পিনপতন : দ্বিত্ব শুভ্রা

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

এক.

আলমিরার কালো ড্রয়ার থেকে বহু বছর পর বের হয় একটা অ্যালবাম, অতীতের অতল তলে ডুবতে ডুবতে একদিন হাজামজা পুকুরের তলানিতে পচা কাদার মতো পড়ে থাকতো নিশ্চয়ই, যদি না এই আলোর মধ্যে আছি নাকি অন্ধকারের মধ্যে আছি- এই রকম একটা ভুতুড়ে সময়ে হঠাৎ কেন এই আলমারিটা খুললাম সে সম্পর্কে হিতাহিত জ্ঞান ছাড়াই আমার হাতটা চলে গেল কাঠের তলার সবচেয়ে নিচের দেরাজটায়। তার জন্য আমাকে প্রথমে উবু হতে হলো, তারপর ঘোলাটে হয়ে যাওয়া প্লাস্টিক কভারটি উল্টে পাতার পর পাতা খুলে দেখতে থাকলাম ধীরে ধীরে- এত ধীরে যে পায়ের পাতায় ঝিঁঝিঁ ধরে গেল। এখন মেঝেতে বসে পড়লে এমন কোনো লোক নেই দেখার, থাকলে হয়তো কেউ প্রশ্ন না করে কেবল ভ্রæ কুঁচকাতো- কি হয়েছে ব্যাপারটা বোঝার জন্য। অন্য রুমে গিয়ে ভাবতে বসে যেত। কিন্তু ঘরের বাকি সবাই এখন যে যার মতো বাইরে, কে কখন আসবে তা জানার অবশ্য গরজও নেই। আমার মাথা ঝুলে আছে নিচের দিকে, ঘাড়ের স্থিতিস্থাপক ত্বক কোনোমতে ধরে রাখছে মাথাটা যেন ত্বক ছিঁড়ে যে কোনো মুহূর্তে ওটা পড়ে যাবে মসৃণ মেঝেতে, মার্বেলের মতো গড়াতে গড়াতে ঘরের কোনায় বা খাটের নিচে হারিয়ে যাবে জন্মের মতো, স্মৃতির ওপরে ধুলো পড়ে তখন চেনাই যাবে না যে ওটা এককালে কার ছিল। সত্যিকার অর্থে ওটা কার ছিল সেটা জানার প্রয়োজনও ফুরাবে ততদিনে। সে যাই হোক এখন এই মাথাটা যে এখন সামনের দিকে দুটো গর্তের ভেতরে দুটো চোখ ঢুকিয়ে রেখেছে, তারা গোল গোল মণি দিয়ে তাকিয়ে আছে অ্যালবামটির দিকে।

আহামরি নয় অ্যালবামটি, আহামরি হবার কথাও নয় কারণ আমি তেমন আহামরি কিছু নই যে ওতে রাখা ফটোগুলো সুন্দর হবে। ফটোতে দেখাচ্ছে অতি বাজে ছাপার পোশাকে সজ্জিত একটা কমবয়সী মেয়ে যার চুলগুলো খুব সেকেলে ঢঙে আঁটা। বুঝতে পারছি না কেন ঐ পোশাক আমার পছন্দ হয়েছিল অথবা কোঁকড়ানো চুলের বস্তি নিয়ে অহেতুক হাসার কেন দরকার ছিল, ঠিক ঐ রকম একটা জায়গায় যেখানে আদতে হাসার মতো কিছু ছিল না। এই যুক্তিহীন হাসি আমার ভালো লাগলো না, যুক্তিহীন কোনো কিছু যারপরনাই বিরক্তিকর, খুব কদর্য লাগছিল ওটাকে। আমি ছবিটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে থাকলাম অনেকক্ষণ, কদর্যতা প্রতিবার বেড়ে উঠছিল আগের বারের চেয়ে, ভ্রæ জোড়া লেগে যাচ্ছিল পরস্পর। তখন মনে পড়লো সেই উপদেশ যা প্রায়শ শুনতে হয়, যা ভালো লাগবে না, যা স্মরণ করলে ক্ষোভ জাগে তা থেকে যেন সরিয়ে রাখি নিজেকে। আমি অল্প অল্প করে চেষ্টা করবো সেটাই করার যা ভালো লাগে। উপদেশের মর্মার্থ বুঝলাম, অ্যালবামের ভেতর আঠা লেগে যাওয়া পাতলা বর্ণহীন কাগজের ভাঁজ থেকে খুলে নিলাম ছবিটা, তারপর নখ দিয়ে মুচড়ে তুলে ফেললাম ঠোঁট। কাগজটা বেশ শক্ত, ঠোঁট ছিঁড়তে গিয়ে পুরো কাগজটা দুমড়ে গেল, মেঝেতে বিছিয়ে দিতে দেখলাম ওটার চেহারায় অসংখ্য ভাঁজ। তখন ভালো লাগলো আমার; এবারে ছবিটাকে মনে হচ্ছিল না অন্য কারোর। এইবার ঐ ছবি আর আমি এক।

ছবিটা আমাদের বাড়িতে তোলা। ভুল বললাম, বলা উচিত আমার বাবা ও মায়ের বাড়িতে তোলা। কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছর বাবা-মা না ডাকার অনভ্যস্ততায় পেয়ে বসলো, তাই সঠিকভাবে বললে বলা চলে যে ছবিটা আমার বাবা ওরফে সাইদুল ইসলাম ও মা ওরফে আনোয়ারা খাতুনের বাড়ির উঠোনে ছায়া রোদের মিশেলে কোনো এক দুপুরবেলায় তোলা। আমাকে তুলে দেয়া হচ্ছে, সঁপে দেয়া হচ্ছে অথচ তখনো আমি বুঝতে পারিনি যে এটা হলো বিদায়। খুব আনন্দের সাথে মামাবাড়ি যাচ্ছি সেই আনন্দে উৎফুল্ল চেহারা। মামা-মামি আমাকে আদর করতেন, এখনো করেন, এখনো আছি মামার বাড়িতেই, সেই থেকে এই বাড়িটি আমার ঘরবাড়ি।

আরো তিনটা ঘর আছে, একটা শ্বশুরবাড়ি, একটা ছিল স্বামীর কোয়ার্টার, আরেকটা হাসপাতাল। সবচেয়ে শেষেরটায় গত আড়াই বছরের প্রায় পুরোটা সময় কাটাতে হয়েছে, হাসপাতালের বিষণœ করিডোরে অলস হাঁটতে হাঁটতে অথবা কেবিনের সোফায় পা গুটিয়ে শুয়ে। এবার একটানা দশদিন হাসপাতালে থাকবার পর দুপুরে বাসায় এসেছি, পাহারাদারের দায়িত্বে রেখে এসেছি মামার বাসায় বহুদিন থাকা কাজের সহকর্মী দিলু ভাইকে। হাসপাতালে দিনরাত কোনো কাজ নেই, অলস অবসন্ন সময় তবু একটুও ঘুম হয় না কেবিনে।

যেদিন বুঝেছিলাম আমাকে দিয়ে দেয়া হয়েছে মামা-মামির হাতে, দিয়েছে আমারই মা-বাবা। তারপরই কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলাম। তখনো অনেক মাস ঘুম হয়নি, মানুষ-ঘরবাড়ি-বাস-ট্রাক-নদী-গাছপালা-ফলমূল-লতাপাতা সব লাগছিল ধোঁয়া ধোঁয়া। সবকিছু আছে আবার কোনো কিছু নেই- আরো তিন ভাইবোন আছে আমার অথচ তাদের সাথে আমি নেই! হয়তো তারাও এতদিনে ভুলে গেছে আমি এককালে তাদেরই ছিলাম। এখন অসুখ-বিসুখ হলে কখনো বাড়ি যাই কিন্তু ওতে ভাইবোনের বোধ কই?

এতকিছু না ভেবে আমার উচিত এখন শুয়ে পড়া, বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে গা মেলে থাকা, ঝুঁকে যাওয়া মেরুদণ্ডটাকে একটু আরাম দেয়া। বিছানায় কাত হয়ে চোখ বুজে আছি। চোখ বোজার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যেন একটা সিনেমার পর্দা উঠে গেল। দেখছি : আমি দাঁড়িয়ে আছি কোনো পতাকার সামনে। উড়ন্ড পতাকার মতো বাতাসের সাথে হেলছি দুলছি- যখন যেদিকে ওড়ে সেদিকে ঘুরি। আমি হাওয়া বদলের সাথে চলছি এঁকেবেঁকে, নিজেকে পেঁচিয়ে। পতাকার লোহার দণ্ডটি মাটিতে ঢুকে আছে কিন্তু আমি শিকড়ছাড়া দুলছি কেবল।

আমার না ঘুমাবার কথা! ঘুমাবো বলে এতদিন পরে এই বিছানায় শুয়েছি। হাসপাতালের ঘোলাটে আলোয় যেখানে তুমিও ঘুমিয়ে আছো কি নেই, চোখের পর্দার নিচে জেগে আছো। হয়তো পুরো রাত্রিই জেগে ছিলে, হয়তো সারা রাত জেগে ঘুমিয়ে পড়লে এই মাত্র! সারাক্ষণ তুমি ঘুমালে কি ঘুমালে না সেই চিন্তায় থেকে থেকে কেবিনের লাইটগুলো কেমন নিভিয়ে রাখি! ঘোলাটে আলো, ঘোলাটে অন্ধকার। আমি আস্তে আস্তে পা ফেলি, নিঃশব্দে। কত নিঃশব্দে দরজা খুলে বার হই! মাকড়সাও অত নিঃশব্দ নয়।

গ্রামে রান্নাঘরের পেছনে গাছের সাথে জড়িয়ে থাকতো মাকড়সার ঝুল, শীতের সকালে ঝুলের গিঁটে গিঁটে জমে থাকতো শিশির বিন্দু। আমি শিশির জড়ানো ঐ গিঁটগুলোর নাম দেই দুঃখ গিঁট, খুব গোপনে ছড়িয়ে যাওয়া সম্পর্কের গিঁটে গিঁটে জমানো যন্ত্রণা। কেউ দেখে না, কেউ জানে না- সময় অসময় না বুঝে কখনো কেবল চোখের কোণ ভিজিয়ে দেয়।

ঘুম হবে না বুঝে গেছি, বিছানা ছেড়ে উঠে যাই। ঐ অ্যালবামটিকে আবার ড্রয়ারে ঢুকিয়ে দেয়া দরকার, যাচ্ছেতাইভাবে ওটা আমাকে পোড়াতে শুরু করেছে। জায়গামতো প্রবেশ করিয়ে দেবার পর ‘আমি এখন কি করবো?’ এই রকম একটা অবস্থায় পড়ে গেলাম। গান শুনতে ভালো লাগে না, নাটক দেখা ছেড়েছি কত কাল হলো! এ কক্ষে ও কক্ষে পায়চারি করে সময় কাটবে না, তাই এক কাপ চা বানিয়ে বসে থাকি সোফায়। সেখানেও ভালো লাগে না। ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে আসি নিজের ঘরে, পায়ের আঙুলে চেপে ডেস্কটপটা ছেড়ে দেই, মাউস নাড়াচাড়া করি। কোথা থেকে যে কোথায় চলে যাই!

দুই.

হাসপাতালের কেবিনে এয়ারকুলারের ঠাণ্ডায় পৌষের শীত, লোকটা ঠাণ্ডায় নেতিয়ে পড়া নেড়ি কুকুরের মতো শুয়ে আছে আকাশি চাদরের তলায় যেন ওর পেটের তলায় ভেজা রাস্তার কালো হিম। ও ঘুমের ভেতর প্রায়ই গোঙায়, অনেকগুলো ভয়ঙ্কর কুকুরের তেড়ে আসা দুঃস্বপ্ন ফিরে ফিরে আসে। কখনো কখনো গোঙাতে গোঙাতে মুখের কোনা বেয়ে লালা নামে, চেপে ধরা দু ঠোঁটের মাঝে বুদবুদ করে বেরিয়ে আসে সাদা থুতু। আমি পাশে থাকি, গোঙানি শুনি। গোঙানোর আওয়াজে বুঝতে পারি, কুকুরগুলো আসছে দূর থেকে। প্রথমে বোঝা যায় না ওদের তী² দাঁতগুলো হাঁ হয়ে আছে, লোভাতুর জিহ্বাগুলো বের হয়ে ঝুলছে মাটি পর্যন্ত। আমার স্বামী গোঙায়, থর থর করে কাঁপতে শুরু করে, শরীর দুমড়ে-মুচড়ে বাঁচাতে চায় নিজেকে। ও জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে, বুক ওঠানামা করে, কপালে সিঁথির গোড়ায় জমে রোয়া রোয়া ঘাম। কুকুরগুলো বোধহয় তখন কামড় দেয়। সে যেন বুঝতে পারে না ওগুলো তাকে খুবলে খেতে শুরু করবে, তারপর হয়তো ওরা গলার কাছে, ঘাড়ের পাশের শিরাটা ধরে টান মারে। ও হয়তো দেখে, শরীরের ভেতর দিয়ে ফিতার মতো খুলে খুলে আসছে মাইলের পর মাইল লম্বা চিকন শিরা- তখন বিছানার ওপর ভয়াবহ আতঙ্কে ডানে-বায়ে, ওপরে নিচে পা ঠেলে ক্রমশ পেছাতে চায়- গোঙায়। কষ বেরিয়ে আসে। আমি তখন ঝাঁকি দিয়ে ওঠাতে চাই

: এই! এই! এই!

বারবার ঝাঁকি খেয়ে দুঃস্বপ্ন ফেলে উঠে আসে, গোল গোল তাকায়, এক সেকেন্ড আমার দিকে চেয়ে ১৮০ ডিগ্রি কোণে ধীরে ধীরে ঘুরাতে থাকে মাথাটা। শফিকের ঘোর ঘোর অবস্থা কাটে না। ঘোর ঘোর অবস্থা পুরোপুরি কাটছেও না। কয়েক বছর ধরে চলছে। আর কতদিন চলবে কে জানে! প্রতিবার পাঁচ দশ মিনিট লাগে আমি কে- সেটা বুঝতে। প্রথম কয়েকদিন মায়া লাগতো, ‘আহারে! তাহার সাথে বেঁধেছি আমারই জীবন। কি করি!’ এখন আমার প্রায়ই ওর থুঁতনি চেপে, ঠেসে মুখ বোচকা বানিয়ে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, ‘চিনতে পারছিস আমাকে? বল তো! চিনতে পারছিস?’

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। নখগুলো মাছের সাদা আইশের মতো, একটা আরেকটা দিয়ে খুঁটতে থাকি।

হাসপাতালে সকাল হয়, সেখানে জানালার পর্দা দিয়ে ঢোকে মরা রোগীর মতো ফ্যাকাসে আলো। সকালের নরম রোদ- দুপুরের সূর্যের তেজ- বিকালের নুয়ে যাওয়া রশ্মি- সন্ধ্যার মোহনীয় আভা- এসবের বালাই নেই এখানে। মাঝে মাঝে ছাদে গিয়ে রোদ দেখতে ইচ্ছে হয়, বৃষ্টি নয়- একটু প্রখর রোদে শুকাতে চাই। মাড় নষ্ট হওয়া এইসব ম্যাড়ম্যাড়ে দিনে ছাদে উঠে কড়কড়ে হতে পারলে বেশ হয়!

কিন্তু ছাদে যাওয়া যায় না। শফিককে কেবিনে একা রেখে কোথাও যাওয়া যাবে না। ডাক্তারের বারণ। গতকাল একটুখানি সময়ের জন্য বাসায় গিয়েছিলাম কিন্তু থাকা হলো না আমার। মামা-মামি প্রায়ই আসেন, তারা দেখা করে যান কিন্তু তাদের কি আর রাতে থাকতে বলা যায়? ‘মামা! আপনি একটু পাহারা দিন!’ হয়তো বলা যায় কিন্তু যেচে বলতে ভালো লাগে না। তাই গত রাত বেশি না হবার আগেই ফিরে ফিরে এসেছি। সারারাত এপাশ ওপাশ করে সকালের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মাত্র, তখনই শুরু হলো গোঙানি তার!

ওনার!

সকাল হলো। আমি জানি এরপর কেবিনের দরজা খুলে কে আসবে, তারপর কে, তারপর কারা কারা? ক্লিনার-নার্স-ডাক্তার। ইচ্ছে হয় ওদের সাথে কথা বলি- একটা দুটো টুকরো কথা- কিন্তু ওদের বড্ড তাড়া। এখানে কত রোগী- তাদের দেখাশুনা করতে হয়- আমার সাথে কথা বলার সময় কই? কথা না বলতে বলতে কখনো চোয়াল চেপে আসে, কখনো চিবুক বাড়িয়ে উৎসুক হয়ে থাকি যদি নার্স মেয়েটা একটু কথা বলে! জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয়, প্রশ্নের পিঠে উত্তর। ওদের আউড়ে যাওয়া সংলাপের সামনে বসে থাকি আমি উন্মুখ শ্রোতা। তারপর আবার আগের মতন। দেয়ালে ঝোলানো টেলিভিশন, যদি শফিকের শরীরটা ভালো থাকে তাহলে ওটাতে শব্দ থাকে আর যদি একের পর এক অপারেশন টেবিল ঘুরে আসা রোগী হয়ে যায় তখন টেলিভিশনটা থাকে মূক, আমি বধির।

শফিক জেগে গেছে, ওর তাকানো দেখে মনে হলো আজ অনেকটা সুস্থ। দুমাস আগে ডান পায়ের অপারেশনের সময় ভেতরে একটা রড ঢুকিয়ে দিয়েছিল, চার দিন হলো আরেকটা অপারেশন করে সেই রড আর স্ক্রু খোলা হয়েছে। শয়তানগুলো শফিকের হাত-পা ভেঙে চুরমার করেছিল, ভয় ছিল মেরুদণ্ড নিয়ে- ও বুঝি সারা জীবন প্যারালাইজড হয়েই থাকবে! হ্যাঁ! তাই! শফিক এখন দাঁড়াতে পারে- আস্তে আস্তে হাঁটতেও পারে- তবু তো এখনো প্যারালাইজড! প্যারালাইজড তো এই আমিও! তাই না! আমার হাত পা সব ঠিক আছে তবু আমি বসে থাকি অথর্বের মতো শুয়ে থাকি চলৎশক্তিহীন মানুষের মতো- আমার কানে ডাক্তার আর নার্সের শব্দ শোনা ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হাসপাতালের একঘেয়ে করিডোর ছাড়া দেখার আর কোনো পৃথিবী নেই!

শফিক আমার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে আমি একটু হাসলাম, হাসলো শফিকও। কিন্তু ও আমার দাঁতের সাথে দাঁত ঘষার কিটকিট শব্দ শুনতে পেলো না। বরং দেখতে পাচ্ছে আমার হাসিটা আরো বিস্তৃত হচ্ছে, সারা মুখ জুড়ে সোনালি ধানের ক্ষেত। এ মুখ জ্বলজ্বল করছে ক্ষোভে ও আগুনে! অসহ্য এই লোক! কে আসতে বলেছিল তাকে এই জীবনে?

তিন.

পুলিশ! শব্দটা শুনলেই একসময় শিয়াল পচা গন্ধ পেতাম। কখনো পচা শেয়ালের পাশ ঘেঁষে দাঁড়াইনি, কোনো জ্যান্ত শেয়াল জ্বলজ্বল চোখে আমাকে আঁচড়ানোর জন্য ছোক ছোকও করেনি তবু পুলিশ বললেই শেয়াল পচা গন্ধে নাক সিটকে উঠতাম। ধূর্ত কোনো প্রাণী যে মরে গেলেও ধূর্ততার গন্ধ ছাড়ে না- মৃত্যুর শোক ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে ময়লা জীবনের ঘেঁটো-পচে যাওয়া শেয়ালের গন্ধ বুঝি তেমনই। তো এক পুলিশকে মামা-মামির পছন্দ হয়ে গেল। মামি ছবিসহ এক চিলতে সাদা কাগজ সামনে রেখে গিয়েছিল যেদিন, সেদিন পড়ার টেবিলে অনেকক্ষণ ঝিম মেরে ছিলাম।

না ছেলের চেহারা, না তার পিতা-মাতা না কাজের বৃত্তান্ত- কোনো কিছু মনে আসেনি। ভাবলাম, প্রথম ও দ্বিতীয় ঘর পারি দিয়ে এবার আমার তৃতীয় ঘরের দিকে যাত্রা করার বাদ্যি বাজতে শুরু করেছে। মা-বাবার ঘরে জন্মানোর জন্য আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি যে আমি তাদের ঘরে আসবো কিনা, মামা-মামির বাড়ি পাঠানোর জন্য আমাকে প্রশ্ন করা হয়নি যে আমি যেতে ইচ্ছুক কিনা, সাদা কাগজের ভেতর নির্ণিত তৃতীয় ঘরটি দেখতে এতটুকু ইচ্ছে হচ্ছিল না। বরং বিতৃষ্ণায় ভরে উঠেছিল মন, খারাপও লাগছিল- মামা-মামির স্নেহযতœ সত্ত্বেও কোথাও যেন খালি খালি রয়েই গেল!

সবকিছু আছে আবার কোনো কিছু নেই- সেই সাত বছর হতে যেন আমি ভাসছি নিজের ঘরে, নিজের ঘরটাই চিরকাল থেকে গেল পরের ঘর, মন কখনো শক্তভাবে বলতে পারলো না এটা আমার ঘর। বাবা-মার কথা এখন আর তেমন মনে পড়ে না কিন্তু যখন মনে পড়ে যায় তখন ঐ মনে পড়াটাকেই মনে হয় সর্বোচ্চ ভুল, সর্বোচ্চ যন্ত্রণায় সন্তানকে পাঠিয়ে দিয়ে তারা এই সন্তানটির কথা নির্বিকারভাবে ভুলে রইতে জানে। তাদেরকে মনে করাটা নিশ্চয়ই ভুল, মারাত্মক ভুল! মামা-মামি নিঃসন্তান বলে তাদেরকে আমাকে দিয়ে দিতে হবে? মা কেমন করে পারলে? বাবা, তুমিও তো কিছু বললে না!

আমার শ্বাসের উত্থান-পতন বেড়ে গিয়েছিল- দ্রুত মামির রেখে যাওয়া পাত্রের ছবি দেখলাম- ছবি দেখে কোনো ভাব প্রেম কিছু জাগেনি। তারপর বায়োডাটা পড়তে পড়তে যখন দেখি পাত্র আমার পুলিশ- এমন বিকট হাসি দিলাম যে হাসির দমকে ঘরের দেয়াল-জানালা-মেঝে থরথর কাঁপতে শুরু করলো। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল হৈ হৈ করে নাচতে, চৈতের বাওকুড়ানীর মতো পথে পথে ঘুরতে থাকা মরা পাতার কুণ্ডুলি- পাক খেয়ে খেয়ে এবার আমি যাবো শেয়াল পচার ঘরে!

স্কুলে-কলেজে পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে এতটা কাল ধরে আমি মামা-মামির কাছে থাকি অর্থাৎ কিনা আশ্রয়ে থাকি- এটাই তো সত্য! তারা আমাকে ভালোবাসে সেও সত্য! তাহলে আমার বাবা-মা আমাকে ভালোবাসে না আর কখনো বাসেওনি সেও তবে সত্য! চোখ ভরে জল এলো, ভেতর নিংড়ে সবকিছু উঠে আসতে লাগলো হৃদয় ধরে- টপটপ করে বড় বড় ফোঁটা মেঝের অনেকখানি ভিজিয়ে দিলো। এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে কাঁদলাম কেবল। অনেকক্ষণ ধরে মন ভরে কান্নার পর ঠিক করলাম- আমার অপছন্দই যদি হয় আমার নিয়তি তাহলে শেয়াল পচাই সে নিয়তি হোক!

মামিকে বলেছিলাম, তোমাদের যা পছন্দ তাই করো। তারা দায়িত্ববশত বাবা সাইদুল ইসলাম ও মা ওরফে আনোয়ারা খাতুনকে জানালেন। তারাও বললেন, তোমাদের যা পছন্দ তাই করো! সে কথা শুনতে পেয়ে খুব মজা লেগেছিল, ‘আমাদের যা পছন্দ’! ও মা! কি কৌতুক গো! ‘আমাদের’ মাঝে ‘আমি’ আছি তো?

শ্বশুরবাড়ি গেলাম, চারপাশে তার শেয়ালপচা গন্ধ! পড়শীদের সাথে কথা বলি কিন্তু ওদের কথায় প্রাণ নেই- সন্দেহ মিশ্রিত সচেতন গল্প যেন সকলের উদ্বেগ- দু’ একটা বেফাঁস কথায় যদি তাদের ধরিয়ে দেই! থানা পুলিশের বউ- কখন কি কথায় কি মনে করে বসি! আড্ডার মাঝে ফাঁকটুকু টের পাই। কিন্তু দেখি শ্বশুর-শাশুড়ি ননদ এই ফাঁকটুকু উদযাপন করেন অহমিকায়- পুলিশ পুত্র তাই সকলে তাদের সমঝে চলে। আমিও সমঝে চললাম।

চার.

কি ব্যাপার! ওকে তো গোসলখানায় ঢুকতে দেখলাম, তাহলে ঘরের মধ্যে কথা বলছে কে? জানালার পর্দা নড়ে ওঠে, তাড়াতাড়ি ডানদিকে ঘুরলাম, কাউকে দেখছি না ওদিকে। তিরতির করে কাঁপছিল পর্দা আর কেমন একটা ঘড়র ঘড়র আওয়াজ। জোরে ডাক দিচ্ছিলাম ‘কে ওখানে?’ কেউ উত্তর দিলো না আর ঘড়র ঘড়র আওয়াজটাও থেমে গেল। ভেবেছিলাম কিছু না কিন্তু তারপর আবারো ঘড়র ঘড়র। মাগরিবের আজান দিয়েছে কিছুক্ষণ হলো। ছোট শহরে সন্ধ্যার পর দুম করে রাত্রি নামে আর নানারকম আওয়াজ শোনা যায়। থানা কোয়ার্টারের পাশে বাজার- টিনের চাল দেয়া দোকানগুলোয় জ্বালিয়ে দেয় গন্ধ ধূপ, আগরবাতি। আগরবাতি বললেই আমার কেবল মৃত বাড়ির কথা মনে হয়। বাড়ির বারান্দায় কাফনের কাপড়ে ঢাকা লাশ, আগরবাতির গন্ধ, চাচিরা দাদিরা মিহি সুর করে দুলে দুলে কুরআন শরিফ পড়ছে। সন্ধ্যার সময় যুবতী কন্যাদের বাইরে থাকা বারণ, ও সময় বাজে জিনেরা ঘোরাঘুরি করে। এইরকম একটা সন্ধ্যায় ঘরের মধ্যে ঘড়র ঘড়র। আমি নিশ্চিত যে ওকে গামছা নিয়ে গোসলখানায় ঢুকতে দেখেছি। তবে ঐ আওয়াজটা কার? পুরুষের কণ্ঠ!

হঠাৎ কি হলো, দুম করে ইলেকট্রিসিটি চলে গেল- সঙ্গে সঙ্গে আবারো ঘড়র ঘড়র- মহাবেগে জলপতনের শব্দ- একটা কালো মতন কি যেন আমার চারপাশে পাক খেয়ে সরে পড়ছিল। দরজার পর্দার দিকে সোজা তাকিয়ে আছি -ওটা আর দুলছে না; আবার সেই জিনিসটা পাক খেয়ে গেল- ঘড়র ঘড়র। আমি চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম,

: কে? কে?

ঝনর ঝন করে কিছু পড়ে গেল আবার! ধাক্কা খেয়ে ওটা বিকট আওয়াজ তুলতে লাগলো। আমি দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে থরথর করে কাঁপছিলাম- দুটো হাত তখন আমায় চেপে ধরলো,

: এই কি হয়েছে? চোখ খোলো, কি হয়েছে? ভয় পেয়েছো? এই দেখো, আমি, আমি!

তড়তড় করে কথা বলে যাচ্ছিল শফিক, অনেকক্ষণ পরে থিতু হয়ে বুঝতে পারলাম ওটা অয়্যারলেসের আওয়াজ। সেই ছিল অয়্যারলেসের সাথে আমার প্রথম পরিচয়, আমাদের দু’জনের সংসারের তৃতীয় সঙ্গী।

শ্বশুরবাড়ি থেকে সাত আট মাস পরে গ্রাম ছেড়ে এসেছিলাম মফস্বল শহরে। সে সময়টায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে বিরোধী দল আর সরকারের মাঝে তুমুল আন্দোলন, সেই ঝামেলায় পড়ে শফিকের ছুটি হয় না। যার যার স্টেশনে ২৪ ঘণ্টা সতর্ক থাকার নির্দেশ। দুমাস হয়, সে বাড়ি আসতে পারে না। সংবাদপত্র খুললে নানা রকম দুর্ঘটনার চিত্র পাই। শ্বশুর বাবা মা ফোনে কথা বলে উদ্বেগের কথা জানায়, শফিক ‘ও কিছু না’ বলে উড়িয়ে দেয়। আমি পত্রিকার সব পাতা মেলে খুলে পড়ি : পিকেটারদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ, ব্যাটন, রাস্তায় পড়ে থাকা রক্তাক্ত মানুষ, দুজন দু’পাশ ধরে টেনে নিয়ে চলছে আহতকে।

সাংবাদিকের তোলা ছবিতে দেখেছিলাম, এক পুলিশের মাথায় কেউ ইট মেরেছে, গলগল করে রক্ত নামছে কানের লতি বেয়ে। পুলিশটা মাথায় হাত দিয়ে পেছনে সরে যাচ্ছে কিন্তু পেছানোর উপায় নেই তার। পেছনে দেয়াল, তাকে চারপাশ দিয়ে ঘিরে ধরেছে উত্তেজিত পিকেটার। পুলিশটার চেহারায় প্রবল ভয়- ব্যথার চেয়ে আতঙ্কেই যেন সে বেশি কুঁকড়ে গিয়েছিল!

আমার হঠাৎ খারাপ লাগতে শুরু করেছিল- দুলে উঠেছিল মন- রাজ্যের অভিমান ঠেলে উঠছিল শফিককে ঘিরে। ‘ও কিছু নাহ!’ এত এত মারাত্মক সংঘর্ষ হচ্ছে আর সে বলছে ও কিছু না! খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল শফিককে। কখনো যা বলিনি ফোন করে সেটাই বলেছিলাম, তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।

পরদিন সকালে শাশুড়ি মা জানিয়ে দেন, এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শফিকের পাশে আমার থাকা দরকার।

একা একা হেসেছিলাম।

তারপর এই : শফিক সকালে উঠে কাজে যায়, আমি দুই বেডের ঘরে সারাদিন টুকটুক করি, এক চাদর দুইবার ঝাড়ি, তিনবার বালিশ করি ঠিকঠাক। সহজ হয়ে উঠছিল দুজনের সংসার-সম্পর্ক। কেউ নেই আমার সেই বোধটা গোপন ঘরে চুপচাপ বসে ছিল। বিয়ের আট নয় মাস পরে আমি বালিশে হেলান দিয়ে ভাবছিলাম, বাহ! এই তবে দাম্পত্য।

পাঁচ.

শফিক বেড থেকে নামে, এখন একটু একটু হাঁটতে পারে। রোগীর পাশের ছোট সোফাটায় একদিকে গুটিসুটি শুয়ে আমি ওর নামা দেখি। ও বাথরুমে গেলে আমাকে উঠতে হবে, অন্ততপক্ষে কমোডে বসিয়ে দিয়ে দরজা ভেজিয়ে আমি বাথরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবো। আজকাল শফিকের অস্বস্তি হয় আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি বুঝলে। আস্তে আস্তে বলে, ‘তুমি বসো, লাগবে না, আমি পারবো।’ একদিন বসবো বলে ভাবছি, অমনি শুনি শফিক ভেতর থেকে দরজা লক করে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বাথরুমে ধাক্কা দেই, ‘লক কোরো না, পড়ে গেলে বিপদ হবে, আনলক করো!’

শুনি ভেতরে কল ছাড়ার আওয়াজ, শফিক একটা কল ছেড়েছিল, তারপর একে একে সবকয়টা কল, ঝর্না ছেড়ে দেয়। ঝরঝর করে পানি পড়তে থাকে। কি হচ্ছে ভেতরে! ভাবতে ভাবতে অপেক্ষা করি। কয়েক মিনিট পার হয়, কল আর বন্ধ হয় না। আমি বুঝতে পারছিলাম না এত পানি দিয়ে সে কি করছে? হঠাৎ মনে হলো ও পা দিয়ে পানি ছুড়ছে! অপারেশন করা নিতম্ব আর কোনোমতে হাঁটতে পারা পা নিয়ে পানি ছোড়া খেলছিল! পড়ে গিয়ে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে আমি আতঙ্কে চিৎকার দিচ্ছিলাম

: দরজা খোলো! কি করছো তুমি? পড়ে যাবে তো! দরজা খোলো!

তখন ভেতরে শফিক বিকট শব্দ করে হাসতে শুরু করে। ছরছর করে পানি নেমে যাচ্ছে আর তার সাথে উন্মাদের হাহা হাহা উত্তেজিত প্রবল হাসি। এখনো অনায়াসে সেই হাসি মনে করতে পারি, সে কি অপরিসীম কদর্য ছিল! রীতিমতো ভেংচি কেটে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছিল

: হা হা হা! পড়ে যাবে তো! অ্যাহ! উনি বলতেছেন, পড়ে যাবে তো! ভাঙা পাছা, ভাঙা পা বুঝছিস ঠিক হয় নাই এখনো? হইছে! হইছে! দ্যাখ! দ্যাখ! এই দ্যাখ তোর গায়ে পানি ছিটাই।

বাথরুমের দরজা দিয়ে পানি উপচে কেবিনের ভেতর চলে আসে। মরিয়া হয়ে যতবার ডাকছিলাম, দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলাম তত উচ্চস্বরে সে হাসছিল। ছোট্ট একটুখানি কেবিনের ভেতর বিকৃত হাসিগুলো লাফাতে লাফাতে আমার মাথায় ঢুকতে শুরু করে দেয়। দৌড়াতে দৌড়াতে ডাক্তারের কাছে ছুটি

: ও বাথরুমের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে আর ভেতর থেকে হা হা করে হাসছে!

ডাক্তার-নার্স অনেকভাবে ডাকাডাকি করেও সেদিন দরজা খুলতে পারেনি; পরে মেকানিক এসে তালা খুলে দিলে একেবারে চুপ মেরে ছিল শফিক। কারো সাথে বিন্দুমাত্র কথা না বলে ভেজা কাপড় আর অগোছালো চুল নিয়ে খালি পায়ে বেরিয়ে এসেছিল। নার্স মুখের কাছে ওষুধ ধরতেই খুব শান্ত ছেলের মতো খেয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু আজ ওকে অনেক সতেজ লাগছে, ভালো ঘুম হয়েছে বোঝা যায়। বাথরুমের দিকে না গিয়ে চলে আসে আমার সোফার পাশে। জানালার পর্দা সরিয়ে চারপাশ দেখতে থাকে শফিক। এখন ওর চোখ স্বাভাবিক, ঠোঁটে অস্বাভাবিক বিড়বিড়ানি নেই। আমরা একসাথে নাস্তা করতে বসি, শফিক ওর ডিমটা আমার পিরিচে উঠিয়ে দিতে চায়। মানা করি না, দিতে দেই। আমার ভালো লাগে ওর স্বাভাবিকতা দেখে, ও ঠিক হয়ে গেছে ভাবতে ভাবতে চোখে জল আসে। টিস্যু পেপার আনার কথা বলে উঠে গিয়ে আঁচলে জল মুছি, ফিরে খেতে বসলে দেখি ওর মুখে মৃদু হাসি।

অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগার অনুভূতি নিয়ে হাসপাতালের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে ছুটন্ত নার্সদের সাথে কথা বলি। অনেকবার আসতে হয়েছে, অনেকদিন থাকতে হয়েছে এখানে, তাই সবাই মোটামুটি পরিচিত বলা যায়। আমার মতো আরো যারা দীর্ঘদিন ধরে রোগীর সাথে আছে সে সব কেবিনে যাই। সবাই আমার মতো বউ, রোগীর মোটা বা শুকনো বউ, তাদের সাথে গল্প করি। কেবিনে ঢুকলেই বউগুলো কেমন বেরিয়ে আসে যেন ওরা অপেক্ষা করে মনের মতো কারো আসার অপেক্ষায়। স্বামীর পাশে কেবল মনমরা হয়ে বসে থাকো, আত্মীয় পরিজন এলে বিষণœ হয়ে বসে থাকো, নইলে পিছে কথা হয়। কপালে ঠোঁটকাটা মানুষ থাকলে হয়তো সামনেই হুঁল ফুটিয়ে দেয়।

পরিচিত একটা কেবিনে ঢুকি, বউটার চোখ ঝলমলিয়ে ওঠে। অনেকক্ষণ গোমড়া হয়ে বসে থেকে থেকে নিশ্চয়ই ওর মুখের চোয়াল ব্যথা হয়ে গেছে। আমাকে দেখতে পেয়ে রব্বানি সাহেবের স্ত্রী বলে ওঠেন, ‘এই দেখো কে এসেছে? তোমাকে দেখতে এসেছে আবার!’ মিসেস রব্বানি খুশি হয়ে স্বামীকে দেখাতে চায়। এক ঝলক স্বামীর দিকে তাকিয়েই মিসেস রব্বানি আমার হাত টেনে বাইরে নিয়ে আসে। কেবিন থেকে বেরিয়ে আমরা হাসি, কোনো কথা ছাড়াই কেবল হাসতে থাকি।

বহুদিন ধরে চলা একটানা দীর্ঘশ্বাসের ভেতর যেন কোনো এক ফাঁকে বোঝাতে চাই যে, এত গুমোট হয়ে থাকা যায় না। দশ পনেরো মিনিটের জন্য আমাদের মানসিক রোগী স্বামী, প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া স্বামীর গল্পকে ছেড়ে নাটকের গল্প, তারকাদের রঙিন জীবনের রটনার সুর ধরে কোনো এক পথে আমাদের গল্পে যৌনতা ঢুকে পড়ে। আমরা দুই রোগীর স্ত্রী বলতে বলতে উত্তেজিত হই, হাসি। একটার পর একটা যৌন গল্প রচনা করে ফেলি অবলীলায়। মনে পড়ে কে কবে কখন কোন ইঙ্গিত দিয়েছিল, অন্য সব প্রসঙ্গ চাপা পড়ে শরীরী গল্পে। আমরা এই কথাগুলো বলার জন্য মুখিয়ে থাকি, অন্য আলাপচারিতার ভেতর দিয়ে কিভাবে আসবো যৌনতায় সেজন্য মনে মনে ছটফট করি। বলতে বলতে উষ্ণ হই, নিজের গাঢ় শ্বাস স্পষ্ট শুনতে পাই নিজের কানে।

মিসেস রব্বানির সাথে গল্প শেষে কেবিনে ফিরে দেখি শফিক বিছানায় বসে টিভি ছেড়ে টম অ্যান্ড জেরি কার্টুন দেখছে। আমি তাই দেখে হাসি। আমার হাসির উত্তরে শফিকও হেসে দেয়। আমি আস্তে ওর পাশে গিয়ে চুলে পিঠে হাত বোলাই। ও আমার হাত টেনে নিয়ে বিছানার একপাশ ছেড়ে দিয়ে বলে

: এখানে বসো।

আমি মুখোমুখি বসে ওর মুখ ছুঁই, আঙুলগুলো নামিয়ে আনি গাল থেকে থুঁতনিতে। আঙুলের স্পর্শ পেতে ওর চোখ ধীরে ধীরে বুজে আসে। মায়া লাগে। আরো আলতোভাবে স্পর্শ করি।

ওর চোখে জল।

গালের ভিজে জায়গা ছুঁয়ে দিতে শফিক চোখ খুলে আমার দিকে তাকায়, এতক্ষণে আমার চোখ ভরে উঠেছে অশ্রæতে। যেন আর বাঁধ মানে না, এক ঝটকায় জড়িয়ে ধরি।

আহ!

কতদিন পর! কতদিন পর!

ছয়.

হাসপাতালের ক্যাফেটেরিয়ায় খাবারের টোকেন নিয়ে বসে আছি আর বাচ্চা শিশুদের মতো খুঁটেখুঁেট দেখছি মানুষ। আজকাল ভিড় দেখতে ভালো লাগে। পা থেকে মাথার চুল, ক্লিপ, পোশাক, জুতো এমনকি আন্দাজ করার চেষ্টা করি কে কী ধরনের প্রসাধনী লাগিয়েছে। খাবারের অর্ডার দিয়ে অনেকে দাঁড়িয়ে থাকে তাড়াতাড়ি পাবার আশায়, কেউ কেউ চেয়ার বসে বসে অধৈর্য হয়, কেবল আমার বসে থাকতে ভালো লাগে। যত বেশি দেরি করে খাবার আসবে, তত বেশিক্ষণ আমি ওদের দেখতে পাবো। পাশ দিয়ে শিশুরা টুকটুক করে হেঁটে যায়, আমি হাত বাড়িয়ে রাখি যদি কেউ একটুখানি কোলে আসে। কখনো কোনো শিশু আমার বাড়ানো হাতে ঢুকে পড়ে, কোলে নিলে ইতিউতি চায়, বাচ্চার বাবা-মা তাই দেখে মিষ্টি করে হাসে। আমার ঐ হাসি দেখতে ভালো লাগে।

টেবিলে খাবার নিয়ে বসে আছি। এখন রাত, বাচ্চাদের পাবার সম্ভাবনা কম, ক্যাফেটেরিয়ায় অধিকাংশই পুরুষ আর কিছু গাট্টাগোট্টা মহিলা সম্পূর্ণ শরীর দিয়ে খাচ্ছে। শিশুদের খেতে দেখা আনন্দের কিন্তু বড়দের খাওয়ার দৃশ্য ভালো লাগে না দেখতে। বড় টিভিটায় ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক বা ডিসকভারি চ্যানেল খোলা, কোনো শব্দ ছাড়া যেগুলো দিনের পর দিন চলছে তো চলছে। আমি বোবা টিভির দিক থেকে চোখ সরিয়ে তাকাই ক্যাশ পেমেন্টের জায়গায়, ওখানে সাদা শার্ট পরা একজন দীর্ঘদেহী পুরুষ বিল দিচ্ছে।

লোকটার কাঁধ সুন্দর। কলারের সরু অংশ সুন্দরভাবে গলা জড়িয়ে আছে, কলারের চওড়া অংশটি চিবুকের নিচে, কণ্ঠকে ছুঁয়ে আছে রিমঝিম উষ্ণতায়। তারপর নিশ্চয়ই একটা খোলা বোতাম! কল্পনা করি, যদি আমি গলা জড়িয়ে ধরি তাহলে ঐ বোতামের জায়গায় থাকবে আমার মুখ, নাক ঘষতে ঘষতে হয়তো আমি বোতামটার কাছে চলে যেতে পারি। লোকটির পিঠ দেখতে দেখতে আমি মেরুদণ্ড বেয়ে নামি, কিছুক্ষণ থামি কোমরের বেল্টটায়, তারপর আরেকটু নিচে। অদূরের টেবিল থেকে অস্ফুট স্বরে বলি,

সুন্দর!

অনেকক্ষণ পর একলাই হেসে উঠি, ভাবা ছাড়া আর কিইবা করার আছে!

সাত.

হাতের মোবাইলটা ঝিনঝিন শব্দে কেঁপে কেঁপে জাগে। হয়তো মামা-মামি অথবা শ্বশুর-শাশুড়ি ফোন দিয়ে জানতে চাইবে শফিকের ভালো-মন্দের হাল-হকিকত। যখন বোঝা যায় রোগীর অবস্থার উন্নতি হবে অতি ধীরে অথবা সম্পূর্ণভাবে কখনই হবে না তখন মানুষের আগ্রহ মরে যায়। এক সময় প্রিয়জনরাও খোঁজ নেয় আবশ্যিকতার খাতিরে, শফিকের মা-বাবাও এ বছরে কয়বারই বা এসেছে!

দুর্ঘটনার পর অনেক আত্মীয়-স্বজন আসতো, মামা-মামি, শ্বশুর-শাশুড়ি, আমার মা-বাবা পর্যন্ত! একটা বড় অপারেশন শেষে প্রধানমন্ত্রী শফিককে দেখতে আসার পর দলে দলে লোক এসে কেবিন ভরে ফেলতো। আর ডা. রেজা! প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নিয়মিত খোঁজ রাখে, প্রতিবার হাসপাতালে ভর্তি হবার আগে থেকে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত অমায়িকভাবে সবকিছু জেনে নেয়। হয়তো এটাই তার কাজ বলে করে! হয়তো একটু মায়াও আছে! শফিকের চিকিৎসার খরচাপাতি সরকারি দপ্তর থেকে পাচ্ছে।

আড়াই বছর ধরে বারবার হাসপাতালে আনা-নেয়াতে এখন আর তেমন কেউ আসে না। শফিকের শারীরিক, মানসিক পরিস্থিতির উন্নতি বেশ মন্থর সেটা সবাই বুঝে গেছে ইতোমধ্যে, ওর মা-বাবা মাঝেমধ্যে আসে। সারা দিন থেকে সন্ধ্যার পর, কখনো এক-দুদিন থেকে বাড়ি চলে যায়। ইচ্ছে হয় অন্তত ঐ দুটো দিন হাসপাতাল ছেড়ে মামার বাসায় হাত পা ছড়িয়ে থাকি। যাই না। যদি মনে করে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছি! মোবাইলটা আবার ঝিনঝিন বেজে ওঠে।

ফোনে খোঁজ নেয়া খুব সহজ তাই না শাশুড়ি মা?

ফোনে কণ্ঠ কোমল করা খুব সহজ, তাই না বাবা-মা?

উত্তেজিত হয়ে পড়ি! বাজুক মোবাইল আজ, রিসিভ করবো না। একটার পর একটা খাবারের অর্ডার দিয়ে যতক্ষণ এই ক্যাফেটেরিয়ায় লোক থাকে ততক্ষণ বসে বসে তাদের দেখবো। শ্বাস ঘন হয়ে ওঠে, রাগে ক্ষোভে হৃৎপিণ্ডটা বাজে দ্রিম দ্রিম। হাতের মুঠোয় হাত চেপে আঙুল খুলছি আর বন্ধ করছি। টেবিলের ওপর মোবাইলটা আলো ছড়িয়ে কেঁপে কেঁপে ঘুরছে। কি দেখছি?

ভ্রæ জোড়া কুঁচকে গেল একটু, মনে হচ্ছে হসপিটালের নাম্বার, সাথে সাথে ফোনটা রিসিভ করি। কেউ বলছে,

: আপনি কোথায় আছেন? তাড়াতাড়ি কেবিনে আসেন! তাড়াতাড়ি!

কণ্ঠটায় ভয় আর উদ্বেগ মেশানো, আমাকে শিউরে দিলো। লিফটের দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে প্রশ্ন করি,

: কি হয়েছে? বলুন কি হয়েছে?

আমি লিফটের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ওটা গ্রাউন্ড ফ্লোর ছেড়ে যায়, পাশাপাশি তিনটা লিফটার প্রতিটা এখন ওপরে। সর্বোচ্চ তলায় পৌঁছে আবার গ্রাউন্ড ফ্লোরে আসতে আসতে ভয়ানক চিন্তায় আমার শরীর ছেড়ে দিলো। নার্সটি কি হয়েছে বললো না, ফোন কেটে দিলো। মনে হলো মেয়েটার আশপাশের নার্সরাও জোরে জোরে কিছু বলছিল ঐ সময়। খারাপ কিছু হয়নি তো! ভালোভাবেই তো শফিককে রেখে এসেছিলাম। খুব অস্থির লাগে, গায়ে এক চিলতে শক্তি নেই, হাত পা অবশ হয়ে জ্ঞান হারাবো এখনই। টলতে টলতে ফ্লোরে পৌঁছাই। আমাদের কেবিনের সামনে অনেক লোক, দরজা খুলে যাচ্ছে উল্টো পাশের অন্যান্য কেবিনের, স্টেশন থেকে ডাক্তার নার্স ছুটে ছুটে যাচ্ছে। কি হয়েছে ওর?

সমস্ত শক্তি একত্র করে দৌড় দেই রুমের দিকে। গলায় বিছানার চাদর পেঁচিয়ে ঝুলছে শফিক!

শফিকের দুই পা একজন ব্রাদার উঁচু করে ধরে আছে, আরেকজন ডাক্তার গিঁট খুলে বসিয়ে দিতে চেষ্টা করছে বিছানায়। ঘাড় ঝুলে যাওয়া শফিক খুব ধীরে ধীরে মাথা জাগিয়ে আবার মাথা ঝুলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ে। আমার চোখ ঘোলা হয়ে আসে, আবছা হয়ে ওঠে মানুষ- দেয়াল-আসবাব-জানালা। জ্ঞান হারাতে যাচ্ছি আমি।

এমন সময় কেউ যেন রেগে বললো

: আপনাকে তো বলেছি, এই পেশেন্টকে একলা রেখে কোথাও যাবেন না। আপনি গেলেন কেন? তার মানসিক সমস্যা আছে জানেন, তারপরও কাউকে না রেখে বাইরে গেলেন! আমরা একটা মিনিট দেরি করে ঢুকলে কি হতো বুঝতে পারছেন? ডাক্তার ভয়ানক খেপে গেছে

: আপনি কি রকম মানুষ?

হাত পা হিম হয়ে গেল আমার।

তাই তো! আমি কি রকম মানুষ? প্রশ্নটা হতভম্ব হয়ে মেঝেতে পড়ে পাক খেয়ে লোহা সিমেন্ট ফুঁড়ে আমাকে মাটির অতলে ঢুকিয়ে দেয়। মাথা দুলে ওঠে। কেবিনের সবকিছু মহাঘূর্ণির মতো ঘুরতে ঘুরতে চারপাশের দেয়ালে আছড়ে বিকট শব্দে প্রতিধ্বনি তুলতে শুরু করে। শুনি পুব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ-উপর-নিচ হতে প্রবল চিৎকার : তুমি কেমন মানুষ? তুমি কেমন মানুষ? ভয়ানক ধাক্কায় দেয়ালগুলো ভাঁজ হয়ে আমাকে তুমুলভাবে চেপে ধরে। দম নিতে কষ্ট হয়। বুকের ভেতর টনকে টন পাথরের স্ত‚প, শ্বাস আর টেনে তুলতে পারি না- ইচ্ছে হয় ভেঙেচুরে লুটিয়ে পড়ি। কিন্তু কোথায় পড়বো? নিচে চেয়ে দেখি আমার পায়ের তলায় মাটি নেই, মেঝে খুলে নিচে পড়ে গেছে। আমি ঝুলছি বাতাসে! আমি তলাহীন মানুষ, আমার মাটি নেই, শিকড় নেই! কেউ নেই!

চোখ মুখ উপচে জল ভেঙে পড়ে, তীব্র কষ্টে আর্তনাদ করতে করতে ডাকি

: মা! মা! ও মা!

কাকে ডাকি? মা কে? মা কি আছে? কোথায় আছে? কখন ছিল?

আট.

অনেকক্ষণ ধরে ফ্লোরে বসে আছি আর বিছানায় উল্টোদিকে মুখ করে শুয়ে আছে শফিক। মাথার ভার রাখতে না পেরে ঘাড় ছেড়ে দিলে কপাল ঢলে মেঝে ছুঁইছুঁই করে। চোখের পানি শেষ হয়ে শুকায় এখন, তন্দ্রামতো ঘোরঘোর, নিচে লুটিয়ে পড়া আমি।

হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। উঠে কোথায় আছি, রাত না দিন কিছু বুঝতে পারছিলাম না। বিছানার দিকে চোখ গেলে দেখি শফিকও এই ভোর সমাগত রাত্রিতে না ঘুমিয়ে তাকিয়ে আছে। দ্বিতীয়বারের মতো বেঁচে সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের জেরে যখন প্রায় প্রতিদিন হরতাল, ভাঙচুর, পুলিশের সাথে পিকেটারদের মারামারি, সে রকম কোনো একদিনে কতগুলো খ্যাপাটে পিকেটারদের সামনে পড়ে যায় শফিক। সম্মিলিত ৮-১০ জন লাঠি দিয়ে আঘাত করতে করতে ওকে একেবারে মেরেই ফেলবে সেই উন্মক্ততায় মাটিতে ফেলে, তারপর ঘাড় মাথা কোমরে চরমভাবে একের পর এক লাথি মারতে থাকে। হয়তো ও মারাই যেতো কিন্তু কোনোভাবে সরকার প্রধানের কাছে খবর চলে যায়, দ্রুতগতিতে একটা হেলিকপ্টার উড়ে আসে। তারপর হাসপাতাল আর অপারেশন। মানসিক শরীর আর মাংসের শরীর সম্পূর্ণ প্যারালাইজড হয়ে যেতে যেতে কোনো রকমে বেঁচে যায়।

এই প্রায় ভোর রাতে আমি মেঝেতে শরীর শক্ত করে আছি, শফিকের চোখের দিকে তীব্র দৃষ্টি হেনে দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে অপেক্ষা করি কয়েক মুহূর্ত। মাথার একপাশে ব্যথা করছে কিন্তু মন এখন আর অত ভারী নয়; বরং ঘুমের ভেতর- হয়তো স্বপ্নের ভেতর পেয়েছি কোনো উত্থানের শক্তি, ভেতরে তাই অনুভব করি। কোনো কিছুর পরোয়া করতে ইচ্ছে হয় না, টানটান লম্বা হয়ে সরাসরি শফিকের সামনে গিয়ে বলি

: আমি মা হতে চাই।

সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলে শফিক, মাথা উঁচু করতে পারে না। আমি জানি, সে পারবেও না তবু কিছু একটা শোনার জন্য অপেক্ষা করি। হ্যাঁ বা না- যে কোনো একটা কিছু! সেকেন্ড কেটে যায়, মিনিট কেটে যায়। কিছু একটা বলুক!

শুয়ে আছে শফিক, মেঝের দিকে আনত চোখ, একটু পর দু-পা গুটিয়ে অপর পাশে উল্টে শোয়।

তবে এই!

প্রচণ্ড চিৎকার যেন ঠিকরে বের হতে চায়!

আমার মা থেকেও ছিল না আর আমি মা হবার ক্ষমতা থাকতেও মা হতে পারবো না! মা আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে কিন্তু আমি তো ঐ মাকে দেখিয়ে দিতে চাই, এই দেখো আমি মা! আসল মা! আমি আমার সন্তানকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়ে তাকে জানাবো যে, এর নাম মাতৃত্ব! সন্তানকে নিয়ে আমার মায়ের সামনে গিয়ে বলবো, তুমি দেখো! আমাকে দেখো! এই মাকে দেখো! সন্তানের জন্য মায়ের টান দেখো।

আমি এর জন্য দীর্ঘ প্রতিক্ষা করে আছি শফিক, তোমার চুপ থাকা চলবে না, আমার উত্তর প্রয়োজন।

শফিকের নোয়ানো কাঁধ, আমি পাথরের খিলান, শত শাবল দিয়ে খুঁড়লেও জায়গা থেকে এক চুল সরবো না এখন। হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj