সেতারা : মানজুর মুহাম্মদ

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

শিশিরমাখা গোলাপগুলো রমিজকে ভাবালুতায় ফেলে দিল। মুহ‚র্তের জন্য রমিজ সব ভুলে গেল। গোলাপ এত সুন্দর হয় কী করে! এই বাগান, হলদে চুনকামের পলেস্তারা খসে পড়া বাড়ি এত মায়াবী হয় কী করে! এ বাড়িতেই যেন পৃথিবীর যত সুখ। কারণ এ বাড়িতে সেতারা থাকে। ডান পায়ের শিশিরে ভেজা বুড়ো আঙুলে ক্যাঁচ করে কী যেন কামড় দিল। রমিজ কঁকিয়ে উঠল। পা তুলে বড়ো বিষাক্ত ডউয়া পিঁপড়াটির ওপর ঠাস করে চড় বসাল। পিঁপড়ার কামড়ে রমিজ সম্বিৎ ফিরে পেল। মুহ‚র্তে রমিজের সন্দেহ হলো- পিঁপড়া কি তার মনের কথা শুনে ফেলেছে? সেতারার বাড়ির প্রতি তার এ গোপন ভাবাবেগ, দুর্বলতা পিঁপড়ারও কি সহ্য হচ্ছে না?

কাঁটাতার মোড়ানো বাগানের ঠিক মাঝখানে সরু পথটার মুখে লোহার রডের প্রধান ফটক। ফটকের লোহার রডের ফাঁক দিয়ে বাড়ির ভেতরের সব দেখা যায়। রমিজ ফটকের ডান পাশে কাত হয়ে থাকা পুরোনো কলিং বেলের সুইচটার কাছাকাছি ডান হাত তুলল। হাতটা প্রচণ্ড কাঁপছে। অগত্যা সে ডান হাত নামিয়ে ফেলল। তার বাম হাতে একটি সরকারি খাকি খাম। আবার মনকে শক্ত করে ধীরে ধীরে ডান হাত কলিং বেলের সুইচ বরাবর তুলল। দ্রুত সুইচের বোতাম চেপে দিল। বাড়ির ভেতর আওয়াজ হলো কিনা বোঝা গেল না। এখনো সূর্য ওঠেনি। প্রচণ্ড শীত পড়েছে। দোতলা সরকারি বাড়িটির বাম কর্নারে হেলে পড়া বিদ্যুতের একটি লাইট জ্বলছে। বোঝা গেল বিদ্যুৎ আছে। কলিং বেল ঠিক থাকলে নিশ্চয় বেজেছে। রমিজ ভয়ে ঠকঠক কাঁপছে, দরদর করে ঘামছে। গায়ে শীতের কোনো কাপড় নেই।

গত রাতেও গায়ে লেপ রাখতে পারেনি। দরদর করে ঘেমেছে। একটুও ঘুমুতে পারেনি। বারবার বেড থেকে উঠে পায়চারি করেছে শুধু। ভোরের আজান হওয়ার সাথে সাথে সে বেরিয়ে পড়েছে। কয়েক মিনিটে উপজেলা কমপ্লেক্সের উত্তর-পূর্ব দিকের শেষ বাড়িটির সামনে পৌঁছেছে। গতকালও সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে সে বাড়িটির সামনে এসেছিল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার ফিরে গিয়েছিল। এরপর থেকে সারাক্ষণ শুধুু মনকে শক্ত করেছে। যে করেই হোক সেতারাকে কনভিন্স করতে হবে। প্রয়োজনে তার পা ধরে হলেও তার থেকে মাপ চাইতে হবে। নয়তো সব শেষ হয়ে যাবে। পৃথিবীতে তার আর বেঁচে থাকার কোনো উপায় থাকবে না। পুবের আকাশ আর একটু ফর্সা হয়ে উঠল, হঠাৎ ঘরের দরজা খোলার আওয়াজ কানে আসল। রমিজ বড়ো বড়ো চোখ করে দরজার দিকে তাকাল। একটি ছোট্ট কাজের মেয়ে মূল ফটকের দিকে এগিয়ে আসছে।

– কারে চান?

– তোমার সেতারা ম্যাডামকে।

– আফনে কে?

আমি সেতারার সাথে একই অফিসে কাজ করি। আমার নাম রমিজ চৌধুরী।

মেয়েটা কিছুই না বলে ঘরের ভেতর চলে গেল। রমিজ অদ্ভুত মায়াভরা চোখে শিশিরে ভেজা গোলাপগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। মনে মনে ভাবছে- আহা! এমন গোলাপ যদি আমার বাগানে ফুটতো! আহা স্রষ্টা যদি এই বাড়িতে সেতারার সাথে আমার বসবাসের সুযোগ দিত…!

সেতারা আর রমিজ ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বর্ষে অনার্স মাস্টার্স করেছে। রমিজের পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেটেছে একজন সেতারার কথা চিন্তা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম যে দিন সেতারাকে দেখেছে সেদিন থেকে আজ অবধি রমিজ যখনি জীবনের কঠিন বাস্তবতায় হাঁপিয়ে উঠেছে, তখনি একটু সুখ খোঁজার জন্য চোখ দুটি বন্ধ করে কল্পনায় সেতারার মুখখানা মনে করার চেষ্টা করেছে। সেতারার কোন রঙ প্রিয়, কোন্ খাবার পছন্দ, সেতারার শখ কী ইত্যাদি ব্যক্তিগত অনেক কিছুই রমিজের জানা। রমিজ সাহস করে সেতারাকে ক্লাসমেট হিসেবে তুমি পর্যন্ত বলতে পেরেছে। এর পর আর এগোতে পারেনি। সেতারা রমিজকে আপনি করেই বলে। একদিন রমিজ তাকে তুমি করে বলার অনুরোধ করে। রমিজ যুক্তিতে বলল- ক্লাসমেটরা একজন আরেকজনকে তুই করেও তো বলতে পারে। সেতারা মৃদু হেসে বলল- রমিজ ভাই, আপনি বয়সে আমার অনেক বড়। রমিজ সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিল। রমিজ কতই বা বড় হবে। এইচএসসিতে মানোন্নয়ন দিতে গিয়ে এক বছর তার দেরি হয়েছে। গ্রামের স্কুলে দেরিতে ভর্তি হয়েছিল বলে আঠার বছরে এসএসসি পাস করেছে। এ আর তেমন কী! না-হয় সে চার-পাঁচ বছর সেতারার থেকে বড় হবে। সেতারাকে কখনো মনের কথা রমিজ বলতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে যে যার মতো নানান দিকে ছড়িয়ে পড়ছে, জড়িয়ে পড়েছে চাকরি যুদ্ধে।

– কী রমিজ ভাই! এত সকালে, কোনো সমস্যা?

সেতারার কণ্ঠ শুনে রমিজ হকচকিয়ে গেল। সেতারা ঘর থেকে ফটক পর্যন্ত এল, কিন্তু রমিজ একটুও টের পেল না। সেতারা নকশি শাল গায়ে রমিজের দিকে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছে।

– তোমার সাথে আমার গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।

সেতারা ভেতর থেকে ফটক খুলে দিয়ে বলল, আসেন, ভেতরে আসেন। খুব ঠাণ্ডা পড়েছে। ঘরে চলুন। চা খেতে খেতে আপনার কথা শোনা যাবে।

রমিজ সেতারার পিছু পিছু ঘরে ঢুকল।

– আপনি বসুন, আমি চা করে নিয়ে আসছি।

রমিজ কিছুই বলল না। চুপচাপ বেতের সোফার সিঙ্গেল একটি সিটে বসে পড়ল। সোফার দুধ-সাদা কভারে রমিজের চোখ আটকে যাচ্ছে বারবার। সাদা এত সুন্দর হয় কী করে! রমিজ আলতোভাবে সোফার সাদা কাপড় ছুঁয়ে দিল। ঘরে আহামরি তেমন কিছু নেই। সেন্টার টেবিলটাও বেতের তৈরি। টেবিলের টপটা স্বচ্ছ কাচের। টেবিলের মাঝখানে রয়েছে একটি জীবন্ত মানিপ্ল্যান্টের বনসাই গাছ। কী সবুজ! কী চকচকে মায়াবী রং! সবুজ এত সবুজ হয় কী করে! রমিজের ইচ্ছে হচ্ছিল সেন্টার টেবিলের মানিপ্ল্যানটা ছুঁয়ে দিতে। নীল রং করা দেয়ালের কিছু কিছু জায়গা কালচে-সাদা হয়ে ফুলে উঠেছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে- বর্ষায় ঘরের দেয়াল পানি চুষে। উপজেলা কমপ্লেক্সের সবগুলো ঘরের একই হাল। তবুও সেতারার ঘরের দেয়ালের নীল যেন আকাশের নীল, যেন সমুদ্রের নীল। সেই নীলে কান পাতলে স্পষ্ট সমুদ্রের ঢেউয়ের গুঞ্জন শোনা যাবে কিংবা আকাশের বুকের ধুকপুক শোনা যাবে। আহা! নীল কী করে এমন নীল হয়! এতক্ষণে মেঝেয় রমিজের চোখ পড়ল। পুরোনো কালশিটে পড়া মেঝেটা কী চকচক করছে! বেলফুল উপজেলার সরকারি বাসার কোনো মেঝে এত চকচকে নয়। এমনকি কৃষি বিভাগের উপজেলা প্রধান রমিজ চৌধুরীর বাসার মেঝেও এমন চকচকে তকতকে নয়।

এ কী! রমিজের পায়ে বালি আর শিশিরমাখা ময়লা সেন্ডেল। রমিজ লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। সে ভেতর ঘরের দরজার পর্দার দিকে তাকাল। স্রষ্টাকে করজোড়ে অনুরোধ করল- সেতারা যেন ঠিক এ মুহ‚র্তে ড্রইংরুমে চা নিয়ে না ঢুকে। রমিজ দ্রুত পা থেকে সেন্ডেল জোড়া খুলে হাতে তুলে নিল। ধীরে ধীরে দরজার কাছে গিয়ে স্ট্যান্ডে সেন্ডেল জোড়া রেখে যখনি দাঁড়াল, ঠিক তখনি সেতারার গলার আওয়াজ শুনল- পরী, কই গেলি। রান্নাঘরে আয়। রমিজ দ্রুত সোফায় গিয়ে বসে পড়ল। সেতারা বেগমের চা তৈরির টুংটাং শব্দ রান্নাঘর থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

রমিজের কৃষি বিভাগে সরকারি চাকরি হওয়ার পরবর্তী বছর সেতারারও কৃষি বিভাগে সরকারি চাকরি হয়। রমিজ তার চাকরি হওয়ার দু-বছর পর এক ক্লাসমেট থেকে এ খবর শুনেছে। যদিও রমিজ ইতোপূর্বে বিয়েপর্ব সেরে ফেলেছে, তবুও কৃষি বিভাগে সেতারার চাকরি হয়েছে শুনে রমিজ তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছিল। সেতারার ফোন নম্বর পরিবর্তন হয়েছিল বলে রমিজ যোগাযোগ করতে পারেনি। যোগাযোগের অন্য কোনো সূত্রও পায়নি। স্ত্রী লীনা ও দুই সন্তান নিয়ে বেলফুল উপজেলায় সরকারি বাসায় উপজেলার প্রধান কৃষি কর্মকর্তা রমিজ চৌধুরীর গতানুগতিক সংসারজীবন একরকম নীরবেই কাটছিল। গত মাসের এক তারিখ সেতারা যখন বেলফুল উপজেলা কৃষি অফিসে বদলি হয়ে এল, তখন থেকে রমিজের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। সেতারার যোগদানের দিন রমিজ সেতারার যোগদানপত্র টাইপ করা থেকে শুরু করে বেলফুল উপজেলায় সুবিধা-অসুবিধা বর্ণনাসহ যোগদান সংক্রান্ত সকল খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ব্যতিব্যস্ত থেকেছে। বেলফুল উপজেলায় সেতারার প্রথম দিনটির পুরো সময়ই প্রধান কৃষি কর্মকর্তা রমিজ চৌধুরীর রুমেই কেটেছে। দুপুরে রমিজ বাসায় লাঞ্চ খেতে যায়নি। পিয়ন দিয়ে উপজেলার বাজারে বড়ো হোটেল ‘শান্তি হোটেল’ থেকে খাসি ভুনা, ডাল, সবজি, ডিম ভাত এনে সেতারাকে নিয়ে অফিসের নিজ কক্ষে বসেই খেয়েছে। সকাল থেকে তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা এ নিয়ে কানাঘুষাও করেছে। দুপুরে ভাত খেতে খেতে রমিজ সেতারাকে বলল- তুমি আমাকে রমিজ ভাই বলে ডাকবে, স্যার ডাকবে না।

সেতারা হেসে বলল- অফিসে আপনাকে আমি অবশ্যই স্যার ডাকব।

সেতারার স্বাক্ষর করা যোগদানপত্র গ্রহণ করার সময় রমিজ ভ্রƒ কুঁচকে বলল- তোমার অফিসিয়াল নাম করফুলেনেচ্ছা নাকি?

– হ্যাঁ স্যার।

– দেখ, একসাথে অনার্স-মাস্টার্স করলাম, অথচ তোমার আসল নামটাই আমি জানি না। জীবনটা এমনই, মানুষ তার কাছের মানুষের অনেক কিছুই জানে না। এ বলে রমিজ হো হো করে হাসতে লাগল। তার হাসির মধ্যেই একজন লোক হন্তদন্ত হয়ে অফিস কক্ষে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই বলতে লাগল- স্যার, আমারে বাঁচান, আমারে বাঁচান।

রমিজ রাগান্বিত কণ্ঠে বলল- কী হয়েছে রশিদ?

– দেখেন স্যার, সেতুলী আমারে মারার জন্য লোহার রড নিয়ে দৌড়াচ্ছে।

কথা শেষ হতে না-হতেই একটি মহিলা লোহার রড হাতে রমিজের রুমে ঢুকল। ঢুকেই চেঁচিয়ে বলল- স্যার রশিদরে আপনি লায় দিতে দিতে মাথায় তুলছেন। হয় আমারে বদলি করেন, নয়তো তারে বদলি করেন। এইভাবে একসাথে চাকরি করলে একদিন খুনাখুনি হইয়া যাইবো।

– থাম তোমরা। রমিজ চিৎকার করে বলল।

রমিজ সেতারাকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য বলতে লাগল, রশিদ আমার পিয়ন, আর সেতুলী এখানকার টাইপিস্ট। এই দুজনের ঝগড়া নিত্যদিনের। এদের ঝগড়া কোনোদিনও শেষ হবে না। তারা খুব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে।

রশিদ আর সেতুলীর দিকে কটমট করে তাকিয়ে রমিজ বলল, তোমরা এখন যাও। তোমাদের নতুন অফিসার এসেছেন। তোমাদের এসব দেখে তিনি কী মনে করছেন, একবার ভেবে দেখেছ? তোমাদের দুজনকেই আমি একসাথে বদলি করবো।

অফিসের এই দৃশ্য দেখে অফিসের প্রধান রমিজ চৌধুরীর অফিস নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে সেতারার স্পষ্ট একটি ধারণা হয়ে গেল।

সেতারার বেলফুল উপজেলায় যোগদানের দিনই অফিস শেষে রমিজ সেতারার মোবাইলে একটি এসএমএস পাঠায়। এসএমএসে সে লিখেছিল- ‘তুমি আগের মতোই সুন্দর রয়েছ। গোলাপি শাড়িতে তোমাকে খুব মানিয়েছে।’ এসএমএসের কোনো উত্তর রমিজ পায়নি। পরের দিন রমিজ সেতারার কাছে তার পরিবার সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। সেতারা জানিয়েছিল তার স্বামী চাকরি সূত্রে আমেরিকায় থাকে। তার কোনো সন্তান নেই। সেতারা আপাতত একা ভেবে রমিজের মন নেচে উঠেছিল। রমিজ তৃতীয় দিন আরো একটি এসএমএস পাঠায়। এসএমএসটি ছিল- ‘যে কোনো সমস্যায় সুখে-দুঃখে তোমার পাশে থাকব।’ গত দু’মাস ধরে রমিজ এমন অনেক এসএমএস পাঠিয়েছে। কিন্তু সেতারার থেকে কখনো কোনো উত্তর পায়নি। সেতারা অফিসেও নিতান্ত প্রয়োজন না হলে রমিজের কক্ষে যায় না, গেলেও কাজ সেরে দ্রুত চলে আসে। রমিজ গল্প করতে চাইলেও কাজের অজুহাতে বেরিয়ে আসে।

গতকাল অফিস শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহ‚র্তে ডাক ফাইল স্বাক্ষর করতে করতে একটি চিঠিতে রমিজের চোখ আটকে যায়। চিঠিটি জেলা অফিস থেকে এসেছে। চিঠির বিষয়ে স্পষ্ট বোল্ড অক্ষরে লেখা রয়েছে- ‘সেতারা বেগমের সাথে আপত্তিকর যৌন হয়রানিমূলক আচরণের তদন্ত প্রসঙ্গে।’ চিঠির বিষয়বস্তু রমিজকে প্রচণ্ড এক ধাক্কা দেয়। রমিজের মাথা ঘুরে গেল। পুরো শরীর নিস্তেজ শীতল হয়ে যেতে লাগল। টেবিলের পাশে রাখা এক গøাস পানি রমিজ ঢকঢক করে এক নিমিষে খেয়ে ফেলল। চিঠিটি পুরো পড়া শেষ না করেই ভাঁজ করে খাকি খামে ভরে ফেলল। ভোঁ ভোঁ করে তার মাথা ঘুরছে। চোখের সামনে লীনার মুখ ভেসে উঠল। সন্তান দু’টোর মুখ ভেসে উঠল। পুরো উপজেলার পরিচিত সকলের মুখ একে একে চোখের সামনে ভিড় করতে লাগল। সবাই ঘৃণাভরে রমিজের দিকে তাকাচ্ছে যেন। একি করল সে! সবাই ছিঃ ছিঃ করছে যেন। রমিজের নিজের চুল নিজেরই ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। উ™£ান্তের মতো রমিজ মাথায় হাত মারতে লাগল। এক পর্যায়ে টেবিলে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে চোখ মুছে খাকি খামটি হাতে অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা সেতারার বাসার দিকে হাঁটা শুরু করল। কিছুদূর গিয়ে তার মনে পড়ল- সেতারা অফিস ছুটির সাথে সাথে বাজারে যায়। বাজার করে সে ঘরে ফেরে। অগত্যা রমিজ নিজ বাসার দিকে পা বাড়াল। লীনা রমিজকে কিছুটা অস্বাভাবিক দেখে জিজ্ঞাসা করল, তোমার কি অসুখ করেছে?

– না অসুখ না। আমি ঠিক আছি, তুমি আমাকে চা করে দাও। না না, চা না, শরবত দাও। আচ্ছা থাক, কিছু লাগবে না।

লীনা বুঝতে পারে অফিসে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। লীনা অন্তর্মুখী মেয়ে। সে রমিজকে নিয়ে কখনো গায়ে পড়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে না। রমিজের মন খারাপ হলে, মন ভালো না হওয়া পর্যন্ত সে অপেক্ষা করে। রমিজ সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে খাকি খামটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। লীনা কিছুই বলে না। কিছুক্ষণ পর রমিজ আবার বাসায় ফিরে আসে। রাতে রমিজ যখন দরদর ঘামছিল লীনা শুধু বলেছে, তুমি টেনশন করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। বলেই লীনা পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে। রমিজের সন্দেহ হয়, লীনা কী সব জেনে ফেলেছে? সে কি জেনেই বলেছে সব ঠিক হয়ে যাবে? নাকি সান্ত¡নার জন্য এমনি বলেছে। রমিজের ইচ্ছে হলো লীনাকে সব খুলে বলবে। বলবে, শুধু এসএমএস দিয়েছে। আর কিছুই ঘটেনি। পরক্ষণেই বুকের ভেতর কে যেন বলে উঠল- রমিজ, এ কথা লীনা শুনলে তোমাকে ছেড়ে ছেলে দুটো নিয়ে চিরদিনের জন্য চলে যাবে। রমিজ সাথে সাথে থেমে যায়। লীনাকে এ ঘটনা কখনো জানানো যাবে না। পুরো রাতজুড়ে রমিজ যখনি সমস্যার সমাধান খুঁজেছে, ততবারই শুধু মনে এসেছে- তদন্ত টিম আসার আগেই, তদন্ত শুরুর আগেই সেতারা থেকে মাপ চাইতে হবে। সেতারাকে যে কোনো উপায়ে কনভিন্স করতেই হবে। প্রয়োজনে সেতারার পায়ে পড়বে সে। এতেও যদি কাজ না হয় তাহলে বলবে- ‘আমার ছেলে দুটোকে তুমি এতিম করো না। তুমি না মানলে আমি নিশ্চিত আত্মহত্যা করবো।’

সেতারাকে কনভিন্স করার এই পন্থাটি রমিজের মনে বারবার সাহস জুগিয়েছে। রমিজের দৃঢ় বিশ্বাস, সেতারা তাকে মাফ করে দেবে। তার অভিযোগ সে ফেরত নেবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার মনের মধ্যে প্রশ্ন উঁকি দেয়, যদি সেতারা এত কিছুর পরও না মানে! তাহলে সে কি তদন্তের আগে আত্মহত্যা করবে? রমিজ আবার দরদর ঘামতে থাকে, হাঁসফাঁস করতে থাকে।

সেতারা ট্রে ভর্তি নাশতা এনে সেন্টার টেবিলের ওপর একে একে নামিয়ে রাখতে লাগল। সেতারার চেহারা ভাবলেশহীন, অতি স্বাভাবিক। রমিজ সেতারার স্বাভাবিকতায় ভয় পেল। সেতারা কি নিশ্চিত জানত সে আসবে! পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে মাফ চাইলেও সে মাফ পাবে না। সেতারার এই দৃঢ় সিদ্ধান্তের জন্যই কি সে এতটা স্বাভাবিক। যদি তাই হয়, তাহলে এত নাশতা বানাল কেন তার জন্য? রমিজ কিছুই ঠিকমতো মেলাতে পারছে না। সেতারা তার সামনের সিঙ্গেল সোফায় বসল। সেতারার কথায় নীরবতা ভাঙল।

– নেন রমিজ ভাই, নাশতা মুখে দিন। খেতে খেতে বলেন কী সমস্যা?

রমিজ শীতের একটি ভাপা পিঠা হাতে তুলে নিল। পরক্ষণে পিঠা রেখে সেতারার কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। বলল, সেতারা, আমাকে মাফ করে দাও। এ বলেই খাকি খামটি সেতারার দিকে বাড়িয়ে দিল। সেতারা রমিজের কাণ্ড দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে গেল। রমিজের হাত থেকে খামটি নিতে নিতে দাঁড়িয়ে গেল।

– কী করছেন রমিজ ভাই! প্লিজ উঠে দাঁড়ান।

রমিজ বসেই রইল। সেতারা খামের চিঠিটি বের করে পড়তে লাগল। রমিজ সেতারার মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু স্রষ্টাকে স্মরণ করতে লাগল। বিড়বিড় করে বলতে লাগল- মাবুদ, এবারের মতো আমাকে ক্ষমা কর। কোনো মেয়ে মানুষকে আর কখনো এমন এসএমএস দেব না মাবুদ। এবারের জন্য বাঁচাইয়া দাও। সেতারার মনে দয়ামায়া ঢুকাইয়া দাও। সেতারা যেন আমাকে মাফ করে দেয়।

চিঠিটি পড়ে সেতারা হো হো করে হেসে উঠল। রমিজ সেতারার হাসিতে প্রচণ্ড রকমের ধাক্কা খেল। তাহলে সেতারা তাকে ক্ষমা করবে না। তাকে সে শাস্তি দেবেই। সেতারার কথায় রমিজ সম্বিৎ ফিরে পেল।

– রমিজ ভাই, আমার অফিসিয়াল নাম তো সেতারা না, করফুলেরনেচ্ছা।

এই সেতারা তো আমাদের টাইপিস্ট। ‘সেতারা’ সেতুলীর অফিসিয়াল নাম। সে পিয়ন রশিদের বিরুদ্ধে জেলা অফিসে অভিযোগ করায় জেলা অফিস থেকে তদন্ত টিম আসছে। আপনি মনে হয় চিঠিটা ভালোভাবে পড়েননি। সেতারার কথাগুলো রমিজের বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সে কল্পনার জগতে স্বপ্নের মধ্যে কথাগুলো শুনছে। রমিজ সেতারার পায়ের কাছে ফ্লোরে তখনো পদ্মাসনের মতো বসে রইল। সেতারার মুক্তো ঝরা হাসিমাখা মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল।

– ম্যাডাম স্যারেরে কি জিনে ধরেছে!

পরীর কথা শুনে রমিজ বাস্তবে ফিরে আসে। ফ্লোর থেকে তড়াক করে দাঁড়িয়ে যায়।

সেতারা হাসতে হাসতে বলল- পরী, স্যারেরে বড় জিনে ধরেছে।

সেতারা আবার খিলখিল করে হাসতে লাগল। সেতারার হাসি রমিজের চোখে জল নামিয়ে দিল। রমিজের বিশ্বাস হচ্ছে না জীবন এত সুখের হয় কী করে! এত মধুর, এত স্বাধীন হয় কী করে! হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj