টেনশন, পেনশন ও ন্যাশন : মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

টেনশন সম্পর্কে কিছু ম্যানশন করা কোনো সহজ কাজ নয়, সিরিয়াস কাজ। সিরিয়াস এ জন্য যে, এটি কোনো মামুলি রোগ নয়, মারাত্মক রোগ। এই মারাত্মক রোগটি মহামারীর রূপ নেয়, যদি মুলুকটি হয় মিসকিন মুলুক। যে মিসকিন তার একিন না করে উপায় নেই। কেননা নিত্য এই সত্যকে নিয়েই তাকে জীবন-জঙ্গের মোকাবেলা করতে হয়।

দুঃখ-দারিদ্র্য, অভাব-অনিশ্চয়তা প্রভৃতি থেকে পয়দা হয় টেনশনের। এর পেছনে আরো অনেক কারণ আছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসল কারণ এগুলোই। আরবিতে একটি শব্দ আছে-ইন্তেজার; যেটি টেনশন এর সমার্থক রূপেও কখনো কখনো ব্যবহৃত হয়। সে জন্যই সম্ভবত একটি প্রবাদও প্রচলিত আছে আরবিতে- আল ইন্তেজারু আশাদ্দুন মিনাল মউত। অর্থাৎ অপেক্ষায় থাকা মৃত্যু যন্ত্রণার চেয়েও মর্মান্তিক। জীবনে মানুষ একবার মরে, কিন্তু টেনশনে মানুষ প্রতিমুহ‚র্তে মরে। এই মৃত্যু থেকে বুঝি মুক্তি নেই। মৃত্যুর পরও টেনশন-জান্নাত না জাহান্নাম? অর্থাৎ শেষ ফয়সালা পর্যন্ত শেষ নেই টেনশনের। এই যে তার জীবনের সাথে জবরদস্তি জুড়ে যাওয়া, তার বুঝি জুড়ি নেই।

টেনশন অনেকটা ট্রেনের বগির মতো। একটার পর একটা এসে জুড়ে যায় জীবনের সাথে। কেননা জীবন মানে যে যন্ত্রণা, নয় ফুলের বিছানা, সে কথা কার না জানা! রামসুন্দর বসাকও বুঝি বুঝেছিলেন ব্যাপারটা। তাই তো বাল্যশিক্ষায় বলেছেন-ভাবনা যত, যাতনা তত। কথাটাকে একটু ভিন্নভাবে ভাবলে তার মানে কি দাঁড়ায়? দাঁড়ায় এই- ভাবনা যত কম হবে, যাতনাও তত কম হবে; ভাবনা নেই, যাতনাও নেই। কিন্তু ভুবনে ভাবনা নেই এমনটা ভুলেও বা স্বপ্নেও ভাবা যায় না। বস্তু বা অচেতন পদার্থের কথা আলাদা। কেননা প্রাণের অস্তিত্বের অভাবে তারা যে অনুভূতিহীন এবং সে কারণে তারা ভাবনার ভারমুক্ত। কিন্তু প্রাণী কখনো পারে না ভাবনামুক্ত থাকতে। প্রাণীদের মধ্যে যারা পশু হিসেবে পরিচিত, তাদের ভাবনাও কম নয়। তাদের মধ্যে মানুষ যাদের গুণ নেই বলে গণ্য করে এবং গালি বা গীবতের ভাষা হিসেবে গণ ব্যবহার করে, সেই গরু বা গাধারাও ভাবনামুক্ত নয় নিজেদের ভালোমন্দ বোঝার ব্যাপারে, ভবিষ্যতের ব্যাপারে। তাহলে মানুষের ভাবনা যে সে তুলনায় কত অধিক, তা সহজেই অনুমেয়। তবে একদিক থেকে মানুষ কিছুটা ভাবনামুক্ত। কেননা ঐসব প্রাণীরা মানুষের গালি বা গীবতের ভাষা বোঝে না। বোঝে না বলে মানুষের রক্ষে। বুঝলে ভার বইতো না গাধা, মানুষই ডাকতো তাকে দাদা। গুরুত্ব বোঝাতে গরুও গুঁতো এস্তেমাল করে প্রতিবাদ প্রকাশ করতো।

মানুষের অভিধানে মাথাব্যথা নামে একটি শব্দ প্রচলিত আছে। মাথা থাকলে ব্যথা তো থাকবেই। তবে শব্দটি যত না মাথাব্যথাকে মূর্ত করে, তারও বেশি ব্যক্ত করে টেনশনকে। এই টেনশন এমনই গুরুতর যে, বাম লাগিয়েও কাম হয় না। ঘুমের দাওয়াই খেলে কিছু সময় হয় তো রেহাই মেলে, কিন্তু রাহা মেলে না। ঘুমেও কি উক্ত উপদ্রব থেকে বেঁচে থাকার উপায় আছে! স্বপ্ন এসে হানা দেয় ঘুমের দেশে। বাস্তব জীবনের স্বপ্নভঙ্গের বেদনাগুলো দুঃস্বপ্ন হিসেবে দেখা দেয় স্বপ্নের মাঝে। সেরকম স্বপ্ন কেউ দেখতে না চাইলেও দেখতে বাধ্য হয়। সেসব কারণে সত্যিকার স্বপ্নসমূহ স্বপ্নই থেকে যায়। তাছাড়া স্বপ্ন দেখারও সমস্যা আছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে স্বপ্নের ছিনতাই হওয়ার সমস্যা। এভাবে চলতে থাকলে স্বপ্ন দেখাই একদিন স্বপ্ন হয়ে যাবে।

পেনশনের সাথে টেনশনের কি সম্পর্ক আছে তা ম্যানশন করার প্রয়োজন পড়ে না ভুক্তভোগীদের কাছে। তাই তো পেনশন নিয়ে টেনশন বলে একটি কথা চালু আছে এই দুর্ভাগা দেশে। চাকরি থেকে অবসরের পর আসে পেনশনের প্রসঙ্গ। কিন্তু অবসরে যাওয়ার পরও অবসর নেই। পেনশনের পেছনে দুশ্চিন্তা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি। দৌড়াতে দৌড়াতে বেশ কয়েক জোড়া স্যান্ডেল ক্ষয় হয়ে যায়। ক্ষয় হতে হতে এমন বেহাল অবস্থা হয় যে, সেলাইয়ের উপায় থাকে না, জাদুঘরে রাখার উপযুক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ টাকা তোলার আগে টাক পড়ে যায় দুশ্চিন্তায়। সেও আরেক সমস্যা। কারণ বিষ্ঠা ফেলার জন্য কাক টাককেই টার্গেট করে। ওপর থেকে হলেও নিশানা তার এত নির্ভুল হয় যে, ঠিক মাথার মাঝখানে এসে পড়ে। পড়া তো নয়, মাথায় বাজ পড়া যেন। কোনো বিয়ে কিংবা বৌ-ভাতে যাওয়ার থাকলে বেবাক কিছুই বানচাল। ওপর থেকে পড়ে বলে কেউ কেউ এটাকে উপরি পাওনা বলেও উপহাস করে।

আসলে টেনশন আরম্ভ হয় তো জীবনের আরম্ভ থেকে অর্থাৎ জন্ম হওয়ার পর থেকে। বঙ্গদেশে প্রতিটি শিশু বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে কিনা সে কারণে। ঋণ না করেও ঋণের বোঝার চেয়ে টেনশন উৎপাদন হওয়ার উৎকৃষ্ট উপাদান আর কি হতে পারে! একজন ছড়াকার কত চমৎকারভাবেই না তুলে ধরেছেন বিষয়টাকে, লিখেছেন-

বাহ কি চমৎকার!

জন্ম নিয়েই… টাকা ধার।

শিশু অবস্থায় সেই টেনশন থাকে বাবা-মায়ের মধ্যে, পরে তা চক্রাকারে নিজের ওপর গিয়ে গড়ায়। অর্থাৎ কারোরই টেনশন থেকে পেনশনে যাওয়ার পথ নেই। প্রতিটি পথেই টেনশনের পাহারা। সেই ভালুকের গল্পের কম্বল ছাড়তে চাইলেও কম্বল যে ছাড়াতে চায়না’র মতো টেনশনকে ছাড়তে চাইলেও টেনশন যে ছাড়াতে চায় না। প্রেমিকার মতো লেগে থাকে পেছনে পেছনে। যদিও এমন প্রেম প্রত্যাশা করে না কেউ।

হৃদরোগের কারণও টেনশন। একমাত্র কারণ না হলেও অন্যতম কারণ। শুনতে শ্রæতিমধুর লাগে- হৃদরোগ। কারো কারো মনে হবে বুঝি হৃদয়ের রোগ, মানে প্রেমরোগ। প্রেম রোগের মধ্যে তবুও একটা আকর্ষণ আছে, কিন্তু হৃদরোগের মধ্যে তা নেই, আছে কেবল অসহ্য যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা। হৃদরোগ হলেও রোগটা কিন্তুরাজরোগ। অর্থাৎ যেমন রোগ, তেমনি চিকিৎসা ব্যয়। বড়লোকদের জন্য সে ব্যয় বেশি কিছূ নয়। তাই তো বহু বড়লোককে দেখা যায় বিমারটি হওয়ার কথা বড়াই করে বলে বেড়াতে। বিচি, পাচড়া, চুলকানি- সেগুলো তো হলো গিয়ে ছোটলোকি রোগ। বড়লোকদের সেগুলো হবে কেন? হলেও লুকায় লজ্জা থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু হৃদরোগ ইদানীং কেবল বড়লোকদেরই হয় না, স্বল্প আয়ের, গরিব নিঃস্ব লোকদেরও হয়। হবে না কেন, যেভাবে চারদিকে সমস্যার ছড়াছড়ি। টেনশনের সম্পর্কও তো সমস্যার সাথে। তা ছাড়া গরিবের কি সমস্যার শেষ আছে। একটির শেষ তো দশটির শুরু, দশটির শেষ তো একশটির শুরু। মাকড়সার জালের মতো সমস্যার জালে তারা এমনভাবে আটকা পড়ে থাকে যে, এর থেকে উদ্ধার হওয়ার কোনো উপায় থাকে না। তাদের জীবন তো অনেকটা গরিবের মেয়ের তিনহাতি শাড়ির মতো- মাথা ঢাকতে গেলে পা ঢাকা যায় না, আবার পা ঢাকতে গেলে মাথা ঢাকা যায় না; অথচ দুটোই ঢাকা ফরজ। এভাবে তারা সমস্যায় থাকতে থাকতে পেনশন হিসেবে পায় টেনশনকে এবং সারা জীবন ভোগ করতে থাকে রোগের যোগ হিসেবে।

হৃদরোগ যে অন্যান্য দেশে তথা উন্নত দেশে হয় না, তা নয়। হয়, কিন্তু এখানকার মতো নয়। মৃত্যুর হারও মামুলি। কিন্তু বঙ্গদেশে এই রোগ যেন মহামারীর মতো। প্রতিটি না হলেও প্রায় পরিবারের একজন না একজন এই রোগে আক্রান্ত। হাসপাতালেও সবার জায়গা হয় না। কথাসাহিত্যিক নীহাররঞ্জন গুপ্ত হাসপাতালের একটি হাসি উদ্রেককারী ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, বলেছেন- হাসাতে হাসতে পাতালে চলে যাওয়াকে হাসপাতাল বলা হয়। হাসতে হাসতে মৃত্যুবরণ করতে পারলে তো কথাই ছিল না। কিন্তু তেমন কপাল ক’জনার! মৃত্যুর আগেই অসংখ্যবার মরতে হয়। সেই মৃত্যুর দুঃখ ভরা নাম দুশ্চিন্তা বা টেনশন। এ দেশে দুশ্চিন্তামুক্ত থাকার সাধ্য কোথায়! বরং সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকাই দুঃসাধ্য। এখানে জাতিগতভাবে যেমন মৌরসী সম্পত্তির মতো কিছু কিছু দুশ্চিন্তার অংশীদার হয়েছি আমরা, তেমনি অন্যদিকে কিছু কিছু দুশ্চিন্তা প্রতিনিয়ত আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করে চলছি। তাইতো কেউ বলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন, কেউ বলে কেবলই প্রহসন। মাঝখানে জনগণের বাড়ে দুশ্চিন্তা। জীবন স্বাভাবিকভাবে চলবে তো? ইদানীং আরেকটি দুশ্চিন্তা যোগ হয়েছে- হঠাৎ গায়েব হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তা। পত্র-পত্রিকাগুলোর কথা যদি সত্য হয়, তাহলে এমন সত্য করো কাম্য নয়। কতই না ভালো হতো, মানুষ গায়েব হয়ে যাওয়ার বদলে যদি দুশ্চিন্তা গায়েব হয়ে যেতো। হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj