রক্ত জালিকা : ম্যারিনা নাসরীন

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

এক.

আজও দুপুর পর্র্যন্ত হরতাল। রাস্তায় কোনো যানবাহন চলছে না। দোকানপাট সব বন্ধ। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রাস্তাজুড়ে ছুটোছুটি করে খেলছে। মার্চের সকাল, সূর্যের তেমন তেজ নেই। মিজানের মন খুব খারাপ লাগছে। রেবেকার ওপর এভাবে চট করে রেগে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। কিন্তু রেবেকা আজ কেন যে এমন করল? মেজাজটা ভীষণ খারাপ করে দিয়েছে।

দেশের যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাতে জনজীবন প্রায় অচল। দিনে চলছে বাঙালির হরতাল আর রাতে ইয়াহিয়ার কারফিউ। উকিল হিসেবে মিজান এখনো পসার জমাতে পারেনি। হাতে কেসের সংখ্যা বেশি না। যা ছিল বেশির ভাগ মামলার ডেট পড়ে গিয়েছে। কয়েকদিন হলো মিজান ঘরে বসে আছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। বন্ধুবান্ধবের সাথে নিয়মিত আড্ডা আর বসছে না। ভেবেছিল আজ বাইরে ঘুরে ঢাকার অবস্থা দেখার চেষ্টা করবে। কিন্তু সকালে মিজানকে বাইরে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে দেখে রেবেকার মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। গোয়েন্দার মতো জেরা শুরু করে,

এত সকালে কোথায় যাচ্ছ?

এত সকাল কোথায়? দশটা বাজে। একটু চেম্বারে যাব সেখান থেকে ফেরার পথে ইসলামপুরেও যেতে পারি।

কোর্টে কাজ নেই বাইরে কেন যাবে? তাছাড়া দোকান তো দুইটার আগে খোলা হবে না।

কাজ আছে। মামলার পার্টি আসবে।

কিসের পার্টি? গিয়ে চেম্বারে বসে আড্ডাবাজি ছাড়া আর কি কর?

আড্ডাবাজি মানে? কি বলতে চাচ্ছ?

বলতে চাচ্ছি তুমি এখন ঘরের বাইরে যাবে না।

এটা কি তোমার হুকুম? বাহ আজকাল ভালোই হুকুম করতে শিখেছ দেখছি?

আহা হুকুম দেবার মালিক তো তুমি একাই, তাই না?

এ কয়দিন তোমার আঁচলের নিচেই তো বসে আছি। যা আদেশ করছ পালন করছি। বাজার করে দিয়েছি। টিউবওয়েল ঠিক করে দিয়েছি, আর কি চাও? এখন কি ঘরে বসে কাপড় কাচবো? আমি

বেরুচ্ছি সন্ধ্যায় ফিরব।

মিজান এরপর রেবেকাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল।

জজ কোর্টের পাশে ছোট্ট একটা রুমে দুই তাকের বুকশেলফে আইনের কিছু বই, তিনটা চেয়ার আর একটা টেবিল নিয়ে মিজানের ওকালতির চেম্বার। বইয়ে ধুলা পড়ে গিয়েছে। মিজান সেগুলো পরিষ্কার করে বেশ খানিকটা সময় অপেক্ষা করল। যে অবস্থা তাতে নিতান্ত বাধ্য না হলে কেউ কোর্ট মুখো হবার কথা নয়। রেবেকার জন্য মনটা খুঁতখুঁত করছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মিজান চেম্বার বন্ধ করে বেরিয়ে আসে।

মোড়ে ইব্রাহিম উকিল পান খেতে খেতে আরও কয়েকজন উকিলের সাথে গল্প করছে। বুঝা যাচ্ছে রাজনৈতিক আলাপ। ইদানীং রাস্তার মোড়, অফিস, দোকান সবখানে একই আলাপ। ক্ষমতায় কে যাবে? ভুট্টো নাকি শেখ মুজিব? ইয়াহিয়া অধিবেশন স্থগিত করার পর থেকে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা আরও জটিল হয়ে গিয়েছে। সাতই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। ঢাকা শহর এখন তপ্ত কড়াই। সে কড়াইয়ে আন্দোলন খইয়ের মতো ফুটছে।

ইব্রাহিম উকিল লোকটা ধূর্ত টাইপের। দুনিয়ার যত মিথ্যা মামলাগুলো সব সেই লড়ে। আবার কেমনে কেমনে যেন তার মক্কেলকে জিতিয়েও আনে। লোকে বলে মামলায় যত বেশি দুই নম্বরি তত বেশি আয়। ইব্রাহিম উকিলের টাকার অভাব নেই। তবে তার সবচেয়ে বড় দোষ হলো অন্যের হেঁসেলের হাঁড়ির ভাত টেপা। আড়ালে আবডালে অনেকে তাকে ‘শকুন উকিল’ নামে ডাকে। মিজান লোকটির সামনে পড়তে চায় না। সে টার্ন নেয় কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

মিজান সাহেব কোথায় যাচ্ছেন? একটু শুনুন। আপনাকে খুঁজছিলাম।

কেন বলুন তো?

দিদারুল সাহেব আপনার চাচা হন বোধহয়। সেদিন আমার কাছে এসেছিলেন। আপনাদের বাড়ি নিয়ে কোনো ঝামেলা আছে নাকি?

না তো? কিসের ঝামেলা থাকবে?

আচ্ছা বাদ দেন। আপনার ছোট ভাইয়ের কি খবর? শুনেছি রাজনীতিতে খুব এক্টিভ। ভেতরের খবর তো কিছুটা আপনার জানার কথা। শেখ সাহেব ক্ষমতা নিতে পারবেন বলে মনে হয়?

আমার কিছুই মনে হয় না। রাজনীতির বিষয়ে আমার তেমন আগ্রহ নেই।

আগ্রহ নেই বললে চলবে? শোনেন, ভাইকে বলে দেবেন জয় বাংলা, জয় বাংলা করে কিছুই হবে না বরং দেশের মুসলমানরা আবার সেই হিন্দুদের গোলাম হবে। আগের কথা ভুলে গেছেন? দেশে যা হচ্ছে সব ভারতের কারসাজি সেটা উজবুক বাঙালি যদি বুঝত তাহলে এত চেঁচামেচি করত না।

জি বলব।

অফকোর্স বলবেন। আরে বাপু, কি দরকার কারফিউ ভেঙে এভাবে মিটিং মিছিল করা? কতজন লাশ হয়ে ঘরে যাচ্ছে সেটা কি শেখ সাহেব জানেন? তিনি তো হুকুম দিয়েই খালাস। এই যে ধরুন; আপনার ভাইয়ের যদি কিছু হয়, কার ক্ষতি? আপনার ক্ষতি।

অধিকার আদায় করতে গেলে তো এরকম কিছু ক্ষতি তো স্বীকার করতেই হবে। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে কি করবে? শেখ সাহেব ১৬৭টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন এটাই তো সাধারণ হিসাব। এভাবে গড়িমসি করলে তো আর তাদের সাথে আপস চলে না।

আপস করবে, করবে। শক্তির দিক থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পৃথিবীর দুই নম্বর বাহিনী বুঝেছেন? ওরা জাত কেউটে। ইয়াহিয়া ওদেরকে গর্ত থেকে বের করে যখন শহরে ছেড়ে দেবে তখন দেখবেন ঢাকা শহরকে তারা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কবরস্থান বানিয়ে ফেলেছে। শেখ মুজিব বাপ বাপ বলে আপস করবে।

ভালো তো, তখন আপনার ভাগ্যেও একটি কবর জুটতে পারে। আপনিও তো বাঙালি, তাই না?

এই বলে মিজান হনহন করে হাঁটা দেয়। ইব্রাহিম সাহেব বিস্মিত হয়ে মিজানের গমন পথে তাকিয়ে থাকেন। তার গালের কোণ বেয়ে পানের লাল রস গড়িয়ে পড়ছে।

মিজানের সাথে এঁটে উঠতে না পেরে দিদার চাচা তাহলে ইব্রাহিম সাহেবকে ধরেছেন? মিজানের মাথায় দুশ্চিন্তার ভার চেপে বসে। বাড়ি নিয়ে কোনো ঝামেলা নেই মুখে বললেও আসল কথা হলো, নিমাই বাবু তার সাথে সাপলুডু খেলছে। দুইবার রেজিস্ট্রির তারিখ দেওয়া হয়েছে কিন্তু নানা অজুহাত দেখিয়ে শেষ মুহূর্তে আসেনি। অথচ তার চাহিদামতো সব টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটের সরু গলির শেষ মাথায় পাঁচ কাঠা জমিতে মিজানদের একতলা বাড়ি। মিজানের বাবা নিমাই দাস নামের এক হিন্দু ভদ্রলোকের কাছ থেকে বাড়িটি কিনেছিলেন। খুব সামান্য টাকা দিতে বাকি ছিল। পুরো টাকা না পেলে রেজিস্ট্রি করবেন না বলে নিমাই বাবু জানিয়ে দিলেন। তারপর বলতে গেলে প্রায় চুপিচুপি একদিন তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। বাবা মিজানকে সাথে নিয়ে নানা জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করে একে ওকে টাকা খাইয়ে বাড়িটির দখলে নিয়েছিলেন। রেজিস্ট্রি করার কাজও অনেকদূর এগিয়েছিল কিন্তু তার আগেই তার ওপারের ডাক এসে গেল।

দিদার চাচা একসময় বাবার ব্যবসার অংশীদার ছিলেন এখন জমি দখলের দালালি করেন। অত্যন্ত ধুরন্ধর লোক। স্বার্থের জন্য অনেক কিছু করতে পারেন এমনকি মানুষ খুন পর্র্যন্ত। জমি দখল করার জন্য তার পোষা গুণ্ডা আছে বলে মিজান শুনেছে। ধানমণ্ডিতে প্রায় এক বিঘার একটা জমি তিনি এক বৃদ্ধার কাছ থেকে জবরদস্তি দখল করেছেন। মিজানদের বাড়িটির ওপর তার বহুদিনের লোভ। বাবা মারা যাবার পর থেকে মিজানদের বাড়িটি দখল করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই নিয়ে মিজানের সাথে তার মনোমালিন্য চূড়ান্ত পর্যায়ে।

দুটার সময় হরতাল শেষ হবার সাথে সাথে রাস্তাঘাটে মানুষের ঢল নামে। রাত আটটায় কারফিউ শুরু হবে। তার আগে কাজ শেষ করে ঘরে ফেরার তাড়া। দোকানে দোকানে প্রচণ্ড ভিড়। কিন্তু ইসলামপুরে কাপড়ের দোকানে এসে মিজান হতাশ হয়। বেশিরভাগ দোকানি শুকনো মুখে বসে আছে। মিজানকে দেখে কর্মচারী নাসির মুখটাকে অত্যধিক করুণ করে রাখে।

কি রে নাসির, বিক্রি বাটা কেমন? মুখ শুকনো ক্যান?

শুকনো থাকবে না তো হাসব? ক্যাশ দেখলেই বুঝবেন বিক্রি-বাটার কি হাল।

ক্যাশ দেখা লাগবে না তোর চেহারা দেখেই আঁচ করেছি। কিছুদিন এমন চলবে তারপর ঠিক হয়ে যাবে।

আমার মন বলে ঠিক হইতে বহুত দেরি ভাইজান। মানুষে চাইল ডাইল আলু কেরোসিন কিনে ফতুর হয়ে গিয়েছে। কাপড় কেনার টাকা কোথায়? আমি বলি কি চাইলের ব্যবসায় গেলে কেমন হয়?

হাহাহা আড়তদারি করবি? আচ্ছা বাক্স খাতা দে দেখি কি অবস্থা।

আসলেই অবস্থা খুব বেগতিক। তিনদিন বিক্রির খাতায় শূন্য আজ বিক্রি হয়েছে মাত্র পনের গজ কাপড়। হোলসেল মার্কেটে এরকম ধস আগে নামেনি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি খরিদ্দাররা ইসলামপুরে আসে কাপড় কিনতে। হরতাল আর কারফিউয়ের কারণে তারা আসতে পারছে না।

দাদার আমলের ব্যবসা। বাবা কাপড়ের এই দোকানের আয় দিয়েই সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু বাবা চলে যাবার পর থেকে ক্রমেই আয় কমে আসছে অথচ এই ব্যবসায় সে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালানো মুশকিল হয়ে যাবে। নাসিরের ওপর ভরসা না করে নিজে একটু নজর দেওয়া দরকার। মনিরকে বলেছিল মাঝে মাঝে দোকানে এসে বসতে কিন্তু সে মনের ভুলেও এ পথ মাড়ায় না।

মনিরের কথা মনে পড়তে স্মরণ হলো অনেকদিন হলো ও বাসায় আসছে না। হলে গিয়ে খোঁজ নেবার দরকার কিন্তু সাতটা বেজে গিয়েছে ওদিকে গেলে আটটার আগে ঘরে ফিরতে পারবে না। আর্মিদের গুলিতে বেঘোরে মরতে হবে। মিজান বাড়ির পথে দ্রুত পা চালায়। ঘরে আরেকজন হয়তো রেগে টং হয়ে আছে।

দুই.

ঘরে ঢুকে মিজান বিস্মিত হয়। রেবেকা লাল কালো ডুরে দেওয়া তাঁতের একটা শাড়ি পরেছে। খোঁপায় নিজের গাছের গোলাপ। চোখে কাজল সে প্রতিদিনই দেয় আজ কপালে ছোট্ট কালো টিপ দিয়েছে। সকালের রাগের কোনআভাসই চেহারায় নেই। মিজান চোখ ফেরাতে পারছে না। রেবেকাকে দেখে তার মাথা থেকে বিশাল একটা ভার নেমে গিয়েছে বলে মনে হলো। কিন্তু রেবেকার এই সাজগোজের উপলক্ষ কি বুঝতে পারছে না।

মিজানকে আড়চোখে দেখে নিয়ে রেবেকা বলে,

হাসিম, বাবাকে বল গোসল সেরে আসতে। আমি খাবার রেডি করছি।

প্রতিউত্তরে ওদের আড়াই বছরের ছেলে হাসিম এক গাল হেসে টলমল পায়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে।

মিজান ওকে দুহাতে উঁচু করে ওপরে ছুড়ে দেয়,

বাবা, আকাশটাকে ধরে ফেল তো।

হাসিম খলখল করে হাসছে আর বলছে,

বাবা আবাল! আবাল দাও।

রেবেকা মন্টুকে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। দশ বছরের মন্টু রেবেকার ডান হাত। বাবা মা নেই। ভিক্ষা করত। একদিন কোর্ট থেকে ফেরার পথে রাস্তায় মিজানের সামনে হাত পেতে ধরল। মিজান ভিক্ষা দেয়নি। বলেছিল,

এত বড় ছেলে ভিক্ষা করিস কেন?

মন্টু কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল।

মিজান আবার বলেছিল,

আমার বাসায় কাজ করবি? খাওয়া পাবি বেতন পাবি।

যাব, নিয়ে যাবেন?

রেবেকার পেটে তখন হাসিম। কাজ করতে পারে না। বাসায় একা থাকতে ভয় পায়। মিজান ওকে সাথে করে নিয়ে এসেছিল। এখন ও এই পরিবারেরই একজন। রেবেকা ওকে পড়তে শিখিয়েছে কিছু কিছু লিখতেও পারে।

রেবেকা মন্টুকে নিয়ে ফিরে এসেছে। মন্টুর হাতের ট্রের দিকে তাকিয়ে মিজানের বুকের মধ্যে ধড়াস করে ওঠে। আজ মার্চের সতের। ওদের বিবাহবার্ষিকী। রেবেকার সকালের আচরণের কারণ এখন বুঝা গেল। প্রতি বছরের এই দিনে রেবেকা খুব যতœ করে পুডিং বানায়, খাসির মাংসের বিরিয়ানি রাঁধে। খাবার দুটি মিজানের খুবই প্রিয়। গত চার বছরে দিনটার কথা মিজান কখনই মনে রাখতে পারেনি। রাতে বাসায় ফিরে যখন রেবেকার এসব আয়োজন দেখে তখন লজ্জায় মরতে মরতে বলে, আগামীবার নিশ্চয় মনে রাখবে। ছোটখাটো কোন গিফট কিনে দেবে কিন্তু সে মনে রাখার বছর আর আসে না।

রেবেকা এক খণ্ড পুডিং মিজানের মুখে তুলে দেয়।

মিজান ¤øান মুখে পুডিং খায়। হাসিম বাবাকে খাওয়াতে দেখে খুব মজা পাচ্ছে সে ছোট্ট দুটি হাতে

তুমুল তালি দিচ্ছে। রেবেকার মুখে পুডিং তুলে দিতে গিয়ে মিজান চুপি চুপি বলে,

সরি রেবু। আগামী বছর মনে থাকবে।

রেবেকা চোখে চোখ রেখে মুচকি হাসে,

আগামী বছর আমি বেঁচে থাকলে তো।

মিজানের মন খারাপ হয়, খুব খারাপ।

তিন.

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। মুজিব-ইয়াহিয়ার আলোচনায় কোনো অগ্রগতি নেই। এদিকে হরতাল এবং কারফিউ চলছেই। কারফিউ ভেঙে বাঙালিরা মিটিং মিছিল করছে। খান সেনারা নির্বিচারে গুলি করে অনেক বাঙালিকে হত্যাও করেছে। সর্বশেষ ইয়াহিয়া যে ভাষণ দিয়েছে সেখানেও বাঙালিদের প্রতি প্রচ্ছন্ন হুমকি। বিভিন্ন বাড়িতে, অফিসে, আদালতে বাঙালিরা স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে। শোনা যাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সিভিল ড্রেসে প্রচুর মিলিটারি আসছে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ভর্তি অস্ত্র খালাস হচ্ছে। মোট কথা সবার মধ্যে ভয় আতঙ্ক, কি হচ্ছে? কি হবে?

২৫ তারিখ রাতে খাবার পর রেবেকা আর মিজান বারান্দায় চেয়ারে বসে গল্প করছিল। এটা ওদের প্রতি রাতের রুটিন। পায়ের কাছে গন্ধরাজের ঘ্রাণ। রাত বারোটা বা তার কিছু বেশি বাজে হঠাৎ বিকট আওয়াজে ঢাকা শহর কেঁপে উঠল। এরপর মুহুর্মুহু গোলাগুলির শব্দ আর আকাশে আলোর ঝলকানি। রেবেকা দৌড়ে হাসিমের কাছে যায়। হাসিম ঘুমের মধ্যে কেঁপে কেঁপে উঠছে। শব্দগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে আসছে বলে মনে হলো। সারারাত আতঙ্কে ওরা বিছানায় যেতে পারেনি। ভোরের দিকে গোলাগুলির আওয়াজ কিছুটা কমে আসে। তখনো জানা যায়নি শহরে কি তাণ্ডব চলেছে। ভোর হলো, সূর্য উঠল তবুও চারপাশ সুনসান। মনে হচ্ছে কেউ এখনো ঘুম থেকে জাগেনি। আগে ভোর না হতেই রাস্তায় রিকশা, হকার, পথচারীর হাঁক ডাকে মুখরিত হয়ে উঠত। বিভিন্ন বাড়ি থেকে গানবাজনার সুর ভেসে আসত। আজ মনে হচ্ছে চারপাশে শ্মশানের মতো নীরব। মলয়কাকুর ঘর থেকে পূজার ঘণ্টিও শোনা যায়নি। মিজান রেডিও নিয়ে নব ঘুরাতেই থাকে। ঘুরেফিরে একটা মাত্র মিউজিক বাজছে। সকাল সাড়ে নটার দিকে রেডিও থেকে উর্দু এবং ইংরেজিতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারফিউর ঘোষণা এল। লোকটির কণ্ঠ খুবই কর্কশ!

মনিরের চিন্তায় খুব অস্থির লাগছে। কাল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কি ঘটেছে কিছুই আন্দাজ করা যাচ্ছে না। ঢাকায় যে কোনো ঘটনা ঘটুক বিশ্ববিদ্যালয়ে তার প্রভাব সব থেকে বেশি পড়ে। মনির কদিন যাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে থাকছে। এখন কি অবস্থায় আছে কে জানে। কারফিউয়ের জন্য মিজান বেরোতে না পেরে ছটফট করতে থাকে।

পরদিন কিছু সময়ের জন্য কারফিউ তুলতেই মিজান ভাইয়ের খোঁজে ছুটে বেরিয়ে যায়। সেখান থেকে যখন ফিরে এল তখন ওকে বদ্ধ পাগলের মতো লাগছিল। চোখ লাল টকটকে, চুল উষ্কখুষ্কু। রেবেকাকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে ওঠে,

রেবু, আমার মনিরকে বোধহয় ওরা মেরে ফেলেছে। ইকবাল হল, জগন্নাথ হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে মিলিটারি যে কত মানুষ মেরে ফেলেছে ঠিক নাই। কয়েক জায়গায় এখনো আগুন জ্বলছে। লাশ আর লাশ। চারদিকে পোড়া গন্ধ। আমি মরে যাওয়া বাবা মায়ের কাছে কি জবাব দেব?

রেবা কি বলে সান্ত¡না দেবে ভেবে পাচ্ছিল না। ওর বুকের মধ্যে বাষ্পাকুল হয়ে ওঠে। মনির মিজানের ছোট ভাই শুধু নয়, সন্তানের মতো। ছোটবেলায় মা মারা যাবার পর বাবা সারাদিন ব্যস্ত থাকতেন। মিজান কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে।

মনির তার নিজের ইচ্ছেতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু লেখাপড়ার চেয়ে রাজনীতির দিকে সে বেশি ঝুঁকে পড়ে। ভর্তির কিছুদিন পরেই ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিল। এখন সেটাই তার ধ্যানজ্ঞান। মিজান অনেকবার রাগারাগি করেছে কিন্তু ফল হয়নি। পুরো মার্চ মাস জুড়ে মিটিং মিছিল করে বেড়িয়েছে। শেষ যেদিন বাসায় এসেছিল সেদিন সাথে ছাত্র ইউনিয়নের আরো তিনবন্ধু ছিল। বস্তায় পাউডার আরও কিসব নিয়ে এসেছিল। রেবেকা ওর ঘর থেকে সারারাত খুটখাট শব্দ শুনেছে। সকালে রেবেকা জিজ্ঞেস করতে মনির বলেছিল,

বোমার নাম শুনেছ? সেগুলো বানিয়েছি। দেখছ না ওরা কত বাঙালি মারছে? আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছে ভাবী। প্রস্তুত থাকতে হবে। ওদেরকে জানান দিতে হবে আমরা আছি। মনিরের চোখ থেকে আগুন ঝরছিল।

কারফিউ তোলার সাথে সাথে মিজান প্রতিদিনই মনিরের খোঁজে বেরিয়ে যায় আর কারফিউ শুরু হবার আগে ভাগে ফেরে। এ কয়দিনে শুধু এটুকু জানতে পেরেছে যে ওই রাতে মনির ইকবাল হলে ছিল না। হলে ছিল না, বাসায় আসেনি, তাহলে কোথায় গেল? কোনো হাসপাতালেও পাওয়া যায়নি।

আজো সকাল আটটায় মিজান বেরিয়েছে। এখন বাজে রাত দশটা, এখনো ফিরল না। সন্ধ্যা থেকে কারফিউ শুরু হয়ে গিয়েছে। একেকবার মনে হচ্ছে হয়তো কোথাও আটকে পড়েছে সকাল হলেই দুই ভাইয়ে একসাথে ফিরবে। পরক্ষণে দুশ্চিন্তায় মন ভারী হয়ে আসছে খারাপ কিছু হলো না তো?

থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। ছাদে দাঁড়ালে আগুনের ধোঁয়া দেখা যায়। একা আতঙ্কে রেবেকার পেটে খিল ধরে আসে। শহর ঘুরে এসে মিজান যে সব খবর দেয় সেসব শুনলেও রেবা শিউরে ওঠে। শাঁখারীবাজার, রায়ের বাজার, নিউমার্কেট কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন জায়গা আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। এখানে সেখানে লাশ নিয়ে কাক কুকুরে টানাটানি করছে। রাস্তার রাস্তায় পাক আর্মি অস্ত্র তাক করে আছে। জোয়ান ছেলেদের দেখলে হাত পেছনে মুড়ে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। দলে দলে মানুষ ঢাকা ছাড়ছে।

রেবেকাদের আশপাশের বেশিরভাগ বাড়ির বাসিন্দা হিন্দু। তাদের অনেকেই ভারতে চলে গিয়েছে। সন্ধ্যার পর সেসব বাড়িকে ভুতুড়ে মনে হয়। মিজানের মুখে শুনেছে কোনো কোনো বাড়ি বিহারিরা দখল করে নিয়েছে। সামনের বাড়িটি মলয় কাকুর। বিশাল দোতলা বাড়িটি রেবেকাদের বাড়িকে এমন ভাবে ঢেকে রেখেছে যে অচেনা মানুষ বুঝতেই পারবে না পেছনে আরেকটি একতলা বাড়ি রয়েছে। মলয় কাকু তার পরিবারের সবাইকে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ব্যবসা গুটিয়ে নিজেও কয়েকদিনের মধ্যে চলে যাবেন। রেবেকা জিনিসপত্র সব গুছিয়ে রেখেছে। মনিরের একটা খোঁজ পেলে তবে যশোরে বাড়িতে যাবার চেষ্টা করবে। সে ভাবছে বাড়িটি খালি রেখে গেলে ফিরে এসে পাবে তো!

পাঁচ বছর আগে বিয়ের পর যেদিন এ বাড়িতে আসে রেবেকা সেদিনই বাড়িটিকে খুব আপন মনে হয়েছিল। শান্তনিবিড় পরিবেশ। জানালার কাছে বড় নিম গাছ থেকে ঝিরঝিরে বাতাস ওর ঘরটিকে যেন ধুয়ে মুছে পরিশুদ্ধ করে রাখে। শ্বশুর বলেছিলেন,

মা, তোমার শাশুড়ি তো নেই। তোমাকেই সবকিছু গুছিয়ে নিতে হবে। পারবে না?

রেবেকা ঘাড় নেড়েছিল। বিয়ের দ্বিতীয় দিন থেকেই তিনজন পুরুষের অগোছালো ঘরটিকে সাজাবার কাজে লেগে গিয়েছিল। তিনটি শোবার ঘর, একটি বসার ঘর আর রান্নাঘরের সাথে লাগোয়া ছোট্ট একটি জায়গায় চার চেয়ারের টেবিল বিছিয়ে খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘরের প্রতিটি ইঞ্চি রেবেকার মুখস্থ। ঘরের তিনপাশে চওড়া বারান্দা। বারান্দাজুড়ে টবে নানা জাতের ফুল, পাতাবাহার ইত্যাদি গাছ লাগিয়ে দিয়েছে। কদিন ধরে গাছে পানি দেওয়া হয়নি। গাছগুলো কেমন নেতিয়ে পড়েছে।

রেবেকা অশরীরী আত্মার মতো একা একা ঘরময় হেঁটে বেড়ায়। বারান্দায় আসে। মলয় কাকুর দোতলার ঘরে আলো জ্বলছে। একটা ছায়া ঘুরছে। ছায়া দেখে বুঝা যায় সেটা মলয় কাকু। বারান্দা ঘুরে রেবেকা মনিরের ঘরে আসে। ওর ঘরটা এক কোণে। টানটান করে বিছানো চাদরটি রেবেকা আর একবার টেনে দেয়। টেবিল ঝেড়ে বইগুলো আকার অনুযায়ী নিখুঁত করে সাজিয়ে রাখে। দেয়ালে মনিরের একটি সাদা কালো ছবি ঝুলছে। অবিকল মিজানের মতো করে হাসে। রেবেকা মাঝে মাঝে খুনসুটি করে বলে,

তোমার ভাই যখন মুখ পেঁচার মতো করে রাখবে তখন তুমি এসে একটু হেসে দিয়ে যাবে।

মনিরও পাল্টা জবাব দেয়,

উহু শুধু শুধু হাসি দিতে পারব না দাম দিয়ে কিনে নিতে হবে।

মনিরের টেবিল থেকে শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসটি হাতে নিয়ে রেবেকা নিজের ঘরে আসে। বিছানায় হাসিম ঘুমাচ্ছে। মেঝেতে মন্টু। টেবিল ঘড়িতে এখন রাত প্রায় বারোটা। হঠাৎ মনে হলো বাইরে থেকে চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। জানালা দিয়ে বল্কে বল্কে ধোঁয়া ঢুকছে। রেবেকা দরজা খুলতেই এক রাশ ধোঁয়া মুখের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সামনে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। মলয় কাকুর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। রেবেকা দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘরে ঢোকে। মন্টুকে জাগায়,

এই মন্টু ওঠ ওঠ। আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।

মন্টু চোখ কচলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

রেবেকার বুকে হাসিম। মন্টুকে হাত ধরে টেনে রেবেকা পেছনের বারান্দায় আসে। যদি পাঁচিল টপকে পালানো যায়। উঁকি দিয়ে হতাশ হয়ে মেঝেতেই বসে পড়ে। গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে তার মানে আশপাশে আর্মি রয়েছে। আবার ঘরে ঢুকে দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। মনির মিজান কেউ নেই। রেবেকার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু তারা এতই পরাধীন যে চিৎকার করে কাঁদার সাহসও করতে পারছে না। মলয় কাকুর কথা মনে হয়। কে জানে বেঁচে আছে নাকি আগুনে পুড়ে গেলেন। কাকিমা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। ঢাকায় রেবেকাদের তেমন কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। বিপদে আপদে অনেকবারই মলয় কাকু তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

বিদ্যুৎ চলে গিয়েছে। চারদিকে ভুতুড়ে অন্ধকার। মফস্বলের মেয়ে রেবেকা। বিয়ের পর প্রথম ঢাকা শহরে এসেছিল। মাঝে মাঝে নিউমার্কেটে একা কেনাকাটা করতে গিয়েছে এর বাইরে মিজান ছাড়া ঢাকার অন্য কোথাও কখনো একা বের হয়নি। এই অন্ধকার রাতে ঘরের চেয়ে বাইরে আরও বেশি অনিশ্চিত জীবন। কোথায় পালাবে? হাসিমকে বুকে চেপে সারারাত বসে কাটিয়ে দেয়। মন্টুও জেগে থাকার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। দূর থেকে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ শোনা যাচ্ছে। রেবেকার বুক কাঁপে হাসিমকে আরও জোরে বুকের মধ্যে চেপে ধরে। মনে মনে আয়াতুল কুরসি, দোয়া ইউনুসসহ যে সমস্ত দোয়া মুখস্ত রয়েছে সব পড়তে থাকে।

রেবেকার চোখ ভেঙে দরদর করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মনে মনে ঠিক করে আর কোনোদিনই সে মিজানের সাথে খারাপ ব্যবহার করবে না। ধীরে ধীরে পুবদিকে ফর্সা হয়ে আসে। আর একটা সকাল হয়। রেবেকা খুব সাবধানে দরজা খোলে। মলয় কাকুর বাড়ি থেকে এখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। হাসিম ঘুম থেকে জেগে ঘরময় দৌড়ে বেড়ায় আজ চুপচাপ ঘুরছে। শিশুরা পরিবেশের অনেক কিছুই আঁচ করতে পারে।

সকাল আটটায় কারফিউ তুলে দিয়েছে। এখন মিজানের জন্য অপেক্ষার পালা। অপেক্ষার একেক পল যেন এক একটি বছর। কিন্তু অপেক্ষা আর শেষ হয় না। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়। বারান্দায় আলগোছে পড়ে থাকা আলোর তেজ ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে। কিন্তু মিজান মনির কেউ আসে না।

এই বাড়ির বাউন্ডারির বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে রেবেকা একেবারে বেখবর। সুতরাং কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধু বুঝতে পারছে এ বাড়িতে থাকা একদম নিরাপদ নয়। আশপাশের কয়েকটি বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। মিজান বলেছিল বিহারিরা বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে লুটপাট করছে। মেয়েদেরকে নির্যাতন করছে। রেবেকার বুকের মধ্যে হিম হয়ে আসে। মন্টু একবার চুপি চুপি উঁকি দিয়ে দেখে এসেছে রাস্তায় আর্মির গাড়ি টহল দিচ্ছে। গলির মুখে কিছু বিহারি যুবকের আড্ডার খবরটি রেবেকাকে আরও বেশি বিচলিত করে তোলে।

হাসিমকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে কখন যে ক্লান্ত শরীর ঘুমিয়ে পড়েছিল! গেট থেকে শব্দ আসছে। এটা বুঝতে রেবেকার অনেকটা সময় লেগে গেল। এমনিতেই পুরনো টিনের গেট, তার ওপর হাজার ছিদ্র। টোকা দিলে কাঁসার থালার মতো ঝনঝন করে বাজে আর ইনি তো মনে হচ্ছে হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে। মিজান না তো? আশার আলোয় রেবেকার মুখ ঝলমল করে। তড়াক করে লাফ দিয়ে ওঠে। প্রায় উড়ে গিয়ে ও দরজা খোলে কিন্তু গেটের দিকে তাকিয়ে দমে যায়। দিদার চাচা দাঁড়িয়ে আছেন। সাথে উঁচু লম্বা একজন লোক।

বৌমা গেটটা খোল।

দিদার চাচার মুখ গম্ভীর! কিছুদিন আগে মিজানের সাথে প্রচণ্ড গোলমাল হয়েছে। চাচা মিজানকে হুমকি দিয়ে বলেছিল, দিদারুলের সাথে শত্রুতা করে কেউ আজ পর্র্যন্ত টিকতে পারেনি, তুই তো দুধের বাচ্চা! আমার পেশাবের সাথেই ভেসে যাবি। সাথের লোকটি মনে হচ্ছে বিহারি। গেট ছাড়িয়ে প্রায় এক হাত উঁচু। গাছের গুঁড়ির মতো মোটা। ভয়ে রেবেকার মুখ পাংশু বর্ণ ধারণ করেছে।

কি হলো? দাঁড়িয়ে আছ কেন? গেট খোল।

চাচা উচ্চকণ্ঠে আদেশ করে। রেবেকা সম্মোহিতের মতো গেট খুলে দেয়। দশাসই লোকটি ঘরে ঢুকছে। তার দিকে তাকিয়ে রেবেকার বুক শুকিয়ে আসে। লোকটির চোখের ভেতরে নদীর মতো রক্ত জালিকা ছড়িয়ে আছে সেগুলো জোঁকের মতো কিলবিল করছে।

চার.

জায়গাটা কোথায় চিনতে পারছে না মিজান। উঁচু নিচু পাহাড়ি এলাকা। ইটের মতো লাল রঙয়ের মাটিতে লতাগুল্ম আর ছোট ছোট গাছের ঝোপ। সামনে যতদূর চোখ যায় বিরান। কোনো মানুষজন বা ঘরবসতির আলামত নেই। চারদিকে সবকিছু অস্পষ্ট ধোঁয়াশা। মিজান হাঁটছে তো হাঁটছেই। লোকটি ক্রমশ ওর দিকে এগিয়ে আসছে। লোকটির চোখে রক্ত জালিকা। মিজান ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ায়। অসমতল মাটির পথে ছোট মাঝারি নুড়ি। কিসে বাঁধল কে জানে কিন্তু সে হুমড়ি খেয়ে সামনে পড়ল। মাগো, বলে একটা অস্ফুট চিৎকার করতেই মিজানের ঘুম ভেঙে গেল। রেবেকার একটা হাত ওর বুকের ওপর জগদ্দলের মতো চেপে আছে। পিপাসায় বুক শুকিয়ে গিয়েছে।

রেবু এই রেবু এক গøাস পানি দাও না।

কোথায় রেবেকা। নড়তে গিয়ে মনে হলো শরীর থেকে হাত পা খুলে যাচ্ছে। প্রচণ্ড ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে তারপর আবার ঘোরের মধ্যে চলে যায় ওর সামনে ছোট বেলার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে।

মিজানের বয়স তখন নয় দশ বছর। সূত্রাপুরের একটা স্যাঁতসেঁতে পুরনো বাসায় ওরা ভাড়া থাকত। বিহারি বাড়িওয়ালার এক ছেলে ছিল ইয়া লম্বা, শণ্ডাগুণ্ডার মতো চেহারা। নাম আজমত খাঁ। লোকটার বড় বড় চোখে ভেসে থাকা লাল রঙের জালিকাগুলো মনে হতো জোঁকের মতো কিলবিল করছে। পাশের গলিতে প্রণব স্যারের বাড়িতে প্রাইভেট পড়ে ফিরে আসতে আসতে প্রায়ই সন্ধ্যা পেরিয়ে যেত। মা বেশিরভাগ সময় অসুস্থ থাকে। বাবা চলে যায় দোকানে। যার ফলে ছোটবেলা থেকে মিজান একা একা অনেক কাজ করতে শিখে গিয়েছিল। সেদিন সন্ধ্যায় প্রণব স্যারের বাসা থেকে বের হয়েছে। মাগরিবের আজান শেষ। বিভিন্ন বাড়ি থেকে সন্ধ্যা পূজার ঘণ্টির টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে। ঐ গলিতে একটা পরিত্যক্ত ভাঙা বাড়ি ছিল। দিনের বেলাতেও সেখানে অন্ধকার জমাট বেঁধে থাকে। মহল্লার অনেকে নাকি গভীর রাতে বাড়িটিতে মানুষকে হাঁটাচলা করতে দেখেছে। তাদের ধারণা সেগুলো আসলে মানুষ নয় অতৃপ্ত আত্মা। ভয়ে কেউ সেখানে যায় না। ওইদিন বাসায় ফেরার পথে বাড়িটি যখন পার হচ্ছে তখন সেখান থেকে গোঙানির শব্দ ভেসে এল। বুক হিম করার মতো ভয়ঙ্কর আওয়াজ। মিজানের খুব ভয় করছে তবুও এক পা দুই পা করে শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে যায়। ঘরের পেছন দিকে স্ত‚প করা ইট, তার পাশে যুবকটি মাটিতে চিত হয়ে হাত পা ছুড়ছে। কাটা গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। সামনে দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে একজনকে চিনতে পারল না। অন্যজন আজমত খাঁ। তার হাতে ধরা লম্বা ছুরি থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরছে। মিজান পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ মনে হলো আজমত খাঁ ওর দিকে আগুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখের ভেতর থেকে লাল লাল জোঁকগুলো বেরিয়ে ওর দিকে ছুটে আসছে। মিজান ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ায়। এক মুহূর্তের জন্য ও পিছু ফিরে দেখে না। ও কিভাবে কখন ঘরে এসেছে কিছুই মনে নেই। জ্ঞান ফেরার পর দেখল মায়ের কোলে শুয়ে আছে। পাশে বাবা। তিনি উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন,

কি হয়েছে বাবা?

মিজান কোনো জবাব না দিয়েই আবার চোখ বন্ধ করেছিল।

এই ঘটনার কথা মিজান কোনোদিন কাউকে বলেনি। কিছুদিন পরে ওরা বংশাল রোডের আরেকটি বাসায় চলে গিয়েছিল। আজমত খাঁর সাথে আর দেখা হয়নি। কিন্তু ঘুমের মধ্যে আজো এই স্বপ্ন ওকে তাড়া করে ফেরে। মিজান দশ বছরের বালক এখন ত্রিশ বছরের তরুণ। অথচ স্বপ্নের আজমত খাঁ এখনো শণ্ডাগণ্ডা চেহারার যুবক।

রেবু, এই রেবেকা। মিজান আবার ডাকে। কিন্তু কোনো শব্দ আসে না।

মাগো! কে যেন গুঙিয়ে উঠল। মিজান স্বপ্ন দেখছে না তো? সে এখন কোথায়? এটা তো তার

শোবার ঘর না। রেবেকা, হাসিম কই?

মিজান উঠে বসার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। একটু কাত হয়। অন্ধকারে প্রথমে কিছুই দেখতে পায় না পরে ধীরে ধীরে অন্ধকার সয়ে আসে। ও চিত হয়ে শুয়ে আছে। অনেক ওপরে ছাদের কাছে ছোট্ট একটা ডিমলাইট টিমটিম করে জ্বলছে। পা দুটো মনে হচ্ছে শরীর থেকে আলাদা কিছু, কোনো সাড় নেই। হাত পিঠের নিচে বাঁধা। ঘরটি বেশি বড় নয়। এর মধ্যে অনেক লোক এলোমেলো হয়ে শুয়ে বসে আছে। আবছা আলোয় কারো চেহারা ¯পষ্ট নয়। কেউ কথা বলছে না। নড়াচড়াও করছে না। তবে থেকে থেকে গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে।

মিজান এখানে কিভাবে এল সেটা মনে করার চেষ্টা করে। এ কয়দিনে ঢাকা শহর সে চষে বেড়িয়েছে। প্রায় সবগুলো হাসপাতাল খুঁজেছে, থানায় খোঁজ নেবার চেষ্টা করেছে কোথাও মনির নেই। হাঁটতে হাঁটতে মিজানের পায়ে ফোস্কা পড়ে গিয়েছে। বাবা মা মরা একমাত্র ভাই। বুকের মধ্যে হাহাকার করে ওঠে। রাস্তায় রাস্তায় টহলরত আর্মির গাড়ি। মিজান যে কোনো মুহূর্তে মিলিটারির হাতে ধরা পড়তে পারে বা গুলি করে মেরে ফেলতে পারে সেটা জানে। প্রতিদিন এমন অনেক যুবককে তারা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সে নিজেই মিলিটারির ট্র্যাকে হাত চোখ বাঁধা অবস্থায় যুবকদের দেখেছে। কিন্তু ভাইয়ের জন্য কোনো ভয়কেই সে তোয়াক্কা করেনি। যে যেখানে যেতে বলছে সেখানেই খোঁজ নিতে ছুটে গিয়েছে।

মনির যেতে পারে এমন কয়েকটা ঠিকানা নিয়ে সেদিন সকালে বেরিয়েছিল। ভূতের গলি, বাড্ডা, মুগদা, ঘুরে ঘুরে কোথাও মনিরের খোঁজ পেল না। ফেরার পথে চেম্বার হয়ে ঘরে ফেরার জন্য বেরিয়েছে। সন্ধ্যে তখন উৎরে গিয়েছে। রাস্তায় তেমন রিকশা নেই। যাও দুই একটা আছে কেউ যেতে রাজি নয়। কারফিউ শুরু হয়ে যাবে। সবার মধ্যে একটা তাড়াহুড়ো ভাব। মিজান দ্রুত হাঁটতে থাকে। মোড়ের কাছে এসে দেখল মিলিটারির একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ত্রিপল দিয়ে ঢাকা। ভেতরে কেউ আছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না। মিজান মাথা নিচু করে জায়গাটা দ্রুত পার হয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু দুজন আর্মি এসে পথ রোধ করে দাঁড়াল।

লম্বা দশাসই। ঘাড়ে বন্দুক ঝুলানো। মিজানের মনে হলো অন্ধকারেও সে লোকটির চোখ দেখতে পাচ্ছে অবিকল আজমত খাঁর চেহারা। চোখের মধ্যে রক্ত জালিকা জোঁকের মতো কিলবিল করছে।

নাম কিয়া?

মিজান। এডভোকেট মিজান।

হাহাহা, উকিল সাহাব?

লোকটির অট্টহাসি শুনে মিজানের বুক কেঁপে ওঠে।

তো উকিল সাব ইতনা জলদিমে কাঁহা যাতা হ্যাঁয়। ইধার আইয়ে।

লোকটি ট্রাকের পাশে নিয়েই তার হাত চোখ বেঁধে ফেলল। তারপর ধাক্কা দিয়ে সম্ভবত ট্রাকের মধ্যে ফেলে দিল। চোখ বাঁধা অবস্থায় সে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না তবে সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাসে বুঝতে পেরেছিল ট্র্যাকে সে একা নয় আরও অনেকেই আছে। বেশ কিছু সময় চলার পর তাদেরকে ট্রাক থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে আনা হলো। কোথায় সেটা জানে না। তবে এরপরের কয়েক ঘণ্টা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। চোখ খুলে দিয়েছে কিন্তু তাকিয়ে সামনে দেখার আগেই নাক বরাবর ঘুষি। মিজানের মনে হয়েছিল চোখ দিয়ে আগুনের ফুলকি ছুটছে। সামলে নিতে পারেনি, মেঝেতে পড়ে গিয়েছিল। সে অবস্থাতেই রাইফেলের বাঁট দিয়ে হাঁটু বরাবর বাড়িতে মনে হলো পা ভেঙে দু টুকরো হয়ে গেল। অনেকক্ষণ মেঝেতে পড়ে ছিল। দুজন সিপাহি ধরাধরি করে উঁচু একটা টুলে বসিয়ে দিল। বসে থাকার মতো ক্ষমতা মিজানের ছিল না নাক মুখ দিয়ে ঝরঝর করে রক্ত ঝরছে। ওদের একজন ধরে রেখেছে। মুখের সামনে সূর্যের মতো জ্বলন্ত বাল্ব কত পাওয়ার কে জানে। চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। বাল্বের ওপাশে কেউ একজন বসে আছে তার চেহারা মিজান দেখতে পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর ওপাশে বসে থাকা লোকটি গমগমে কণ্ঠে ইংরেজিতে বলল,

তুমি তাহলে এডভোকেট

মিজান ঘাড় নাড়ায়।

কোর্টে যাও নাকি হরতাল কর?

প্রতিদিন যাই স্যার। কণ্ঠে জড়তা নিয়ে মিজান ধীরে ধীরে বলে।

রবিউলকে তুমি চেন?

জি না স্যার।

তোমার ভাইকে চেন না? খুব আশ্চর্য তো।

মনিরের বন্ধু রবিউলকে মিজান চেনে। ওরা একসাথে ছাত্র ইউনিয়ন করে। অনেকবার বাড়িতে এসেছে। রবিউলকে যখন খুঁজছে তখন এরা মনিরকেও নিশ্চয় খুঁজছে। সম্ভবত ইনফরমেশনে গোলমাল হয়ে গিয়েছে মনিরের বদলে ওকে রবিউলের ভাই ভেবেছে। মিজান আরও সাবধান হয়ে যায়। বেফাঁস কিছু বলা যাবে না।

জি না স্যার। আমার কোনো ভাই নেই। এবার মিজানের কণ্ঠ বেশ দৃঢ়।

ঝুট বলতা হ্যাঁয়। আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে তোমার ভাই রবিউল। টেররিস্ট বোমাবাজি করেছে।

মিজান একই জবাবে অনড় থাকে। তাকে আরও কিছু সময় জেরা করে পুনরায় হাত বেঁধে এই ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়।

মাঝারি সাইজের ঘর। উজ্জ্বল একটা আলো জ্বলছে। সে আলোয় দেখতে পেল একগাদা মানুষ সেখানে কেউ বসে কেউ শুয়ে আছে। শুয়ে আছে বললে ভুল হবে শুইয়ে রাখা হয়েছে। বসে থাকার তাদের ক্ষমতা নেই। প্রত্যেকের হাত পেছন দিকে বাঁধা। কারো ঠোঁটের কোণ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে কারো মাথা ফাটা। হাত ভাঙা পা ভাঙা। নাক থেঁতলে গিয়েছে। মিজানের নিজেরও নাক দিয়ে এখনো টপটপ করে রক্ত ঝরছে। দুজন কিশোর মরার মতো পড়ে আছে। জীবনের স্পন্দন আছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না। ওদের মাথার পাশে মেঝেতে রক্ত জমাট হয়ে গিয়েছে। এই বালকগুলোর কি অপরাধ মিজান বুঝতে পারল না।

মিজানকে দেখে কারো মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। মানুষগুলোকে অশরীরী ছায়ার মতো লাগছে। এতগুলো মানুষ একটি ঘরে অথচ কি সুনসান! কেউ ফিসফিস করেও কথা বলছে না। মিজানও কোনো কথা বলেনি ইচ্ছা করেনি। এখানে আসার কারণ এখন সবারই জানা।

বসে থাকতে থাকতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল বা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। আজ কি বার কত তারিখ কতদিন এখানে বন্দি হয়ে আছে কিছুই বলতে পারছে না। রেবা কোথায়, হাসিম কেমন আছে? মিজানকে ছাড়া হাসিম রাতে ঘুমাতে পারে না। এখন কি করছে কে জানে মিজান নিজেই কি এই জল্লাদের কারাগার থেকে জীবিত ফিরতে পারবে সে আশা করতে পারছে না। কত শত লোককে ওরা মেরে ফেলেছে। মনিরকেও হয়তোবা তাই। মিজানের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।

মিজান আচ্ছন্নের মতো পড়ে ছিল হঠাৎ মনে হলো কেউ দরজা খুলছে। ওরা কেউ কেউ একটু সচকিত হয়, কেউবা আগের মতোই নির্জীব হয়ে পড়ে থাকে। দুজন আর্মি ঢুকেছে হাতে বন্দুক। একজন লিস্ট থেকে একেক জনের নাম ধরে ধরে ডাকছে। মিজান কিছু বুঝতে পারছে না। লোকগুলোকে তারা দুভাগে ভাগ করল মিজান যে ভাগে পড়ল তাদের দলে মাত্র ছয়জন অন্যদিকে অন্তত পনের বিশজন। ওদের সবাইকে চোখ বেঁধে সারি ধরে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। মিজানদের হাতের দড়ি খুলে একজন সিপাহি ঘাড় ধরে ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করে দিয়ে বলে, আপলোগ ঘর যাইয়ে।

মিজান দাঁড়িয়ে থাকে। বুঝতে পারছে না সে ঠিক শুনছে কিনা। লোকটি ধমক দেয়, কেয়া বলা শুনতা নেহি? জলদি যাইয়ে।

মিজান হাঁটতে পারছে না অনেক কষ্টে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেরিয়ে আসছে। লম্বা করিডোর। একজন সিপাহির কাঁধে ভর দিয়ে এক যুবক ঢুকছে। তার প্রায় পুরো শরীর রক্তাক্ত। কাছে আসলে মিজান আঁতকে ওঠে। রবিউল। মিজানের ছাড়া পাবার পেছনে তাহলে এই কারণ। কিন্তু মনে মনে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে মনির ধরা পড়েনি তো? রবিউলের চোখ বন্ধ মিজানকে সে দেখতে পেল না। মিজান বুঝতে পারে আল্লাহর অসীম রহমতে সে ছাড়া পেয়েছে কিন্তু চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া মানুষগুলো আর কোনোদিন বাড়ি ফিরতে পারবে না।

বাইরে এসে বহুক্ষণ এলোমেলোভাবে উদ্দেশ্যহীন হাঁটার পর ওয়ারীর কাছে এসে রাস্তা মনে পড়ল। পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কাছে কিছু টাকা ছিল এখন দেখল পকেটে মানিব্যাগ নেই। রিকশা নেওয়া সম্ভব নয়। মুখের পাশে শুকনা রক্ত লেগে আছে। মিলিটারি যদি খেয়াল করে তাহলে পুনরায় ধরে নিয়ে যাবে। মিজান ছোট ছোট গলির মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটে পা রাখে। জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। এত ক্লান্তি লাগছে মনে হচ্ছে রাস্তাতেই শুয়ে পড়ে কিন্তু বাড়ির রাস্তায় ওঠার পর মনের মধ্যে তীব্র একটা জোর তৈরি হলো। যত দ্রুত সম্ভব সে বাড়িতে পৌঁছাতে চাচ্ছে। না জানে রেবেকা, হাসিম কেমন আছে। মনির ফিরে এল কিনা।

মিজানের মনে হলো সে ভুল রাস্তায় এসেছে। বাড়িগুলো পরিত্যক্ত মনে হচ্ছে। না ওই তো, ঠিকই তো আছে। ওই যে হারুনের দোকান ঠিক ওদের গলির মুখেই। হারুন দোকানে বসে আছে। মিজানকে দেখে হারুন এগিয়ে আসে মিজানের কাঁধে হাত রাখে কিন্তু কিছু বলে না। মিজান অবাক হয়। মলয় কাকুর বাসার বাউন্ডারির ভেতর দিয়ে ওদের বাসায় যেতে হয়। মলয় কাকুর বাসার দিকে চোখ পড়তে মিজানের বুক শুকিয়ে আসে। আগুনের ধ্বংসলীলা পুরো বাড়িতে প্রকট। মলয় কাকুর গেটের কাছে দুজন বিহারি যুবক দাঁড়িয়ে হাসি তামাসা করছে। একজন মিজানের দিকে তাকাল। কি ভয়ঙ্কর দৃষ্টি!

মিজান দৌড়ে নিজের বাসার কাছে যায়। গেট খোলা। দরজায় বড় একটা তালা ঝুলছে। তালাটা ওর পরিচিত নয়। ওর মাথা কাজ করছে না। রেবেকা গেল কোথায়? ঢাকায় তেমন কোনো আত্মীয়স্বজন নেই যে সেখানে যাবে। ওকে না পেয়ে যশোর গেল না তো? কিন্তু সেটা হলে এই তালা কেন লাগাবে? মলয় কাকুর বাড়িতে আগুন, বিহারিদের আনাগোনা কি নির্দেশ করছে?

মিজান মাটিতেই বসে পড়েছিল। কি মনে হতে চট করে উঠে জানালার কাছে গেল। এক টান দিয়ে জানলার পাশ থেকে একটা ইট টেনে বের করে সেখানে হাত ঢুকিয়ে দিল। ইটের আড়ালে ছোট একটা গর্ত। এটা ঘরের চাবি রাখার গোপন জায়গা। আগে বাবা যখন ঘরে তালা দিয়ে বাইরে যেতেন তখন চাবিটা এখানে রেখে যেতেন। মনির বা মিজান যাতে এসে পায়। রেবেকাও কয়েকবার এখানে চাবি রেখে বাইরে গিয়েছে। মিজান ওইটুকু জায়গায় পাগলের মতো হাতড়ায় কোনো চাবি নেই।

একটা কাগজ বের করে আনে। মিজানের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মনির লিখেছে।

ভাইজান, আমার সালাম নিও। জানি আমাকে নিয়ে তোমরা খুব চিন্তিত আছ। আমাকে নিয়ে একদম ভেব না। আমি আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। গত কয়েকদিন নরসিংদী ছিলাম। এই কারণে তোমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। তুমি তো জান পাক বাহিনী আমাদের সাথে যা করছে সেটা মেনে নেওয়া যায় না। তাই ঠিক করেছি ওদের সমুচিত শিক্ষা দেব। আমরা যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছি। এখন যথেষ্ট সংগঠিত। আমরা এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছি। আমি কবে কোথায় থাকি বলতে পারছি না। তোমাদের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম কিন্তু ঘরে তালা দেখে এই চিঠি লিখে যাচ্ছি। তোমরা কোথায় গিয়েছ বুঝতে পারছি না। যদি যশোর গিয়ে থাক তাহলে আমার এই চিঠি পাবে না কিন্তু এই চিঠি যদি হাতে পাও তাহলে বলব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভাবী এবং হাসিমকে নিয়ে যশোর চলে যাও। ঢাকা এখন নিরাপদ নয়। ওদেরকে বাড়িতে রেখে যুদ্ধে যাও। দেশকে বাঁচাও। বেঁচে থাকলে স্বাধীন বাংলায় আমাদের দেখা হবে আর যদি বেঁচে না থাকি তাহলে ভেবে নিও তোমার ভাই দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছে।

আল্লাহ তোমাদের মঙ্গল করুন। ভাবীকে সালাম দিও হাসিমের প্রতি স্নেহ।

ইতি মনির

পুনঃ- মলয় কাকুর বাড়িতে দেখলাম শয়তানরা আগুন লাগিয়েছে। আসার সময় কিছু বিহারিদেরকে পাহারায় থাকতে দেখেছি। বিহারিদের থেকে সাবধান থেকো ভাইজান। ফিরে এসে আমরা এদের একটা ব্যবস্থা করব ইনশাল্লাহ। জয় বাংলা।

মনিরের চিঠি পড়ে তার বিষয়ে আশ্বস্ত হয় মিজান। কিন্তু রেবেকা, হাসিম, মন্টু কারো কোনো কথা সেখানে নেই। মনিরের সাথে ওদের দেখা হয়নি। তাহলে কোথায় গেল?

মিজান উ™£ান্তের মতো আবার গলির মুখে আসে। দোকানে হারুন একা। তার কাছে যায়।

হারুন আমাদের বাড়ির কাউকে দেখেছ? ওরা কোথায় গিয়েছে বলতে পার?

হারুন এদিকে ওদিকে তাকিয়ে মিজানকে হাত ধরে টেনে দোকানের পেছনে নিয়ে যায়। ভাইজান আপনে পালান। ওই দেখেন গলির মুখে বিহারির বাচ্চারা। এখনই খবর চলে যাবে। আমার কথা কাউকে বলবেন না। পালান।

কি বলছ এসব, ওরা কোথায় গিয়েছে?

মলয় বাবুর বাড়িতে যেদিন আগুন লাগাইয়া দেয়, তারপরের দিন। আর্মির একটা জিপে এসে ভাবী আর বাচ্চাকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। সাথে একজন বিহারি আর আপনার ওই চাচা ছিল। উনি প্রতিদিন একবার করে আসেন চারদিকে বলে বেড়াচ্ছেন আপনি উনার কাছে বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন। মিজানের মাথা ঘুরছে; চোখের সামনে অন্ধকার।

কোথায় নিয়ে গিয়েছে, কেন? সে যেন নিজেকেই প্রশ্ন করছে।

কোথায় নিয়ে গিয়েছে সেটা তো জানি না তবে শুনেছি এরকম আরও মেয়েদেরকে পাক বাহিনী ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ভাইজান আপনি যদি বেঁচে থাকেন তাদেরকে খুঁজে পাবেন কিন্তু এখানে থাকলে আপনার বিপদ। আপনার চাচা বিহারিদের লাগিয়ে রেখেছে। যে কোনো সময় মেরে ফেলবে বা আর্মিদের হাতে ধরিয়ে দিতে পারে।

কয়েকদিনের মানসিক যন্ত্রণা, শারীরিক নির্যাতন, না খাওয়া অসুস্থ শরীর। তার ওপর স্ত্রী-সন্তান হারানোর এই শোক মিজান কুলিয়ে উঠতে পারছে না। ওর মাথার মধ্য দিয়ে লক্ষ ওয়াটের তাপ প্রবাহিত হচ্ছে। ওর স্বাভাবিক চিন্তা শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। সামনে কোনো বাড়ি নেই, কোনো নদী নেই, গাছপালা নেই. কোনো মানুষ নেই, সামনে সবকিছু বিরান। হারুন অবাক হয়ে দেখল, মিজান ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছে। দৌড়াতেই থাকে। এক সময় দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।

পাঁচ.

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে বিশ বছর কেটে গিয়েছে। স্বঘোষিত রাজাকার দিদারুল মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেয়েছে। র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটের সরু গলির শেষের সেই জায়গাটিতে দিদারুল রিয়েল এস্টেটের বহুতল ভবন। মনির ফিরে আসেনি। রেবেকা, হাসিম, মন্টু কেউ ফেরেনি।

লোকটি বৃদ্ধ। রাস্তার পাশে ফুটপাতে ঝিম ধরে বসেছিল। মাথায় লম্বা জটায় উকুন হাঁটছে। হাত পায়ের নখ কতকাল কাটা হয়নি কে জানে। লম্বা দাঁড়ি গোঁফে ঢাকা মুখে শুধু চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। লোকটির পা ফেটে রক্ত পড়ছে। সামনের থালায় এক খণ্ড পাউরুটি, কয়েকটা খুচরা টাকা। পাউরুটিতে মাছিদের মচ্ছব।

ফুটপাত ধরে একজন তরুণী মা হেঁটে যাচ্ছিল। তার হাতে ধরা ছোট্ট ছেলেটির বয়স আড়াই তিন বছর হবে। শিশুটির দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ লোকটির মধ্যে ভীষণ রকমের চঞ্চলতা দেখা দিল। তড়াক করে সে উঠে দাঁড়াল। বৃদ্ধ শিশুটিকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে পিষে ফেলতে চাইছে। তার সমস্ত শরীরে চুমু খেতে খেতে বলছে,

হাসিম, বাবা এতদিন কোথায় ছিলি?

শিশুটি ভয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। তরুণী দুহাতে ধাক্কা দিয়ে বৃদ্ধকে সরিয়ে দেয়।

ছাড়–ন, ছাড়–ন এ কি করছেন? ও হাসিম নয়, আমার ছেলে রবিন।

রেবু, আমাকে চিনতে পারছ না? আমি মিজান। মন্টু কই? মনির কি যুদ্ধ জয় করে ফিরেছে? দেখ স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ছে।

সামনে স্কুলে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। তরুণীটি সেদিকে তাকিয়ে অদ্ভুত দৃষ্টিতে বৃদ্ধকে দেখে। তারপর বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে ধীরে ধীরে চলে যায়।

বৃদ্ধটি খুব অবাক হয়। নিজের মনে বিড়বিড় করে বলে,

রেবু আমাকে চিনতে পারল না কেন? হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj