বেশির ভাগ মেয়ের কপালেই ঘটে। যা চায় তা পায় না, যা পায় তাই আপন হয়। বিশ্বাস কর- তোর মতো বিদ্রোহী মেয়ের ‘মানিয়ে নেয়ার’ ব্যাপারটা আমাকে অবাক করেছে। না, এ তোর ভাগ্য নয়; নয়ই বা বলি কেন! শুনেছি তুই ভালো আছিস। স্বামীভক্ত স্ত্রী। মানিয়েও নিয়েছিস বেশ। ছেলেমেয়েও বড়সর। কয়টা রে? গণ্ডা গণ্ডা নয়তো? তুই তো দুটোর বেশি চাইতিনে?

কিন্তু কথা হচ্ছে পিকু, এই যে মানিয়ে নেয়া- ওতেই আমার যত ক্রোধ। কারণ মানিয়ে তো নিতে শিখলাম আমরাই, ওরা কি?

কী বিস্ময়কর, তুই ও আমি দুজনেই এক সময় দুজনের কাছ থেকে হারিয়ে গেলাম। হারাবার প্রক্রিয়াটাও কী ভয়ঙ্কর রে, পিকু! একদিন একটা টর্নেডো এলো, তোকে এবং আমাকে আধমরা করে সারাজীবনের মতো ভাগ করে দিল! এভাবে কি মানুষ ভাঙে রে, যেভাবে আমরা ভাঙলাম?

হ্যাঁ, আমিও বিয়েথা করলাম। তোর খানিকটা পরেই। দিব্যি দিয়ে বলতে পারি, তোর ওপর রাগ করে নয়। রাগটা এ কারণে যে, দেখ, তুই আর আমি এতোগুলো বছর ধরে যে সংগ্রাম, যে প্রতিজ্ঞা করলাম, তার কি হলো? পারলাম কি জীবনটা বদলে দিতে? পারলাম কি আমাদের দাদি, আমাদের নানি আর মায়েদের কষ্টটা আমাদের প্রজন্মের বিদ্রোহে সার্থক করতে?

বিশ্বাস কর পিকু, এ প্রশ্নের মীমাংসা আজো আমার হয়নি। অথচ দেখ, কী দিব্যি ছিল তোর ও আমার! আমরা শুধু বন্ধুই ছিলাম না, ছিলাম কমরেড। আমাদের প্রতিজ্ঞা ছিল, পুরুষের শারীরিক ও আর্থিক প্রধান্য আমরা ভাঙবোই, জয়ী আমরা হবোই। এবং যদ্দিন না সমান সুযোগ সমান অধিকার হচ্ছে, যদ্দিন না আমরা সাবলম্বী হচ্ছি, তদ্দিন কেউই আমরা বিয়েথা করবো না। কারণ আমরা জানতাম, বিয়ে কেবল জৈবিক নয়, পুরুষেরই ঘর নয়, বিয়ে এক যৌথ পাণ্ডুলিপি- যার রচয়িতা নারী ও পুরুষ সমানভাবে।

কিন্তু পিকু, ভেবে দেখ, পরাজয় না মানলেও বিজয়ী কি হতে পারলাম? আজ এই মধ্যবয়সে এসে প্রশ্ন করি- আমাদের সেই অহঙ্কারের মাঝেই কী কোনো পরাজয় লুকিয়ে ছিল? কিন্তু না, আমি দৃঢ়চিত্ত, বিজয়ের মুখ হয়তো দেখবো, হয়তো কেন- নিশ্চয়ই দেখবো। আমি আশাবাদী রে পিকু। মেয়েরা আগে নিজে পরিচিত হতো না, কিন্তু এখন হয়। দিন আসছে, আরো হবে, পুরুষের শরীরী সাম্রাজ্য ভাঙবে।

তোর নিশ্চয়ই মনে পড়বে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল টপকাতেই শুরু হলো জীবনের আসল বিড়ম্বনা আমাদের। ছাত্রীবাস ছাড়তে হলো, কিন্তু থাকবার জায়গা কই? নিজেরা যে কিছু করবো তারই বা সুযোগ কই? বাবা-মা তেমন শিক্ষিত নন- গ্রামের মানুষ। বড়লোক নয় যে, চাইলেই ঢাকা শহরে একটা বাড়ি ভাড়া করে আমাদের আদর্শ প্রচারের সুযোগ করে দেবে! তাছাড়া অবিবাহিতা দুটো মেয়ে একা একা ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়া করে থাকবে, এও কি মানা যায় নাকি!

অথচ দেখ, তোদের ঢাকা শহরেই এমন অগণিত মেয়ে আছে যারা দিব্যি স্বাধীন জীবনযাপন করে; শুনি, যা ইচ্ছে তাই নাকি করতে পারে। আমি অবশ্য যা-ইচ্ছে তাই করাটাকে কখনো আদর্শ ভাবিনে। তুইও না। আদর্শ নয়ও হয় না, স্বাধীনতা হয় না। যাক সে কথা। নিজেদের বলে তো কিছু আছে, নাকি?

তোর কি মনে আছে রে পিকু, সেই যে উপায়ান্ত না দেখে, আমরা যখন একটা মেয়েদের সংগঠনে যোগ দিয়েছি, তখন কী এক কাণ্ড ঘটলো?

বয়স কম ছিল বলে মিছিলে জোর গলায় স্লোগান দিতাম তো আমরাই। ছবি তোলার জন্য থাকতেন নেতারা। শ্রম দেয়ার জন্য আমরা, বেশির ভাগ সংগঠনের এই নাকি রীতি!

একদিন আমাদের সংকট পাড়তেই এক নেত্রী বলে উঠলেন, তোমরা ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছো। এখনই বিয়েথা কেন? কোনো দরকার নেই। আমরা বিয়ে করে ঠকেছি। তোমাদের মতো মেয়েরা যদি সাহসী না হয় তাহলে সমাজ বদলাবে কে? আমি তোমাদের লেডিস হোস্টেলে থাকবার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আমার সঙ্গে দেখা করো।

বিশ্বাস কর, আজো আমার গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। ভদ্রমহিলা, কী যেন নাম রে, শেষ পর্যন্ত আমাদের দুজনের জন্য একটা হোস্টেলে সুপারিশ করলেন। কাজও হলো। কিন্তু আমরা বেশিদিন থাকতে পারলাম না। সন্ধ্যার পর পরই গেট বন্ধ। ‘সান সেট রুল’! যুক্তি হচ্ছে, এটা মেয়েদের হোস্টেল, ছেলেদের নয়। ছেলে তো ছেলেই। ওরা দেশময় ঘুরতে পারে, রাতভর নির্বিঘ্নে চলতে পারে, কিন্তু মেয়েরা কেন? অতএব হোস্টেলে থাকতে হলে সন্ধ্যার মধ্যেই খোয়াড়ে ঢুকতে হবে। নিজেদের বাঁচিয়ে চলতে হবে। সবচে অবাক হই, আমাদের সেই নেত্রীও যখন একই কথা বলেন! কাজেই আর থাকা হলো না।

তুই বিশ্বাস কর পিকু, অনেক বছরের অভিজ্ঞতায় আমার এই বোধ জন্মেছে যে, কেবলমাত্র ছেলেরাই মেয়েদের অগ্রগতির পথকে রুদ্ধ করে না, করে মেয়েরাও। বুঝে কিংবা না-বুঝে। তা না হলে আমরা কেন সেদিন একযোগে এ প্রতিবাদ করতে পারিনি যে ছেলেরা যে সুযোগ পায় মেয়েরাও তা পাবার অধিকারী। নারী অর্ধেক মানুষ নয়! নারী পুরুষের সম্পত্তি নয়। পুরুষ যেমন নারীকে চায় নারীও চায় পুরুষকে। নারী স্বাধীনতার কথা বলবো অথচ মেয়েদের বলবো, তোমরা ঘরে থাক….. কারণ তোমরা মেয়ে। বলবো, ছেলেরা যা পারে তা তোমরা পারো না। এ বৈপরীত্ব আমাদের কবে ঘুচবে- কে জানে?

তোর স্বামী কি আচরণ করে জানিনে পিকু, আমি কিন্তু আমার স্বামীকে বোঝাতে সক্ষম যে (এখনো পর্যন্ত)- শোন, অঙ্গন আর প্রাঙ্গণ যাই বলো তোমার আর আমার তা সমান। তোমার দিন যেমন আমার রাত নয়, আমারও রাত তোমার দিন নয়। আমি যদি তোমার সম্পত্তি হই তুমিও আমার। দয়া করে ভুল করো না।

লোকটা ভালো রে। আমার কথা শোনে হাসে। কিছু উত্তর দেয় না।

যা বলছিলাম। মনে আছে তোর, হোস্টেল থেকে বিতাড়িত হয়ে পরিচিত কতজনের বাসাবাড়িতে গেলাম, কতজনকে অনুরোধ করলাম। সবাই প্রায় এক বাক্যে বললেন, না না- ঠাঁই নেই। শুধু এ কারণে যে, আমরা দুজনেই বয়স্থা, তাও আবার মেয়ে। সাথে ছেলে বা স্বামী না থাকলে কি বাসাবাড়ি ভাড়া দেয়া যায়! কত ঝামেলা, কত সংকট, কে সামলাবে?

ভেবে দেখ, আমাদের সমাজে ছেলেরা কিন্তু কখনো এ ঝামেলায় পড়ে না। হাসি পায় ভাবতে, এ সমাজেই আমাদের মেয়েরা বিশ্ব নারী দিবস পালন করে! পুরুষ দিবস পালন করার প্রয়োজন হয় না।

পিকু, তোকে আজ একটা কথা বলেই ফেলি। রাগ করলেও করতে পারিস। কিন্তু কথাটা আমি বলবো এ জন্য যে, তুই আমার চেয়ে কম করেও পাঁচ বছর আগে বিয়ে করেছিস। না, বিয়েটাই একমাত্র নয়। বিয়ে না করার মাঝে বিপ্লব-বিদ্রোহ কিছুই নেই। কিন্তু বিয়ে মানেই হারতে হবে কেন? কথাটা হচ্ছে এই, তুই আর আমি মিলে একদিন (মনে আছে?) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে তিনতলার খিলআঁটা এক কামরায় বসে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম সে প্রতিজ্ঞার কিছুটা হলেও আমি কিন্তু রক্ষা করেছি। জেনে খুশি হবি, আমার স্বামী আমার অভিভাবক নয়, আমরা দুজনের বন্ধু, কখনো সাময়িক প্রতিপক্ষ, কিন্তু একে অপরের পরিপূরক। কখনো আমি ওর অভিভাবক, কখনো ও আমার। আমাদের একমাত্র মেয়ে চৈতি। এখন কলেজে যায়। তোর কি খবর রে?

অন্তত এটুকু বলতে পারি, আমি কাছে দেয়া প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে চেষ্টা করেছি। পরিপূর্ণ বিজয়ী হয়নি মানি, কিন্তু একেবারেই কি হেরে গেছি? হয়তো এভাবেই সভ্যতা গড়ে ওঠে। তিলে তিলে গড়ে ওঠে। হয়তো সবটা মিলে না। কিন্তু সবটা পাবার জন্য সংগ্রাম করে যেতে হয়।

অনেক আগের কথা মনে পড়ছে পিকু। তোর ‘পিকু’ নামটা এতো ভালো লাগতো যে, দেখ, এতোকাল পরও তোকে একটা চিঠি লিখতে গিয়ে বারবার শুধু ‘পিকু পিকুই’ বকে যাচ্ছি। সেই চিঠি লেখার বিদ্যে, যা স্কুল-কলেজে মুখস্থ করেছিলাম, আজ যেন উবেই গেছে। দেখ, পুস্তকের মুখস্থ করা বিদ্যে কতো সমূলে বদলে যায়! কেবল আকাশ বদলায় না, পৃথিবী বদলায় না, কারো কারো বিশ্বাসও বদলায়!

তুই নিজের জীবন থেকেই তা হয়তো অনুভব করতে পারবি। অবশ্য এটিও ঠিক যে, মানুষের মৌলিক বিশ্বাস বদলাতে নেই। তাতে নিজের কাছেই পাপ জমে ওঠে, যা মোচন করা যায় না। জন্ম যেমন বদলায় না, মৃত্যু যেমন বদলায় না, মৌলিক বিশ্বাসও না। গাছের গুঁড়ির মতো সে আসল অবয়বে বাড়ে, রোদবৃষ্টির হেরফেরে চেহারার পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু সমূলে উৎপাটিত হয় কী?

শেষ করার আগে বলি, পিকু, আমাদের দুজনেরই এককালের পরিচিত সেই ভদ্রলোকের স্ত্রী ভাগ্য কিন্তু মন্দ। বয়েস পঞ্চাস পেরিয়েছে। এখনো আগের মতোই চুপচাপ। রীতিমতো যেন দার্শনিক, যে নামে তুই-ই ডাকতি কখনো কখনো! ভাবলাম একটু বাড়াবাড়িই হয়ে যাবে, কাজেই বেশি কিছু জিগ্যেসও করা হলো না। এখনো কি সে একা। এককালের সতীর্থ বলেই জিজ্ঞেস করলাম, কি ব্যাপার?

সরাসরি উত্তর দিলেন না। মাথা নিচু করে জিজ্ঞেস করলেন,- বেশ তো আছি। আপনিও তো ভালো আছেন?

-দেখতেই পাচ্ছেন।

-হ্যাঁ, আপনাকে দেখছি, কিন্তু পিকু?

খুবই অবাক হলাম। প্রশ্ন করলাম- কেন ওর ফোন নম্বর, ঠিকানাটা তো আপনিই আমায় দিলেন!

তুই বিশ্বাস কর ভদ্রলোক কোনো উত্তর দিলেন না। জিপে ওঠার আগে শুধু বললেন- আমি ওর ঠিকানাটা রেখে দিয়েছি। কেমন আছে খোঁজ রাখিনে।

পিকু, তোকে সবিশেষ অনুরোধ, আমাকে চিঠি লিখে জানাস, লোকটা কার? তোর না আমার? নাকি দুজনের? আমি ভাই মনস্তত্ত্ব বুঝিনে। উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।

তোরই, প্রেমা। হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj