ভালোবাসা এতো নীল কেন বলতে পারো : লায়লা আঞ্জুমান ঊর্মি

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

প্রতিদিনের মতো আজও প্রভাত এসেছে। ইউক্যালিপটাস গাছের বিষাক্ত বাতাসে, পাঁজরের বাম কুঠরিতে গোপনে তুলে রাখা এক অপ্রিয় সত্যকে নাড়া দিয়ে দিলো।

আজ কেন জানি দিনের শুরুতেই এক ধরনের নীরবতা নেমে আসলো। গত রাতটাও ছিল একেবারে শ্মশান- করুণ। ঘুম ভেঙে হঠাৎ জেগে, উদ্বাস্তুর মতো কাউকে খুঁজে বেড়ানোর মতো অসহায়ত্ব খুবই নির্মম। মনে প্লাইস্টোসিন প্রস্তর লেপে নিলেও বারবার ভাঙতে থাকে; তীব্র বিষাদ এসে কুড়ে খায় অস্তিত্বকে। কারণ অস্তিত্বের ভাঙন ঠেকানোর মতো মনোবল সবার থাকে না।

আনমনে ভাবছে অহনা।

কি পাইনি তার হিসেব করার প্রয়োজন অনুভব করিনি, তবে কি যে হারিয়েছি সেই ব্যথাটাই আজ প্রবল হয়েছে।

নিজের সাথেই চলতে থাকে অহনার তর্ক, দ্ব›দ্ব আর সম্পর্কের টানাপড়েন।

মনের মধ্যে একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে বারবার-

একদিন তুমিই তো বলেছিলে, আর একলা থেকো না। তবে কেন যে আমাকে আরো নিঃসঙ্গতা, দীর্ঘশ্বাস আর একাকীত্ব উপঢৌকন দিয়ে গেলে তা আমার আজও জানা হলো না। ভাবতে ভাবতে চোখের কোণটা ভিজে উঠলো অহনার। চোখ মুছতে গিয়ে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া সেই মানুষটার লেখা কয়টা কবিতার লাইন মনে পড়ে গেলো-

‘ভেজা চোখে যে সুর ভাসে

কোন সে বীণার সাধ্য আছে-

ভালোবাসে, তারে ভালোবাসে।’

হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ আর গাড়ির হার্ড ব্রেকের কারণে সামনের সিটে এলিয়ে রাখা অহনার শীর্ণ শরীরটা ছিটকে পড়ে যাচ্ছিল। সাথে সাথেই একটা হাত শক্ত করে গলা জড়িয়ে ধরে বলল-

কিরে, ভয় পেয়েছিস??

না, কতদূর আসলাম?

এইতো সেন্ট্রাল রোড পাড় হচ্ছি। বুঝতেই পারছিস রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট।

আচ্ছা। বলেই চোখ বন্ধ করলো অহনা।

দুজনের গন্তব্য স্কয়ার হাসপাতালের মনরোগ বিশেষজ্ঞ ড. ডেভিড সাইমনের চেম্বার।

গত চার বছর ধরে বিভিন্ন মনরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা হয়েছে দুজনের। এই ডাক্তারের সাথে আজই প্রথম সাক্ষাৎ অহনার।

দুটো মুখোমুখি চেয়ারে ডাক্তার আর অহনা বসেছে। এমন রূপবতী একটা মেয়ের এতো জটিল অসুখ ভাবতেই ড. ডেভিড বিমর্ষ হলেন। এক দৃষ্টিতে তিনি অহনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন। আর অহনা আগের মতোই তার কোলের ওপর রাখা নোট বইয়ের মধ্যে ডুবে আছে।

ডাক্তার ডাকলেন-

অহনা! (সাড়া নেই)

আবারও ডাকলেন-

অহনা! (এবারও কোনো সাড়া পেলেন না)

জ্যোতি! (এবার চোখ তুলে তাঁকালো অহনা, এটা ত‚র্যের দেয়া নাম)

আমার নাম জানেন? অথচ সবাই ভুল করে আমাকে অহনা বলে ডাকে।

আমরা কি বন্ধু হতে পারি অহনা?

আপনাকে তো চিনি না।

আমি তোমার নাম জানি তাহলে ধরে নাও কিছুটা চেনাজানা আমাদের অবশ্যই আছে।

হুম বলে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো অহনা।

শুভ জন্মদিন।

অবাক দৃষ্টি নিয়ে আর কিছুটা বিশ্বাস মনে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে অহনা বলল- ধন্যবাদ।

তোমার আজ কতো বছর পূর্ণ হলো?

চব্বিশ বছর।

ড. ডেভিড ভ্রæযুগল কুঁচকে নিয়ে অহনাকে প্রশ্ন করলেন-

এটা কতো সাল অহনা?

১৫ই জুন ২০১০ ইং। (এতোটা সমস্যা ডাক্তার আশা করেননি))

পাঠক, এখানে আগেই বলে রাখি সময়টা ছিল ১৫ই জুন ২০১৫ইং। জীবনের পাঁচটি বছর অহনার স্মৃতি থেকে মুছে গেছে।

আট বছর বয়সে অহনার মা মারা যাওয়ার পর জহির সাহেব আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। নিজেই ওর বাবা-মা উভয় হয়েছেন। মা মরা মেয়েকে উজাড় করে দিয়েছেন সমস্ত আদর-ভালোবাসা। আর অহনাও এই বাবা বলতেই সমস্ত পৃথিবীকে বোঝে। মেয়ের সমস্ত আবদার, আকাক্সক্ষা তিনি চোখ বন্ধ করেই পূর্ণ করেছেন। তবুও তার মাঝে মাঝে মনে হতো মেয়েটার মনে অন্য একটা স্থান আছে যেখানে তিনি কখনই প্রবেশ করতে পারবেন না। যদিও এই বাবা-মেয়ের সম্পর্ক বন্ধুর মতো তবুও সেই স্থানটার খবর তিনি জানতে পারছেন না। হয়তো ওর মা থাকলে খুব সহজেই সেখানে প্রবেশাধিকার পেতো। এই ভেবে ভেবে জহির সাহেব অনেকটা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালে নেয়া হলে ডাক্তার জানিয়েছে হার্ট ব্লুক হয়েছে। জহির সাহেব ভাবলেন অহনার কথা। ওর কি হবে যদি তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়ের বিয়ে দেবেন। বিয়ের কথা শুনে অহনা হতবাক কিন্তু বাবার অসুস্থ মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছুই বলল না। অহনার পছন্দের কোনো ছেলে আছে কিনা জানতে চাইলে সে বাবার পছন্দের ছেলেকেই বিয়ে করবে বলে জানিয়ে দিলো। তাছাড়া ও যাকে ভালোবাসে সে তো রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতার’ অমিত রায়। ২০০২ সালে এসএসসি পরীক্ষার পর সময় কাটানোর জন্য বাবা বেশ কিছু বই এনে দিয়েছিলেন। এই বইটাও ছিল সেখানে। এটা অহনার সবচেয়ে প্রিয় বই। প্রথম যেদিন বইটা পড়েছিল সেদিন থেকেই অমিত রায়ের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। তবে অমিতের মতো আর কাউকে খুঁজে পায়নি অহনা।

শিক্ষিত, সুদর্শন, অবস্থা সম্পন্ন এবং একটা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের বড়ো কর্মকর্তা আবির আহমেদের সাথে খুব ধুমধাম করেই বিয়ে হয়েছিল অহনার। কিন্তু বিয়ের পর প্রায় বছর খানেক সময় অতিবাহিত হলেও অহনা ওর বাবাকে ছেড়ে আবিরের সাথে যায়নি এমনকি দুজনের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মতো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। আবির এসব মুখ বুজে সহ্য করে নিয়েছে কারণ ও অহনাকে মনে-প্রাণে ভালোবেসে ফেলেছে। অহনা আজকাল আবিরের সাথে বেশ সহজ হয়ে উঠেছে। একসাথে গল্প করছে, শপিংয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে কাছাকাছি কোথাও বেড়াতেও যাচ্ছে। অহনাদের বাসায় আবিরের জন্য একটা শোবার ঘর বরাদ্দ রয়েছে। ইদানীং এই ঘরে আবির প্রায় রাতে থেকে যাচ্ছে কারণ অনেক সময় গল্প আর খাওয়া-দাওয়া শেষে বেশ রাত হয়ে যায়। এরই মাঝে আবির এসে জহির সাহেবকে বলল-

বাবা, অহনা সবুজ প্রকৃতি, পাহাড় খুব পছন্দ করে তাই আমি ঠিক করেছি আমরা তিনজন মিলে দুদিনের জন্যে সিলেট-মৌলভীবাজার ঘুরে আসব।

ও বেশ ভালো কথা কিšন্তু আমার শরীরের অবস্থা বেশি একটা সুবিধার না তাই আমি না গেলাম। তোমরা দুজন যাও।

আবির মনে মনে বেশ খুশি হয়েছে তবে এখন অহনাকে রাজি করাতে পারলে হয়।

অহনা পাহাড় আর চা বাগান দেখার কথা শুনে বেশ খুশি হলো কিন্তু যখন জানলো বাবা যেতে পারবে না তখন সেও যাবে না বলে দিল। অবশেষে জহির সাহেব মেয়েকে বুঝিয়ে দুদিনের জন্যে আবিরের সাথে পাঠিয়ে দিলেন। ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার পৌঁছাতে প্রায় রাত হয়ে গেছে। ওরা উঠেছে সেখানকার এক ডাকবাংলোতে। বেশ অনেকটা পথ ভ্রমণ করে ওরা দুজনেই বেশ ক্লান্ত আর এরই মধ্যে প্রচণ্ড রকমের বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পাহাড়ি এলাকার বৃষ্টি সহজে থামার নয়। রাত দশটায় কেয়ার টেকার খাবার পাঠিয়ে দিলো। হালকা পাতলা কিছু খেয়ে অহনা বিছানায় ঘুমাতে গেলো। আবির সোফায় বসে একটা সিগারেট ধরালো। অহনা তখন গভীর ঘুমে। নির্জন পাহাড়ের এই বাংলোতে ওরা দুজন একা, অবিরাম বর্ষণ আর অহনার ঘুমন্ত মুখ সব মিলিয়ে কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলো আবির। এই প্রথম অহনার গালে ঠোঁট ছোঁয়ালো আবির। অহনার সাথে সাথে ঘুম ভেঙে গেলো। ভয় আর জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে থাকলো। আবির শক্ত হাতে অহনাকে বুকে জড়িয়ে নিতে চাইলে অহনা প্রাণপণে নিজেকে ছাড়াতে চাইল। কিন্তু আবিরের পৌরুষের কাছে চূর্ণ-বিচূর্ণ হলো তার নারীসত্তা।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই গত রাতের কথা মনে করে আবির কুঞ্চিত ও লজ্জিত হলো। অহনার সামনে দাঁড়ানো কঠিন। বিছানা থেকে নামতেই মেঝেতে পড়ে থাকা অহনার বিপর্যস্ত শরীর দেখে আবির চমকে উঠলো। দৌড়ে গিয়ে অহনাকে কোলে করে বিছানায় শুইয়ে দিলো। মনে হয় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে আর শরীরে ভীষণ জ্বর। আপাতত কেয়ার টেকারকে দিয়ে ডাক্তার ডেকে আনলো। ডাক্তার এসে ইনেজকশন পুশ করলেন আর প্রেসক্রিপশনে কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে বললেন জ্ঞান ফিরলে খাইয়ে দিতে। ঘণ্টাখানেক পর অহনার জ্ঞান ফিরে আসলে আবির ওর কাছে গত রাতের অশোভন আচরণের জন্য ক্ষমা চাইলো। অহনা শুধু বলল আমি বাবার কাছে যাবো। কণ্ঠ স্বরের মধ্যে এমন কিছু ছিল যে আবির আর কিছু বলার সাহস পেলো না।

মেয়েকে দেখে জহির সাহেব হতবুদ্ধি হয়ে বললেন- এ কি চেহারা হয়েছে তোর? এক দিনেই চেনা যাচ্ছে না।

অহনা কিছু না বলে নিজের ঘরে চলে গেলো। আবির অপরাধীর মতো বসার ঘরের সোফায় বসে পড়লো। রহিমা খালা অহনার ঘরে এক গøাস পানি নিয়ে ঢুকলে অহনা বলল ওর বাবাকে এই ঘরে একা আসতে যেন বলা হয়।

জহির সাহেব মেয়ের ঘরে এসে বসতেই অহনা বলল আবির যেন এই বাসা থেকে চলে যায় এবং আর কোনো দিন যেন অহনার সামনে না আসে।

তারপর থেকে প্রায় দু’মাস আবির প্রতিদিন অহনার বাসায় আসলেও একটি বারের জন্যও অহনাকে দেখতে পারেনি। এদিকে অহনার অবস্থা দিনদিন খারাপ হচ্ছে। কারো সাথে কোনো কথা বলে না, ঘর থেকেও বের হয় না। খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়ম আর নির্ঘুম থেকে থেকে ভীষণ রকমের অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে ভর্তি করার পর ডাক্তার বললেন সমস্যা যতটা না শারীরিক তারচেয়ে মানসিক সমস্যাই বেশি। তাছাড়া ডাক্তারের যে সংবাদে জহির সাহেব সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছেন তা হলো অহনা চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি এখন বুঝতে পারছেন কেন অহনা গত চার মাস ধরে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। বাবা হিসেবে নিজের ব্যর্থতায় তিনি নিজেকেই উপহাস করলেন। ওর মা থাকলে বিষয়টা অনেক আগেই বুঝতে পারতেন। এই মুহূর্তে তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে আর কোনো দিন আবিরের সাথে অহনাকে দেখা করতে দেবেন না। ওর জন্যেই মেয়েটার আজ এই অবস্থা। আবির হাসপাতালে এসে অহনার অন্তঃসত্ত্বার খবরটা শুনে আরো বিচলিত হয়ে পড়লো। কারণ বলতে গেলে অহনা এখন একেবারেই মানসিক ভারসাম্যহীন। নিজেকে সে আজও ক্ষমা করতে পারেনি। জহির সাহেবকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে অজানা এক ভয়ে সমস্ত শরীর হিম হয়ে গেছে। তিনি এসে আবিরকে বললেন যেন আর কোনো দিন অহনা কিংবা উনার সামনে সে না আসে। আবির অনেক চেষ্টা করেও নিজের ভুলের জন্য জহির সাহেব, অহনা এমনকি নিজের কাছেও ক্ষমা পেলো না।

মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায়ই দশ মাস দশ দিন পর অহনার কোলে এলো ফুটফুটে একটি ছেলে সন্তান। এই সন্তানের স্নেহে ধীরে ধীরে অহনা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে তবে আবিরকে ক্ষমা করতে পারেনি কোনো দিনও। স্বামীর কাছে ধর্ষিতা হবার বিষয়টি অহনা সহজভাবে নিতে পারেনি। তাছাড়া আবিরকে বন্ধুর মতোই গ্রহণ করেছিল অহনা, কিন্তু তার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে ছিল সেই কিশোরী বয়সের প্রেম অমিত রায়। বছর দুই-এক হলো আবির কানাডায় স্যাটেল হয়েছে। তবে সেও একাকীত্বকেই বেছে নিয়েছে।

আগে থেকেই লেখালিখি করার অভ্যাস ছিল অহনার। আর এখন প্রায় অনেকটা সময়ই কাটে লেখালিখি নিয়ে। অনলাইন কিছু কবিতা, গল্প আর সাহিত্য গ্রুপে নিয়মিত লিখে থাকে অহনা। নিজের জীবনের কষ্টগুলোকে উপমা, অলংকার আর ছন্দ দিয়ে চরণে চরণে বর্ণনা করে যায়। ফেসবুক কবিদের মধ্যে অহনার জনপ্রিয়তাও রয়েছে বেশ। বন্ধু তালিকায় অনেক কবি, সাহিত্যিক, পাঠক, সমালোচক, প্রকাশক রয়েছে। তাদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা আর সাড়ে তিন বছরের দুরন্ত ছেলের সাথে ভালোই সময় কেটে যাচ্ছে অহনার। অহনার নিজেরও অনেক পছন্দের কবি রয়েছে যাদের লেখা পড়ার জন্য চাতক চোখে অপেক্ষা করে থাকে। তেমনই একজন তরুণ, বিজ্ঞ, তুখোড় কবি ত‚র্য নীরদ যাকে অহনা গুরুর মতো শ্রদ্ধা করে এবং তার কবিতার একজন একনিষ্ঠ ভক্ত। তার বিভিন্ন কবিতা এবং অহনার নিজের কবিতায় মন্তব্য করার মধ্য দিয়েই দুজনের মাঝে সখ্য গড়ে উঠেছিল। তবে ক্ষুদে বার্তা বা মোবাইলে কথা হয়নি তখনও। তবে পাঁচ নভেম্বর কবির জন্মদিনে গ্রুপের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানানো হলে অহনা সাহস করে কবির ইনবক্সে ‘শুভ জন্মদিন’ লিখে একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠায়। যদিও অহনা ভেবেছিল কোনো রিপ্লে আসবে না তবুও সেই ভাবনাকে মিথ্যে করে দিয়ে কবি অহনাকে রিপ্লেতে লিখেছেন-

কবি : ধন্যবাদ।

আমি কল্পনাও করিনি যে আপনি আমার জন্মদিনে উইশ করবেন।

অহনা : কেন নয়?

আমি আপনার একজন ভক্ত এবং আপনাকে গুরুর মতো শ্রদ্ধা করি।

কবি : কি যে বলেন! আমি তেমন কি-ই বা লিখি?

আপনিও দারুণ লিখেন।

অহনা : হা হা হা

হাসালেন আমাকে।

শুভ রাত্রি।

কবি : শুভ রাত্রি।

অহনা মনে মনে আজ ভীষণ খুশি হলো।

সারাদিন ছেলের সাথেই সময় কাটে অহনার। জহির সাহেবের সময়ও বেশ ভালো কাটছে যদিও মেয়ের কথা ভেবে মাঝে মাঝেই উদাস হয়ে পড়েন। তবুও এটা ভেবে খুশি হন যে অহনা এখন পুরোপুরি সুস্থ আছে আর নিজের মতো করে বেশ ভালো আছে।

রাত দশটার পর সাধারণত অনলাইনে বসে অহনা। লগ ইন করতেই কবির একটা ইনবক্স চোখে পড়লো। অনেকটা উত্তেজনা নিয়ে ইনবক্স ওপেন করে দেখে কবি লিখেছেন-

‘একজনের জন্য আমি রাত এগারোটার পর অপেক্ষায় থাকবো।’

একই লেখা অহনা বারবার পড়তে থাকলো। কিন্তু রিপ্লেতে কি লিখবে বুঝতে পারছে না। তারপর অহনা রিপ্লে করলো-

আমার সৌভাগ্য।

এভাবেই দুজনের মধ্যে কথোপকথন শুরু হয়। লক্ষীপেঁচার সাথে সমস্ত রাত জেগে জেগে একজন আরেক জনের অজানা কথা আর না বলা ব্যথাগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে দুজনের বন্ধুত্ব বেশ গভীর হয়েছে।

এরই মধ্যে একদিন কবি অহনাকে প্রশ্ন করলো-

অহনা, তুমি কতোটা সুখে আছো? আমি নিজের সাথে তোমাকে মিলিয়ে দেখতে চাই।

অহনা : আমি একটুও সুখে নেই, ত‚র্য।

কবি : তোমার দুঃখগুলো আমায় দেবে?

অহনা : না, সে কি হয়?

কবি : কেন নয়??

অহনা : আমার একটা জীবন্ত অতীত আছে। আর আছে আমার অবিচ্ছেদ্য অংশ আমার ছেলে। তাছাড়া আমার সব কিছুই তোমাকে খুলে বলেছি, কোনো কিছু গোপন করিনি।

কবি : তোমার অতীতের জন্যে তুমি দায়ী নও বা এখানে আমি তোমার কোনো কমতি দেখতে পাচ্ছি না। আর তোমার ছেলে কি আমার ছেলে হতে পারে না? আমরা কি নতুন করে শুরু করতে পারি না??

অহনা : এতো এতো সুন্দরী আর কুমারী মেয়ে থাকতে আমাকে কেন বেছে নিলে? কতো মেয়েই তো তোমার জন্য উন্মাদ হয়ে আছে।।

কবি : হা হা হা ….. তবে তাদের কেউই আমার কাম্য নয়। আমার সম্পর্কে কতোটা জানো তুমি?

আর পাঁচটা মানুষের মতো আমারও কিছু কষ্ট আছে, কমতি আছে, না পাওয়ার যন্ত্রণা আছে। আমার কথাগুলো শুনবে? বিদ্যা-বুদ্ধি-পদবি সব থাকতেও কেন এখন পর্যন্ত আমি একা আছি জানতে চাও? কেন আমি এখন পর্যন্ত বিয়ে করিনি শুনবে?

অহনা : নাম ছাড়া তোমার সম্পর্কে আর কিছুই আমি জানি না। তোমার কষ্টগুলো আমার কাছে বলে শান্ত হও। আমি সব শুনবো।।

কবি : কিশোর বয়সে একদিন ক্রিকেট খেলতে গিয়ে বলের আঘাতে আমি প্রচণ্ড রকমের আহত হই। হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর ডাক্তার বলে দিলেন আমি আর কোনো দিন বাবা হতে পারবো না। আমার এমন অক্ষমতা নিয়ে কোনো মেয়ের সাথে ঘর বাঁধি কি করে? কারণ আমি যে কখনোই কোনো নারীকে মাতৃত্বের অহংকারে পূর্ণ করতে পারবো না।

অহনা : দুঃখ করো না। সবারই কিছু কষ্ট থাকে। আর এ কষ্ট বয়ে চলার নামই জীবন।।

কবি : তুমি কি আমাকে আগের মতোই পছন্দ করবে??

অহনা : যা কিছুই হোক না কেন তুমি সবসময় আমার কাছে ‘ত‚র্য নীরদ’ হয়েই থাকবে।

তবে তুমি আমাকে বেছে নিয়েছো কি শুধু মাত্র আমার সন্তানের জন্য? আর কিছু নয়?

কবি : আর একলা থেকো না অহনা। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।।

অহনা : সমাজ আছে, সংসার আছে, তোমার বাবা-মা আছেন তাঁরা কি আমাদের মেনে নেবে? আমার ছেলেকে মানতে পারবে সবাই??

কবি : তোমার জন্যে সমস্ত পৃথিবীকে এক পাশে সরিয়ে রাখবো অহনা।।

এই তো সেই অমিত রায়, যার প্রতীক্ষায় এতোটা সময় সে একলাটি বসে ছিল। অহনাও এই প্রথম ভালোবাসার হাতছানিকে উপেক্ষা করতে পারেনি।

অহনা চোখে কাজল টেনে দিলো। খোলা চুলে তিনটি কাঠগোলাপ গুঁজে দিয়ে গুনগুন সুরে গাইতে শুরু করলো-

‘আমার একলা আকাশ থমকে গেছে

রাতের স্রোতে ভেসে,

শুধু তোমায় ভালোবেসে।

আমার দিনগুলো সব রং চিনেছে

তোমার কাছে এসে,

শুধু তোমায় ভালোবেসে।’

অহনার মন পুরোপুরি কবির কাছে সমর্পণ করলো। কারণ প্রতিটা নিঃসঙ্গ মানুষই সঙ্গী খুঁজে পেতে চায়। এভাবেই দিন সাতেক ভালোবাসার সমুদ্রে ভেসেছিল অহনা। সমস্ত দিন-রাত এক করে দুজন শুধু বলে গেলো ভালোবাসার কথা।

এরই মাঝে কবি যেন কেমন বদলে যেতে লাগলো। সারাদিন একটি বারের জন্যেও অহনাকে কোনো ইনবক্স কিংবা ফোন করার কথা ভুলে গেলো। এমনকি অহনার ইনবক্সের রিপ্লে পর্যন্ত করছে না। আর এদিকে অহনার মনে রাজ্যের অভিমান জমা হতে লাগলো। সেও মনে মনে ভাবলো আর কোনো ফোন বা ইনবক্স করবে না কবিকে। কিন্তু যতবার কঠিন হতে চেয়েছে ততোবারই ভেঙে যেতে লাগলো। না, অহনা কঠিন হয়ে থাকতে পারছে না। এবার সে অনেকটা রাগ আর অভিমান নিয়ে কবিকে ইনবক্স করলো-

আমি কি করেছি? অজান্তে কোনো অপরাধ হয়েছে আমার? জবাব দেবে প্লিজ।

তুমি কিছুই করোনি। আমি শুধু শান্তিতে থাকতে চাই।

কি হয়েছে আমাকে বলবে?

বললাম তো, শান্তি চাই। আমাকে আমার মতো করে থাকতে দাও প্লিজ।

আমি তোমার অশান্তির কারণ? তুমি কি টানাপড়েনে আছো? আমাদের সম্পর্ক নিয়ে তুমি এখনও দ্বিধায় আছো? তাহলে বলি, কোনো বোঝা বয়ে চলার প্রয়োজন নেই। আমার দিক থেকে তুমি সম্পূর্ণ মুক্ত।

আমি অনেক কিছু ভাবছি। আবেগে অন্ধ হয়ে যারা কিছু না ভেবেই সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে, আমি তাদের দলভুক্ত নই।

আমি তোমাকে আগেই ভাবার সময় দিয়েছিলাম। তবে এখন এসব বলছো কেন? আমাদের সম্পর্ক মিথ্যে? তোমার ভালোবাসা? আর যে বলেছ আমার জন্যে সমস্ত পৃথিবীকে এক পাশে সরিয়ে রাখবে, তা কি মিথ্যে ছিল?

না, আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি। তবে আমাকে আরো ভাবতে হবে।

সত্যি ভালোবাসা কখনও এতো ভেবে-চিন্তে হয় না। ভেবে ভেবে কবিতা, গান, গল্প হয়। কখনো নতুন আবিষ্কার হয় কিন্তু ভালোবাসা হয় না। ঠিক আছে ভাবতে থাকো। আর কিছু না হলেও আমরা বন্ধু হতে পারি।

আমি যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে যাচাই করি তাই তোমার সাথে একমত হতে পারলাম না। আমরা তো এখনও বন্ধু আছি। খুব শিগগিরই তোমার সাথে আমার দেখা হচ্ছে।

শুভ রাত্রি।

সত্যি দেখা হবে আমাদের?

শুভ রাত্রি।

অহনা সেই রাতটুকু আর ঘুমাতে পারেনি। এক সময় মনে হয় মানুষটা একটু অন্য ধাঁচের তাই হয়তো মাঝেমধ্যে ভাবুক হয় পড়ে। কবি বলে কথা!!!

কিন্তু মস্তিষ্ক বলে, সে সত্যি ভালোবাসে না। হয়তো একটা ঘোর বা মোহ কাজ করেছিল যা তাকে অহনার পথে নিয়ে এসেছে। আর এখন সব মোহ কেটে গেছে, তাই পালাতে চাইছে।

না, আর ভাবতে পারছে না। মাথায় প্রচণ্ড পেইন শুরু হয়েছে। সেই আগের ব্যথাটার মতো।

মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও ত‚র্যকে নিয়ে ভাবনা সরাতে পারছে না অহনা।

ত‚র্য হয়তো আমাকে চমকে দেবার জন্যে এমন করে অভিনয় করছে। দেখা যাবে সকালে ঢাকায় এসে ফোন দিয়ে বলবে- একটু জানলার পর্দাটা সরিয়ে দেবে? তোমার মুখটা দেখতে পাচ্ছি না।।

অহনা আনন্দে কিশোরীর মতো করে হাসতে শুরু করলো। হাসির শব্দে পাশের ঘর থেকে জহির সাহেব বের হয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়াতেই বুকের মধ্যে একটা অজানা আশঙ্কায় কুঁচকে উঠলেন। তিন বছর আগের সেই মানসিক ভারসাম্যহীন অহনাকে মনে হয় তিনি আবারও দেখতে পেলেন।

আসমানি রঙা শাড়িটা পরিপাটি করে পরে নিয়ে সুন্দর করে কাজল লাগানো দু’চোখের মাঝখানে একটা কালো টিপ লাগিয়ে খোলা চুলে জানালার গ্রিল ধরে বসলো অহনা।

এখন রাত তিনটা বেজে পনেরো, ভোর হতে ঢের দেরি। অহনা ত‚র্যের জন্যে অপেক্ষা করছে। ও ধরেই নিয়েছে ত‚র্য আসবে। তাই জানালার পর্দাটা টেনে দিয়েছে যেন ত‚র্য বুঝতে না পারে অহনা আগে থেকেই সেখানে বসে অপেক্ষা করছে। পাছে ত‚র্য চমকে দেবার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়, তাই নিজেকে আড়াল করে রাখলো।

সকাল নয়টা, অহনা তখনও এক জায়গাতেই বসে আছে। হয়তো রাস্তায় ভীষণ রকমের যানজট তাই ত‚র্যের এতো দেরি হচ্ছে। আরো ঘণ্টা খানিক অপেক্ষা করার পর অহনা ত‚র্যের ফোন নম্বরে ডায়াল করল

আপনার ডায়ালকৃত নম্বরটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন আছে।

যান্ত্রিক গলায় কথাটা বলেই লাইনটা কেটে গেলো। অহনা চিন্তিত হয়ে ভাবছে, ত‚র্যের কিছু হয়নি তো?

অহনার সমস্ত চিন্তাশক্তি শিথিল হতে লাগলো। অস্থির হয়ে অনলাইনে লগইন করলো কিন্তু হাজারো আইডির ভিড়ে ‘ত‚র্য নীরদ’ নামটা খুঁজে পেলো না।

অহনা আর ত‚র্যকে খুঁজে পেলো না। তারপর থেকে কতো রাত অহনা একলা জেগেছিল তার আর হিসেব রাখেনি কেউ। ত‚র্যের অপেক্ষায় কতো নির্ঘুম রাত্রি পার করেছে অহনা কেউ কখনো জানতেও পারেনি। এখন অনেকেই জানে অহনা আবার মানসিকভাবে অসুস্থ। সে ভুলে গেছে তার জীবনের গত হওয়া পাঁচটি বছর। ভুলে গেছে তার একমাত্র অবলম্বন ফুটফুটে ছেলে সন্তানটিকে। এখন অহনা সেই চব্বিশ বছর বয়সে ফিরে গেছে। হয়তো সেখান থেকে ত‚র্য কখনই হারিয়ে যেতো না। রাত জেগে জেগে অহনা লিখে গেলো ত‚র্যকে উৎসর্গ করা ১০৮টি নিখাদ প্রেমের কবিতা।

সৃষ্টির সবচেয়ে রহস্যময় অনুভূতি ভালোবাসা। কতো পরিচিত শব্দ, অথচ আমরা কয়জন চিনতে পেরেছি এই ভালোবাসা নামক অনুভূতিকে?

প্রায় চার ঘণ্টা কাউন্সেলিংয়ের পর ডাক্তার ডেভিড সাইমন, অহনার ডিটেলসে এড করলেন- “চবড়ঢ়ষব পযধহমব ভড়ৎ ঃড়ি সধরহ ৎবধংড়হং : বরঃযবৎ ঃযবরৎ সরহফ যধাব নববহ ড়ঢ়বহবফ ড়ৎ ঃযবরৎ যবধৎঃং যধাব নববহ নৎড়শবহ .”

আর অহনার মন ভেঙেছে বলে এই পরিবর্তন। ভীষণ ভাবে কাউকে ভালোবাসা এক ধরনের দৈন্য দিয়ে যায়। সে হলো সুখ না পাওয়ার দৈন্য কিংবা শান্তি না পাওয়ার দৈন্য।

কিন্তু ত‚র্য ছিল বরাবরের মতোই অতি প্র্যাক্টিকাল। তাই বুদ্ধি আর যুক্তির কাছে ভালোবাসাকে বড়ো হতে দেয়নি। এখন বেশ ভালো আছে নিশ্চয়।

ভালো থাকারই কথা ছিল। ত‚র্যরা সবসময়ই ভালো থাকতে পারে কারণ তারা যে কখনই সত্যি সত্যি ভালোবাসে না।

আর অহনা?

থেমে গেছে ভালোবাসার সেই নীল স্টেশনে, যেখান থেকে ত‚র্য সময়ের ট্রেন ধরে বহু সামনে এগিয়ে গেছে।

অহনাকে বলা ত‚র্যের সবচেয়ে প্রেমপূর্ণ কথাটি- ‘তোমার জন্য সমস্ত পৃথিবীকে এক পাশে সরিয়ে রাখবো’ রাখতে পারেনি ত‚র্য।

সচেতন যুবক খুব সহজেই উপেক্ষা করে গেছে এক নারীকে দেয়া তার প্রতিশ্রæতি।

অথচ সেই নারী আজও ভালোবাসার নীল যন্ত্রণা বয়ে চলছে। অহনার আজ একটাই প্রশ্ন-

ভালোবাসা এতো নীল কেন বলতে পারো? হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj